মানুষ তার জীবনের অভিজ্ঞতা থেকে, অপ্রাপ্তি থেকে সবচেয়ে বেশি শেখে।।অহনা বিশ্বাস লিখলেন।
আমার দিদিমার সবচেয়ে বেশি ক্ষোভ ছিল এই যে, দ্বিতীয় শ্রেণীতে তাঁকে পড়াশোনা ছাড়িয়ে দেওয়া হয়েছিল। অথচ তাঁর দাদারা তখন বড়ো ইস্কুলে পড়তে যাচ্ছেন। তাঁকে একটি ছেঁড়া কাপড়ে বইখাতা বেঁধে নিয়ে যেতে হত। ছোটবেলায় একটি ব্যাগের আকাঙ্ক্ষা ছিল তাঁর, যে অপ্রাপ্তির বেদনা তিনি বৃদ্ধ বয়স পর্যন্ত বয়েছিলেন।
নিতান্ত নিম্নমধ্যবিত্ত পরিবারের এই বধূ সারাজীবন নিজের একমাত্র সন্তান ছাড়াও আত্মীয়, প্রতিবেশী বহুজনের পড়াশোনায় সাধ্যাতীত শ্রম ও অর্থ দিয়ে সাহায্য করে গেছেন।
আমি আমার দিদিমার কাছে বড় হয়েছি এবং তাঁকে মাত্র সতেরো বছর বয়েসে হারিয়েছি। সারাজীবন তিনি প্রচুর বই পড়তেন। বই না পেলে ঠোঙা পড়তেন। আমার মা ছাড়াও বিভিন্ন লোককে দিয়ে বিভিন্ন গ্রন্থাগার থেকে তিনি বই আনাতেন। নিজে খুব একটা বের হতেন না বলেই বোধ হয়, ভ্রমণকাহিনী পড়তে খুব ভালোবাসতেন।
পাড়ার শিশু, কিশোর , যুবক যুবতীর প্রতি তাঁর অবারিত দ্বার ছিল। তিনি ছিলেন গণ -পিসীমা। এখনও তাঁর কথা স্মরণে রেখে বহুজন আমাদের পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ রাখে।
আমার দিদিমাকে কখনও লিখতে দেখিনি। তাঁকে দিয়ে কিছু লেখাইনি --এই আক্ষেপ আমার যাবার নয়। তাঁকে কখনও শুয়ে বসে থাকতে দেখিনি। সবসময় কিছু না কিছু করছেনই। সামান্য উপকরণে অসামান্য রাঁধুনি তিনি। বই পড়া ছাড়া সেলাই করেই তাঁর অবকাশ কাটত। সেলাইএর উপকরণের জন্য বাজার যেতে হত না। সবই পুনর্নবীকৃত শিল্প। পুরোনো শাড়ি থেকে সুতো বের করে পুরোনো বস্তার ওপর কাজ, কখনও আবার ছেঁড়া টুকরো কাপড় সংগ্রহ করে জোড়া দিয়ে কাঁথা তৈরি । সেসবই ব্যবহার হয়েছে প্রতিদিনের জীবনে। কয়েকটি যা বেঁচেবর্তে আছে, আজ তাকে বের করে ছবি তুললাম।
আমার দিদিমার নাম টগর সেন। তিনি ছোটখাটো চেহারার রাশভারী মানুষ ছিলেন। ইয়ার্কি ঠাট্টা পছন্দ করতেন না। ধনীদের এড়িয়ে চলতেন আর ঝাড়ুদারনির সঙ্গে পুজোর সময় ঠাকুর দেখতে যেতেন।
যতদূর জানি, আমার দাদামশাইএর সঙ্গে দিদিমার সম্পর্ক খুব ভালো ছিল। তবু আজ ভাবলে খুব আশ্চর্য লাগে, তিনি আমাকে বিয়ে করতে নিষেধ করতেন। বলতেন বুদ্ধিমতী মেয়েদের সংসারে সুখ হয় না।
বলতেন, আমাদের মতো বাড়িতে ইন্দিরা গান্ধীও যদি আসেন, তাহলে বাড়ির লোক তাঁকে জিজ্ঞাসা করবে, তুমি ভাত রাঁধতে জানো? তুমি সেবা করতে জানো? এ দুটি গুণ ছাড়া আমাদের দেশের মেয়েদের আর কোনও গুণ মূল্য পায় না।
জানিনা , বই পড়ে নাকি জীবন থেকে তিনি এই বোধ অর্জন করেছিলেন
No comments:
Post a Comment