চ্যানেল আই এর ছোট্ট একটা ক্লিপ দেখলাম, কমেন্টে আছে, তবে এটা ছোট কিছু না। একজন শ্রমজীবী মানুষকে জিজ্ঞেস করা হয়েছিল, কোন প্রতীকে ভোট দেবেন ঠিক করেছেন? তিনি খুব সরলভাবে বললেন, ইসলামী প্রতীকে দেবো, যাতে মেয়েরা বোরখা পরে। বোরখা পরলে আমরা মনে করি মেয়েরা ভালো, এইটাই আমার একমাত্র চাওয়া।
এই কথাটার ভেতরে যে রাজনীতি, যে ক্ষমতার ভাষা, যে সহিংসতা, সেটা বুঝতে হলে আমাদের আরেকটু গভীরে যেতে হবে………দুঃখিত পোস্টটা অনেক বড় কিন্তু in-depth।
এখন বলি, এই লোকের কথা শুনে আমার প্রথম যে জিনিসটা মাথায় এসেছে সেটা ধর্ম না, সেটা ক্ষমতা। কারণ সে বলছে না, আমি ইসলামী নীতিতে ন্যায়বিচার চাই, দুর্নীতি কমুক, শ্রমিকের মজুরি বাড়ুক, হাসপাতাল-স্কুল ঠিক হোক।
সে বলছে, “বোরখা পরলে মেয়েরা ভালো।” মানে, রাষ্ট্র চালানোর যোগ্যতা যাচাইয়ের মাপকাঠি সে বানিয়েছে নারীর শরীর ঢাকার কাপড়। এটাই বাংলাদেশের পুরুষতান্ত্রিক মস্তিষ্কের কমন এবং সবচেয়ে সফল প্রোপাগান্ডা, নারীর ভালো/খারাপ কে নীতির প্রশ্ন থেকে নামিয়ে এনে পোশাকের প্রশ্নে পরিণত করা, যাতে পুরুষ নির্বিঘ্নে নৈতিক পুলিশ হতে পারে, আর নারী সারাজীবন প্রমাণ দিতে থাকে যে সে সম্মানযোগ্য।
এটা কোনো একক ব্যক্তির মতামত না। এটা বাংলাদেশের বৃহৎ এক মানসিক কাঠামোর প্রতিফলন, যেখানে নারীর ভালো হওয়া মানে তার নৈতিকতা না, তার পোশাক। যেখানে নারী মানুষ না, চলমান নৈতিক সাইনবোর্ড। যেখানে রাষ্ট্র, সমাজ, পরিবার, সবাই মিলে নারীর শরীরকে একটা রাজনৈতিক প্রজেক্ট বানিয়ে ফেলেছে।
বোরখা এখানে শুধু ধর্মীয় পোশাক না। বোরখা এখন একটা নৈতিক সার্টিফিকেট। আপনি বোরখা পরলে আপনি ভালো, আপনি না পরলে আপনি সন্দেহজনক। আপনার চিন্তা, শিক্ষা, কাজ, সততা, মানবিকতা, সবকিছু গৌণ হয়ে যায়। মূল প্রশ্ন একটাই, আপনি ঢাকছেন কি না। এই নির্বাচনের মৌসুমে সবাই মৌসুমী বোরখা বা মাথা ঢাকছে ঠিক এই কারণেই।
এই ভাবনাটা খুব বিপজ্জনক, কারণ এখানে নৈতিকতার মাপকাঠি মানুষের আচরণ না, মানুষের শরীর। আর যখন শরীর নৈতিকতার একমাত্র মাপকাঠি হয়, তখন সহিংসতা খুব স্বাভাবিক হয়ে ওঠে। কারণ তখন সমাজ মনে করে, এই শরীরটা নিয়ন্ত্রণ করাই ন্যায়ের কাজ।
বাংলাদেশে গত এক দশকে বোরখা কীভাবে ভালো মেয়ের ইউনিফর্ম হয়ে উঠেছে, সেটা কোনো স্বাভাবিক সাংস্কৃতিক বিবর্তন না। এটা পরিকল্পিত, রাজনৈতিক, এবং পুরুষতান্ত্রিক। ধর্মীয় ভাষা ব্যবহার করে নারীর ওপর নিয়ন্ত্রণ বাড়ানো হয়েছে, আর সেই নিয়ন্ত্রণকে বলা হয়েছে নৈতিকতা, শালীনতা, সংস্কৃতি।
সবচেয়ে ভয়ংকর বিষয় হলো, এই চিন্তাটা শুধু অশিক্ষিত মানুষের মধ্যে সীমাবদ্ধ না। এটা শহুরে মধ্যবিত্ত, শিক্ষিত শ্রেণীর মধ্যেও গভীরভাবে প্রোথিত। পার্থক্য শুধু ভাষায়। একজন শ্রমজীবী মানুষ সরাসরি বলছে, “বোরখা মানেই ভালো”। আর শিক্ষিত মানুষ বলছে, “বোরখা না পরলে মেয়েরা সেফ না”, “সমাজের কথা ভাবতে হবে”, “রিয়েলিটি বুঝতে হবে”। কিন্তু মূল যুক্তিটা একই, নারীর নিয়ন্ত্রণই মুখ্য।
এইখানেই পিতৃতন্ত্র সবচেয়ে naked। কারণ পিতৃতন্ত্র নারীর নৈতিক দায়িত্ব তার নিজের ওপর চাপায়, কিন্তু পুরুষের দায়িত্ব নিয়ে নীরব থাকে। পুরুষ কী পরবে, কী দেখবে, কী করবে, এই প্রশ্নগুলো অপ্রাসঙ্গিক। সব নজর নারীর শরীরের ওপর।
আর এই বোরখা কেন্দ্রিক নৈতিকতা শেষ পর্যন্ত রাজনীতির জায়গায় গিয়ে দাঁড়ায়। যখন একজন মানুষ বলে, আমি ইসলামী প্রতীকে ভোট দেবো যাতে মেয়েরা বোরখা পরে, তখন সে আসলে বোঝায়, রাষ্ট্রের কাজ হবে নারীর পোশাক ঠিক করা। অর্থনীতি, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, শ্রমের অধিকার, সব গৌণ। রাষ্ট্রের মূল দায়িত্ব হবে নারীর শরীর শাসন করা।
এই মানসিকতা থেকেই আসে নারীর বিরুদ্ধে সহিংসতা, চরিত্রহনন, ডিজিটাল লিঞ্চিং, এমনকি হত্যা। কারণ একবার যদি সমাজ ঠিক করে ফেলে যে “good woman” কেমন হবে, তাহলে “bad woman” কে শাস্তি দেওয়াও নৈতিক কর্তব্য হয়ে যায়।
অনেক নারী বোরখা পরেন বিশ্বাস থেকে, নিরাপত্তার জন্য, স্বাচ্ছন্দ্যের জন্য, এবং সেটা তাদের অধিকার। সমস্যাটা হলো যখন বোরখা নৈতিকতার সার্টিফিকেট হয়ে যায়, আর না পরা মানেই খারাপ নারী হয়ে যায়। তখন পোশাক থাকে না, পোশাক হয়ে ওঠে শাসনের ভাষা, যার ভেতর দিয়ে নারীকে ‘ভালো মেয়ে/খারাপ মেয়ে’ ক্যাটাগরিতে ভাগ করে রাখা হয়। এবং এই ভাগটা রাজনৈতিক, কারণ ভালোর অর্থ এখানে প্রায়ই obedient, আর খারাপ হচ্ছে স্বাধীন বা প্রশ্নকারী।
বাংলাদেশে বোরখা কীভাবে এত শক্তিশালী সামাজিক প্রতীক হয়ে উঠল ? হুম, এটা একদিনে হয়নি। এটা একটা দীর্ঘ রাজনৈতিক-সাংস্কৃতিক রূপান্তরের ফল। ১৯৭১ এর পর যে সংবিধান ধর্মনিরপেক্ষতা কে রাষ্ট্রীয় নীতির অংশ করেছিল, সেটা থেকে বেরিয়ে সময়ের পরিবর্তে রাষ্ট্র ধীরে ধীরে ধর্মকে ক্ষমতার ভাষায় ফিরিয়ে আনে। সামরিক শাসনের সময় এই প্রক্রিয়া গতি পায়, আর ১৯৮৮ সালে ধর্মীয় পরিচয় রাষ্ট্রীয় বৈধতার অংশ হয়ে ওঠার পর সমাজও ধর্মীয় চিহ্নকে নৈতিকতার মাপকাঠি বানাতে শুরু করে। রাজনৈতিক সমাজবিজ্ঞানের খুব সাধারণ পাঠ, রাষ্ট্র যে নৈতিকতা প্রতিষ্ঠা করে, সমাজ সেটাকে দৈনন্দিন পুলিশিংয়ে অনুবাদ করে।
এরপর ৯০ এর দশক থেকে আরেকটা বড় পরিবর্তন আসে, গাল্ফ মাইগ্রেশন ও রেমিট্যান্স অর্থনীতি। মধ্যপ্রাচ্যে কাজ করতে গিয়ে সেখানকার ধর্মীয় সংস্কৃতির সংস্পর্শে এসে অনেক পরিবারে পোশাক-আচারের নতুন মানদণ্ড ঢোকে, একই সঙ্গে দেশে ইসলামী পোশাকের বাজারও বিস্তৃত হয়।
গবেষণা ও সমাজতাত্ত্বিক পর্যবেক্ষণ স্পষ্টভাবে দেখায় যে গত দুই দশকে বাংলাদেশে, বিশেষ করে নগর এলাকায়, হিজাব ও বোরখা পরিধানের হার উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে।
এই পরিবর্তনকে শুধুমাত্র ধর্মীয় জাগরণ হিসেবে ব্যাখ্যা করা খুব সরলীকরণ হবে। গবেষণা বলে বাংলাদেশে নারীদের পর্দা বা বোরখা গ্রহণের পেছনে ধর্মীয় বিশ্বাসের পাশাপাশি কাজ করছে সামাজিক নিরাপত্তা, সম্মানজনকতা (respectability), এবং পুরুষতান্ত্রিক নিয়ন্ত্রণের কাঠামো, যেখানে নারী শরীরকে নিয়ন্ত্রণ করা সামাজিক শৃঙ্খলার অংশ হয়ে দাঁড়িয়েছে (রহমান, ২০২৫)। অনেক নারী বোরখা পরেন ‘নিজের পছন্দে’, কিন্তু সেই পছন্দটি তৈরি হয় সামাজিক প্রত্যাশা, ভয় এবং গ্রহণযোগ্যতার চাপে, স্বাধীন শূন্যতায় না(Kabeer et al., Cambridge University Press)।
আচ্ছা এইখানে একটু বলে রাখি, ওই ব্যক্তির শিক্ষাগত অবস্থান বা ব্যক্তিগত বিশ্বাস নিয়ে আমি বলছি না। আমি বলছি কীভাবে বোরখা ধীরে ধীরে ভালো নারীর একমাত্র দৃশ্যমান প্রতীক হয়ে উঠল, এবং কীভাবে এই প্রতীক আজ রাষ্ট্রক্ষমতা কল্পনার মানদণ্ড পর্যন্ত নির্ধারণ করছে। সমাজবিজ্ঞানে একে বিশ্লেষণ করা হয়েছে moral coding of women’s bodies হিসেবে, এখানে নারীর শরীর পরিণত হয় নৈতিকতার বাহকে, আর পুরুষেরা নিজেদের নিরাপত্তা, শৃঙ্খলা ও কর্তৃত্বের কল্পনাকে সেই শরীরের ওপর চাপিয়ে দেয়।
ঐতিহাসিকভাবে বাংলাদেশে নারীর পোশাক কখনোই একরৈখিক ছিল না। গ্রাম-শহর, শ্রেণি-পেশা, ধর্মীয় অনুশীলন, সবকিছুর মধ্যেই বৈচিত্র্য ছিল। ষাট ও সত্তরের দশকে শাড়ি ছিল প্রধান পোশাক, মাথা ঢাকার রীতি ছিল সামাজিক, কিন্তু তা কোনো রাজনৈতিক পরিচয়ের ভাষা ছিল না।
আশির দশকে সামরিক শাসন, মধ্যপ্রাচ্য-ফেরত শ্রমিকদের অভিজ্ঞতা, পেট্রো-ডলারের সাংস্কৃতিক প্রভাব এবং আন্তর্জাতিক ইসলামিক নেটওয়ার্কের বিস্তারের সঙ্গে সঙ্গে ধীরে ধীরে পোশাক রাজনীতিকরণ শুরু হয়। নব্বইয়ের পর এনজিও রাষ্ট্র, উন্নয়ন বয়ান ও একই সঙ্গে ইসলামিক পরিচয় রাজনীতির উত্থান, এই দুই বিপরীত ধারার সংঘাতে নারীর শরীর হয়ে ওঠে আদর্শিক লড়াইয়ের মাঠ।
দুই হাজার দশকের পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, ওয়াজ-মাহফিলের ডিজিটাল বিস্তার এবং ধর্মীয় আবেগের রাজনৈতিক পুঁজিকরণ এই প্রক্রিয়াকে আরও ত্বরান্বিত করে। বোরখা তখন আর ব্যক্তিগত বিশ্বাসের অনুশীলন থাকে না, এটা হয়ে ওঠে visual shorthand, এক নজরে ভালো নারী চেনার উপায়। তোহা এবং লুৎফার গবেষণায়, বাংলাদেশে নারীর “ভালো” বা “খারাপ” মূল্যায়ন এখন ক্রমেই পোশাককেন্দ্রিক হয়ে উঠছে, যা সরাসরি নারীর কর্মসংস্থান, নিরাপত্তা ও সামাজিক গ্রহণযোগ্যতাকে প্রভাবিত করছে।
Scroll in এর প্রতিবেদন পড়লাম, ৮০-৯০ এর দশকের ঢাকায় যেখানে হিজাব ছিল তুলনামূলকভাবে বিরল, সেখানে আজ এটা সামাজিক সম্মান ও শালীনতার দৃশ্যমান প্রতীক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। অর্থাৎ পোশাক এখন ব্যক্তিগত পছন্দ থেকে সামাজিক চরিত্রের সার্টিফিকেট হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে ।
এই বোরখা-কেন্দ্রিক নৈতিকতা শুধু নারী-পুরুষের মধ্যে বিভাজন তৈরি করে না, নারীদের মধ্যেও গভীর শ্রেণিবিন্যাস ও বিচ্ছিন্নতা সৃষ্টি করে। একই ধর্মের ভেতরেই ভালো মুসলিম নারী বনাম অপর্যাপ্ত বা সন্দেহজনক নারী এই বিভাজন গড়ে ওঠে। সমাজবিজ্ঞানের ভাষায়, intra-group othering। এখানে বোরখা পরা নারী হয়ে ওঠে নৈতিক মানদণ্ড, আর না পরা নারীকে ক্রমাগত ব্যাখ্যা দিতে হয়, তার বিশ্বাস, চরিত্র ও নাগরিকত্ব নিয়ে। অফিসে কে বিশ্বাসযোগ্য, রাস্তায় কে নিরাপদ, পরিবারে কার কথা গ্রহণযোগ্য, এসব নির্ধারণে পোশাক একপ্রকার নীরব আদালত হয়ে ওঠে।
এই প্রক্রিয়া আরও ভয়ংকর হয় যখন তা অন্য ধর্মের নারীদের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য হয়। ভালো নারী যদি একমাত্র একটা ধর্মীয় ভিজ্যুয়াল কোডে আবদ্ধ হয়, তবে হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিস্টান বা আদিবাসী নারীরা স্বয়ংক্রিয়ভাবে নৈতিক মানচিত্রের বাইরে ঠেলে দেওয়া হয়। আরেন্ট যাকে বলেছিলেন the banality of exclusion, বর্জন এতটাই স্বাভাবিক হয়ে যায় যে কেউ আর প্রশ্ন তোলে না। সহিংসতা তখন নৈতিকভাবে নীরবভাবে অনুমোদিত হয়ে ওঠে।
এখানেই পিতৃতন্ত্র সবচেয়ে কার্যকর। এটা সরাসরি শাসন করে না, কিন্তু সমাজের ভেতরেই নৈতিক পুলিশ বসিয়ে দেয়। নারী নারীর পাশে দাঁড়ানোর বদলে একে অপরকে মাপতে শুরু করে, কে বেশি ভালো, কে কম। অ্যাক্সেল হনেথের recognition theory বলে, এই ধরনের নৈতিক অবমূল্যায়ন নারীর সামাজিক মর্যাদা ক্ষতিগ্রস্ত করে এবং রাষ্ট্রীয় সুরক্ষার দাবিকেও দুর্বল করে দেয়।
আর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মোড়টা আসে যখন মেয়েরা বড় পরিসরে ঘরের বাইরে যেতে শুরু করে। গার্মেন্টস, এনজিও, বিশ্ববিদ্যালয়, শহুরে চাকরি। তখন পুরুষতান্ত্রিক সমাজ একটা পুরোনো টেনশন ফিল করে, নারী বাইরে গেলে নিয়ন্ত্রণ কমে। এই নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখার সবচেয়ে কম খরচের টুল কী? লজ্জা। পর্দা না করলে সম্মান নেই, এই ন্যারেটিভ নারীকে কাজ/পড়াশোনার সুযোগ থেকেও পুরোপুরি ফেরায় না, আবার স্বাধীনতাকেও শর্তসাপেক্ষ করে। একে ডেনিজ কান্দিয়োটি যেভাবে বলেন, এটা একধরনের patriarchal bargain, সমাজ নারীর চলাচল মেনে নেয়, বিনিময়ে নারীকে ‘ভদ্রতার ইউনিফর্ম’ পরতে হয়। তত্ত্বের ভাষা বাদ দিলেও বাস্তবটা সোজা, বাইরে যেতে হলে, বোরখা পরো।
এখানেই বোরখা ব্যক্তিগত পছন্দ থেকে সামাজিক বাধ্যবাধকতা হয়ে উঠতে শুরু করে। বাংলাদেশে অনেক নারীর জন্য বোরখা/হিজাব একধরনের সামাজিক ঢাল, যার মাধ্যমে তারা রাস্তাঘাটের হয়রানি, আত্মীয়-প্রতিবেশীর নজরদারি, এবং চরিত্রহননের ঝুঁকি কমানোর চেষ্টা করেন। কিন্তু ট্র্যাজেডি হলো, এটা নারীর নিরাপত্তা বাড়ায় না, বরং পুরুষদের অপরাধবোধ কমায়। কারণ তখন দায়টা ঘুরে যায়, “তুমি ঢাকোনি বলেই তোমার সাথে এমন হলো।” এইভাবেই ভালো নারী ধারণা আসলে অপরাধকে নৈতিকভাবে ধুয়ে দেয়, ভিক্টিমকে দায়ী করে।
এর সাথে যোগ হয় ২০১০ এর পরের ডিজিটাল সময়: ফেসবুক-ইউটিউব-টিকটকে নৈতিক পুলিশিং, শেমিং, ভাইরাল বিচার এগুলো বোরখাকে আরও রাজনৈতিক করে তোলে। নারী যত বেশি দৃশ্যমান, তত বেশি শরীরকে শাস্তির জায়গা বানানো হয়, ছবি, পোশাক, হাঁটাচলা, সব কিছু দিয়ে। ফলে বোরখা শুধু বিশ্বাস না, একটা সেফটি পাস হিসেবেও ব্যবহৃত হতে থাকে। কিন্তু যে সমাজে নিরাপত্তা পেতে নারীর শরীর ঢাকা লাগবে, সেই সমাজে নিরাপত্তা আসলে নারী পাচ্ছে না, পুরুষতন্ত্র পাচ্ছে।
এখন ওই লোকের কথায় ফিরে আসি। “বোরখা পড়লে মেয়েরা ভালো”, এই বাক্যে তিনটা ভয়ংকর অনুমান আছে। এক, নারীকে মানুষ হিসেবে না, মরাল অবজেক্ট হিসেবে দেখা। দুই, ভালো মানে নৈতিকতা না, মানে পুরুষের জন্য কম ঝুঁকিপূর্ণ নারী। তিন, রাষ্ট্র চালানোর প্রশ্নেও কেন্দ্রবিন্দু বানানো হচ্ছে নারীর শরীর, অর্থনীতি, স্বাস্থ্য, শিক্ষা না। এটাকে আমি বলব political socialisation। মানুষকে বছরের পর বছর শেখানো হয়েছে, রাষ্ট্রের বড় শত্রু নারী স্বাধীনতা। ফলে ভোটের ভাষাও হয়ে গেছে নারীর পোশাক।
এই যে বোরখা এখন ভালো নারীর সিম্বল, এটা নিরীহ সাংস্কৃতিক পরিবর্তন না। এটা ক্ষমতার শ্রেণিবিভাগ! I mean, কে সম্মান পাবে, কে সন্দেহভাজন হবে; কে রাস্তায় নিরাপদ থাকবে, কে টার্গেট হবে; কে কথা বলার অধিকার পাবে, কে চুপ থাকার নির্দেশ পাবে। এবং শেষ পর্যন্ত কে দেশ চালাবে, যারা নীতি-যুক্তি দিয়ে না, নৈতিক আতঙ্ক দিয়ে রাজনীতি করতে পারে।
যদি আমরা সত্যিই একটা ন্যায্য সমাজ চাই, তাহলে প্রশ্নটা বোরখা-বিরোধিতা বা বোরখা-সমর্থন না। প্রশ্নটা আরও কড়া, কোন যুক্তিতে নারীর পোশাককে রাষ্ট্র পরিচালনার মানদণ্ড বানানো হয়? যে সমাজ নারীকে ভালো প্রমাণ করতে কাপড়কে শর্ত করে, সে সমাজ আসলে পুরুষকে খারাপ কাজ করার লাইসেন্স দেয়। এবং যে রাজনীতি নারীকে “ঢেকে” ভালো বানাতে চায়, সে রাজনীতি একদিন সবাইকে ঢেকে ফেলবে, প্রশ্নকে, ইতিহাসকে, অধিকারকে, ভোটকে।
আপনি বোরখা পরতে পারেন, আপনার অধিকার। কিন্তু “বোরখা = ভালো নারী” এই সমীকরণটা রাজনৈতিকভাবে ভাঙতেই হবে। কারণ এটা নারীর ওপর ধর্ম চাপানোর আগেই একটা জিনিস চাপায়, পুরুষের কর্তৃত্ব।
ড. লুবনা ফেরদৌসী
শিক্ষক ও গবেষক,
ইউনিভার্সিটি অব হাল, ইংল্যান্ড