Monday, September 21, 2026

আপনি কি জানেন, ভারতের ইতিহাসে এমন এক রাজা ছিলেন, যাঁর একমাত্র শখ ছিল পাহাড়ের চূড়া থেকে জ্যান্ত হাতি ফেলে দিয়ে তাদের যন্ত্রণার চিৎকার শোনা?

 


৫১৫ খ্রিস্টাব্দ। উত্তর ভারতের সিংহাসনে বসল শ্বেত হুন বংশের এক নতুন আতঙ্ক—রাজা মিহিরকুল। মিহিরকুল শব্দের অর্থ ‘সূর্যের সন্তান’, কিন্তু তাঁর শিরায় বইত অন্ধকারের রক্ত। তিনি ছিলেন শিবের একনিষ্ঠ উপাসক (শৈব)।
তাঁর প্রতিটি মুদ্রায় খোদাই করা থাকত শিবের ত্রিশূল আর ষাঁড়ের (নন্দী) ছবি। তিনি নিজেকে পরম শৈব বলে অহংকার করতেন, কিন্তু শিবের শান্ত রূপ নয়, তাঁর ভেতরে বাস করত এক প্রলয়ংকরী ধ্বংসাত্মক রূপ। শিবের উপাসক এই অপরাজেয় ক্রূর রাজার জীবনে একটা গোপন কৌতূহল ছিল—তিনি বৌদ্ধ ধর্মের রহস্যময় আধ্যাত্মিক শক্তির উৎসটা জানতে চেয়েছিলেন।
ঠিক এই জায়গাতেই শুরু হয় সেই খেলা, যা পুরো ভারতের মানচিত্র বদলে দিয়েছিল।
রাজা পরম অহংকারে বৌদ্ধ সংঘের কাছে চরম বার্তা পাঠালেন—"আমার প্রাসাদে একজন পরম জ্ঞানী বৌদ্ধ পণ্ডিতকে শিক্ষক হিসেবে পাঠাও, আমি দীক্ষা নেব।" বার্তাটি পাওয়া মাত্রই বৌদ্ধ মঠগুলোতে তীব্র আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ল। কারণ ভিক্ষুরা জানতেন, মিহিরকুলের মেজাজ কতটা উগ্র। কোনো বড় পণ্ডিত তাঁর রাজসভায় গিয়ে নিজের জীবন বাজি রাখতে রাজি হলেন না।
আর ঠিক তখনই, বৌদ্ধ সংঘ এমন এক মারাত্মক সিদ্ধান্ত নিল, যা ছিল আত্মঘাতী।
রাজার দরবারে এমন একজন ভিক্ষুকে পাঠানো হলো, যিনি অতীতে ওই প্রাসাদে মিহিরকুলেরই সাধারণ জুতো পরিষ্কার করার চাকর ছিলেন! সংঘ ভেবেছিল, এই ভিক্ষু রাজপ্রাসাদের সবকিছু চেনেন, তাই নিরাপদ। কিন্তু তারা এই পরম শৈব রাজার অহংকারকে মাপতে ভুল করেছিল।
পাঠশালা চলাকালীন হঠাতই রাজার চোখ গেল সেই শিক্ষকের পুরনো ক্ষতের দিকে। চাবুকের সেই দাগ দেখেই মিহিরকুল চিনে ফেললেন—এ তো তাঁরই পুরনো কৃতদাস! এক মুহূর্তের জন্য স্তব্ধ হয়ে গেল পুরো রাজসভা।
একজন সামান্য চাকর আজ রাজার মাথার ওপর বসে তাঁকে জ্ঞান দিচ্ছে? এই চরম অপমান মিহিরকুলের ভেতরের পিশাচটাকে জাগিয়ে তুলল। রাজসভার মাঝেই তরবারি উঁচিয়ে গর্জে উঠলেন তিনি—"এই ধৃষ্টতার শাস্তি পুরো ভারতবর্ষ পাবে! এই মাটি থেকে আমি বৌদ্ধ ধর্মের নাম নিশানা মুছে দেবো।"
৫২০ খ্রিস্টাব্দ। কোনো আগাম সতর্কবার্তা ছাড়াই, মিহিরকুলের হুন বাহিনী ক্ষ্যাপা নেকড়ের মতো ঝাঁপিয়ে পড়ল গান্ধার ও পাঞ্জাব অঞ্চলে। শিবের উপাসক মিহিরকুল এবার নিজের তলোয়ারকে বৌদ্ধদের রক্তে স্নান করাতে লাগলেন।
চোখের পলকে গুঁড়িয়ে দেওয়া হলো শতাব্দী ধরে গড়ে ওঠা প্রায় ১,৬০০টি পবিত্র বৌদ্ধ মঠ ও স্তূপ! অমূল্য সব প্রাচীন লাইব্রেরিতে আগুন লাগিয়ে দেওয়া হলো। কিন্তু আসল বিভীষিকা তখনো বাকি ছিল।
হাজার হাজার বৌদ্ধ ভিক্ষু এবং পণ্ডিতদের লাইনে দাঁড় করিয়ে সিন্ধু নদের তীরে নিয়ে আসা হলো। তারপর? শুরু হলো ইতিহাসের নির্মমতম গণহত্যা। শত শত তরবারির এক কোপে মাথাগুলো ছিটকে পড়তে লাগল সিন্ধু নদের বুকে। ঐতিহাসিক হিউয়েন সাং-এর ডায়েরি অনুযায়ী, সিন্ধু নদের জল সেদিন আর জল ছিল না, তা হয়ে উঠেছিল টকটকে লাল রঙের এক রক্তের স্রোত। নদী দিয়ে বয়ে যাচ্ছিল শুধু ছিন্ন ভিন্ন লাশ।
মিহিরকুল ভাবলেন, তিনি অপরাজিত। কিন্তু তিনি জানতেন না, এই রক্তই ভারতের বাকি রাজাদের ঘুম উড়িয়ে দেবে এবং এক চরম প্রতিশোধের জন্ম দেবে।
৫২৮ খ্রিস্টাব্দ। মালবের মহাশক্তিমান রাজা যশোধর্মন এবং মগধের গুপ্ত সম্রাট নরসিংহগুপ্ত বালাদিত্য গোপনে হাত মেলালেন। তৈরি হলো এক বিশাল সম্মিলিত অক্ষবাহিনী। মান্দাসোরের যুদ্ধক্ষেত্রে মুখোমুখি হলো দুই পক্ষ। যে হুন বাহিনীকে এর আগে কেউ ছুঁতেও পারেনি, ভারতীয় রাজাদের যৌথ চক্রবূহের সামনে তারা খড়কুটোর মতো উড়ে গেল।
যুদ্ধের শেষে ধুলো উড়তেই দেখা গেল এক অবিশ্বাস্য দৃশ্য। যে মিহিরকুলের পায়ের নিচে লক্ষ মানুষ মাথা নত করত, সেই মিহিরকুল আজ লোহার শৃঙ্খলে বন্দী হয়ে হাঁটু গেঁড়ে বসে আছেন রাজা যশোধর্মনের পায়ের কাছে!
কিন্তু গল্প এখানেই শেষ নয়। আসল টুইস্ট তো এরপরে!
সম্রাট বালাদিত্য যখন মিহিরকুলের মৃত্যুদণ্ড দিতে চাইলেন, তখন বালাদিত্যের মা দয়াবশত এই নিষ্ঠুর রাজার প্রাণ ভিক্ষা চাইলেন। মিহিরকুলকে মুক্ত করে দেওয়া হলো। মুক্ত হয়ে এই পিশাচ কাশ্মীর রাজ্যে গিয়ে আশ্রয় নিলেন। এবং ঠিক এক বছরের মাথায়, যে রাজা তাঁকে আশ্রয় দিয়েছিলেন, তাঁকেই পেছন থেকে হত্যা করে মিহিরকুল কাশ্মীর দখল করে নিলেন!

কিন্তু প্রকৃতির বিচার অলঙ্ঘ্য। ৫৩৩ খ্রিস্টাব্দে এক অদ্ভুত ও রহস্যময় চর্মরোগে আক্রান্ত হয় মিহিরকুলের পুরো শরীর। পচে যেতে থাকে তাঁর চামড়া। নিজের শরীরের যন্ত্রণায় ছটফট করতে করতে তিলে তিলে নারকীয় মৃত্যু হয় এই নিষ্ঠুর শাসকের। মিহিরকুলের তলোয়ার আজ মাটির নিচে হারিয়ে গেছে, কিন্তু সিন্ধু নদের সেই লাল জলের দাগ ইতিহাস কোনোদিন ভুলতে পারেনি।

Tong Daing Ne

No comments:

Post a Comment