এই একুশ শতকেও কোটি কোটি মানুষ বিশ্বাস করে যে আমাদের এই পৃথিবী নিয়ন্ত্রণ করছে এমন একদল রূপ পরিবর্তনকারী সরীসৃপ, যারা মানুষের রূপ ধরে ক্ষমতার শীর্ষে বসে আছে। আজ আমি ট্রে দ্য এক্সপ্লেইনার চ্যানেলের রেপটিলিয়ান কনস্পিরেসি নিয়ে তৈরি করা একটি ভিডিও দেখলা, যেখানে মূলত এই তত্ত্বের পেছনের ইতিহাস তুলে ধরা হয়েছে।
তো ভিডিওটি দেখার সময় আমার মাথায় যে প্রশ্নটা ঘুরছিল তা হল, মানুষ কেন এই অদ্ভুত তত্ত্বে এত প্রবলভাবে বিশ্বাস করে। ভিডিওটি খুব সুন্দরভাবে উনিশ শতকের ত্রিশের দশকের লস অ্যাঞ্জেলেস টাইমসের একটি রিপোর্টের কথা তুলে ধরেছে কিন্তু আমার কাছে মনে হয়েছে এই ষড়যন্ত্র তত্ত্বের শিকড় আরও অনেক গভীরে প্রোথিত যা সাধারণ দৃষ্টিভঙ্গি দিয়ে পুরোপুরি বোঝা সম্ভব নয়।
তাই আমি সিদ্ধান্ত নিয়েছি এই ভিডিওর তথ্যের পাশাপাশি আমার নিজস্ব গবেষণা এবং রহস্যবিদ্যার কিছু চমকপ্রদ ডেটা আপনাদের সামনে তুলে ধরব যা হয়তো আপনাদের চিন্তার জগতকে পুরোপুরি নাড়িয়ে দেবে।
ভিডিওটির শুরুতেই জর্জ ওয়ারেন শুফেল্ট নামের একজন মাইনিং ইঞ্জিনিয়ারের কথা বলা হয়েছে যিনি দাবি করেছিলেন যে তিনি রেডিও এক্সরে মেশিনের সাহায্যে লস অ্যাঞ্জেলেস শহরের নিচে ফোর্ট মুর হিলের তলদেশে সরীসৃপদের তৈরি করা এক বিশাল ভূগর্ভস্থ শহরের সন্ধান পেয়েছেন। শুফেল্টের দাবি অনুযায়ী এই শহরে প্রচুর সোনার পাত এবং অমূল্য সম্পদ লুকানো ছিল। তিনি লিটল চিফ গ্রিনলিফ নামের একজন কল্পিত আদিবাসী চরিত্র এবং কাল্পনিক কিছু উপকথার সাহায্য নিয়ে এই দাবি করেছিলেন যে পাঁচ হাজার বছর আগে একদল বুদ্ধিমান টিকটিকি মানব এই শহরটি নির্মাণ করেছিল। এমনকি তিনি এও বলেছিলেন যে এই সরীসৃপ প্রজাতির নয় বছর বয়সী শিশুরা বর্তমান যুগের কলেজ গ্র্যাজুয়েটদের সমান বুদ্ধিমত্তার অধিকারী ছিল। ইতিহাস ঘাঁটলে দেখা যায় সেই সময়টা ছিল চরম অর্থনৈতিক মন্দার কাল।
মজার ব্যাপার হলো শুফেল্ট এর আগে দাবি করেছিলেন যে তিনি স্প্যানিশ দিগ্বিজয়ীদের ফেলে যাওয়া সোনা খুঁজছেন কিন্তু যখন তিনি কিছুই পেলেন না এবং মানুষের হাসির পাত্রে পরিণত হলেন তখন তিনি নিজের গল্প পরিবর্তন করে এই টিকটিকি মানবের উপকথা তৈরি করেন।
তিনি মূলত জুনি উপজাতির একটি সাধারণ সৃষ্টিতত্ত্বকে বিকৃত করেছিলেন যেখানে বলা হয়েছিল আদিম মানুষ একসময় গুহায় বাস করত এবং তারা পশুদের মতো আচরণ করত। শুফেল্ট এই সাধারণ গল্পটির সাথে রবার্ট ই হাওয়ার্ড এবং এইচ পি লাভক্র্যাফটের মতো লেখকদের পাল্প ফিকশন থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে একটি নিখুঁত কল্পকাহিনী তৈরি করেছিলেন। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় হলো শুফেল্টের সেই ভুয়া গল্পটি কালের গহ্বরে হারিয়ে যাওয়ার বদলে ধীরে ধীরে এক বিশাল ষড়যন্ত্র তত্ত্বে রূপান্তরিত হয়েছে।
এখানেই রহস্যবিদ্যার আসল খেলা শুরু হয়। নব্বইয়ের দশকে ডেভিড আইকের মতো কনস্পিরেসি থিওরিস্টরা এই ধারণাটিকে মূলধারায় নিয়ে আসেন এবং দাবি করেন যে আলফা ড্রাকোনিস নক্ষত্রমণ্ডল থেকে আসা এই সরীসৃপ এলিয়েনরা সুমেরীয় সভ্যতার অ্যানুনাকিদের সাথে সম্পর্কিত। আইকের মতে এই মহাবিশ্ব মূলত কম্পন বা ভাইব্রেশনাল এনার্জি দিয়ে তৈরি এবং এই রেপটিলিয়ান বা আর্খনরা অন্য এক ডাইমেনশন বা মাত্রা থেকে আমাদের পৃথিবীতে প্রবেশ করেছে। তিনি অত্যন্ত জোরালোভাবে দাবি করেন যে ব্রিটিশ রাজপরিবার থেকে শুরু করে জর্জ বুশ এবং রথসচাইল্ড পরিবারের মতো বিশ্বের শীর্ষ ক্ষমতাধর এলিটরা মূলত এই রেপটিলিয়ান রক্তের উত্তরাধিকারী। ডেভিড আইক দাবি করেন যে এই রেপটিলিয়ানরা মানুষের ভয় থেকে উৎপন্ন নেতিবাচক শক্তি বা লো ভাইব্রেশনাল এনার্জি গ্রহণ করে বেঁচে থাকে কারণ তারা আবেগহীন এবং শীতল রক্তের প্রাণী। এই থিওরি অনুযায়ী তারা মানুষের শরীরকে একটি মায়ার মতো ব্যবহার করে এবং নির্দিষ্ট কিছু অতীন্দ্রিয় আচারের মাধ্যমে নিজেদের মানব রূপ ধরে রাখে।
আইকের এই ধারণার সাথে প্রাচীন নস্টিক বা জ্ঞানতাত্ত্বিক টেক্সট বিশেষ করে নাগ হাম্মাদি লাইব্রেরির পাণ্ডুলিপিগুলোর এক অদ্ভুত মিল পাওয়া যায়। সেই পাণ্ডুলিপিগুলোতে আর্খন নামক সত্তাদের কথা বলা হয়েছে যারা মহাবিশ্বের আদিম পদার্থ দিয়ে এমন এক মায়া বা ম্যাট্রিক্স তৈরি করেছে যেখানে মানুষের আত্মাকে বন্দি করে রাখা হয়েছে। এই আর্খনরা মানুষের আত্মিক উন্নতিতে বাধা দেয় এবং তাদেরকে মায়ার জগতে আটকে রেখে নিজেদের আধিপত্য বজায় রাখে।
এই তত্ত্বের সাথে প্রাচীন মেসোপটেমিয়ার উবাইদ পিরিয়ডের কিছু রহস্যময় মাটির মূর্তির কথা বারবার উঠে আসে। প্রত্নতাত্ত্বিকরা ইরাকে সাত হাজার বছরের পুরনো এমন কিছু মূর্তি আবিষ্কার করেছেন যেগুলোর মাথা টিকটিকি বা সাপের মতো লম্বাটে এবং চোখগুলো কফি বিনের মতো। প্রাচীন এলিয়েন তত্ত্বে বিশ্বাসীরা দাবি করেন যে এগুলো কোনো কাল্পনিক চরিত্র নয় বরং এগুলো সেইসব সরীসৃপদের বাস্তব প্রতিকৃতি যাদের সাথে প্রাচীন মানুষের সরাসরি যোগাযোগ ছিল।
কিন্তু আমরা যদি একজন বিশ্লেষক এর দৃষ্টিকোণ থেকে বিষয়টিকে দেখি তবে বুঝতে পারব যে এই মূর্তিগুলো মূলত প্রাচীন মানুষের শৈল্পিক কল্পনার বহিঃপ্রকাশ। এগুলো হতে পারে কোনো বিশেষ ধর্মীয় আচার অনুষ্ঠানের মুখোশ কিংবা শিশুদের মাথার খুলি লম্বা করার যে কৃত্রিম প্রচলন সেই যুগে ছিল তার শৈল্পিক রূপ। এগুলো কোনোভাবেই ভিনগ্রহের প্রাণীর অকাট্য প্রমাণ হতে পারে না।
এছাড়া জেকারিয়া সিচিনের অনুবাদ করা সুমেরীয় মাটির ফলকগুলোর কথা এখানে উল্লেখ না করলেই নয়। সিচিন দাবি করেছিলেন যে নিবিরু নামক গ্রহ থেকে অ্যানুনাকিরা পৃথিবীতে এসেছিল সোনা উত্তোলনের জন্য এবং তারা আদিম মানুষের ডিএনএ পরিবর্তন করে নিজেদের দাস হিসেবে ব্যবহার করার জন্য এক নতুন মানব প্রজাতি তৈরি করেছিল। যদিও মূলধারার ইতিহাসবিদরা সিচিনের এই দাবিগুলোকে সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন বলে উড়িয়ে দিয়েছেন কিন্তু কনস্পিরেসি থিওরিস্টদের কাছে এটি একটি অকাট্য প্রমাণ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়ে গেছে। তারা বিশ্বাস করে যে সেই প্রাচীন অ্যানুনাকিরাই হলো আজকের এই রেপটিলিয়ান যারা গোপনে মানুষের মাঝে লুকিয়ে থেকে পুরো মানব সমাজকে নিয়ন্ত্রণ করছে। তারা বিশ্বাস করে যে প্রাচীন যুগের দেবতারা আসলে ভিনগ্রহ থেকে আসা এই সরীসৃপরাই ছিল যারা আকাশ থেকে নেমে এসে মানুষের ওপর রাজত্ব কায়েম করেছিল।
ইতিহাস এবং বিভিন্ন ধর্মের প্রাচীন পাণ্ডুলিপিগুলো বিশ্লেষণ করলে আমরা দেখতে পাই যে সরীসৃপ বা সাপের প্রতি মানুষের এক অদ্ভুত এবং চিরন্তন আকর্ষণ রয়েছে। হিন্দু এবং বৌদ্ধ পুরাণে নাগা নামক এক অর্ধ সর্প এবং অর্ধ মানব জাতির কথা বলা হয়েছে যারা পাতাল নামক এক ভূগর্ভস্থ জগতে বাস করে।
একইভাবে হিব্রু বাইবেলে গার্ডেন অফ ইডেনের সেই সাপের কথা বলা হয়েছে যে ইভকে নিষিদ্ধ ফল খেতে প্ররোচিত করেছিল। প্রাচীন এলিয়েন তত্ত্বে বিশ্বাসীরা দাবি করেন যে এই সাপটি আসলে একটি হিউম্যানয়েড রেপটিলিয়ান ছিল যাকে ঈশ্বর পরে অভিশাপ দিয়ে বুকে হাঁটার শাস্তি দিয়েছিলেন। এছাড়াও বাইবেলে বর্ণিত সেরাফিমদের কথা বলা হয় যাদের আক্ষরিক অর্থ হলো জ্বলন্ত উড়ন্ত সাপ।
মেসোপটেমিয়ার গিলগামেশ মহাকাব্যেও আমরা দেখতে পাই যে একটি সাপ গিলগামেশের কাছ থেকে যৌবন ধরে রাখার জাদুকরী গাছটি চুরি করে নিয়ে যায় এবং নিজের খোলস পাল্টানোর ক্ষমতা লাভ করে।
ভিডিওটিতে খুব চমৎকারভাবে ব্যাখ্যা করা হয়েছে যে প্রাচীন যুগের মানুষ তাদের চারপাশের প্রাকৃতিক রহস্যগুলোকে ব্যাখ্যা করার জন্যই নিজেদের কল্পনাশক্তির সাহায্যে এই ধরনের মিথ বা রূপকথার জন্ম দিয়েছিল। গ্রিক পুরাণের মেডুসার কথাও চিন্তা করুন যিনি একসময় ঘোড়ার মতো দেখতে এক প্রাণী ছিলেন কিন্তু মানুষের মুখে মুখে তার গল্প পরিবর্তিত হয়ে তিনি সাপের চুল বিশিষ্ট এক দানবীতে পরিণত হন। মানুষ যুগ যুগ ধরে তাদের কল্পনার রঙ মিশিয়ে রূপকথাগুলোকে এমনভাবে সাজিয়েছে যে আধুনিক যুগের মানুষ সেগুলোকে আক্ষরিক অর্থে গ্রহণ করে বিভ্রান্ত হচ্ছে।
একজন বিশ্লেষক হিসেবে আমি বিষয়টিকে আরেকটু ভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে দেখতে চাই। বিখ্যাত মানসিক কার্ল ইয়ুংয়ের আর্কিটাইপ তত্ত্ব অনুযায়ী সরীসৃপ হলো মানুষের অবচেতন মনে লুকিয়ে থাকা আদিম ভয় এবং মন্দের একটি প্রতীক। মানুষের মস্তিষ্কের একটি প্রাচীন অংশ রয়েছে যাকে রেপটিলিয়ান ব্রেইন বলা হয় যা মূলত আমাদের টিকে থাকার প্রবৃত্তি এবং আক্রমণাত্মক আচরণের জন্য দায়ী।
যখন আমরা দেখি যে সমাজের সবচেয়ে ক্ষমতাধর মানুষগুলো সাধারণ মানুষের প্রতি কোনো ধরনের সহানুভূতি ছাড়াই অত্যন্ত নিষ্ঠুর এবং স্বার্থপরের মতো কাজ করে যাচ্ছে তখন আমাদের অবচেতন মন সেই নিষ্ঠুরতাকে ব্যাখ্যা করার জন্য তাদেরকে মানুষ হিসেবে ভাবতে অস্বীকার করে। আমরা অবচেতনভাবেই তাদেরকে এমন এক ঠান্ডা রক্তের সরীসৃপ হিসেবে কল্পনা করি যাদের মধ্যে কোনো মানবিক আবেগ বা সহানুভূতি নেই। রেপটিলিয়ান কনস্পিরেসি আসলে কোনো ভিনগ্রহের প্রাণীর গল্প নয় বরং এটি হলো আমাদের রাজনৈতিক এবং সামাজিক কাঠামোর মধ্যে লুকিয়ে থাকা চরম নিষ্ঠুরতা এবং অমানবিকতার একটি মানসিক প্রতিচ্ছবি।
ইতিহাসের পাতা উল্টালে দেখা যায় এই ধরনের ষড়যন্ত্র তত্ত্বগুলো মূলত সমাজের গভীরে লুকিয়ে থাকা বৈষম্য এবং অবিচার থেকে জন্ম নেয়। যখন সাধারণ মানুষ বুঝতে পারে না যে কেন তাদের সাথে এত অন্যায় হচ্ছে তখন তারা এক অদৃশ্য শত্রুর কল্পনা করে নেয়। অতীতের অ্যান্টি সেমিটিজম বা ইহুদি বিদ্বেষের সাথে এই রেপটিলিয়ান থিওরির এক অদ্ভুত এবং ভীতিকর মিল রয়েছে
Touhidul Islam
No comments:
Post a Comment