Wednesday, January 14, 2026

Samita Gopal Halder এর ক লাম

 



আঁউরি বাঁউরি চাঁউরি ( আউনি, বাউনি, চাউনি)
তিনিদিন পিঠা খাওনি
তিনদিন না কোথা যেও
ঘরে বসে পিঠা খেও।
কার্তিক সংক্রান্তিতিথিতে মুঠ আনা খড়কে লক্ষ্মীর আসন থেকে এনে সেই খড় জলে ভিজিয়ে বেনীর মতো পাকানো হবে, পৌষ সংক্রান্তির আগের দিন ' আগ নেওয়া', ধানের শীষের সাথে মুলো ফুল, সরষে ফুল আমপাতা বেঁধে গৃহস্থালির প্রতিটি জিনিসে বাঁধন দেওয়া হয়। আঁউরি মানে লক্ষ্মী, বাঁউরি মানে তাকে বাঁধন দেওয়া,চাঁউরি হলো মায়ের কাছে চাওয়া। এ আরাধনা পৌষলক্ষ্মীর, কৃষকের কাছে এ এক অফুরান উৎসাহ, লক্ষ্মীকে আপন ঘরে নিজের মেয়ে করে রাখার, আর সেই চিরন্তন চাওয়া অন্নদামঙ্গল থেকে লোককথায়,
"পৌষ মাস লক্ষ্মী মাস না যেও থুইয়ে
ছেলেপুলেদের ভাত খাইয়ো উদর পুরিয়ে"।
সংক্রান্তির রাত থাকতে ব্যস্ততা শুরু ঘরে ঘরে, চাল গুড়ো হয়ে আসবে জাঁতায়, নারকেল, গুড়, দুধ, চিনির জোগাড় শুধু কি মিষ্টি পিঠার পার্বণ? ঝালের পিঠাও হবে ছেলেপিলের জন্য, তাতে মুসুর ডাল সেদ্ধ করে, মটর শাক দিয়ে মিশিয়ে ভরা হবে।
শীতের বেলা ছোট, তাই আগের দিনই উঠোন, গোলা সব ঝেড়ে ধুয়ে নিকানো হয়, মারুফা বিবির ঘর ভরে আত্মীয়রা, গ্রামের থানে পৌষ মেলা দেখতে এসেছে , সবাই হাতে হাতে কাজ করে। আজ ভোর থাকতেই কাঁচা হলুদ মেখে স্নান সারা হয়, ছেলেপিলেরা উনুন ঘিরে বসে, তাপ নেয়, রস জ্বাল হয় উনুনে, তাতে তেজপাতা, কয়েক ডেলা গুড় আর আদা কুচি দেন মারুফা, ফুটে গেলে নতুন চাল, ঘন হয়ে এলে লাল ক্ষীর তৈরি হয়, প্রথমে পাঠান থানের মেলার লক্ষ্মী ঠাকুরকে, পরে বাচ্চাদের দেন, বলেন এ চাল এইবার মাঠের ফসল, গ্রামের বড়লোকেরা খাসা আতপ তুলাইপাঞ্জিতে পিঠাপায়স করবে৷ আমরা পাবো কই।
পাড়ার ছেলেমেয়েরা, শান্তি দিদির বাচ্চারা উনুনের ধারে গোল হয়ে বসে,তাপ নেয়, কলাপাতায় খায় খুদের চালের মোয়া, লাল ক্ষীর,তিলের কদমা, মুড়ি গুড়। সকালের পাট মিটলে হবে বাহারি পিঠা, চাকলি, সরা পিঠা, পাটিসাপটা, পুলি, কাঠ সন্দেশ,চাঁদ পাকান আরো কত কি, ছেলেপিলে কিছু খাবে, কিছু রাখা থাকবে।
আজ রতুয়া বেহারি আসে নিজের ক্ষেতের রাঙালু নিয়ে, গ্রামের ঘরে ঘরে ঘোরে, মানুষজন রাঙালু রাখে, বদলে ধান দেয়, আগামী তিনদিন কেউ টাকা পয়সার লেনদেন করেন না, বাকির খাতায় নাম লিখে রাখে কারো কারো। মাটির হাঁড়িতে পোহাল বিছিয়ে রাঙালু সেঁকা হবে, তারপর খাওয়া হবে নুন মরিচ দিয়ে।
শীতের বেলার রোদ বড় অস্থির। বেলা গড়ায় তাড়াতাড়ি।
আমাদের সংক্রান্তির দিন হয় মটর ডাল বেটে চাপড় ঘন্ট, সরষে ফুলের বড়া, হয় মুলোর টক, তাতে কাঁচা তেঁতুল আর গুড়। আমার দিদিমা মহামায়ার পাথরের বাটি ছিলো টক দেওয়ার জন্য, সংক্রান্তিতে থালা সাজিয়ে, মুলোর টক দিয়ে প্রসাদ করতেন, মটর ডাল, শাকপাতার ঘন্ট আরো কত কি। একটা ফেলে আসা জীবনের টুকরো টুকরো ছবি বাঁধতেন মহামায়া, তার মোটা কাঁচের ঝাপসা চশমার আড়ালে কখনো জল খুঁজে পাইনি।
আজকাল এসব বিন্দু বিন্দু জীবন দেখতে ইচ্ছে হয়, মহামায়াকে, মারুফ বিবিকে, রতুয়া বেহারিকে।
ঘাসের ওপর টুপটাপ ওশ পড়ে। মুক্তোর মতো। শুধু ভেসে থাকা, নোঙর নাই তাই মহামায়াও অধরা।




ঢেঁকি ছাটা চাল এর ভাত

নিজেদের বোনা শাকপাতা, সীম দানা
চাপড় ঘন্ট



মুলো, কাঁচা তেঁতুল এর টক



            বিন্নির পিঠা

No comments:

Post a Comment