আমার স্ত্রী নাবিলাকে আমি গত পাঁচ বছর ধরে চিনি, তার শরীরের প্রতিটি তিল এবং মুখের হাসির ভাঁজ আমার মুখস্থ; অথচ গত এক সপ্তাহ ধরে আমার পাশে যে নারী শুয়ে থাকে, সে যে নাবিলা নয়, বরং নাবিলার মতো হুবহু দেখতে অন্য কোন অপরিচিত মানুষ, এই সত্যটা আমি ছাড়া দুনিয়ার কেউ বিশ্বাস করছে না।
আজ সকালেও সে রান্নাঘরে দাঁড়িয়ে চা বানাচ্ছিল। ধোঁয়া ওঠা লাল চা, চিনি ছাড়া, ঠিক অল্প একটু আদা দিয়ে, যেভাবে আমি খেতে পছন্দ করি।
সে যখন আমার দিকে চায়ের কাপটি বাড়িয়ে দিল, আমি তার হাতের দিকে তাকালাম। নাবিলার ডান হাতের অনামিকায় একটা ছোট কালো তিল আছে। এই মেয়েটির হাতেও ঠিক একই জায়গায় একই তিল। সে হালকা হেসে বলল, "আফিফ, চা ঠান্ডা হয়ে যাচ্ছে। কী দেখছ অত?"
তার গলা, কথা বলার ধরন, চোখের পাতা ফেলার ভঙ্গি, সবকিছু হুবহু নাবিলার মতো। কিন্তু তার চোখের দিকে তাকালেই আমার চামড়ার নিচে এক ধরনের হিমশীতল অস্বস্তি দৌড়ে যায়। ওই চোখে ভালোবাসা নেই। ওই চোখে রয়েছে এক গভীর, গোপন আতঙ্ক এবং একটা অজানা অপরাধবোধ।
আমার স্ত্রী নাবিলা আমাকে ভালোবাসত এক অন্ধ, সরল নির্ভরতায়। আর এই নারী আমাকে দেখে এমনভাবে, যেন সে যেকোনো মুহূর্তে চিৎকার করে উঠতে পারে, অথচ নিজের অস্তিত্ব বাঁচানোর জন্য জোর করে হাসছে।
আমি ধীরহাতে চায়ের কাপটা নিলাম। চুমুক দিয়ে বললাম, "বাইরে খুব বৃষ্টি হচ্ছে, তাই না?"
"হুম, সকাল থেকেই তো নামল," সে হালকা নিঃশ্বাস ফেলে জানালার দিকে তাকাল। ধানমন্ডির ছয় তলার এই ফ্ল্যাটের বারান্দা থেকে বাইরের মেঘলা আকাশ আর ভিজতে থাকা কদম গাছটা স্পষ্ট দেখা যায়।
আমি মনে মনে বললাম, তুমি যে-ই হও না কেন, তুমি আমার নাবিলা নও। তুমি রূপ বদলে আমার ঘরে ঢুকেছ। আর আমার আসল নাবিলা কোথায়, তা আমি বের করবই।
আমাদের বিয়ে হয়েছিল পাঁচ বছর আগে। সংসারের প্রথম চার বছর ছিল এক অপূর্ব রূপকথার মতো। নাবিলা একটা ইন্টেরিয়র ডিজাইন ফার্মে কাজ করত, আর আমি একটা বহুজাতিক কোম্পানির সিনিয়র আর্কিটেক্ট। আট মাস আগে ময়মনসিংহ হাইওয়েতে এক ভয়াবহ সড়ক দুর্ঘটনায় আমি মারাত্মক আহত হই। আমার মাথায় প্রচণ্ড আঘাত লেগেছিল, কয়েকদিন লাইফ সাপোর্টেও থাকতে হয়েছিল।
পরবর্তী কয়েক মাস নাবিলা দিন-রাত এক করে আমার সেবা করেছে। আমি সুস্থ হয়ে ঘরে ফিরেছি ঠিকই, কিন্তু আমার মস্তিষ্কের কিছু স্মৃতি এবং অনুভূতির তার যেন ছিঁড়ে গিয়েছিল। চিকিৎসক কিছু কড়া নিউরোলজিক্যাল ওষুধ দিয়েছিলেন।
কিন্তু গত এক সপ্তাহ ধরে আমি ওই ওষুধগুলো খাওয়া বন্ধ করে দিয়েছি। কারণ আমার প্রবল সন্দেহ, এই নতুন নারীটিই আমাকে ভুলিয়ে-ভালিয়ে ওই কড়া রাসায়নিকগুলো খাইয়ে মাথা ঝিমঝিম করিয়ে রাখে, যাতে আমি আসল সত্যিটা ধরতে না পারি।
গত রাতেও সে আমার খুব কাছে এসেছিল।
বাইরে তখন ঝুম বৃষ্টির শব্দ। ঘরের নরম আলোয় সে যখন পাতলা সিল্কের নাইটগাউন পরে এসে আমার পাশে বসল, তার ভেজা চুল আর চন্দনের সুবাসে ঘরটা ভরে গিয়েছিল। সে আমার বুকে মাথা রাখল, তার উষ্ণ শ্বাস আমার গলায় এসে লাগছিল।
সে আমার শার্টের বোতাম খুলতে খুলতে ফিসফিস করে বলেছিল, "আফিফ, তুমি আজকাল এত দূরে দূরে থাকো কেন? আমাকে কি আর আগের মতো ভালোবাসো না?"
আমার ভেতরের পুরুষটি তার শরীর, তার স্পর্শ আর কামনার টানে সাড়া দিতে চেয়েছিল। আমি তাকে জড়িয়ে ধরেছিলাম। আমাদের ঠোঁট আর শরীর এক হয়েছিল এক তীব্র, আদিম আকুলতায়। একজন প্রাপ্তবয়স্ক পুরুষ তার স্ত্রীকে যেভাবে চেনে, যেভাবে স্পর্শ করে, আমি তাকে সেভাবেই স্পর্শ করছিলাম। তার শরীরের প্রতিটি বাক, তার উরুর কোমলতা, তার বুকের ধুকপুকানি, সবকিছুর অনুভূতি ছিল ভীষণ চেনা।
কিন্তু চরম মুহূর্তের ঠিক মুখোমুখি দাঁড়িয়ে, আমি যখন তার চোখের দিকে তাকালাম, অমনি আমার পুরো শরীর জমে কাঠ হয়ে গেল।
ঘরের মৃদু আলোয় তার চোখে পানি টলমল করছিল। তার ঠোঁট কাঁপছিল, কামনায় নয়, এক গভীর আতঙ্কে। তার আঙুলগুলো আমার পিঠে চেপে বসেছিল, কিন্তু সে স্পর্শে কোন অনুরাগ ছিল না; ছিল কেবল এক অসহ্য যন্ত্রণা সহ্য করে নেওয়ার চেষ্টা। সে যেন নিজের ইচ্ছার বিরুদ্ধে, কোন এক বাধ্যতামূলক নাটক অভিনয় করার জন্য আমার বিছানায় শুয়েছিল।
আমি তাকে ধাক্কা দিয়ে সরিয়ে দিইনি, কিন্তু আমার শরীর শক্ত হয়ে গিয়েছিল। আমি বিছানায় শুয়ে সিলিংয়ের দিকে তাকিয়ে মনে মনে ভেবেছিলাম, এই নারী আসল নাবিলা হলে এমন আতঙ্কে শিউরে উঠবে কেন? সে কি অপরাধবোধে ভুগছে? নাকি সে আর ফাহাদ মিলে আমার আসল স্ত্রীকে সরিয়ে দিয়ে এই চক্রান্ত সাজিয়েছে?
ফাহাদ। নাবিলার অফিসের সিনিয়র কলিগ।
লম্বা, সুপুরুষ, ফর্সা গায়ের রং আর নিখুঁত বাচনভঙ্গি। এক্সিডেন্টের পর যখন আমি ঘরে বন্দি ছিলাম, ফাহাদ প্রায়ই আমাদের বাসায় আসত। নাবিলার কাজের তদারকি করার বাহানায় ঘণ্টার পর ঘণ্টা ড্রয়িংরুমে বসে থাকত। তাদের মাঝের হাসাহাসি, চোখাচোখি, আমার চোখ এড়ায়নি। আমি পুরুষ মানুষ, অন্য এক পুরুষের চোখে নিজের নারীর প্রতি লালসা আমি চিনতে পারি।
তিন সপ্তাহ আগে থেকে ফাহাদ হঠাৎ নিখোঁজ হয়ে যায়।
সেদিন বিকেলে এই বহুরূপী নারীটি যখন তার বুটিকে গেল, আমি পুরো ঘর তল্লাশি করা শুরু করলাম।
আমার মাথায় তখন অনেকগুলো মেলানো প্রশ্ন। যদি এই মেয়েটি নাবিলার জায়গায় এসে বসে থাকে, তবে ঘরের মূল কাঠামোয় নিশ্চয়ই কিছু না কিছু গলদ থাকবে।
আমি ড্রয়িংরুমে এসে দাঁড়ালাম। মাঝখানের মেঝের টাইলসের ওপর একটা অদ্ভুত শূন্যতা।
হঠাৎ আমার মনে পড়ল, এখানে একটা বিশাল দামি পার্সিয়ান উলের লাল কার্পেট পাতা ছিল। তিন সপ্তাহ আগে কার্পেটটা হঠাৎ গায়েব হয়ে যায়। আমি যখন তাকে জিজ্ঞেস করেছিলাম, সে চোখ না মিলিয়ে বলেছিল, "ড্রাই ক্লিনিংয়ে দিয়েছি আফিফ, কফি পড়ে খুব বাজে দাগ হয়ে গিয়েছিল।"
তিন সপ্তাহ হয়ে গেল, একটা কার্পেট ড্রাই ক্লিনিং থেকে ফিরে এলো না?
আমি স্টোররুমে ঢুকলাম। সেখানে ঢুকতেই আমার নাকে এলো ব্লিচিং পাউডার আর কড়া ফ্লোর ক্লিনারের এক বিশ্রী, রাসায়নিক গন্ধ। মেঝের একটা কোণে টাইলসের ওপর হালকা ফাটল, আর সেখানে গাঢ় বাদামি রঙের শুকনো কোন তরলের ছাপ। যেন কেউ খুব যত্ন করে মেঝেটা ঘষে ঘষে মেজেছে, কিন্তু পুরোটা মুছে ফেলতে পারেনি।
আমার বুকের ভেতরে ধক করে উঠল। রক্তের গন্ধ?
আমি দৌড়ে নাবিলার সাজগোজের ড্রয়ার খুললাম। সেখানে তার পার্সোনাল ডায়েরি আর এক্সট্রা একটা সিম কার্ড রাখা ছিল।
আমি বাথরুমে গিয়ে নাবিলা ও ফাহাদের সব পুরোনো মেসেজের হিস্ট্রি আমার মাথায় মেলাতে লাগলাম। হঠাৎ আমার মনে পড়ল, দুই দিন আগে নাবিলার ফোনে একটা অজানা নম্বর থেকে মেসেজ এসেছিল। নাবিলা তখন গোসলে ছিল, আমি স্ক্রিনে নোটিফিকেশনটা দেখেছিলাম:
"নাবিলা ভাবি, ফাহাদ ভাইয়ের কোন খোঁজ পেলেন? তিন সপ্তাহ ধরে পুলিশও কিছু বলতে পারছে না। আপনি শেষবার ওর সাথে কথা বলেছিলেন, প্লিজ কিছু জানা থাকলে জানান।"
মেসেজটা পাঠিয়েছিল ফাহাদের ছোট বোন।
ফাহাদ তিন সপ্তাহ ধরে নিখোঁজ! আর এই একই সময়ে আমার ঘর থেকে পার্সিয়ান কার্পেট গায়েব হয়েছে, স্টোররুমে ব্লিচিংয়ের গন্ধ পাওয়া যাচ্ছে, আর আমার আসল নাবিলা বদলে গিয়ে এই ছদ্মবেশী নারীটি আমার ঘরে এসে ঢুকেছে!
আমার হাত কাঁপতে লাগল। সত্যটা যেন পানির মতো পরিষ্কার হয়ে উঠতে লাগল আমার সামনে।
ফাহাদ আর নাবিলা নিশ্চয়ই প্রেম করছিল। কোন এক রাতে তারা হয়তো ধরা পড়ে যায়, অথবা তাদের মধ্যে কোন বড় ঝামেলা হয়। তারপর কি এই বহুরূপী মেয়েটি ফাহাদের সাহায্য নিয়ে আমার নাবিলাকে খুন করে কার্পেটে মুড়ে ফেলে দিয়ে এসেছে? নাকি ফাহাদ নিজেই নাবিলাকে কোথাও সরিয়ে দিয়ে এই মেয়েটিকে পাঠিয়েছে আমার ওপর নজর রাখতে, যাতে আমি পুলিশের কাছে না যাই?
আমার মাথায় রিমঝিম করে রক্ত ছুটতে লাগল। আমার মাথা ফেটে যাওয়ার উপক্রম হলো।
আমি সিদ্ধান্ত নিলাম, এভাবে একা একা ধোঁয়াশার মধ্যে থাকা যাবে না। আমার একজন নিরপেক্ষ মানুষের সাহায্য প্রয়োজন।
পরদিন সকালে আমি গোপনে দেখা করলাম ডক্টর শাহেদের সঙ্গে। ডক্টর শাহেদ আমার বাবার পুরোনো বন্ধু, শহরের একজন প্রখ্যাত নিউরো-সাইকিয়াট্রিস্ট। ধানমন্ডি লেকের পাশের এক শান্ত ক্যাফেতে আমরা সামনাসামনি বসলাম।
ডক্টর শাহেদ আমার চোখের দিকে তাকালেন। চশমাটা খুলে পরিষ্কার করতে করতে বললেন, "আফিফ, তোমাকে খুব ক্লান্ত আর বিষণ্ন দেখাচ্ছে। তোমার হেড ইনজুরির ওষুধগুলো ঠিকমতো খাচ্ছ তো?"
আমি চারপাশ দেখে নিয়ে নিচু স্বরে বললাম, "আঙ্কেল, আমি খুব বিপদে আছি। আমার ঘরে যে মেয়েটি এখন থাকছে, সে আমার স্ত্রী নাবিলা নয়।"
শাহেদ আঙ্কেল কফি কাপটা টেবিল থেকে তুলতে গিয়ে থেমে গেলেন। তিনি গভীর দৃষ্টিতে আমার দিকে তাকিয়ে বললেন, "মানে? কী বলতে চাইছ তুমি?"
"আমি সত্যি বলছি আঙ্কেল!" আমি ফিসফিস করে উত্তেজনায় কাঁপতে কাঁপতে বললাম, "সে দেখতে নাবিলার মতো, তার কণ্ঠ নাবিলার মতো, সে আমাদের সংসারের সব গোপন কথা জানে। কিন্তু সে নাবিলা নয়। তার চালচলন, তার চোখের দৃষ্টি অন্যরকম। সে একটা বহুরূপী। আমার আসল নাবিলাকে সে কোথাও গায়েব করে দিয়েছে!"
শাহেদ আঙ্কেল এক দীর্ঘশ্বাস ফেললেন। তার চোখে কোন বিস্ময় দেখা গেল না, বরং ফুটে উঠল গভীর এক দুঃখ আর সহানুভূতি।
তিনি হাত বাড়িয়ে আমার হাতের ওপর রাখলেন। "আফিফ, শান্ত হও। যা বলছি শোনো। তোমার এই সমস্যাটার একটা ডাক্তারি নাম আছে। একে বলা হয় ক্যাপগ্রাস ডিলুশন।"
আমি চমকে উঠলাম। "ডিলুশন? আপনি বলতে চান আমি পাগল?"
"না, তুমি পাগল নও," শাহেদ আঙ্কেল বুঝিয়ে বলতে লাগলেন, "মানুষের মস্তিষ্কে কোন ভিজ্যুয়াল অবজেক্ট চেনার দু'টি পথ থাকে। একটি পথ চোখের দেখা দেখে ব্রেনকে বলে দেয়, ইনি তোমার পরিচিত মানুষ, ইনি তোমার স্ত্রী। আর অন্য একটি পথ, যা লিম্বিক সিস্টেম বা অ্যামিগডালা থেকে আসে, তা ওই পরিচিত মানুষকে দেখার পর ভেতরে এক ধরনের সুনির্দিষ্ট আবেগ আর উষ্ণতা তৈরি করে।"
তিনি একটু থেমে আবার বললেন, "তোমার ওই মারাত্মক এক্সিডেন্টের কারণে তোমার ব্রেনের এই দুই রাস্তার মধ্যকার সংযোগটা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। তাই তুমি যখন তোমার স্ত্রী নাবিলাকে দেখছ, তোমার চোখ আর স্মৃতি বলছে ইনি নাবিলা। কিন্তু তোমার ক্ষতিগ্রস্ত ব্রেন সেই পরিচিত অনুভূতির স্পন্দনটা তৈরি করতে পারছে না। ফলে তোমার সচেতন মন এই বৈপরীত্য মেলাতে গিয়ে একটা কাল্পনিক যুক্তি বানিয়ে নিচ্ছে, 'যেহেতু একে দেখে আমার মনে আগের মতো অনুভূতির ঢেউ উঠছে না, নিশ্চয়ই এ আমার আসল স্ত্রী নয়! নিশ্চয়ই এ কোন বহুরূপী!'"
আমি স্তব্ধ হয়ে বসে রইলাম।
শাহেদ আঙ্কেল আমার দিকে তাকিয়ে বললেন, "আফিফ, নাবিলা নিখোঁজ হয়নি। তোমার পাশে যে শুয়ে থাকে, সে তোমার আসল স্ত্রী নাবিলাই। তুমি ওষুধগুলো বন্ধ করে দিয়েছ বলেই তোমার এই ডিলুশন আবার প্রবল হয়ে উঠেছে। তুমি আজই আবার ওষুধ খাওয়া শুরু করো।"
আমার ভেতরের যুক্তিবাদী মনটা এক মুহূর্তের জন্য কেঁপে উঠল। সাইকিয়াট্রিক কন্ডিশন? ক্যাপগ্রাস সিন্ড্রোম?
কিন্তু পরমুহূর্তেই আমার মনে পড়ল স্টোররুমের রক্তের ছাপের কথা, গায়েব হয়ে যাওয়া কার্পেটের কথা, নিখোঁজ ফাহাদের কথা আর ওই মেয়েটির চোখের হিমশীতল আতঙ্কের কথা!
ডাক্তারের ব্যাখ্যাটা খুব সুন্দর, খুব বৈজ্ঞানিক। কিন্তু বিজ্ঞান কি গায়ের বুটিকের গন্ধ, মেঝের ব্লিচিংয়ের গন্ধ আর নিখোঁজ ফাহাদের বোনটির করুণ মেসেজের ব্যাখ্যা দিতে পারে?
না।
আমার মনে হলো, শাহেদ আঙ্কেলকেও হয়তো ওই মেয়েটি ভুল বুঝিয়ে এসেছে। নাবিলা সেজে সে সবার চোখেই ধূলো দিয়েছে। আমি যদি পুলিশে যাই, পুলিশ আমাকে পাবনার মানসিক হাসপাতালে পাঠিয়ে দেবে।
আমাকে নিজেই এর শেষ দেখতে হবে। সত্যটা বের করতেই হবে, আজ রাতেই।
রাত দশটা। বাইরে মুষলধারে বৃষ্টি আর কালবৈশাখী ঝড়ের তাণ্ডব চলছে। বিদ্যুত চলে গেছে প্রায় এক ঘণ্টা আগে। পুরো ফ্ল্যাট অন্ধকারে ডুবে আছে, শুধু মাঝে মাঝে জানালার কাচ ঘেঁষে বিজলীর তীব্র আলো ঘরটাকে মুহূর্তের জন্য ভীতিপ্রদ সাদা আলোয় ভরিয়ে দিয়ে যাচ্ছে।
ড্রয়িংরুমে দু'টো মোমবাতি জ্বলছিল। হলুদ শিখাগুলো বাতাসের তোড়ে কাঁপছিল।
নাবিলা, অথবা যে নিজেকে নাবিলা বলে দাবি করে সে রান্নাঘরে একটা ট্রেতে করে আমার জন্য রুটি আর স্যুপ নিয়ে আসছিল।
আমি ড্রয়িংরুমের দরজায় গিয়ে দাঁড়ালাম। মোমবাতির আলোয় তার ছায়াটা দেয়ালে এক বিশাল দানবের মতো দেখাচ্ছিল।
আমি শান্ত কণ্ঠে বললাম, "স্যুপটা টেবিলে রাখো।"
সে চমকে উঠে আমার দিকে তাকাল। "আফিফ? তুমি অন্ধকারে এভাবে দাঁড়িয়ে আছ কেন? এসো, খেয়ে নাও। তোমার শরীরটা ভালো লাগছে না নিশ্চয়ই..."
"খাব না," আমি সোজা তার দিকে হেঁটে গেলাম।
আমার চেহারার অভিব্যক্তি দেখে সে ভয়ে একপা পিছিয়ে গেল। ট্রে-টা ধপ করে টেবিলে রেখে দিল। "আফিফ... কী হয়েছে তোমার? তুমি এভাবে তাকাচ্ছ কেন?"
আমি তার কাছে গিয়ে শক্ত করে তার দুটো কবজি চেপে ধরলাম। সে ব্যাথায় কঁকিয়ে উঠল, "আফিফ! ছাড়ো, ব্যাথা পাচ্ছি!"
"তুমি কে?" আমি দাঁতে দাঁত চেপে ফিসফিস করে বললাম, "আমাকে আর নাটক দেখাতে হবে না। তুমি আমার নাবিলা নও। বলো, আমার আসল নাবিলা কোথায়? ফাহাদ কোথায়?"
মেয়েটির চোখ দু'টো আতঙ্কে বড় বড় হয়ে গেল। বিজলীর আলোয় তার মুখটা এক মুহূর্তের জন্য ফ্যাকাশে প্রেতাত্মার মতো দেখাল।
সে কান্নাভেজা গলায় বলল, "আফিফ, তুমি আবার শুরু করেছ? প্লিজ, আল্লাহ দয়া করো! তুমি তোমার ওষুধগুলো খাচ্ছ না কেন? ডাক্তার শাহেদ তোমাকে কতবার বলেছিলেন..."
"ডাক্তারের কথা বাদ দাও!" আমি তাকে ধরে বেডরুমে টেনে নিয়ে গেলাম এবং দরজাটা ভেতর থেকে লক করে দিলাম।
বাইরে প্রচণ্ড শব্দে কড়কড় করে বাজ পড়ল।
আমি তাকে ধাক্কা দিয়ে বিছানায় ফেলে দিলাম। মোমবাতির আলোয় তার হাঁপাতে থাকা শরীরটা কাঁপছিল।
আমি বললাম, "তুমি যদি সত্যিই আমার নাবিলা হয়ে থাকো, তবে আমাকে প্রমাণ দাও। এমন প্রমাণ যা কোন বহুরূপীর পক্ষে জানা বা নকল করা সম্ভব নয়। তোমার শরীরে এমন কী চিহ্ন আছে যা কেবল আমার জানার কথা?"
মেয়েটি শিউরে উঠে আমার দিকে তাকাল। তার চোখ দিয়ে অঝোরে পানি পড়ছিল।
সে কাঁপতে কাাঁপতে ধীরহাতে তার জামাটা একটু আলগা করে নিজের ডান পাঁজরের ঠিক নিচে একটা খুব ছোট, সরু অপারেশনের কাটা দাগ দেখাল।
"কলেজে পড়ার সময় আমার অ্যাপেনডিক্সের অপারেশন হয়েছিল... তুমি নিজে এই দাগে কত রাত চুমু খেয়েছ, আফিফ..." তার গলা বুজে এলো কান্নায়।
তারপর সে পাজামাটা খুলে তার বাঁ উরুর ভেতরের দিকটা উন্মুক্ত করল। সেখানে একটা জন্মদাগ আছে, দেখতে হুবহু তারার মত।
সে কান্নায় ভেঙে পড়ে বলল, "আমাদের বাসর রাতে, তুমি যখন প্রথম আমাকে স্পর্শ করেছিলে... তুমি এই দাগটা দেখে হেসে বলেছিলে, 'তুমি আমার আকাশের তারা।' তুমি কি এসবও ভুলে গেছ আফিফ? আমি তোমার নাবিলা! আমি অন্য কেউ নই! তুমি কেন আমার সাথে এমন করছো?"
আমি মন্ত্রমুগ্ধের মতো তার উরুর সেই জন্মদাগের দিকে তাকিয়ে রইলাম।
আমার মাথার ভেতরে যেন এক বিকট বিস্ফোরণ ঘটল।
অনুকরণ করা সম্ভব, মুখস্থ করা সম্ভব, কিন্তু শারীরিক এই গোপন চিহ্নগুলো? এই নিখুঁত দাগ, এই পরিচিত গন্ধ, এই কন্ঠের আকুলতা?
আমার হাত দুটো শিথিল হয়ে নেমে এলো। হাঁটু গেড়ে আমি মেঝের ওপর বসে পড়লাম।
ডক্টর শাহেদ ঠিক বলেছিলেন।
কেউ নাবিলাকে গায়েব করেনি। কেউ রূপ বদলে আমার ঘরে আসেনি। আমার মস্তিষ্কই নষ্ট হয়ে গেছে। আমার অ্যাক্সিডেন্টের ব্রেন ইনজুরি আমাকে এমন এক তলে নিয়ে গেছে যেখানে আমি আমার নিজের প্রাণের চেয়ে প্রিয় স্ত্রীকেই এক রক্তমাংসের অচেনা ছদ্মবেশী মনে করছি!
আমি আমার দুই হাতে মুখ ঢেকে ফেললাম। আমার চোখ দিয়ে অঝোরে পানি পড়তে লাগল।
"নাবিলা..." আমি ডুকরে কেঁদে উঠলাম, "আমাকে ক্ষমা করে দাও, নাবিলা! আমি পাগল হয়ে গেছি! আমার মাথা কাজ করছে না... আমি তোমাকে কত কষ্ট দিয়েছি! কত সন্দেহ করেছি! ডক্টর শাহেদ যা বলেছিলেন, সবই সত্যি... আমার ক্যাপগ্রাস ডিলুশন হয়েছে..."
আমি তার হাঁটুর কাছে মাথা রেখে কাঁদতে লাগলাম।
কিন্তু...
নাবিলা আমাকে জড়িয়ে ধরল না।
সে আমার চুলে হাত রাখল না। সে আগের মতোই পাথরের মতো নিস্পন্দ হয়ে বসে রইল। তার কান্নার শব্দ বন্ধ হয়ে গিয়েছিল, কিন্তু তার বুকটা দ্রুত ওঠানামা করছিল।
আমি ধীরে ধীরে মাথা তুললাম। মোমবাতির শিখার আবছা আলোয় আমি তার চোখের দিকে তাকালাম।
তার চোখে এখনও সেই একই আতঙ্ক। একই হিমশীতল ভয়।
আমার ভেতরের আর্কিটেক্টের সূক্ষ্ম যুক্তিবাদী মনটা হঠাৎ এক পরম সত্যের মুখোমুখি হয়ে ধাক্কা খেল।
যদি সে সত্যিই আমার আসল নাবিলা হয়... যদি আমার ক্যাপগ্রাস ডিলুশনের কারণে আমি তাকে অচেনা মনে করে থাকি... তবে সে তো আমার ওপর রাগ করবে, কিংবা আবেগে আমাকে জড়িয়ে ধরে কাঁদবে।
কিন্তু সে আমাকে দেখে এভাবে ভয় পাচ্ছে কেন?
কেন সে আমার প্রতিটি স্পর্শে এত আতঙ্কিত হয়ে ওঠে? কেন গত কয়েক সপ্তাহ ধরে সে আমাকে সেবা করছে এক অদৃশ্য বন্দির মতো, অপরাধবোধে জর্জরিত হয়ে?
যদি আমি পাগল না হয়ে থাকি... যদি এই পুরো ঘটনায় আমার ক্যাপগ্রাস ডিলুশন ছাড়াও অন্য কোন ভয়ঙ্কর বাস্তব সত্য লুকিয়ে থাকে?
আমার দৃষ্টি চলে গেল ঘরের কোণে।
"নাবিলা," আমি শান্ত, হিমশীতল কণ্ঠে জিজ্ঞেস করলাম, "তুমি আমার নাবিলা, আমি মেনে নিলাম। কিন্তু... ড্রাই ক্লিনারে দেওয়া সেই পার্সিয়ান কার্পেটটা কোথায়? আর স্টোররুমের মেঝের ব্লিচিং পাউডারের গন্ধটা?"
নাবিলার মুখ থেকে সব রক্ত যেন এক মুহূর্তে নিভে গেল। সে থরথর করে কাঁপতে লাগল।
"আর ফাহাদ?" আমি তার চোখের দিকে একদৃষ্টে তাকিয়ে বললাম, "ফাহাদ তিন সপ্তাহ ধরে নিখোঁজ কেন? ওর বোন কেন তোমাকে মেসেজ করে তার খবর জানতে চাচ্ছে?"
নাবিলা হাত দিয়ে নিজের মুখ ঢেকে ফেলল। সে এক ভয়াবহ আর্তনাদ করে উঠল, কিন্তু তার মুখ থেকে কোন শব্দ বের হলো না, শুধু এক নিঃশব্দ, প্রাণঘাতী ডুকরে ওঠা ছাড়া।
"আফিফ..." সে কাঁদতে কাঁদতে হাঁটু গেড়ে মেঝের ওপর আমার মুখোমুখি বসল, "তুমি... তুমি সত্যি কিছু মনে করতে পারছ না? তুমি কিচ্ছু মনে করতে পারছ না, আফিফ?"
"কী মনে করার কথা বলছ তুমি?" আমার বুকের ভেতরে এক অজানা আশঙ্কায় ধকধক করে হাতুড়ি পিটতে লাগল।
নাবিলা দুই হাতে আমার মুখটা চেপে ধরল। তার চোখের পানিতে আমার গাল ভিজে গেল।
"আজ থেকে ঠিক তিন সপ্তাহ আগের শুক্রবার রাতের কথা তোমার মনে নেই?" সে ফিসফিস করে বলল, "সেদিন রাত ১১টায় যখন ফাহাদ আমাদের বাসায় এসেছিল?"
আমি ভ্রূ কুঁচকে ভাবার চেষ্টা করলাম। তিন সপ্তাহ আগের শুক্রবার? আমার মাথায় এক তীব্র যন্ত্রণা শুরু হলো। এক ধোঁয়াশা... কিন্তু আস্তে আস্তে সেই ধোঁয়াশা পরিষ্কার হতে লাগল।
নাবিলা কাঁপতে থাকা গলায় সত্যটা বলতে লাগল, আর তার প্রতিটি শব্দের সাথে সাথে আমার স্মৃতির রুদ্ধ দরজাগুলো এক এক করে খুলে যেতে লাগল।
সেদিন রাতে ফাহাদ আমাদের বাসায় নাবিলার সাথে পরকীয়া করতে আসেনি।
ফাহাদ এসেছিল ডক্টর শাহেদের দেওয়া আমার সর্বশেষ সাইকিয়াট্রিক রিপোর্ট আর কিছু নিউরোলজিক্যাল প্রেসক্রিপশন নিয়ে। অফিসে আমার আচরণ দিন দিন অস্বাভাবিক হয়ে উঠছিল, আমি ছোটখাটো বিষয় নিয়ে চিৎকার করছিলাম এবং কাজ ভুলে যাচ্ছিলাম। তারা দুজন ড্রয়িংরুমে বসে সেই রিপোর্টগুলো দেখছিল।
আর আমি...
আমার পারানোয়েড আর হিংসায় অন্ধ মস্তিষ্ক ভেবেছিল, নাবিলা আর ফাহাদ আমার ঘরে বসে প্রেম করছে।
আমি রান্নাঘর থেকে পিতলের তৈরি একটি ভারী শোপিস নিয়ে নিঃশব্দে ড্রয়িংরুমে ঢুকেছিলাম। আমার মাথায় তখন কেবল এক রক্ত পিপাসা, আমার স্ত্রীকে অন্য পুরুষ হরণ করছে!
আমি ফাহাদের মাথার পেছনে পূর্ণ শক্তিতে আঘাত করেছিলাম।
একবার... দুবার... তিনবার...
ফাহাদ চিৎকার করার সুযোগও পায়নি। সে মেঝের পার্সিয়ান কার্পেটের ওপর আছড়ে পড়েছিল। গ্লাস টপ টেবিলটা ভেঙে চুরমার হয়ে গিয়েছিল। তার মাথা থেকে তাজা, গরম রক্তে ভেসে গিয়েছিল সুন্দর উলের কার্পেটটা।
নাবিলা আতঙ্কে চিৎকার করে উঠেছিল। সে আমাকে থামানোর চেষ্টা করেছিল, কিন্তু আমি তখন এক উন্মাদ পশুকে পরিণত হয়েছি।
ফাহাদ যখন শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করল, তার রক্তাক্ত চোখ দু'টো আমার দিকে স্থির হয়ে আটকে রইল।
আর ঠিক সেই মুহূর্তেই, আমার মাথার মারাত্মক ইনজুরি এবং মানসিক ট্রমার কারণে আমার ব্রেনে এক বিকট সিজার বা খিঁচুনি শুরু হয়েছিল। রক্তের দৃশ্য আর নিজের হাতে ঘটে যাওয়া হত্যাকাণ্ডের ভয়াবহতা সহ্য করতে না পেরে আমার মস্তিষ্ক সঙ্গে সঙ্গে এক ধরনের সাইকোজেনিক ফুগ বা পোস্ট-ট্রমাটিক রেট্রোগ্রেড অ্যামনেশিয়ায় চলে যায়। আমি সোফায় গলে পড়ে গিয়ে জ্ঞান হারিয়ে ফেলি।
তারপর?
নাবিলা চাইলে সঙ্গে সঙ্গে পুলিশে ফোন করতে পারত। আমাকে খুনের আসামীরূপে পুলিশে ধরিয়ে দিতে পারত।
কিন্তু সে তা করেনি।
সে আমাকে ভালোবাসত। সে জানত আমার মাথার অ্যাক্সিডেন্টের ফলে তৈরি অসুস্থতার কথা। সে জানত আমি জেলে গেলে বা মানসিক হাসপাতালে গেলে আমার জীবন শেষ হয়ে যাবে।
তাই সেই বৃষ্টিভেজা রাতে, নিজের অসুস্থ স্বামীকে বাঁচানোর জন্য, এক একা নারী হয়ে যা করেছিল তা কোন মানুষ কল্পনাও করতে পারবে না।
আমি সোফায় অচেতন হয়ে পড়েছিলাম। আর নাবিলা একাই ফাহাদের রক্তে ভেজা ভারি লাশটাকে সেই পার্সিয়ান কার্পেটে মুড়ে ফেলেছিল। তারপর মধ্যরাতে, সার্ভিস লিফট ব্যবহার করে, কোনোমতে টেনে-হিঁচড়ে সেই কার্পেট মোড়ানো লাশটা আমাদের গাড়ির ডিকেতে তুলেছিল।
সে একা গাড়ি চালিয়ে ঢাকার বাইরে কেরানীগঞ্জের এক নির্জন, অন্ধকার খালের কাছে গিয়ে ফাহাদের লাশটা পানিতে ফেলে দিয়ে এসেছিল।
ঘরে ফিরে এসে, সে সারারাত ধরে মেঝে থেকে ফাহাদের রক্তের দাগ ব্লিচিং পাউডার দিয়ে ঘষে ঘষে মুছেছিল। সকালে যখন আমি ঘুম থেকে উঠি, আমার ব্রেন সেই ট্রমাটিক স্মৃতি সম্পূর্ণ মুছে ফেলেছিল, যাকে বলে Psychogenic Confabulation।
আমার মস্তিষ্ক নিজের অপরাধবোধ আর ভীতি থেকে বাঁচার জন্য এক কাল্পনিক গল্প সাজিয়ে নিয়েছিল, 'নাবিলা ফাহাদের সাথে পালিয়ে গেছে বা কোন চক্রান্ত করছে।'
আর পরদিন সকালে, যখন আমি চোখ মেলে নাবিলার দিকে তাকিয়েছিলাম...
নাবিলা তখন আর কেবল আমার সুমিত, শান্ত স্ত্রী ছিল না। সে তখন একজন খুনীকে আড়াল করা, লাশ গুম করা এক সহ-অপরাধী। তার চোখে ছিল এক প্রচণ্ড ট্রমা, অপাপবিদ্ধ জীবন হারিয়ে ফেলার এক হাহাকার এবং আমার মতো এক হিংস্র খুনীর পাশে ঘুমানোর এক অবিরাম আতঙ্ক!
আমি যখন সকালে ঘুম থেকে উঠে নাবিলার চোখের দিকে তাকিয়েছিলাম, তার চোখে ভালোবাসার জায়গায় ওই অভিশপ্ত আতঙ্ক দেখতে পেয়েছিলাম।
আমার মস্তিষ্ক নিজের অপরাধ মেনে নিতে পারেনি। সে কিছুতেই মেনে নিতে পারেনি যে নাবিলা আমাকে ভয় পাচ্ছে কারণ আমি এক নরপশু!
তাই আমার মস্তিষ্কের ডিফেন্স মেকানিজম ক্যাপগ্রাস ডিলুশনকে জন্ম দিয়েছিল। আমার মেমোরি মিথ্যা গল্প বুনেছিল, 'এই নারী আসল নাবিলা হতে পারে না! আমার সরল, নিষ্পাপ নাবিলা এমন আতঙ্কিত চোখে আমার দিকে তাকাতে পারে না! নিশ্চয়ই সে কোন বহুরূপী ছদ্মবেশী!'
স্মৃতির বাঁধ ভেঙে সব দৃশ্য এক মুহূর্তে আমার সামনে ভেসে উঠল।
পিতলের ভারী শোপিস... ফাহাদের মাথার খুলি ভেঙে যাওয়ার মটমট শব্দ... রক্তে ভেসে যাওয়া লাল কার্পেট... আর শেষ রাতে নাবিলার একা একা ড্রয়িংরুমের মেঝেতে বসে কাঁদতে কাঁদতে ব্লিচিং পাউডার দিয়ে রক্ত মোছার দৃশ্য!
আমার পুরো শরীর থরথর করে কাঁপতে লাগল। আমার মুখ দিয়ে কোন কথা বের হলো না।
আমার ক্যাপগ্রাস ডিলুশন কোন রোগ ছিল না, তা ছিল আমার কাপুরুষ মস্তিষ্কের এক আত্মরক্ষার ঢাল! আমি নিজের অপরাধের সত্য থেকে পালানোর জন্য, নিজের স্ত্রীর চোখের ভালোবাসার সলিল সমাধি না দেখার জন্য নিজেকে বিশ্বাস করিয়েছিলাম যে আমার স্ত্রী একজন ছদ্মবেশী!
আমি নাবিলার দিকে তাকালাম।
মোমবাতির কাঁপতে থাকা আলোয় সে আমার সামনে বসে আছে। তার চোখের পানি গড়িয়ে পড়ছে। সে আমাকে ঘৃণা করে না, কিন্তু সে ট্রমার সাগরে ডুবে আছে। আমার জন্য, শুধু আমাকে ভালোবাসার অপরাধে সে নিজেকে এক নরকের অতলে ঠেলে দিয়েছে।
সে কোন বহুরূপী নয়। সে কোন ছদ্মবেশী নয়।
সে আমার নাবিলা। যাকে আমি নিজের হাতে তিল তিল করে ধ্বংস করে দিয়েছি।
"আফিফ..." সে কপালে হাত রেখে ফিসফিস করে বলল, "তুমি সব মনে করতে পেরেছ?"
আমি কোন কথা বলতে পারলাম না। শুধু ধীরহাতে তাকে জড়িয়ে ধরলাম।
এবার আর সে আমাকে ধাক্কা দিল না। সে আমার বুকে মাথা রেখে হাউমাউ করে কেঁদে উঠল। সেই কান্নায় কোন রহস্য ছিল না, কোন লুকোচুরি ছিল না, ছিল কেবল দুই নষ্ট হয়ে যাওয়া মানুষের এক অসীম, সীমাহীন বিষাদ।
বাইরে বৃষ্টির শব্দ তখনও থামেনি। জানালার কাচে জলবিন্দুগুলো গড়িয়ে পড়ছিল।
আমি বুঝতে পারলাম, আমার ঘরে কোন বহুরূপী দানব আসেনি। আসল দানবটি সবসময় আমার নিজের ভেতরেই লুকিয়ে ছিল। আর আমরা দু'জন, ধানমন্ডির এই ছয় তলার রুদ্ধদ্বারের ভেতরে, এক রক্তমাখা গোপন সত্য আর অপরাধবোধের কারাগারে সারাজীবনের জন্য বন্দি হয়ে রইলাম।
'
No comments:
Post a Comment