১
মানুষ প্রথমত প্রেমে পড়ে সৌন্দর্যের কিন্তু আশ্চর্য, এই সৌন্দর্য প্রেম টিকিয়ে রাখে না, রাখে অন্যকিছু। বরং দেখা গেছে সৌন্দর্য প্রেমের হন্তারক হয়ে দাঁড়ায়। কারণ সৌন্দর্য অজস্র প্রেমের ট্রিগার হয়ে বিরাজ করে, ফলত কেউ প্রেমে আছে জানলেও লোকে তার প্রেমে পড়ে। এমনকি বিবাহিত জানলেও।
প্রিন্সেস ডায়ানার প্রেমে পড়েনি এমন মানুষ পৃথিবীতে বিরল। এবং এই প্রেমে পড়াগুলি ঘটেছিল বিয়ের পরই। কারণ, ডায়ানা বিয়ের পরই তার অপরূপ সৌন্দর্য নিয়ে সারা পৃথিবীর মানুষের সামনে হাজির হয়েছিল।
হেলেন ছিলেন মেনেলাসের স্ত্রী, কিন্তু তাকে অপহরণ করে নিয়ে পালিয়েছিল প্যারিস। এটা অপহরণ না বলে বরং বলা ভালো স্বেচ্ছায় চলে যাওয়া। কারণ ততদিনে মেনেলাস হেলেনের প্রতি ততটা আগ্রহী ছিলেন না। তাকে রেখে বেরিয়ে পড়েছিলেন রাজ্যজয় করতে, যুদ্ধে।
অথচ হেলেন ছিলেন সেই সময় সবচেয়ে রূপসী। এই রূপ দুটি ঘটনা ঘটিয়েছিল, মেনেলাসের প্রতি আগ্রহ হারিয়ে ফেলা এবং প্যারিসের প্রতি ঝুঁকে পড়া। অনুঘটক একটাই- রূপ।
আমরা জানি মেনেলাস যুদ্ধ জয় করে হেলেনকে উদ্ধার করেছিলেন কিন্তু সে প্রেমের জন্য নয়, অপমানের প্রতিশোধ নিতেই ছিল এই যুদ্ধ। দীর্ঘ দশ বছর হেলেন ছিলেন প্যারিসের স্ত্রী হয়ে।
২
তাহলে প্রেম কিসে টেকে?
কিছুতেই না। রূপ তো নয়ই। বরং রূপ একসময় কাঁটা হয়ে দাঁড়ায়। শুনেছি বঙ্কিম চট্টোপাধ্যায়ের স্ত্রী ছিলেন অপরূপ সুন্দরী। তারা একসংগে কোথাও বেড়াতে গেলে লোকেরা হা করে তার স্ত্রীর দিকে তাকিয়ে থাকতো। বঙ্কিম ছিলেন রসিক, এই দেখে একবার তিনি বলেছিলেন:
'দেখলে হবে না, অনেক খরচ'!
এই যে 'খরচ' শব্দটা কিন্তু শুধু অর্থনীতিকে নির্দেশ করছে না, বরং তাকে আগলে রাখতে সবসময় যে নিরাপত্তাহীনতায় ভুগতে হচ্ছে, এটাকেও নির্দেশ করছে।
বহিঃস্থ সৌন্দর্য ছাপিয়ে একসময় মানুষ প্রেমে পড়ে অন্তঃস্থ গুণের। একজন মানুষ কতটা গুণী, কতটা মানবিক, কতটা দায়িত্বশীল এইসবের সমাহার একটা মানুষকে অন্যের কাছে আস্থাশীল করে তোলে। এই আস্থাই সম্পর্ককে দীর্ঘস্থায়ী করে তোলে। কিন্তু দিনশেষে এটাও সম্পর্ককে ভাঙনের হাত থেকে বাঁচাতে পারে না।
তাহলে সত্য হচ্ছে কোনকিছুই, না রূপ, না গুণ, সম্পর্ককে টিকিয়ে রাখতে পারে না। আমরা যে সম্পর্কগুলি দেখি আসলে সেগুলি ভাঙা সম্পর্ক, দেখতে মনে হয় জোড়া লেগে আছে কিন্তু আসলে ভেতরে ভেতরে ভাঙা, শতচ্ছিন্ন।
মানব সম্পর্কগুলি এভাবেই টিকে আছে- ভাঙা, জোড়াতালি দেয়া, লোকদেখানো।
৩
তাহলে কি এমন আছে মানুষের ভেতর যা তাকে সম্পর্কে থাকতে দেয় না, ভাঙার জন্য সবসময় উদগ্রীব হয়ে ওঠে?
জানি না। মানুষ এক অনিশ্চিত (আনপ্রেডিক্টেবল) প্রাণী। তাকে তাড়া করে ফেরে মৃত্যু চেতনা। ফলত, কোথাও সে স্থির নয়, না রূপে, না জ্ঞানে, না অর্থে, না জনপ্রিয়তায়, না বীরত্বে। জন্মেই সে জেনে যেতে থাকে সে নশ্বর, অবিনশ্বর নয়, নয় অমর। ফলে সে অন্তর্গত এক তাড়নায় সবর্দা তাড়িত। ঐ যে জীবনানন্দ দাশ বলেছিলেন:
'আলো-অন্ধকারে যাই—মাথার ভিতরে
স্বপ্ন নয়, কোন্ এক বোধ কাজ করে;
স্বপ্ন নয়—শান্তি নয়—ভালোবাসা নয়,
হৃদয়ের মাঝে এক বোধ জন্ম লয়;
আমি তারে পারি না এড়াতে,
সে আমার হাত রাখে হাতে,
সব কাজ তুচ্ছ হয়—পণ্ড মনে হয়,
সব চিন্তা—প্রার্থনার সকল সময়
শূন্য মনে হয়,
শূন্য মনে হয়।'
৪
এই যে মানুষ বারবার প্রেমে পড়ে, এটা সেই তাড়নারই ফসল। সে ভাবে এখানে সুখ, কিন্তু পরক্ষণেই দেখে না, এখানে সুখ নাই। সে বেরিয়ে পড়ে আবার সুখের অন্বেষণে।
এমনকি একইসাথে সে বহুজনের সংগে প্রেমে জড়ায়। এটা কেবল তার বহুগামিতা স্বভাবজাত নয়, বরং এটা তার সুখতাড়িত বাসনার তাড়না। লিবিডো তার প্রকাশ। কিন্তু লিবিডোতেও তার চিত্তে সুখ আনে না, সে ক্ষণিক বটে। তারপরেই অবসাদ তাকে ঘিরে ধরে।
মানুষ যেহেতু ঈশ্বরের প্রতিরূপ, তাই সে যখন সম্পর্কে জড়ায়, তখন অন্যকে অংশ দিতে চায় না। কিন্তু এই না চাওয়া তাকে আধিপত্যবাদী করে তোলে এবং এই আধিপত্যবাদীতাই সম্পর্ককে ভেঙে ফেলে।
প্রশ্ন উঠেছে, একসাথে একাধিক প্রেমে জড়ানো যায় কি না?
আমি সাফ বলে দিয়েছি- যায়। কারণ এই প্রশ্নটা যখন উঠেছে, তখন ধরে নিতে হবে এটা মানুষ চায়। শুধু চায় নয়, করেও। তবে একে অপরের কাছে প্রকাশ করতে ভয় পায়। আসলে প্রকাশ করুক বা না করুক সম্পর্ক একদা ভেঙে যাবেই। সম্পর্ক কোন নৈতিকতার ধার ধারে না।
তাহলে একসাথে বহুজনের সম্পর্ককে আমরা কি চোখে দেখবো?
আমার মনে হয় এর উত্তরটা অনেককে ক্ষুব্ধ করবে। কারণ আমরা এখনো সম্পর্ককে মুক্ত করতে পারিনি, পারিনি মানবমনের প্রকৃত বৈশিষ্ট্যকে তার মত করে চলতে দিতে। আমরা এক ব্যবস্থার মধ্যে পতিত হয়েছি যেখানে সম্পর্কের নামে মানুষের মনের উপর এক জগদ্দল পাথর চাপিয়ে রেখেছি। আমরা এই পাথর ছুঁড়ে ফেলতে চাই এবং পারি না বলে বিদ্রোহী হই, সম্পর্কে জড়িয়ে ভাবি এখানে মুক্তি।
কিন্তু মানুষ কোথাও মুক্তি পায় না। আসলে তার মুক্তি যে মৃত্যুতে, এটাই তাকে, আগেই বলেছি, তাড়িয়ে নিয়ে বেড়ায়।
তাহলে মৃত্যুর মত সত্যকে মেনে নিয়ে মানুষকে যদি সুখি হতে হয়, তাহলে সম্পর্ককে মুক্তি দিতে হবে। কিন্তু মুক্তি তো সহজ নয়, যে ব্যবস্থা এই সম্পর্ককে টুটি চেপে দমবন্ধ অবস্থায় বাঁচিয়ে রেখেছে, সেখান থেকে প্রথম মুক্তি পেতে হবে।
সে এক মহালড়াই, সমাজ রূপান্তরের লড়াই।
৫
যখন মানুষের সাথে মানুষের অর্থনৈতিক হায়ায়ার্কি মিলিয়ে যাবে, সম্পর্কের মুক্তি তখনি ঘটতে শুরু করবে। তার আগে মানুষ ছটফট করবে, পরকালের শাস্তির ভয় দেখিয়ে মানুষ মানুষকে ঠকাবে, অন্যের শ্রম শোষণ করে ঠকাবে, ক্ষমতার দাপট দেখিয়ে ঠকাবে। মানুষ সবসময় পিঠে শপাংশপাং বাড়ি খেতে থাকবে, ছুটবে এখানে ওখানে।
তাহলে রূপ কিংবা গুণ এসব কিছুই নয়, আসল সম্পর্কের মুক্তি ব্যবস্থা থেকে মুক্তি যা তাকে বন্দী করে রেখেছে বিবিধ শর্তের বেড়াজালে...
আসুন, আমরা রবীন্দ্রনাথের সেই রাজ্য গড়ি যেখানে:
'আমরা সবাই রাজা আমাদের এই রাজার রাজত্বে...'
No comments:
Post a Comment