Saturday, August 29, 2026

পুনরাবৃত্তি

 


প্রাক্তন স্বামীর উপর আমার কোন রাগ নেই, ভুলটা আমারই। ডিভোর্স হয়েছে বছর চারেক। আদনানের সাথে কাটানো সেই দুই বছর তিন মাসের স্মৃতিগুলো এখন ঝাপসা হওয়ার কথা ছিল, কিন্তু অদ্ভুতভাবে সেগুলো প্রতি রাতে আরও উজ্জ্বল হয়ে ফিরে আসে।

​মুমু পাশের ঘরে ছবি আঁকছে। পাঁচ বছরের ছোট্ট মেয়েটা দেখতে হুবহু ওর বাবার মতো হয়েছে। আদনান নিয়মিত ব্যাংক মারফত মুমুর খরচ পাঠিয়ে দেয়। আমার দেনমোহরের সাত লক্ষ টাকাও সে শোধ করে দিয়েছে। আমি ওকে ভালোবাসি, প্রচণ্ড ভালোবাসি। কিন্তু আদনানের চোখে শেষের দিকে আমি আমার ছায়া আর দেখি নি। সেখানে কেবল একরাশ ক্লান্তি আর আতঙ্ক।
আমি কিন্তু সংসারটা মনপ্রাণ দিয়েই করতে চেয়েছিলাম, আদনান নিজেও। কিন্তু আমার ভেতরের এক আদিম অন্ধকার বারবার সব তছনছ করে দিয়েছে।
​আমার ট্রমার শুরুটা ছিল এক যৌথ পরিবারের ঘুপচি ঘরে। ছয় কি সাত বছর বয়স তখন। এক রাতে বিকট চিৎকার-চেঁচামেচিতে ঘুম ভেঙে গিয়েছিল আমার। ড্রয়িংরুম থেকে ভেসে আসছিল ভাঙচুরের শব্দ। আমি ভয়ে কাঁপতে কাঁপতে দরজার আড়ালে দাঁড়িয়ে যা দেখলাম, তা আজও আমার স্বপ্নে হানা দেয়।
​আব্বা পাগলের মতো ছুটে গিয়ে রান্নাঘর থেকে ধারালো বঁটিটা নিয়ে এলেন। তারপর আম্মার গলার কাছে ওটা চেপে ধরে গর্জন করে উঠলেন,
-আজ তোকে শেষ করেই ছাড়ব, অনেক সয়েছি আমি।
​আমি চিৎকার করে ফুপিকে জাপ্টে ধরলাম। বড় চাচী আর দাদী মিলে আব্বাকে পেছন থেকে শক্ত হাতে টেনে সরাচ্ছিলেন। দাদী ফিসফিস করে বলছিলেন,
-পারু, তুমি ঘরে যাও। লক্ষ্মী মা আমার, ঘরে যাও।
​কিন্তু আম্মা সরেননি। তিনি রক্তবর্ণ চোখ করে ঘাড় বেঁকিয়ে পাথর হয়ে দাঁড়িয়ে ছিলেন। সেই চাহনিতে ভয় ছিল না, ছিল এক পৈশাচিক চ্যালেঞ্জ। আশ্চর্যের বিষয় হলো যেই দৃশ্য দেখে আমি এতটা ভয় পেয়েছিলাম বিয়ের মাত্র আট মাসের মাথায় একই কাজ আমিও করেছিলাম।
​আদনানের সাথে সেদিন তুচ্ছ এক ঝগড়া হয়েছিল। কিন্তু এতোটুকুই যেন যথেষ্ট ছিল। আমার কানে তখন শুধুমাত্র আদনানের শান্ত স্বরে পাল্টা জবাব দেওয়া ঢুকছিল না বরং কানে বাজছিল শৈশবের সেই রণহুঙ্কার। অবচেতনে আমি দৌড়ে রান্নাঘরে গেলাম। বঁটি নিয়ে আদনানের দিকে তেড়ে যেতেই আমার শাশুড়ি আর ননদ রিনা আমাকে জাপ্টে ধরল। আদনান অবিশ্বাসের দৃষ্টিতে তাকিয়ে বলেছিল,
-এ তুমি কি করছো অহনা!
​আমি সেদিন জবাব দিতে পারিনি। আমি নিজেও জানতাম না, আমার হাতের বঁটিটা আসলে আদনানের জন্য ছিল না। ওটা ছিল আমার আব্বার প্রতি জমানো হাজারো ক্ষোভের এক বিস্ফোরণ।
​যখন ক্লাস ফাইভের বৃত্তির কোচিংয়ের জন্য রেডি হচ্ছিলাম, তখন আব্বা-আম্মার মধ্যে কি নিয়ে যেন প্রচণ্ড ঝগড়া হলো। আম্মা চিৎকার করে বলছিলেন,
-করলাম না তোর এই সংসার। আজকে আমি ম*রব আর তোদের সবকটাকে জেলের ভাত খাইয়ে ছাড়ব।
​আম্মা সজোরে ঘরের দরজা বন্ধ করে খিল তুলে দিলেন। আব্বা কিছুক্ষণ দরজার দিকে তাকিয়ে রুক্ষ স্বরে আমাকে বললেন,
-তোর দেরি হয়ে যাচ্ছে অহনা, চল তোকে আগে দিয়ে আসি।
আমি কাঁদো কাঁদো সুরে বলেছিলাম,
-আগে আম্মাকে বের করো...
-ম*রলে ম*রুক। জীবনটা আমার বিষ করে দিল। চল তুই আমার সাথে।
​আব্বার সেই রাগী দৃষ্টি উপেক্ষা করার সাধ্য আমার ছিল না। কোচিংয়ে বসে কলম চলেনি আমার। আমি শুধু ভাবছিলাম, বাড়ি গিয়ে আম্মার ঝুলে থাকা লা*শ দেখতে হবে। বাসায় ফিরে দেখি বড় চাচি আর ফুপি মিলে আম্মার মাথায় জল ঢালছে। আম্মা বেঁচে আছে, এই স্বস্তিটুকু পেলেও আমার ভেতরে এক গভীর ভীতি বাসা বেঁধেছিল। রাতের পর রাত কেউ জোরে দরজা বন্ধ করলেই ভয়ে আমার গা কাঁটা দিয়ে উঠত।
কিন্তু অবিশ্বাস্যভাবে ​একই কাজ আমি করেছিলাম আমার প্রিয় সংসারে। ননদ রিনার সাথে সামান্য কথা কাটাকাটি হয়েছিল আমার। আমি সরাসরি আদনানকে বিচার দিলাম। ও নিরপেক্ষ থাকতে গিয়ে বলল,
-অহনা, তোমার কাছে যেটা ছয় আমার কাছে সেটা নয় হতেই পারে। প্রত্যেকের ভিউ সমান হয় না। তোমার কাছ থেকে শুনলাম এখন রিনার কাছ থেকে শুনবো তারপরে আমি কথা বলব।
​আমার প্রচণ্ড রাগ উঠে গেল। আমার মনে হলো ও আমাকে বিশ্বাস করছে না, আমাকে মিথ্যেবাদী ভাবছে। ঠিক যেমন আব্বা আম্মাকে কোনোদিন বিশ্বাস করতেন না। আমি দৌড়ে ঘরে গিয়ে সজোরে দরজা আটকে দিলাম। আদনান বাইরে থেকে চিৎকার করছিল দরজা খোলার জন্য। কিন্তু আমার কানে তখন আব্বার সেই কণ্ঠস্বর বাজছে "ম*রলে ম*রুক!"
​আমি ড্রয়ার থেকে ব্লেড বের করলাম। আমি তখন গর্ভবতী। পেটে মুমু। তবুও আমি ভাবলাম না। এক টানে হাতের শিরাটা চিরে ফেললাম। আমি চেয়েছিলাম আদনানকে অপরাধী করতে, ঠিক যেভাবে আম্মা আব্বাকে করতে চেয়েছিলেন। যখন জ্ঞান ফিরল, আমি হাসপাতালে। আদনান পাশে বসে অঝোরে কাঁদছিল। ও শুধু বলেছিল,
-কেন করলে এটা অহনা? আমাদের বাচ্চাটার কথা একবারও ভাবলে না?
​আমি তখন ভার্সিটিতে পড়ি। ততদিনে যৌথ পরিবার ভেঙে গেছে। আম্মা আর আমি শপিং থেকে ফিরেছি। বেল বাজানোর আগেই হেল্পিং হ্যান্ড রুনা দরজা খুলে দিল। সে জানালা দিয়ে আমাদের দেখেছে। ভেতরে ঢুকতেই বেডরুম থেকে আব্বার কণ্ঠস্বর ভেসে এল। আম্মা আমার হাত চেপে ধরে ঠোঁটে আঙুল দিয়ে চুপ করতে বললেন। আব্বা ফোনে বলছিলেন,
-হ্যাঁ সুরাইয়া, আমি তো গিয়েছিলাম, তুমি এলে না কেন? আমি আর কতক্ষণ অপেক্ষা করব?
​আম্মা অনেকদিন ধরেই বলছিলেন আব্বার চরিত্রের সমস্যার কথা। আমি হেসেই উড়িয়ে দিতাম। কিন্তু সেদিন নিজের কানে শুনে আমি পাথরের মতো জমে গেলাম। এরপর যা ঘটেছিল তা কেবল ঝগড়া নয়, ছিল এক ঝড়। পাড়ার মোড় পর্যন্ত সেই ঝগড়া গড়িয়েছিল।
​বিয়ের পর আদনান একদিন অফিস থেকে ফিরতে লেট করছিল। ফোনটাও বন্ধ ছিল। আদনান ঘরে ঢুকতেই আমি তলোয়ারের মতো তীক্ষ্ণ স্বরে প্রশ্ন করলাম,
-কোথায় ছিলে? কার সাথে চক্কর চলছে তোমার?
আদানন অবাক হয়ে বলল,
-অফিসের কাজে ব্যস্ত ছিলাম অহনা, কথা তো হলো তোমার সাথে। আর আসার পথে জ্যামে পড়ে গেলাম । তোমাকে তো শেষবার কথা বলার সময়ই বলেছিলাম যে ফোনের চার্জ প্রায় শেষ তাই দেখো ফোনটা এখন বন্ধ হয়ে গেছে।
-মিথ্যে বলবে না! কোন মেয়ের সাথে ছিলে বলো? নিশ্চয়ই কোনো মেয়ের সাথে তোমার চক্কর চলছে।
​আমি কুৎসিত সব কথা বলতে শুরু করলাম। আমি ওর শার্টের গন্ধ শুঁকছিলাম, পকেট চেক করছিলাম। আদনান নিজেকে সামলাতে না পেরে আমাকে প্রায় থাপ্পড় মারতে উদ্যত হয়েছিল। শাশুড়ি এসে ওকে একটা চড় মেরে ঘর থেকে বের করে দিলেন। আমি তখন রাগে ফুঁসছিলাম। আমি দেখতে পাচ্ছিলাম না যে, আদনান আসলে আমার আব্বার মতো না। আদনান আমাকে সত্যিই ভালোবাসত। কিন্তু আমি ওর মধ্যে সারাক্ষণ আমার আব্বার স্বত্বা খুঁজতাম।
​ছোটবেলায় একবার দেখেছি, আব্বা ডিনার টেবিলে বসে ভাতের থালা ছুড়ে ফেলে দিয়েছিলেন কারণ তরকারিটা একটু ঝাল হয়েছিল। আম্মা সেই রাগ ঝাড়তে টেবিলের সব তরকারি মেঝেতে ফেলে দিয়েছিলেন। সবাই ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে ছিল। আব্বা সেদিন আম্মাকে ধরে প্রচন্ড মার দিয়ে ঘর থেকে বের হয়ে গেছিলেন। আর আম্মা পরে ঠাটিয়ে থাপ্পড় লাগিয়ে দিয়েছিলেন ফুপির গালে। সেই হুলস্থুল রাতটা আজও আমার রাতের ঘুম কেড়ে নেয়।
​একবার আদনান অফিস থেকে খুব ক্লান্ত হয়ে ফিরেছিল। আমি তখন সারাদিন মুমুর সাথে একা সামলাতে গিয়ে বিরক্ত। ও ডাইনিং টেবিলে বসে বলল,
-অহনা, একটু পানি দাও তো।
আমি খিটখিট করে বললাম,
-নিজে নিয়ে খেতে পারো না? আমি কি তোমার চাকর?
আদনান অবাক হয়ে বলল,
-আমি তো জাস্ট পানি চেয়েছি, জগটা খালি।
-জানি তো,পানির বাহানায় তুমি আসলে আমাকে চাকরানী বানাচ্ছো। বলে আমি ডিনার টেবিলের সব গ্লাস-প্লেট ঝনঝন করে ফেলে ভেঙে দিলাম। মুমু ভয়ে চিৎকার করে কাঁদতে লাগল।
​আদনান সেদিন আর রাগ করেনি। ও শুধু দীর্ঘশ্বাস ফেলে টেবিলে পড়ে থাকা ভাঙা কাঁচগুলো পরিষ্কার করতে শুরু করল। ও বলেছিল,
-অহনা, তুমি আসলে সুখী হতে জানো না। তুমি অশান্তি তৈরি না করলে শান্তি পাও না।
​আদনান যখন ডিভোর্স লেটার পাঠাল, আমি ওর অফিসে গিয়েছিলাম। ওর হাত ধরে পায়ে ধরেছিলাম।
-আদনান, আমি বদলে যাব। প্রমিজ করছি। তুমি ফিরে এসো।
আদনান শান্তভাবে আমার হাতটা সরিয়ে নিয়ে বলেছিল, -অহনা, তুমি বদলে যাওয়ার কথা এর আগেও দশবার বলেছ। তুমি আসলে নিজের ট্রমার মধ্যে আটকে আছ। কতবার তোমাকে বলেছি সাইকিয়াট্রিক কাউন্সেলিং এর কথা, কিন্ত তুমি তোমার কথাতেই অবিচল। তুমি হয়তো আমাকে ভালোবাসো কিন্তু সেই ভালোবাসাটা বিষাক্ত। আমি তোমার পাশে থাকতে গিয়ে আমার নিজের সুস্থ মানসিকতা হারিয়ে ফেলছি।
​আজ চার বছর পর আমি উপলব্ধি করি, বাবা-মায়ের সেই রক্তবর্ণ চোখ, সেই বঁটি, সেই অবিশ্বাসের শব্দগুলো আসলে আমার অবচেতনে গেঁথে গিয়েছিল। আমি আমার সাজানো ঘরটা নিজ হাতে ভেঙেছি।
​আদনান অসম্ভব ভালো একটা মানুষ। তাই তো সে আজও মুমুর জন্মদিনে সবার আগে উইশ করে। কিন্তু সে আমার ছায়াও সহ্য করতে পারে না। আমি এখন থেরাপিস্টের কাছে যাই। আমি শিখছি কিভাবে সেই শৈশবের স্মৃতিগুলো মাথা থেকে মুছে ফেলতে হয়। ​আমি চাই না মুমু কোনোদিন জোরে দরজা বন্ধ করার শব্দ শুনে আঁতকে উঠুক। আমি চাই না ও কোনোদিন ওর স্বামীর দিকে বঁটি নিয়ে তেড়ে যাক। বাবা-মায়ের সম্পর্কের বিষ যেন আমার মেয়ের ধমনীতে না পৌঁছায়, এটাই এখন আমার একমাত্র লড়াই।
আমি এখনো আদনানকে ভালোবাসি। কিন্তু আমি এখন জানি, সুস্থ না হয়ে কাউকে ভালোবাসা যায় না, কেবল আঁকড়ে ধরে রাখলে তাকেও শুধু ডুবিয়েই দেয়া যায়।
(গল্প ভালো লাগলে লাইক,কমেন্ট,শেয়ার করে পেইজটা ফলো করে পাশে থাকবেন আর হ্যাঁ প্লিজ কপি করবেন না)

কলমে:সুবর্না শারমিন নিশী

No comments:

Post a Comment