Sunday, October 26, 2025

মায়ের_মত

 



রান্নাঘরের পেছনে লম্বা হয়ে বেড়ে ওঠা শীর্ণ , প্রায় ন্যাড়া গোলাপ গাছটার গোড়ার মাটি যত্ন করে কুপিয়ে জমিয়ে রাখা সেদ্ধ চায়ের পাতা মিশিয়ে দিচ্ছিল অন্তরা। রান্নাঘরের জানালা দিয়ে ওর নজর পড়েছিল এই গাছটার দিকে। চারদিকের আগাছা , জমে থাকা আবর্জনার মধ্যে বেমানান গাছটা এত অবহেলা আর অযত্নের মধ্যেও প্রাণপণে ডালপালা ছড়িয়ে নিজের অস্তিত্ব প্রমাণ দিতে চাইছে। ঠিক যেন অন্তরার‌ই মত।

এই গাছটাও একা , কেউ ভালোবাসে না , ফিরেও তাকায় না। তবুও টিঁকে আছে নির্লজ্জের মত। এবার থেকে অন্তরাই ভালবাসবে ওকে। নিজের কথা মনে পড়ে যায় ওর গাছটাকে দেখলে।অন্তরার যত্নের বহর দেখে হাসে প্রশান্ত।
" পণ্ড শ্রম করছ গো ! এই গাছ কি আর বাঁচবে! বাঁচলেও ফুল যে দেবে না , এটা নিশ্চিত। এত শৌখিন গাছ কি এভাবে বাঁচে ! "
অন্তরা জবাব দেয় না। মনে মনে ভাবে যত্ন করতে দোষ কী ! ভালোবাসা আর যত্নের অভাবে কত কষ্টে আছে গাছটা , সে তো ওর চেয়ে বেশী কেউ জানে না।
এই বাড়িতে নিজের অবস্থানটা আজও স্পষ্ট নয় অন্তরার কাছে। এত বড় বাড়িতে লোক মোটে দুজন , এখন ওকে নিয়ে তিন জন। স্বামী প্রশান্ত , আর বছর পনেরোর গম্ভীর ছেলেটা। ছেলেটাকে এতদিনেও বুঝে উঠতে পারল না। বুঝবেই বা কী করে , কথাই তো বলে না ! ছেলের বাবাই সমঝে চলে ছেলেকে , তো অন্তরা কোন ছার !
বাপ ছেলের দেখাশোনা আর রান্নাবান্না ছাড়া অন্তরার কোনো কাজ নেই। কোনো পরিচয়ও কি আছে ? তবে ওর মত মেয়ের ভাগ্যে এই নাকি যথেষ্ট।
মাস কয়েক আগে এক দুপুরে একরাশ বাসনপত্র ধুয়ে আনতে আনতে মামীর ঘরে ডাক পড়েছিল।
ভেজা হাত দুটো মুছে নিয়ে দৌড়েছিল অন্তরা। মামী ওর দিকে ভালো করে নজর চালিয়ে বলেছিল ,
" ভালো একটা শাড়ি পরে একটু সেজে নে। চা করে নিয়ে আয় তিন কাপ। এক ভদ্রলোক এসেছেন তোর মামার সাথে।"
অন্তরা অবাক হয় নি। আজকাল মাঝে মাঝেই হুটহাট সেজেগুজে লোকের সামনে গিয়ে বসতে হয়। হঠাৎ করে মামা আর মামী দুজনেরই মনে হয়েছে এবার ওকে ঘাড় থেকে নামানো দরকার। তাদের মেয়েটাও বড় হয়েছে ,এর আগে অন্তরার বিয়ে না দিলে লোকে যদি মন্দ বলে !
বয়স তিরিশ পার হয়ে গেছে। তবুও বিয়ের পিঁড়িতে বসতে পেল না অন্তরা। অবশ্য এর জন্য মামা মামীর কোনো দোষ নেই। আট বছর বয়সের সেই ভয়াবহ অ্যাকসিডেন্টের পরে একটা পা এমন বাজে ভাবে ভেঙ্গে গেছিল যে , সারা জীবনের জন্য ওই পা টেনে টেনে চলা ছাড়া আর কোনো উপায় ছিল না।
কমজোরি পায়ের জন্য অবশ্য কিছুই আটকে যায় নি। সব কাজেই সে সমান দক্ষ স্বাভাবিক মানুষেরই মত। শুধু চলার সময় অল্প খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে চলতে হয়। বিয়ের বাজারে তাই ওর দর কমে গেছিল।
বিয়ে হচ্ছে না বলে কোনো আক্ষেপ ছিল না অন্তরার। মামার সংসারে বেশ মানিয়েই নিয়েছিল। শুধু মাঝে মাঝে বিছানায় শুয়ে পাশের ঘর থেকে চাপা গলার কিছু কথা ছিটকে এসে কানে লেগে মন খারাপ করে দিয়ে যেত। মেয়েটাকে আর কতদিন ঘাড়ে বসিয়ে খাওয়াতে হবে , সেই আক্ষেপে হয়তো রাতের ঘুমটাই বরবাদ হয়ে যেত মামা - মামীর। অন্তরার মনে হত বেঁচে আছে কেন ও ! বেঁচে থাকাটা কি খুব জরুরী ছিল! যে অ্যাকসিডেন্টে মা বাবা চলে গেল , সেখান থেকে ওকেই বেঁচে ফিরতে হল কেন! কিসের জন্য!
শেষ পর্যন্ত বিয়েটা হয়ে গেল লোকটার সাথে।লোকটার নাম প্রশান্ত দত্ত। প্রায় পঁয়তাল্লিশ হবে বয়স , অন্তরার থেকে পনেরো বছরের বড়। বিয়ের সময়ে অন্তরার কেবল‌ই ভয় করছিল, প্রশান্ত দত্ত লোকটা কেমন হবে কে জানে! একদিনই চায়ের কাপ হাতে নিয়ে গিয়ে এক ঝলক দেখেছিল। সেই দেখায় কতটাই বা বোঝা যায় ! লোকটা কি ভালো বাসবে ওকে! ভালোবাসার কথা মনে হতেই বুক গুড়গুড় করে ওর।
লোকটার হয়তো খুঁতো মেয়েকে বিয়ে করা ছাড়া উপায় ছিল না। এক বছর আগে বউ মারা যেতে বিপাকে পড়েছিল। এমন কারো দরকার ছিল ওর , যে নিজের মনে করে , ভালোবেসে এলোমেলো সংসারটাকে আবার গুছিয়ে দেবে।
অন্যের ফেলে যাওয়া সংসারই হোক , তবু তো এখন নিজের হবে, এই ভাবনাতেই ছন্নছাড়া জীবনটাকে নতুন করে সাজানোর স্বপ্নে বিভোর ছিল অন্তরা। প্রথম ছন্দপতন ঘটল ফুলশয্যার রাতে। লোকটা স্পষ্ট করে বুঝিয়ে দিল,
" বিয়ে যখন করেছি , আমার স্ত্রী হবার যোগ্য মর্যাদাই তুমি পাবে। তবে আমাদের মাঝে তৃতীয় কেউ আসবে না , এটা মনে রেখো। এই সংসারে আমার স্ত্রী পরে , আগে আমার ছেলের মা হয়ে উঠতে হবে। এবং শুধু ওর মা হয়েই থাকতে হবে আজীবন। পারবে তো! "
কিছু না বুঝেই ঘাড় হেলিয়েছিল অন্তরা। ওর জীবনটা কোনোদিনই সহজ ছিল না , আজই বা সহজ হবে কী করে! এর মধ্যেই প্রাণপণে নিজের অস্তিত্ব রক্ষার লড়াই চালিয়ে যেতে হবে। সেদিন থেকেই প্রশান্ত দত্তর স্ত্রী হ‌ওয়ার চেয়ে পনেরো বছরের গম্ভীর ছেলেটার মা হয়ে ওঠার আপ্রাণ চেষ্টা করে আসছে সে।
বাইরে থেকে দেখতে গেলে এ সংসারের সব কিছুই তার। তবে ভেতর থেকে অন্তরা জানে , কিছুই ওর নয়। এখনও এই সংসারের সব কিছুতেই একজনের নামই জড়িয়ে আছে। চলে গিয়েও যিনি সংসারের পুরোটাই দখল করে আছেন। এমনই যদি হবার ছিল , লোকটা অন্তরাকে খামোখা এ সংসারে টেনে নিয়ে এল কেন ? অন্যের সংসারে নিজের নির্লজ্জ উপস্থিতি আর জানান দিতে ভালো লাগছে না। কিছুতেই যেন সংসারটাকে নিজের করে নিতে পারছে না। ত্রুটিটা কার , ওর নিজেরই কি !
কদিন বাদে ছেলেটার বড় পরীক্ষা। সারাক্ষণ নিজের ঘরে পড়াশোনায় ব্যস্ত থাকে। স্বামীর কড়া হুকুম , ছেলের দিকে বিশেষ নজর রাখতে হবে। ওর যাতে একটুও অসুবিধে না হয় , সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে অন্তরাকেই।
সন্ধ্যেবেলা এক গ্লাস গরম দুধ হাতে ছেলের ঘরের দিকে হেঁটে গেল অন্তরা। দরজার সামনে দাঁড়িয়ে পর্দার ফাঁক দিয়ে দেখল একমনে পড়ছে পদ্মনাভ। প্রশান্ত আর মল্লিকার আদরের পিকু। ছেলেটা দেখতে একেবারে ওর মায়ের মত হয়েছে। পিকুর পড়ার টেবিলের ওপর দেয়ালে ঝোলানো মল্লিকার হাসি হাসি মুখের ছবিটার দিকে একবার তাকাল অন্তরা। কী ভাগ্য করেই এসেছিলেন ভদ্রমহিলা! চলে গিয়েও দখল করে রেখেছেন সবাইকে। যেমন স্বামী , তেমন ছেলে , দুজনেরই মন জুড়ে রয়েছেন তিনি ।
ঘরে ঢুকে পিকুর সামনে দুধের গ্লাসটা টেবিলের ওপর বসিয়ে দিয়ে অন্তরা বলল ,
" দুধটা খেয়ে নাও বাবু ! ঠাণ্ডা হয়ে যাবে নইলে। "
"খেয়ে নেব। " বইয়ের পাতার থেকে চোখ না সরিয়েই বলল পিকু। কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকে অন্তরা। খুব ইচ্ছে করে পিকুর মাথায় হাত রাখতে , ইচ্ছে করে ওর মুখ থেকে মা ডাক শুনতে। ওর দুচোখে নিজের জন্য ভালোবাসা খুঁজে নিতে চায় অন্তরা। কিন্তু সাহস পায় না কিছুতেই। মনে পড়ে প্রথম প্রথম এই ছেলের অগোছালো , এলোমেলো ঘরটা গুছিয়ে দিতে চেষ্টা করত। সেই সময়েই একদিন পিকুর টেবিলের ওপর ঝোলানো ওর মায়ের ছবিটা কাপড় দিয়ে মুছে পরিষ্কার করছিল, হঠাৎ পিকু এসে কেড়ে নেয় মায়ের ছবিটা। অত্যন্ত উদ্ধত ভঙ্গিতে অন্তরাকে বলে ,
" আপনি কেন এ ঘরে ঢুকেছেন ? আমার মায়ের ছবিতে হাত দিয়েছেন কেন আপনি!"
" ছবিটায় ধুলো পড়েছিল। মুছে দিচ্ছিলাম তাই। " আমতা আমতা করে বলার চেষ্টা করেছিল অন্তরা।
" দরকার নেই ! মায়ের ছবি আমিই মুছে নেব! আপনি যান এ ঘর থেকে। "
ছেলেটা যদিও উদ্ধত ভঙ্গিতে কথাগুলো বলছিল , অন্তরার কেন যেন মনে হচ্ছিল ঔদ্ধত্যের আড়ালে বিশাল এক কষ্ট লুকিয়ে রেখেছে ও। যে কষ্ট হয়তো হাজার চেষ্টাতেও ছুঁতে পারবে না সে। মাথা নিচু করে পিকুর ঘর থেকে বেরিয়ে এসেছিল।
অন্তরা বেরিয়ে আসার একটু পরেই প্রশান্ত ছেলের ঘরে ঢুকেছিল। রান্নাঘর থেকেও ওদের কথা স্পষ্ট শোনা যাচ্ছিল। প্রশান্ত বলছিল ,
" ও তোমার মা হয় পিকু ! মায়ের সঙ্গে কেউ এভাবে কথা বলে ! "
" মা ! ও আমার মা ! " পিকুর গলায় বিদ্রূপ চাপা ছিল না।
" নয়তো কী! শুধু তোমার অযত্ন হচ্ছে বলেই ওকে এ বাড়িতে নিয়ে এলাম। কেন তুমি ওকে মা ভাবতে পারছ না ! ও তো অনেক যত্ন করে তোমার!"
" মায়ের জায়গায় আমার কাউকে দরকার ছিল না বাবা ! তোমার হয়তো দরকার ছিল , তাই তুমি নিয়ে এসেছ। " পিকুর উদ্ধত জবাব।
" তোর যদি এতই অনিচ্ছে ছিল , আগেই বললি না কেন? আমি তো জিজ্ঞেস করেছিলাম!"
" আমি বললেই কি তুমি শুনতে!" আবার পিকুর গলায় বিদ্রুপের ছোঁয়া।
অসহায় ভঙ্গিতে ছেলের ঘর থেকে বের হয়ে এসেছিল প্রশান্ত। লজ্জায় মাটিতে মিশে যেতে ইচ্ছে করছিল অন্তরার। কেন ওকে এ বাড়িতে নিয়ে এল লোকটা! সে রাতে প্রশান্ত গম্ভীর ভাবে অন্তরাকে বলেছিল ,
" পিকুর ঘরে এভাবে যখন তখন ঢোকার দরকার নেই। ও যখন পছন্দ করে না। "
চুপ করে ছিল অন্তরা। তারপর যতটা সম্ভব গুটিয়ে নিয়েছিল নিজেকে। তবে মাঝে মাঝেই একলা , নিঃসঙ্গ মা হারা ছেলেটার করুণ মুখের দিকে তাকিয়ে ওর মা হয়ে উঠতে ইচ্ছে হয়েছে।প্রশান্তর কাছ থেকে ছেলের পছন্দ অপছন্দের খোঁজ করেছে বার বার। ওর পছন্দের রান্নাগুলো বার বার সাজিয়ে দিতে চেয়েছে খাবারের থালায়। অসুখ বিসুখে দূর থেকে হলেও সারাক্ষণ নজর রেখেছে।
দুধের গ্লাসটা রেখে দিয়ে পিকুর দিকে একদৃষ্টে তাকিয়েছিল অন্তরা। পড়তে পড়তেই হঠাৎ খেয়াল হল পিকুর। ভুরূ কুঁচকে বলল,
" কী হয়েছে ? আপনি কি কিছু বলবেন ? "
এর মানে অন্তরার এখানে দাঁড়িয়ে থাকা পছন্দ করছে না। মাথা নেড়ে বেরিয়ে এল অন্তরা। সে তো আপ্রাণ চেষ্টা করছে এই সংসারের একজন হয়ে উঠতে। কিন্তু তারাই দূরে সরিয়ে দিচ্ছে। ছেলে আর স্বামী , দুজনেই কেমন ছাড়াছাড়া ব্যবহার করে। এই সংসারে কেন যে আছে , বুঝে উঠতে পারে না।
এক বিকেলে প্রচণ্ড মাথা ব্যথায় বিছানা ছেড়ে উঠতে পারছিল না অন্তরা। দু দিন ধরেই কেমন জ্বর জ্বর লাগছিল। আমল দেয় নি। আজ প্রশান্তও বাড়ি নেই। অফিসের কাজে বাইরে গেছে। ছেলেটা স্কুল থেকে ফিরেছে একটু আগেই। ওকে তো কিছু খেতে দিতে হবে ! কষ্ট করে বিছানা ছেড়ে রান্নাঘরে গেল।
বিকেলে স্কুল থেকে ফিরে হালকা কিছু খায় পিকু।রাতে একসাথে ভাত খায়। এখন কিছু বানানোর মত শক্তি নেই। দুধ আর কর্নফ্লেক্স বাটিতে ঢেলে নিল। পিকু এই খাবারটা পছন্দ করে বেশ। বাটিটা হাতে করে পিকুর ঘরে ঢুকল।
" বাবু ! এই খাবারটা খেয়ে নাও! শরীরটা ভালো লাগছে না। তাই কিছু বানাতে পারলাম না। "
পিকু শুয়ে ছিল বিছানায়। এবারে উঠে বসল ,
" কী হয়েছে আপনার?"
" এমন কিছু না ! মাথা ধরেছে অল্প ! আমি একটু শুই গিয়ে ! তুমি কিন্তু খাবারটা খেয়ে নিও ! "
ক্লান্ত পায়ে নিজের ঘরে গিয়ে বিছানায় শুয়ে পড়ল অন্তরা। শরীরটা অসম্ভব খারাপ লাগছে। মাথা ব্যথা করছে , বমি বমি করছে। কেমন আচ্ছন্ন আচ্ছন্ন লাগছে। জ্বর আসছে নাকি ! চোখ বন্ধ করতেই এক গভীর অন্ধকারের মধ্যে তলিয়ে গেল সে।
মাথায় এক ঠাণ্ডা স্পর্শে চোখ খুলল অন্তরা। পিকু ঝুঁকে আছে ওর দিকে। কত রাত এখন ! পিকুর খাওয়ার সময় হয়েছে কি ! ধড়মড়িয়ে উঠে বসতে চাইল অন্তরা। পিকু উদ্বিগ্ন গলায় বলল,
" তোমার গায়ে যে অনেক জ্বর ! ওষুধ খেয়েছ কিছু ? "
" ও কিছু না ! সেরে যাবে ! " আচ্ছন্ন অন্তরা খেয়াল করল না পিকু ওকে আর আপনি বলছে না। বিছানা থেকে নেমে পিকুর জন্য খাবার তৈরি করতে রান্নাঘরের দিকে পা বাড়াল সে। তারপরেই মাথা ঘুরে গেল , চারপাশ অন্ধকার হয়ে এল। টলে পড়ে যাওয়ার মুহূর্তে দুটো কিশোর হাত পেছন থেকে ধরে ফেলল ওকে।
চোখ মেলতেই উজ্জ্বল আলোয় চোখ ধাঁধিয়ে গেল অন্তরার। এটা কোথায় শুয়ে আছে ও ! আস্তে আস্তে পরিষ্কার হয়ে এল মাথা। নিজের ঘরেই শুয়ে আছে ও। এখন দিনের বেলা। কটা বাজে কে জানে! কাল রাতে সেই যে মাথা ঘুরে গেছিল , তারপরের কিছুই আর মনে নেই পরিষ্কার। আবছা আবছা মনে পড়ছে , পিকু ওকে শুইয়ে দিচ্ছে বিছানায় , তারপর কী একটা ওষুধও যেন খাইয়ে দিয়েছিল , এইটুকুই মনে আসছে শুধু।
ছেলেটা কোথায় এখন! কাল রাতে খাওয়াও হয় নি ওর! উঠে বসল অন্তরা। শরীরটা এখন অনেকটাই ভালো লাগছে। উঠে বসতেই চমকে উঠল। পায়ের কাছে গুটিসুটি হয়ে কে শুয়ে আছে ওটা ! পিকু এখানে কেন ? ছেলের গায়ে হাত দিয়ে সাবধানে ডাকল ,
" পিকু ! বাবু ! ওঠো ! "
ধড়মড় করে উঠে বসল পিকু। ঘুম ভাঙ্গা চোখে ফ্যালফ্যাল করে তাকাল অন্তরার দিকে।
" কী হয়েছে পিকু ? তুমি এখানেই শুয়েছিলে কাল! আমার যে কাল হঠাৎ করে কী হল ! "
অন্তরাকে চমকে দিয়ে পিকু হঠাৎ জড়িয়ে ধরল ওকে। আর অন্তরা স্পষ্ট বুঝতে পারল পিকু কাঁদছে। কিছুক্ষণ স্তম্ভিত হয়ে থাকল।তারপর নরম গলায় বলল ,
" কী হয়েছে বাবু ? কী হয়েছে ? "
" আমি কাল এত ভয় পেয়েছিলাম! ভেবেছিলাম মা যেমন আমাকে ছেড়ে চলে গেছে , তেমন তুমিও চলে যাবে ! কত ডাকছিলাম তোমায় , সাড়াই দিচ্ছিলে না! " ফোঁপাতে ফোঁপাতে বলল পিকু।
অন্তরার চোখেও জল চলে এল। মাকে হারানোর যন্ত্রণা যে কী , সেটা অন্তরার চেয়ে বেশী কে জানে! কী করে এই যন্ত্রণা সহ্য করছে ছেলেটা , অন্তরা ভালোই বুঝতে পারে।
পিকুর মাথায় হাত রাখে অন্তরা। এতদিন বাদে গাম্ভীর্যের খোলস ভেঙ্গে অন্তরার সামনে এসে দাঁড়িয়েছে নরম, অবুঝ এক কিশোর। মাকে হারানোর যন্ত্রণা সে ভুলতে চাইছে ওকেই আঁকড়ে ধরে। ঠিক এরকম ভালোবাসাই তো চাইছিল অন্তরা! মা না হোক , পিকুর মায়ের মত তো হয়ে উঠেছে এতদিন পর!
দুপুরে প্রশান্ত এসে হাজির।
" কাল পিকু এত ভয় পেয়ে ফোন করেছে! ছুটতে ছুটতে এলাম! এখন ঠিক আছ তো তুমি! "
মৃদু হেসে মাথা হেলায় অন্তরা। মনে মনে ভাবে , এখন ঠিক না হয়ে উপায় আছে! এত ভালোবাসার সন্ধান পেয়েও কি আর খারাপ থাকতে পারে সে!
বিকেলে গোলাপ গাছটার গোড়ায় জল ঢালতে গিয়ে চমকে উঠল সে। কচি কচি পাতা গজিয়েছে সেই গাছে। পাতা যখন গজিয়েছে , ফুল ফুটতে আর কতদিন। অন্তরা ফিসফিস করে বলল।
" শুনছিস! আমি আর একা নই ! ঠিক তোর মত! কচি কচি পাতারা ভালোবেসে যেমন জড়িয়ে ধরেছে তোকে , ঠিক তেমনি এই সংসারও জড়িয়ে ধরেছে আমাকে মায়ায় , ভালোবাসায়। বাকি পথটুকু আমাকে আর একা চলতে হবে না , কী বলিস ! "

মাধবী_ভট্টাচার্য

No comments:

Post a Comment