Sunday, October 26, 2025

আমি, জীবনানন্দ ও অনেকগুলো সমান্তরাল দুনিয়া...

 


মেয়েটি বেশ কিছুদিন ধরেই আমার প্রতি বিশেষ অনুরাগ প্রকাশ করছে দেখতে পাচ্ছি। আমার কথা সে রাতদিন ভাবে। বিষয়খানা এমন যে আমি যা বলব তাই করতে, আমকে খুশি করতে যে কোন কিছুতে সে রাজি। আমি চাইলে সে তার জীবন সংসার সব কিছু ছেড়ে আমার কাছে চলে আসতে এক পায়ে খাড়া। এমন সময় একদিন সে বলল আমার কবিতাগুলো নাকি জীবনানন্দের কবিতার মত। আমি জানতে চাইলাম কেন এমন মনে হচ্ছে? সে বলল সে জীবনানন্দের কবিতা অনেক পড়েছে এবং কোথায় যেন সে মনের মিল খুঁজে পায়। আমি তাকে বলি কবিরা তাদের কবিতা নয়, কোন মিষ্টি প্রেমের কবি একজন বিরক্তিকর একরোখা আত্মকেন্দ্রীক হতে পারে যার সাথে বাস করা হতে পারে দুষ্কর। তার মত এক সুন্দরী ব্যক্তি জীবনানন্দকে দেখলে হয়ত ফিরেও তাকাতো না। কবির সাথে কথা বলতেই হয়ত বিরক্ত লাগত।
বহু দিন অপেক্ষা করে ছিলাম কবি পত্নীর “মানুষ জীবনানন্দ” বইটির জন্য। সেদিন অনলাইনে পেয়ে এক বসাতেই পড়ে শেষ করলাম। পড়ে হতাশ হলাম। কবি সম্পর্কে খুব হালকা বাহ্যিক কিছু বর্ণনা ছাড়া গভীর কিছু সেখানে নেই। অনেকটা আমার মৃত্যুর পর আমার বোন বা ভাতৃবধুদের যদি আমার সম্পর্কে লিখতে দেওয়া হয় তারা যেমন কিছু পারিবারিক ও আচরণগত বৈশিষ্ট নিয়ে লিখবে যাদের আসলে আমার অন্তর্জগৎ সম্পর্কে কোন ধারণা নাই। এই বইটি যেন তেমন।
জীবনানন্দের কবিতা থেকে তার গল্প উপন্যাস কিন্তু অনেক ভিন্ন। যেন ভিন্ন দুই ব্যক্তির লেখা। গল্প উপন্যাসগুলো অনেক বৈষয়িক এবং জীবন ঘনিষ্ঠ শুধু নয়, অনেকটাই তার পরিবার ও সমসাময়িক মানুষের দৈনন্দিন ক্ষুদ্রতায় সীমিত। সেখানে মহাবিশ্ব নেই দূর নক্ষত্র নেই এমনকি প্রকৃতিও তেমন একটা নেই। অনেকটাই যেন ক্ষুদ্র হতাশা, স্বপ্নভঙ্গ, মৃত্যু ও বিচ্ছেদের সাতকাহন। আমার কাছে মনে হয়েছে গল্পের জীবনানন্দ রক্ত মাংসের মানুষ আর কবিতার জীবনানন্দ সেই মানুষের বেদনা সহ্য করতে না পেরে বাস্তবতা ছেড়ে বেরিয়ে যাওয়া নস্টালজিয়া। প্রেমিকদের সম্পর্কে শেক্সপিয়র বলে গেছেন:
"প্রেমিক ও পাগলের থাকে এমন বিক্ষুব্ধ মস্তিষ্ক,
তা ধারণ করে এমন একাগ্র কল্পনা,
যা সুস্থ যুক্তিবোধের কখনই বুঝতে পারার বাইরের কিছু"
শেক্সপিয়রের সেই প্রেমিকের ‘বিক্ষুব্ধ মস্তিষ্ক’ প্রসূত ‘একাগ্র কল্পনা’ হল কবি জীবনানন্দ যদিও ব্যক্তি জীবনানন্দ মোটেও রোমান্টিক ছিলেন না। মানুষের সঙ্গলাভের যে আনন্দ বাস্তবতায় তিনি উপভোগ করতে পারতেন না। নানা বাধা এসে উপস্থিত হত। আবার সেই সঙ্গলাভ না হওয়াতে তিনি কষ্ট পেতেন। যাদের তিনি নগণ্য ও নিজের সমকক্ষ ভাবতেন না আবার তাদের জগৎ থেকে বের হবারও কোন উপায় তিনি বের করতে পারেননি। আবার তাদের কাছেই যেন তিনি মুল্য চেয়েছেন। সেই অমোঘ চক্রের কষ্টগুলো থেকে যে নষ্টালজিয়া সেগুলোই তিনি যেন কবিতার ভাষায় লিখে গেছেন।
মানুষর সাথে যে সম্পর্ক হবার কথা সেটা করতে না পেরে তিনি যেন প্রকৃতির সাথে কল্পনায় করতে চাইতেন। বিফল হলে ক্ষুদ্র্র মানব জীবনের ব্যর্থতায় মহাবিশ্বের যে শাশ্বত পরিহাস, সেটাকে তার সাথে জুড়ে দিতে চাইতেন। এগুলো সবই আসলে নস্টালজিয়া। নস্টালজিয়া শুধু অতীতের স্মৃতি নিয়েই হয় না, এটা বর্তমান নিয়েও হতে পারে, হতে পারে ভবিষ্যত নিয়েও। হতে পারে ফেলে আসা বসতবাটি নিয়ে, হতে পারে দূর মহাবিশ্বের নক্ষত্র ছায়াপথ নিয়ে। নষ্টালজিয়ার মূল চালিকা হচ্ছে বর্তমান থেকে মানসিক পলায়ন।
কবি পত্নীর “মানুষ জীবনানন্দ” পড়েই শুধু হতাশ হইনি, আসল জীবনানন্দও আমাকে হতাশ করে। একজন মানুষ অনুভবের তীব্রতার যন্ত্রণায় ক্রমেই একা হয়ে যাচ্ছে, তারপর নিজেকে বিচ্ছিন্ন করে ফেলছে সবকিছু থেকে তারপর তার বিক্ষুব্ধ মস্তিষ্ক আশ্রয় নিচ্ছে এক মাতচোকিয়িস্টিক রোমান্টিকতায় যার পরিণতি কিছু ধূসর পাণ্ডুলিপি। জীবনানন্দ সেই অনুভবেরই কবি, অনুভবের বোধ তার মধ্যে ছিল খুব প্রখর। সেই অনুভব তাকে উত্যক্ত করেছে দগ্ধ করেছে কিন্তু সেই অনুভবের প্রকাশ করেই যেন তিনি থেমে গেছেন। অভিমান করেছেন, মৃত্যুকে কামনা করেছেন – ভাবখানা এই যেন কেউ একজন তার অভিমান অনুভব করছেন, তার মনের কষ্ট, অর্থ কষ্ট দেখে একদিন তাকে পুরস্কৃত করবেন সুদে আসলে কিন্তু সেই তাকেও তিনি চেনেন না - তার সাথেও তাঁর কোন যোগাযোগ নেই।
ধরা যাক একজন মানুষ তার হাত চুলার আগুনে রাখল। তারপর সে তার সুক্ষ্ম অনুভূতি দিয়ে বর্ণনা করল কত কষ্টের সেই অনুভূতি, বাকি সব পাঠক সেটা পড়ে কেঁদে কেটেই অস্থির। মানুষ যদি এভাবে দুঃখ অনুভব করতে করতেই জীবন কাটিয়ে দেয় তাহলে তারা মাসচোকিস্টিক বা দুঃখ ভোগে আনন্দিত জনগোষ্ঠী। আমরা শহুরে শিক্ষিত বাঙালীরা আসলে কিন্তু তাই।
জীবনানন্দ খুবই মা নেওটা ছিলেন, পিতাকে ভয় পেতেন প্রচন্ড রকম, এতটাই ভয় পেতেন যে তিনি তার সাথে কথাই বলতে পারতেন না। কিছু দরকার হলে মা বা পরবর্তীতে স্ত্রী সেটা পিতার কাছে বলতেন। তিনি প্রচন্ড রকমের সামাজিক সঙ্কোচে ভুগতেন। একবার তাদের বাসায় চুরি হয়, থানা থেকে দারোগা আসে তদন্ত করতে। তখন তার বাবা বাড়িতে ছিলেন না তাই তার উপর দায় বর্তায় দারোগার সাথে কথা বলার। কিন্তু তিনি কিছুতেই সেটা বলবেন না। পালিয়ে গেলেন বাড়ি থেকে। পরে বাড়ির বধুকেই সব সঙ্কোচ ভেঙে সেটা সামাল দিতে হল। একবার দুর্ঘটনায় তার ছেলের মাথা কেটে গেছে, সেলাই করতে হবে, বন্ধু ডাক্তার জীবনানন্দকে বলল ছেলেটাকে ধরে কোলে নিয়ে বসতে, সে সেলাই করে দেবে। সেটি শুনেই কবি গেলেন পালিয়ে। তার স্ত্রীকে ছেলেকে ধরে বসতে হল ডাক্তারের সামনে। এই সব ঘটনা বলে তার অতিরিক্ত সামাজিক সঙ্কোচ ও অনুভূতিপ্রবণতার কথা।
যাই হোক, যদিও আমি মনে করি জীবনানন্দ এমন এক ব্যক্তি ছিলেন যার “লাইফ এন্ডস এট ফোর্টি”, যিনি ছিলেন এই বাংলার ‘পিংক’ (যারা পড়েননি তারা আমার “লাইফ বিগিনস এট ফোর্টি সিরিজটা পড়ে দেখতে পারেন)। আমার এই লেখাটির উদ্দেশ্য জীবনানন্দর মন-বিশ্লেষণ নয়, সেটি আর একদিন করা যাবে। এই লেখাটিতে আমি বলতে চাই যারা জীবনের দুঃখবোধকে সহ্য না করতে পেরে প্রকৃতি, গ্রহ নক্ষত্র বা মাহাকাশপানে বা আমেরিকান ড্রিমে ডানা মেলে উড়াল দিতে চান তারা যেন মনে না করেন মহাবিশ্ব একটাই। মানুষের মনের মহাবিশ্ব আসলে অনেকগুলো যাকে আমরা বলব অনেকগুলো 'সমান্তরাল দুনিয়া'।
'সমান্তরাল দুনিয়া'
একাকী মাথার ভেতরে আস্ত তোমাকে নিয়ে
উদভ্রান্ত আমি ঘুরে বেড়াই এই শহরেরই রাস্তা ধরে;
হয়ত তোমার অফিসের সামনে দিয়ে যাই কোথাও,
অথবা তোমার বাড়ীর সামনের রাস্তাটা পেরিয়ে
আমার বন্ধুর বাসা যেতে হয়;
হয়ত একই ট্রাফিক সিগনালে
মুখোমুখি দাঁড়িয়ে থাকে দুজনের গাড়ি
সবুজ সংকেতের অপেক্ষায়;
কিন্তু আমাদের মিলনের সংকেত
কেন যেন সবুজ হয় না কোনভাবে।
হয়তো আর একটু হলেই দুজনার
দেখা হয়ে যেতে পারত কিন্তু তাও হয় না,
সেটা কি নিখাদ দৈব কারণে নাকি সেই বিদায়ের
মুহুর্তে ভেঙে গেছে স্থান কালের একতা,
জন্ম নিয়েছে আমাদের নিজস্ব এক সমান্তরাল দুনিয়া?
তুমি আমি যেন একই শহরে, হয়ত একই
ঘরে বারান্দায় জানালায় বিছানায়
বাস করে যাচ্ছি এই একই সময়ে,
বন্ধু বান্ধবসহ হাসি তামাসায়
কিন্তু কেউ কারো জীবন স্পর্শ না করে,
একই আকাশ একই বাতাস
হয়ত সেই এক গুচ্ছ অক্সিজেন কণিকা
তোমার প্রশ্বাস নির্গত হয়ে
ঢোকে ফিরে আবার শরীরে আমার,
তাই কি এই শহরটা এত মধুর লাগে?
হয়ত কোন এক বিখ্যাত কবি
কোন এক অখ্যাত নারীকে মাথার ভেতরে নিয়ে
এমনিভাবে সমান্তরাল বাস করেছিল
এই রকমই অন্য এক শহরে;
যখন সে ঐ শহরের এক ট্রামলাইনের উপরে
তখনই কোন মহাজাগতিক ভ্রান্তিতে এক হয়ে গিয়েছিল
তার দুই দুনিয়া চিরতরে।
আমিও কি এই অসহ্য সমান্তরালতা থেকে
মুক্ত হবার জন্য এমনই কোন ভ্রান্তি মুহুর্তের
অপেক্ষা করব? নাকি তোমার দয়া হবে?
ওই প্রস্তর হৃদয় গলবে একদিন?
কোন এক মহাজাগতিক ভুলে!
প্রতিটি মানুষ জন্মগ্রহণ করে তার নিজস্ব একটি মহাবিশ্ব নিয়ে। যেখানে তার পিতামাতা ঈশ্বরের ভূমিকায় যারা সেই দুনিয়ার রক্ষক ও প্রোভাইডার। শিশু আমার মহাবিশ্বে সব নিয়ম কানুন আমার। ক্রমেই আমাদের খেলার সাথী তৈরী হয়, বন্ধু তৈরী হয় আর তাদের সাথে আমাদের নিজস্ব মহাবিশ্বগুলো মিলে তৈরী হয় সম্মিলিত আনন্দের জগত। সেই আনন্দের জগত তৈরীতে আমাদের ছাড় দিতে হয় নিজের নিয়মে, গ্রহণ করতে হয় অপরের নিয়ম কানুন। অপরের প্রতি অবিশ্বাস আর নিজেকে প্রকাশের লজ্জা আমাদের বাধা দেয় সেই যৌথ জগত তৈরীতে। আমরা তখন ক্রমেই ভাবতে থাকি আমার জগতই সঠিক, অপরেরটা মন্দ তাই সে বাদ।
এই সমান্তরাল জগত শুধু ব্যক্তি সম্পর্কেই নয়। প্রতিষ্ঠানগুলো সব এক একটা আলাদা আলাদা সমান্তরাল জগত। ধর্মীয় সংগঠন, স্কুল কলেজের শিক্ষকদের কমন রুম, বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনিক ভবন, সরকারী অফিস, সচিবালয়, কর্পোরেট বোর্ডরুম থেকে পত্রিকার অফিস, টেলিভিশনের স্টুডিও, মার্কসবাদী দলের কার্যালয় এমনকি মেয়েদের জগত, বিবাহিত জীবন – সবকিছুই এক একটি সমান্তরাল দুনিয়া যেগুলো সেখানকার সংখ্যাগুরু সদস্যদের মানস চরিত্র অনুযায়ী পরিকল্পিত ও গঠিত হয়ে থাকে।
এই সব সমান্তরাল দুনিয়ার আবহাওয়া, অক্সিজেনের মাত্রা, বাতাসের আদ্রতা, তাপমাত্রা এক নয়। কোন কোনটা ক্ষতিকর রাসায়নিক গ্যাসের মাত্রা আমাদের সহ্য ক্ষমতার বাইরে। সেটা মেনে নিয়েই আমাদের সবার সাথে সম্পর্ক রেখেই বাস করতে হয়। আমি যদি মনে করি কেন সব কিছু আমার উপযুক্ত নয়, সেটা নিয়ে আমরা ক্ষোভ প্রকাশ করতে পারি, সেটা পরিবর্তনের জন্য যুদ্ধ বাধাতে পারি কিন্তু অভিমান করে কোন লাভ নেই। হয় ভেঙে ফেলা, সেটা না পারলে মেনে নিতে শেখা, সাময়িকভাবে হলেও - এই দুয়ের বাইরে আসলে কোন পথ নেই।
আমার সবসময়ই মনে হয় আমি যদি ছবি আঁকতে পারতাম, কতই না ভাল হত। মনে আসা অনেক কিছু ছবি দিয়ে প্রকাশ করতে পারতাম। একবার তাই এক বন্ধু বড় ভাই পরিচয় করিয়ে দিলেন এক বিখ্যাত শিল্পীর সাথে। তাঁর বাসায় গিয়ে কয়েকদিন ছবি আকার তালিম নিতে গিয়ে জানলাম এক্ষেত্রে আমি রাবিন্দ্রিক। সেই বিখ্যাত শিল্পী আমার ছবি দেখে বললেন আমার ছবি নাকি শিশুসুলভ, রবীন্দ্রনাথের ছবির মত। এরপর তিনি আমাকে যা শেখাতে চাইলেন সেটি দেখে আমি ভয় পেয়ে গেলাম। তাঁর কথা শুনলে একজন সুন্দরী নারীর দিকে চেয়ে আমার মনে যে ভাব আসে সেটা নষ্ট করে ফেলতে হবে। তিনি চাইলেন আমি যেন আর সমাগ্রিককে না দেখি, আমি যেন একজন সুন্দরী নারীর দিকে চেয়ে তার মুখের রেখা-বিন্যাস, আলো ছায়া এগুলো দেখি।
আমার মনে হল এটি একটা ভয়ংকর প্রস্তাবনা। আমি যদি এভাবে ছবি আঁকা শিখি তাহলে দুনিয়ার সকল সুন্দরী নারীর দিকে চেয়ে আমি যে আনন্দ অনুভব করি সেটা একেবারেই হারাব। আমার ছবি আঁকা শিখে দরকার নেই। বিখ্যাত আর্টিস্ট হয়ে হাজারও সুন্দরী নারীর আগ্রহের কেন্দ্রবিন্দু হবার চেয়ে কোন এক নারীর মুখের দিকে চেয়ে অভিভূত বিস্মিত হওয়া এই নগন্য জীবনের জন্য অনেক বেশী প্রয়োজনীয়।
চিত্রশিল্পের সেই সমান্তরাল দুনিয়ার একজন নাগরিক আমি হতে চাইনি। সেই দুনিয়ার নাগরিক হয়ে যদি আমি আমার নারীর সৌন্দর্য্যের প্রতি যে মুগ্ধতা সেটাকে যদি পেতে চাইতাম, সেটা আমি কখনই পেতাম না। এই দুটো একসাথে থাকে না ঠিক যেমন সমান্তরাল দুনিয়া একত্র করা যায় না। ব্যবসা করে অনেক বড় হতে গেলে মানুষের প্রতি বিশ্বাস রাখা চলে না। মানুষের প্রতি বিশ্বাস হারালে আর প্রেমে পড়া যায় না। লাভ-অবশেসন হতে পারে, মারাত্মক আকর্ষণ জন্ম নিতে পারে কিন্তু সেটা নেহায়েতই বস্তু-আবেগের আকর্ষণ, প্রেম নয়। আমাদের আধুনিক জীবন এইসব অনেকগুলো সমান্তরাল দুনিয়ায় ভরপুর। আগের গ্রামীণ জীবন এমন ছিল না। সেখানে দুনিয়া ছিল একটাই আর মানুষও জীবনের ছোট্ট ধানসিঁড়ি নদীতে নিশ্চিন্তে পাল তুলে দিয়ে আয়েশে ভেসে যেত পারত পথ হারাবার কোন ভয় না করেই। এখন আর সেটি সম্ভব নয়।
আমাদের আজ ভয় নানা রকম সমান্তরাল দুনিয়ার হারিয়ে যাবার। প্রত্যেককে আগে নিশ্চিত হতে হবে তার নিজের বেঁচে থাকার জন্য সবচেয়ে প্রবল উদ্দীপনাগুলো কি কি। তাকে এমন একটি দুনিয়া বেছে নিতে হবে যেখানে সেই উদ্দীপনাগুলো লালিত হয়। তাকে সেই দুনিয়াতেই বাস করতে হবে আর সে ভিন্ন সমান্তরাল দুনিয়াগুলোতে যাবে সাময়িকভাবে, জীবনের প্রয়োজনে। আমার মনে কবিতা আর আমি হয়ে গেলাম ইন্জিনিয়ার, আমার প্রাণে স্বাধীনতা আর আমি হয়ে গেলাম বিসিএস কর্মকর্তা, আমার বন্ধন ভাল লাগে না আর আমার মনে আশা একটা দারুণ পাত্রের সাথে বিয়ে হবে আর স্বামী আমাকে মুক্তি দেবে – এগুলো হল সমান্তরাল দুনিয়ার আজগুবি সন্মিলনের প্রচেষ্টা, যার পরিণতি মহাবিষ্ফোরণ, মনোজগতের বিনাশ।


Sirazul Hossen

No comments:

Post a Comment