যৌনতার বিরুদ্ধে খুব একটা সোচ্চার হবেন না, কে জানে কখন কিভাবে যেন আপনিও ফেঁসে যেতে পারেন!
যৌনশুদ্ধ মানুষ পৃথিবীতে বিরল!
২
তাহলে কি করবেন?
যৌনতা যে একটি রাজনীতি, এটা আগে বুঝতে চেষ্টা করুন। এই যে নারীর উপর পুরুষের যৌন আধিপত্য, এটা তো রাজনীতিরই একটি বহিঃপ্রকাশ। পুরুষতন্ত্র চায় নারীকে তার অধঃস্তন করে রাখতে। এক্ষেত্রে প্রধান অস্ত্র হলো যৌনতা। নারীর যৌনতাকে বন্দী করে ফেলাই এই রাজনীতির প্রধান দিক।
নারী যখন প্রথম গৃহে বন্দী হলো, নারী হারালো তার সকল স্বাধীনতা, বিশেষত তার যৌনস্বাধীনতা। এতোদিন সেহই ঠিক করতো সে কার সংগে যৌনসংসর্গ করবে, কার সংগে করবে না। এখন থেকে তার মালিক বনে গেলো পুরুষ, মানে পুরুষতন্ত্র আর কি।
নারীপুরুষ নির্বিশেষে ছিল বহুগামী, এখন কেবল নারীকে হতে হবে মনোগ্যামি আর পুরুষের জন্য খোলা থাকবে সবকিছু।
এসবের মূলে ছিল ব্যক্তিগত সম্পদ। নারী হয়ে উঠলো ব্যক্তিগত সম্পদ, তার দ্বারা প্রসবিতা সন্তান হয়ে উঠলো সম্পদের উত্তরাধিকারের টুলস।
সমাজবিকাশের মূল তত্ত্ব হলো প্রাকৃতিক মানুষের প্রবৃত্তির উপর অবদমন তৈরী করা। যে যত এই অবদমন জারী রাখতে পারবে, সে তত বিকশিত হয়ে উঠবে, সভ্য হয়ে উঠবে।
কিন্তু অবদমিত প্রবৃত্তি কি লেজ গুটিয়ে বসে থাকবে?
না? থাকবে না, সে বের হতে চাইবে। এই বের হতে চাওয়াটা সহজ না কঠিন তা নির্ভর করে ক্ষমতার উপর। নারী তো এমনি অধীনস্থ, পুরুষ তো জন্মেই সুবিধাপ্রাপ্ত, সবচেয়ে বড় হচ্ছে সম্পদের মালিকানা। শ্রমবিভাজন মালিকানা দিয়ে বসে আছে পুরুষকে। যদিও এই মালিকানা আর পুরুষনিরঙ্কুশ নয়। কিন্তু আধিপত্য এখনো পুরুষের কব্জায়।
সূতরাং যৌনতা তার একচ্ছত্র ভোগের অধিকারী হচ্ছে পুরুষ।
কিন্তু সমাজ তো শুধু একদিকে বিকশিত হয় না, বিকাশ শুধু নিজেকে বদলায় না, অন্যকেও বদলায়। ফলত, পুঁজিবাদ নারীর যৌনতাকে বন্দী করেছে, পণ্য করেছে, কিন্তু সে নারীকে বিকশিত করেছে এবং এই বিকাশের ফলিত রূপ হচ্ছে তারা এর বিরুদ্ধে সংগ্রাম গড়ে তুলেছে এবং তারা তাদের শরীরকে নিজের বলে ঘোষণা করেছে। তারা বলেছে তাদের শরীর কার সংগে শেয়ার করবে, এই স্বাধীনতা কেবল তাদের।
ব্যস, পুরুষতন্ত্রের অহংএ ঘা পড়েছে, সে চপেটাঘাত অনুভব করেছে। সে ক্ষিপ্ত হয়ে উঠেছে। তার আদিম প্রবৃত্তি চেগে উঠেছে। সে যেখানে সেখানে নারীকে শারীরিকভাবে হেনস্থা করার জন্য লেগে পড়েছে।
মোটাদাগে এ হচ্ছে একটি সাংস্কৃতিক সঙ্কট। পুরুষ প্রথম থেকেই যৌনঅসংস্কৃত, যখন নারীরা প্রতিবাদী হয়ে উঠেছে, তখন তারা আরো উন্মাদ হয়ে পড়েছে। তারা আর নারীকে ব্যক্তিগত সম্পদ ভাবতে পারছে না। যদি ভোগ করতে হয়, কিনতে হবে, মুফতে কিছুই পাওয়া যাবে না। কিন্তু পুরুষ তো আদিম, অসংস্কৃত, তার চাই জোর করে। তার জোর দুই দিকের: শারীরিক শক্তি (যদিও এর কোন কানাকড়ি মূল্য নাই) এবং সামাজিক ক্ষমতা। সামাজিক মানে রাজনৈতিক। রাজনৈতিক মানেই অর্থনৈতিক, মানেই ক্ষমতার হায়ায়ার্কি।
এই হায়ায়ার্কি থেকে নারী বের হতে চায়, পুরুষ চায় না। যখনই সে প্রতিরোধের মুখে পড়ে, তখন সে ভিন্ন পথ নেয়। গালি, বডি শেমিং, ধর্ষণ।
এগুলি সবই আদিম প্রবৃত্তি।
৩
আধনিক নারী যৌন বিষয়ে মুক্ত, তারা পরিষ্কার বলে দিয়েছে শরীর তার, সিদ্ধান্ত তার। কিন্তু পুরুষ এই সিদ্ধান্ত মানতে পারে নাই। এই দ্বন্দ্ব থেকে সে বের হতে পারেনি। সে নারীর শরীরের উপর অধিকার খাটাতে চায়, দখল নিতে চায়।
এই না পারার কারণ শুধু তার আদিম মনোজগৎ নয়, এই সঙ্কট ব্যবস্থার মধ্যেই থেকে গেছে। সেটা আর কিছু নয়, পুঁজিবাদ যার কাজ সবকিছুকে তার অধীনস্থ করা, পণ্যায়িত করা।
নারীর যৌনতাকে পণ্য করাকেও নারী মেনে নিয়েছে, সে বিক্রি করতে রাজী, যেমন একজন শ্রমিক তার শ্রমশক্তি বিক্রি করে এবং এখানে সে স্বাধীন। নারী সবকিছু থেকে স্বাধীন হতে চায়। এটাই পুরুষের গাত্রদাহের কারণ।
এই গাত্রদাহই তাকে বর্বর করে তোলে, সে নারীকে হেনস্থা করার জন্য মুখিয়ে থাকে এবং করেও। এটা বিরল ব্যতিক্রম ছাড়া সব পুরুষের বৈশিষ্ট্য।
তাই বলছি, যৌনতা নিয়ে খুব একটা সোচ্চার হবেন না, কখন আপনিও ফেঁসে যেতে পারেন।
৪
তাহলে আমাদের যদি এইসব আদিমতা পরিহার করতে হয়, তাহলে যৌনরাজনীতির বিরুদ্ধে দাঁড়াতে হবে। যে ব্যবস্থা এই বর্বতার জন্ম দেয়, নারীকে ব্যক্তিগত সম্পদ মনে করে, নানান বৈষম্য তৈরি করে ক্ষমতার ভ্যারিয়েশন তৈরি করে, মানুষকে অবদমিত করে রাখে তার বিলোপ ছাড়া এই সঙ্কট থেকে মুক্তি মিলবে না।
No comments:
Post a Comment