ওলের ডালনার রঙ হবে ব্রোঞ্চের মতন। ডুমো ডুমো করে ওল কেটে ভাপিয়ে সেই ওল সোনালী করে ভেজে ডালনা। ওলের ডালনায় ছোলা দিলে স্বাদ খোলে। অল্প পাকা তেঁতুল ধনে জিরে শুকনো লংকা বাটায় কষিয়ে রান্না...
অল্প ঘী দিও উমা!!!ফোড়নে শুকনো লংকা তেজপাতা গোটা জিরে...
উমা আমার মায়ের নাম। মা কে রান্নাঘরের পাশে বসে ঠিক এভাবেই কথাগুলো বলেছিলো ঠাম্মা। টানা জ্বরে দুধ সাবু পথ্যি করে তখন সবে উঠে বসেছে ঠাম্মা আর তার সাধের রান্নাঘরের দায়িত্বে মা। মা কে পাখিপড়া করে শেখাতে শেখাতে হাঁপিয়ে কাঁসার ঘটিতে দু ঢোক জল খায় ঠাম্মা। শরীর এখনো দুর্বল।
কড়ার ঢাকনার ওপরে জল সেটা ডালনায় কখন কিভাবে দিতে হবে সেটাও ঠাম্মার নির্দেশে।ওলের ডালনার গরম মশলা একটু আলাদা সেটা শিলে বাটা হচ্ছে। এদিকে একটা স্টিলের বাটিতে অল্প ডালনার ঝোল আর একটুকরো ওল চাটতে থাকা আমার নজর ওই পাকা তেঁতুলের দিকে।
মায়ের স্কুলে যাওয়ার সময় হয়ে আসে।
পড়া শেষে আমি পুতুল নিয়ে বসি...পুতুল খেলতে খেলতে সময় বুঝতে পারিনা।
বাড়িতে আমি আর ঠাম্মা চারদিক নিস্তব্ধ ...কাঁঠাল গাছের ডালে মৌমাছির চাক ঘিরে গুনগুন করে মাছি। গেটের পাশে গাঁদাল ঝোপে অপুর্ব ফুল।
রাস্তায় তিলেরখাজা ওয়ালা ডেকে যায়। জ্বরের পর ঠাম্মা কেমন উদার হয়ে যায় আমাকে এক টাকা দেয় পেপসি খাওয়ার জন্য। লাল,কমলা,হলুদ, সাদা পেপসি,দাঁতে কেটে চুষে খেতে হয়।
ফুলের সাজিটা টেনে নিয়ে ঠাম্মা ঠাকুরঘরে ঢোকে। আমি স্নান সেরে চুল আঁচড়াই। ঠাম্মা হাতে আলগোছে ছেড়ে দেয় কলা,বাতাসা প্রসাদ।
আমি রান্নাঘরে পিঁড়ে পেতে থালা গুছিয়ে জল রাখি। এক ছুটে লেবুপাতা ছিড়ি পাকা তেঁতুল গুড় দিয়ে মাখি। ভাতে সেদ্ধ উচ্ছে নতুন আলু সর্ষের তেল কাঁচা লংকা দিয়ে ডলে মাখে ঠাম্মা। নিরামিষ বাটিতে ঢেকে রাখা ব্রোঞ্চরঙা ওলের ডালনা।
প্রায় পাঁচ দিন পর আমার আর ঠাম্মার একসাথে খাওয়া। দলা পাকিয়ে তেঁতো ভাত আমার মুখে পুরে দেয় ঠাম্মা তারপর নিজে খায়।
আমার এই দিন গুলো কেমন স্বপ্নের মত ফিরে আসে। আজ ভোরে মনে হলো মা কমলালেবু এনে ডাকছে, দু দিন আগে মনে হয়েছিলো ঠাম্মা ডাকছে ওলের ডালনা চেখে দেখবার জন্য। আদতে আমি নিজেও জানি এই বয়েসে ডেকে খাওয়ানোর আর কেউ থাকেনা।
তবুও ধুসর স্মৃতিতে বারে বারে ফিরে আসে ওলের ডালনা,মুখিকচুর ডাল,মুলোর মুচমুচে বড়া বা কপি পাতা বাটা মাখা গরম ভাত,সেই পিঁড়ি পাতা রান্নাঘর আর সেইসব দিনগুলো খোঁজা আমিটা...
No comments:
Post a Comment