Friday, January 30, 2026

পর্দা: নারীর সম্মান, নাকি মালিকানার চিহ্ন ?

 


সমসাময়িক মুসলিম সমাজে “পর্দা” সাধারণত উপস্থাপিত হয় নারীর সম্মান, নিরাপত্তা ও নৈতিকতার প্রতীক হিসেবে। কিন্তু ইতিহাস, নৃতত্ত্ব ও রাজনৈতিক সমাজতত্ত্বের আলোকে বিষয়টি বিশ্লেষণ করলে একটি ভিন্ন চিত্র সামনে আসে। প্রশ্নটি তখন আর ধর্মীয় অনুশাসনের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না; বরং তা হয়ে ওঠে ক্ষমতা, মালিকানা ও সামাজিক নিয়ন্ত্রণের রাজনীতি।
এই লেখার মূল দাবি তিনটি থিসিসের উপর দাঁড়িয়ে আছে:
ক) পর্দা মূলত নারীর সম্মানের প্রতীক নয়, বরং ঐতিহাসিকভাবে এটি মালিকানার চিহ্ন।
খ) পর্দা নারীকে বাস্তবে নিরাপদ করেনি; বরং তাকে সামাজিকভাবে অদৃশ্য করেছে।
গ) ইসলাম যে নৈতিক আন্দোলন হিসেবে নারীর সামাজিক মুক্তির মাধ্যমে শুরু হয়েছিল, রাজতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থা তাকে ধীরে ধীরে নারীর বন্দিত্বের ভাষায় অনুবাদ করেছে।
১. পর্দার ঐতিহাসিক উৎস: ইসলাম নয়, সাম্রাজ্য !
ইতিহাসবিদদের মধ্যে (Leila Ahmed, Fatima Mernissi, Gerda Lerner) প্রায় ঐকমত্য আছে যে কঠোর পর্দা ও হারেম প্রথার শিকড় প্রাক-ইসলামিক পারস্য ও বাইজেন্টাইন রাজতন্ত্রে। এই সমাজগুলোতে রাজপরিবারের নারীরা ছিল রাষ্ট্রীয় সম্পত্তির অংশ—উত্তরাধিকার ও রক্তের বিশুদ্ধতা রক্ষার রাজনৈতিক যন্ত্র।
ইসলামের প্রাথমিক সমাজে (মদিনা পর্ব) এমন কোনো প্রাতিষ্ঠানিক “নারী-বন্দিত্ব ব্যবস্থা” দেখা যায় না। কিন্তু যখন ইসলাম নৈতিক আন্দোলন থেকে সাম্রাজ্যে রূপ নেয় (উমাইয়া ও আব্বাসীয় যুগ), তখন বিজিত পারস্য ও রোমান প্রশাসনিক-সাংস্কৃতিক কাঠামোর সাথে সাথে নারী নিয়ন্ত্রণের প্রযুক্তিগুলোও আমদানি হয়—হারেম, প্রহরা, এবং কঠোর পর্দা। এখান থেকেই পর্দা হয়ে ওঠে নৈতিক অনুশাসন নয়, বরং রাষ্ট্রীয় সম্পত্তি রক্ষার ব্যবস্থা।
২. “সম্মান” নাকি “মালিকানা”: পর্দার রাজনৈতিক অর্থ কি ?
সমাজবিজ্ঞানী দৃষ্টিতে দেখা যায়, যাকে সবচেয়ে “মূল্যবান সম্পদ” হিসেবে ধরা হয়, তাকেই সবচেয়ে বেশি নিয়ন্ত্রণ করা হয়। ইতিহাসে:
• রাজপরিবারের নারী → কঠোর পর্দা
• দাসী ও ক্রীতদাস নারী → অনেক ক্ষেত্রে কোনো পর্দাই না
এই দ্বৈত মানদণ্ড প্রমাণ করে পর্দা নৈতিকতার প্রশ্ন ছিল না, এটা ছিল মালিকানার চিহ্ন।
সম্ভ্রান্ত নারীর শরীর মানে ছিল:
• বংশপরিচয়ের নিশ্চয়তা
• উত্তরাধিকার রাজনীতির নিরাপত্তা
সুতরাং তাকে “দেখা থেকে লুকানো” ছিল রাষ্ট্রীয় স্বার্থ।
৩. পর্দা ও অদৃশ্যতা: নিরাপত্তা নয়, নীরবতা !
রাষ্ট্র ও সমাজ প্রায়ই দাবি করে: “পর্দা নারীর নিরাপত্তার জন্য।”
কিন্তু ঐতিহাসিক ও সমাজতাত্ত্বিক বাস্তবতা বলে পর্দা নারীকে নিরাপদ করেনি, পর্দা নারীকে সামাজিকভাবে অদৃশ্য করেছে।
অদৃশ্যতা মানে:
• সিদ্ধান্ত গ্রহণ থেকে বাদ পড়া
• জ্ঞান উৎপাদন থেকে বাদ পড়া
• রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক পরিসর থেকে বাদ পড়া
Hannah Arendt-এর ভাষায়, যে দৃশ্যমান নয়, সে রাজনৈতিক সত্তা নয়। এই অর্থে পর্দা নারীর নাগরিক সত্তাকেই সংকুচিত করেছে।
৪. প্রারম্ভিক ইসলামে নারীর সামাজিক উপস্থিতি !
প্রারম্ভিক ইসলামি সমাজে নারীরা:
• মসজিদে উপস্থিত থাকতেন
• বাজারে যেতেন
• যুদ্ধে সেবাকাজ করতেন
• সরাসরি নবীর কাছে প্রশ্ন ও বিতর্ক করতেন
তারা ছিলেন সামাজিকভাবে দৃশ্যমান ও সক্রিয়। এই বাস্তবতা দেখায় যে আজকের “ঘরবন্দি নারী আদর্শ” ইসলামি নৈতিক আন্দোলনের মৌলিক বৈশিষ্ট্য নয়, বরং পরবর্তী রাজতান্ত্রিক রূপান্তরের ফল।
৫. রাজতন্ত্র কীভাবে ধর্মের ভাষা দখল করল ?
উমাইয়া, আব্বাসীয়, উসমানি ও মোগল সাম্রাজ্যগুলোতে আমরা দেখি:
• হারেম = রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান
• নারী = উত্তরাধিকার উৎপাদনের যন্ত্র
• পর্দা = নিরাপত্তা দেয়াল
এই ব্যবস্থাগুলোকে পরে ফিকহ ও ধর্মীয় ভাষার মাধ্যমে নৈতিক বৈধতা দেওয়া হয়। ফলে:
• নিয়ন্ত্রণ → শালীনতা
• বন্দিত্ব → সম্মান
• নীরবতা → পবিত্রতা
এই রূপান্তরই হলো নৈতিক আন্দোলনের রাজতান্ত্রিক অনুবাদ।
যাইহোক,
পর্দা নিজে কোনো ধর্মীয় অপরাধ নয়, যদি তা হয় ব্যক্তিগত পছন্দ। কিন্তু ইতিহাসে ও রাষ্ট্রীয় কাঠামোয় পর্দা অধিকাংশ সময়ই ছিল নারীর উপর মালিকানার চিহ্ন, নারীর সামাজিক দৃশ্যমানতা মুছে ফেলার যন্ত্র, এবং ক্ষমতার শাসনপ্রযুক্তি।
সবচেয়ে গভীর ট্র্যাজেডি হলো, যে ধর্ম নারীর সামাজিক মুক্তির মধ্য দিয়ে শুরু হয়েছিল, সেই ধর্মকে রাজতন্ত্র ধীরে ধীরে নারীর বন্দিত্বের ভাষায় অনুবাদ করেছে।
রেফারেন্স:
• Leila Ahmed – Women and Gender in Islam
• Fatima Mernissi – The Veil and the Male Elite
• Gerda Lerner – The Creation of Patriarchy
• Judith Butler – gender & visibility theory
• Hannah Arendt – public/private & visibility
—————-
জাপান থেকে,
ফকির চাঁদ ॥

No comments:

Post a Comment