আপনি যদি অন্যায়ভাবে কারো মনে দুঃখ দেন তবে আপনি নিজে সেটা অনুভব করবেন এবং আপনার মনে একটি অনুশোচনার জন্ম হবে। কিন্তু আপনি কারো মনে দুঃখ দিয়ে তার পর যদি প্রমাণ করতে পারেন যে ঐ ব্যক্তি মন্দ লোক ছিল বা আপনি আল্লাহর তরফে তাকে দুঃখ দিয়েছেন তাহলে আপনার মনে সেই অনুশোচনার জন্ম হবে না। আপনি খুশি মনে থাকবেন। এটাকেই বলা হয় নৈতিক বিযুক্তি বা মোরাল ডিজএনগেজমেন্ট।
ইতিহাসে সব সময় যে ব্যক্তি, সংগঠন, প্রতিষ্ঠান বা রাষ্ট্র মন্দ কাজ করে এসেছে তারা সবসময় অর্ধেক অশুভ অর্ধেক সাধু ছিল। প্রতিটি সাইকোপ্যাথের বা সোশিওপ্যাথের একটি চার্মিং দিক থাকে। প্রতিটি ডিকটেটর, প্রতিটি ড্রাগ লর্ড প্রতিটি গডফাদারের দলের একটি কোমল, মানবিকতাপূর্ণ, আবেগপূর্ণ, দানশীল সামাজিক বা ধর্মীয় অবদান আছে। মন্দ কখনই ভাল থেকে বিচ্ছিন্ন নয়।
প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে ব্যক্তির অবদান কি হবে পুরো বিষয়টিই নির্ভর করে প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কৃতির উপর। ঐ প্রতিষ্ঠানের সংস্কৃতি যদি ইতিবাচক হয়, মানবতাপূর্ণ হয় ও নৈতিকতাপূর্ণ হয় ও স্বচ্ছ হয়, তাহলে শত দুর্নীতি থাকলে বা অদক্ষতা থাকলেও সেটি থেকে তারা বের হয়ে একটি ইতিবাচক সংগঠনে পরিণত হয়। আর ঐ প্রতিষ্ঠানের সংস্কৃতি যদি নেতিবাচক হয়, লুটপাট হয় ও লক্ষ্যে অস্বচ্ছ হয় তাহলে শতকরা নিরানব্বই ভাগ মানুষ নিজেদের সৎ ও ভাল মানুষ ভাবলেও সেটা একটি ক্ষতিকর ও নিষ্ঠুর অশুভ প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়।
প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কৃতি নির্ধারণ করে মানুষ কেন কাজ করছে। নেতিবাচক প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কৃতির প্রতিষ্ঠানে মানুষ কাজ করে ব্যক্তিগত প্রাপ্তির জন্য এবং তার ফলে সংখ্যাগরিষ্ঠের বা সমাজের উপর যে অন্যায় ও নিয়মের ব্যাত্যয়গুলো ঘটে, যে সব কালিমা লিপ্ত হয়, ‘ভালমানুষেরা’ সেখানে সেগুলোকে সাদা রং দিতে ব্যস্ত থাকে। তাদের ঘাড়ে পা দিয়েই দুবৃত্তরা সেটি নিয়ন্ত্রণ করে। সেই সব ভাল মানুষেরা না থাকলে দুবৃত্তদের এই দুর্গ ভেঙে পড়ত অনেক আগেই।
১৯৭৫ এর এই অগাস্টে ‘কতিপয় বিপথগামী সৈনিক’ এদেশের এক শুদ্ধ ইতিবাচক সংস্কৃতিকে হত্যা করেছিল, সত্যিই কি তারা কতিপয় বিপথগামী সৈনিক ছিল? সেটা যে তারা ছিল না, তাদের প্রতিষ্ঠান তার পরের বিশ বছর যা করেছে সেটাতেই সেটা প্রমাণিত। কিন্তু এত বড় বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর সবাই কি মন্দ লোক ছিল? নিশ্চই নয়। কিন্তু কিভাবে এটা ঘটে?
কিছুদিন আগে অ্যালবার্ট বান্দুরার চিন্তা-আচরণগত তত্ত্ব বা social cognitive theory নিয়ে লিখেছিলাম। অ্যালবার্ট বান্দুরার চিন্তা-আচরণগত তত্ত্বের একটি অংশ হচ্ছে নৈতিক বিযুক্তি তত্ত্ব বা moral disengagement theory. এই তত্ত্বে তিনি দেখিয়েছেন কিভাবে মানুষ মন্দ ও ক্ষতিকর কাজে দলগতভাবে অবদান রাখে এবং কি প্রক্রিয়ায় সে নিজেকে দায়মুক্ত করে ও নিজেকে সৎ, বিবেচনাশীল ও ভাল মানুষ ভেবে সুখে শান্তিতে নিরাপরাধ মন নিয়ে বাস করে।
কিভাবে সাধারণভাবে বিবেচনাশীল মানুষ নিষ্ঠুর ও ক্ষতিকর কাজ করে এবং তার পরও নিজেদের মনে সুখে শান্তিতে নিরাপরাধ মন নিয়ে বাস করে? তার এজেন্টিক তত্ত্বের উপর ভিত্তি করে ড: বান্দুরা সেই মনো-সামাজিক ব্যবস্থার একটি সুনির্দিষ্ট ব্যাখ্যা প্রদান করেন।
নৈতিক বিযুক্তি দিয়ে মানুষ তাদের ক্ষতিকারক আচরণ থেকে তাদের নৈতিক আত্ম-নিষেধাজ্ঞাগুলি (self-sanction) সরিয়ে নেয়। এজেন্টিক তত্ত্ব হলো একটি দলের বা প্রতিষ্ঠানের বা প্রতিষ্ঠানের সদস্যের ব্যক্তি উৎসাহ ও মুল্যবোধের সাথে তার দলের বা প্রতিষ্ঠানের উৎসাহ ও মুল্যবোধের সংঘাত সম্পর্ক বিষয়ক সোশাল কগনিটিভ তত্ত্ব।
নৈতিক আত্ম-নিষেধাজ্ঞা (moral self-sanctions) হল কোন মন্দ কাজ করার ব্যাপারে ব্যক্তির নিজের মনের বাধা বা নিষেধাজ্ঞা। তারা তাদের ক্ষতিকারক আচরণকে ইতিবাচক কাজের প্রয়োজনীয় অংশ হিসেবে দেখায় ও তার মাধ্যমে সেটাকে পবিত্রকরন করে। নানা অভিযোগের বিষয়ে তারা তাদের অপরাধের দোষক্ষালন করে অভিযোগটিকে লক্ষ্যচ্যুত এবং তার দায়িত্ব বিস্তারের মাধ্যমে। তারা তাদের কর্মের ক্ষতিকারক প্রভাবগুলিকে কমিয়ে দেখায় বা অস্বীকার করে। এটি করার জন্য তারা ভুক্তভোগীদের মানববিচ্যুত (dehumanize) করে ও তাদের উপর দুঃখ হতাশা নিয়ে আসার জন্য তাদেরই দোষ দেয়।
ড: বান্দুরার নৈতিক বিচ্ছিন্নতার তত্ত্ব ব্যাপকভাবে বিস্তৃত একটি তত্ত্ব। প্রচলিত নৈতিকতার তত্ত্বগুলি প্রায় একচেটিয়াভাবে ব্যক্তিগত পর্যায়ে ফোকাস করা। তিনি তাঁর অন্তর্দৃষ্টি দিয়ে নৈতিকতার বিচ্ছিন্নতাকে সমাজ-ব্যবস্থার স্তরে প্রসারিত করেছেন যেগুলোর মাধ্যমে বড় আকারের প্রাতিষ্ঠানিক অমানবিকতা সংঘটিত হয়।
২০১৬ সালে প্রকাশিত হয় অ্যালবার্ট বান্দুরার নৈতিক বিযুক্তি তত্ত্ব নিয়ে বই 'নৈতিক বিযুক্তি: কিভাবে মানুষ ক্ষতিকর কাজ করে ও নিরাপরাধ জীবনযাপন করে (Moral Disengagement: How People Do Harm and Live With Themselves)'। যেখানে আছে আধুনিক সমাজ ও আমেরিকান সরকার ও সেখানকার প্রতিষ্ঠানগুলোতে যে নৈতিক বিযুক্তি চরমভাবে বিকাশমান সেগুলো নিয়ে তত্ত্ব ও সাম্প্রতিক ঘটনাসমূহের বিশ্লষণ।
No comments:
Post a Comment