Sunday, September 20, 2026

মেসকেনেত

 


মেসকেনেত— মানুষের মাথাওয়ালা দুটো চারকোণা থান ইট। ইটের দেবী মেসকেনেত।
ইট না বলে একে পিঁড়ি ও বলা যায়। কারণ এর ওপরই পা রেখে হাঁটুতে ভর দিয়ে বসেন নারীরা। সন্তান জন্ম দিতে। ঠিক যেভাবে আমরা লো কমোডে বসি, অনেকটা সেরকম।
দুপাশে আরও দুজন নারী প্রসবকারীর হাত অথবা কাঁধের ভর ধরে রাখেন। ধরে রাখেন বলেই তারা ধাত্রী বা প্রসবে সহায়তাকারী।
মিশরের প্রসূতি সুরক্ষার দেবী মেসকেনেতের আরাধনার আরও বহুকাল আগে থেকে এই হাঁটুতে ভর দিয়ে বসাটাই ছিল নারীদের সন্তান জন্ম দেওয়ার নিয়ম। এতে করে সন্তান প্রসবে মধ্যাকর্ষন বলের সহায়তা পাওয়া যেতো।
প্রসবের এই দৃশ্যটি আমাদের কল্পনা করতে বেশ অসুবিধা হয়। কারণ আমাদের প্রজন্মের স্মৃতিতে প্রসবদৃশ্যে মায়ের অবস্থান থাকে মাটির সঙ্গে সমান্তরাল, বড়জোর কিছুটা ঢালু, কখনোই উলম্ব নয়।
ধারণা করা হয়, চিকিৎসা শাস্ত্রে পুরুষের আধিপত্য প্রতিষ্ঠার সময় থেকে এই সমান্তরাল প্রসব অবস্থানের সূত্রপাত। কারণ সেই আধিপত্য প্রতিষ্ঠা হয়েছিল চার্চের ডিক্রি অনুসারে, জীববিজ্ঞান অনুসারে নয়।
ফ্রাঁসোয়া মরিসিউ, ১৭ শতকে ফ্রান্সের বিখ্যাত প্রসূতিবিদ্যা বিশেষজ্ঞ। লিখিত নথি অনুযায়ী তিনিই প্রথম চিকিৎসক যে এই শোয়ানো প্রসব পদ্ধতি জনপ্রিয় করে তুলতে ভূমিকা রেখেছিলেন। আমেরিকান জার্নাল অব পাবলিক হেলথ, "দ্য এভোলিউশন অব মেটারনাল পস্চার ডিউরিং লেবার অ্যান্ড ডেলিভারি" — এই গবেষণায় বিশ্লেষণ করা হয়েছে কীভাবে মরিসিউয়ের মতামত ইউরোপের ঐতিহ্যবাহী খাড়া বা বসার ভঙ্গি পরিবর্তন করে চিত হয়ে শুয়ে প্রসবের পদ্ধতিকে জনপ্রিয় করে তুলেছিল।
মরিসিউ তাঁর বইয়ে যুক্তি দেন, মাথা ও বুক সামান্য উঁচু করে চিত হয়ে বিছানায় শুয়ে সন্তান জন্ম দেওয়াই একজন গর্ভবতী নারীর জন্য "সবচেয়ে ভালো এবং নিরাপদ" পদ্ধতি। এতে প্রসূতি স্বাচ্ছন্দ্যে শ্বাস নিতে ও জোর দিতে পারেন, এবং চিকিৎসকের জন্যও প্রসব করানো সহজ হয়। বলাই বাহুল্য, তিনি একথা লেখার আগে প্রসূতিদের মতামত নিয়েছিলেন কি না জানা যায় নি।
এখানে শেষোক্ত "চিকিৎসকের জন্য সহজ হয়" কথাটি গুরুত্বপূর্ণ। কারণ এই হাজার বছরের ঐতিহ্যবাহী পদ্ধতির পরিবর্তে নতুন পদ্ধতি প্রচলনের পেছনে প্রভাবশালী শক্তিও কার্যকর ছিলো।
ফ্রান্সের রাজা চতুর্দশ লুই এর পছন্দের কাজ ছিলো সন্তান প্রসব দেখা। আমেরিকান জার্নাল অব পাবলিক হেলথ এ বলা হয়েছে, প্রসবের সময় দৃশ্য বাধাগ্রস্ত না করে সরাসরি দেখার সুবিধার্থেই রাজা চতুর্দশ লুই শুয়ে প্রসবের ভঙ্গি উৎসাহিত করেছিলেন। যা পরবর্তীতে ফরাসি রাজ পরিবার ও অভিজাত সমাজে ফ্যাশনে পরিণত হয়। রাজা চতুর্দশ লুইয়ের স্ত্রী রানি মারিয়া তেরেসা এবং তাঁর প্রেমিকা মাদাম দ্য মন্তেসপাঁর সন্তান জন্মের বিবরণী থেকেও একই কথা জানা যায়।
রাজা চতুর্দশ লুইয়ের রাজকীয় প্রসূতিবিদ হিসেবে কাজ করতেন পুরুষ চিকিৎসক জুলিয়ান ক্লেমেন্ট। মরিসিউ যদিও রাজপরিবারের চিকিৎসক ছিলেন না তবে ইউরোপজুড়ে বিখ্যাত ছিলেন। রাজপরিবার এবং অভিজাতদের মধ্যে ছড়িয়ে পড়া এই ফ্যাশন পরবর্তীতে চিকিৎসা শাস্ত্রে জনপ্রিয় করে তোলেন মরিসিউ।
ততদিনে উইচ হান্টিং প্রায় শেষের দিকে। ফলে ধাত্রীবিদ্যা, বা ধাত্রীবিদ্যায় অভিজ্ঞ নারীদের কুসংস্কার বা ডাইনী বলে বাদ করে দেওয়া হয়েছে ইউরোপ থেকে। চার্চ ডিক্রি জারি করেছে "পুরুষ চিকিৎসকের সাহায্য ব্যতীত কোনো নারী কোনো শারীরিক সমস্যা থেকে মুক্তি লাভ করলে সে ডাইনী এবং তাকে হত্যা করতে হবে"।
এরপর চিকিৎসা শাস্ত্র হয়ে ওঠে যা কিছু পুরুষ চিকিৎসকের জন্য সহজ হয়। প্রসবকালীন জীববিজ্ঞান বা পদার্থবিজ্ঞান অপেক্ষা, ধাত্রীর আবহমান জ্ঞান অপেক্ষা এনজিওর প্রশিক্ষক সেই ২০০ বছর আগের চার্চের ডিক্রি, কিংবা এক রাজার বিনোদন আকাঙ্ক্ষার বদৌলতে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠেন।
এ তো গেলো মিশর আর ফ্রান্সের গল্প। ভারতের প্রসব পদ্ধতি আরও উলম্ব। জাদুঘরের প্রাচীন ভাস্কর্য হোক কিংবা মন্দিরের টেরাকোটাই হোক, ভারতের নারীরা তাতে সন্তান জন্ম দিচ্ছেন দেবী আসন বা উৎকট কোণাসনে, দাঁড়িয়ে। দুই পাশে প্রসবকারীর হাত বা কাঁধের ভর ধরে আছেন দুজন ধরনী বা ধাত্রী।
কোনো কোনো ভাস্কর্যে নীচের দিকে আরও একজনকে দেখা যায় যিনি যোনী নির্গত নবজাতকের মাথা ধরেন।
সিদ্ধার্থের জন্মের গল্পেও পাওয়া যায়, মায়াদেবী একটা অশোক গাছের ডাল ধরে দাঁড়িয়ে ছিলেন। সেই অবস্থাতেই সিদ্ধার্থ জন্ম নেন।
নারীর আবহমান ও সামাজিক জ্ঞান ও জ্ঞানচর্চার ওপর ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের পৃষ্ঠপোষকতায় পুরুষতান্ত্রিক পুঁজিবাদের আগ্রাসন পৃথিবীর প্রায় সব জনপদেই চিকিৎসা শাস্ত্রের বয়ানকে বদলে দিয়েছে। ধাত্রীবিদ্যা তার সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য অধ্যায়।
-নুসরাত জাহান


No comments:

Post a Comment