Tuesday, October 21, 2025

ম্যাকবেথ আর শেখ মুজিবের ভূত

 




ঝড়ে ঢাকা এক বিকেলে স্কটল্যান্ডের এক পাহাড়। আকাশে বজ্রের গর্জন, মাটি কাদা পানিতে একাকার। সেই পাহাড়ের এক পথের ধারে দাঁড়িয়ে ছিল তিন ডাইনি। তারা একে অপরকে বলল,

“যুদ্ধ শেষ হলে দেখা হবে—ম্যাকবেথের সঙ্গে।”
সেদিনই দূরবর্তী যুদ্ধক্ষেত্রে বীরত্বের সঙ্গে যুদ্ধ করছিল স্কটল্যান্ডের সাহসী সেনানায়ক ম্যাকবেথ ও তার বন্ধু ব্যাঙ্কো। সেই যুদ্ধে তারা তাদের শত্রু নরওয়েকে পরাস্ত করল। খবর শুনে স্কটল্যান্ডের রাজা ডানকান আনন্দে উচ্ছসিত হয়ে উঠলেন। পুরস্কার হিসেবে তিনি ম্যাকবেথকে ঘোষণা করলেন “থেন অফ কডর” যা ছিল যে ছিল কডরের ভূস্বামী হবার অধিকার।
ম্যাকবেথ ও তার বন্ধু ব্যাঙ্কো যুদ্ধ থেকে পাহাড় বেয়ে ফেরার পথে কুয়াশার মধ্যে তিন ডাইনি হঠাৎ তাদের সামনে উপস্থিত হলো।
একজন বলল, “হে ম্যাকবেথ, কডরের থেন!”
অন্যজন বলল, “হে ম্যাকবেথ, গ্লামিসের থেন!”
তৃতীয়জন ভবিষ্যদ্বাণী করল, “হে ম্যাকবেথ, একদিন তুমি স্কটল্যান্ডের রাজা হবে!”
সেনাপতি ম্যাকবেথ এটা শুনে হতভম্ব।
ব্যাঙ্কোকে ডাইনিরা বলল, “তুমি নিজে রাজা হবে না, কিন্তু তোমার বংশধররা হবে রাজা।”
ডাইনিরা এর পরই যেন হাওয়ায় মিলিয়ে গেল, কিন্তু তাদের কথা যেন আগুন হয়ে পোড়াতে লাগল ম্যাকবেথের মনকে।
অল্প সময় পর রাজা ডানকানের একজন দূত দৌড়ে এসে ম্যাকবেথকে বলল- “রাজা আপনাকে কডরের থেন বানিয়েছেন।”
অবাক হয়ে ম্যাকবেথ ভাবলেন, তাহলে ডাইনিরা সত্যিই ভবিষ্যৎ জানে!
তার মনে অন্ধ উচ্চাকাঙ্ক্ষার বীজ বপন হলো—যদি তারা একবার ঠিক বলে থাকে, তাহলে বাকি সব ভবিষ্যদ্বাণীও কি সত্য হবে না?
বাড়িতে ফিরে তিনি সব জানালেন লেডি ম্যাকবেথকে।
লেডি ম্যাকবেথ হাসলেন, বললেন - “ভাগ্য তোমার দরজায় কড়া নাড়ছে, আর তুমি কি বসে থাকবে?”
কিছুদিন পর রাজা ডানকান অতিথি হয়ে এলেন ম্যাকবেথের প্রাসাদে।
ম্যাকবেথ প্রথমে ডাইনিদের ভবিষ্যদ্বাণী নিয়ে সন্দিহান ছিলেন। কিন্তু রাজা ডানকান তার কাছে এসে তাঁকে গ্ল্যামিসের থেইন উপাধি দিতেই দ্বিতীয় ভবিষ্যদ্বাণী সত্যি প্রমাণিত হলো। ম্যাকবেথ তখন ডাইনিদের দেয়া স্কটল্যান্ডের রাজা হবার তৃতীয় ভবিষ্যতবানীর বিষয়ে উত্তেজিত।
লেডি ম্যাকবেথ, যিনি অত্যন্ত উচ্চাকাঙ্ক্ষী এবং নির্মম, ম্যাকবেথকে রাজা হওয়ার জন্য উস্কানি দেন। তিনি বলেন, "যা দরকার তা করো, আমি তোমার পাশে আছি।"
স্কটল্যান্ড রাজ্যে ম্যাকবেথের প্রাসাদে রাত নামল - আকাশে তারার আলো ম্লান।
লেডি ম্যাকবেথ বললেন, “এই রাতই তোমার রাজ্যের প্রথম রাত হোক।”
লেডি ম্যাকবেথ গোপনে রাজার প্রহরী ও দাস-দাসীদের মদ্যপান করিয়ে ঘুম পাড়িয়ে দিলেন।
ম্যাকবেথ দ্বিধায় পড়ে গেলেন - রাজাকে হত্যা করা মানে রাজাকে নয়, নিজের বিবেককেও হত্যা করা।
তবু লেডি ম্যাকবেথের প্ররোচনায় তিনি ছুরিটি হাতে তুলে নিলেন। অন্ধকার ঘরে নিঃশব্দে ঢুকে রাজা ডানকানের বুকে বিধিয়ে দিলেন।
হত্যার পর রক্তমাখা হাতে কাঁপতে কাঁপতে তিনি ফিরে এলেন।
ম্যাকবেথ বরলেন “এই রক্ত কি আমার হাত থেকে কোনোদিন ধুয়ে যাবে?”
লেডি ম্যাকবেথ ঠান্ডা গলায় বলল, “একটু জলই যথেষ্ট।”
সকালে রাজহত্যার খবর ছড়িয়ে পড়ল। ডানকানের দুই ছেলে ম্যালকম ও ডোনালবেইন ভয়ে পালিয়ে গেল। সবাই ভাবল তারা-ই রাজাকে মেরেছে।
আর সেই সুযোগে ম্যাকবেথ স্কটল্যান্ডের রাজা হয়ে গেলেন।
কিন্তু রাজমুকুট পরেও রাজা ম্যাকবেথ শান্তি পেলেন না। তাঁর মনে বারবার বাজতে লাগল ডাইনিদের ভবিষ্যদ্বাণী - তার বন্ধু “ব্যাঙ্কোর সন্তানরাই হবে রাজা।”
একদিন গোপনে ভাড়াটে খুনি পাঠিয়ে ব্যাঙ্কোকে হত্যা করাল ম্যাকবেথ।
কিন্তু ব্যাঙ্কোর একটি ছেলে পালিয়ে যায়।
এক রাতে রাজদরবারে ছিল এক মহা ভোজসভা। রাজা ম্যাকবেথ অতিথিদের স্বাগত জানাচ্ছিলেন, হঠাৎ তাঁর চোখে পড়ল রাজসিংহাসনের দিকে।
রক্তাক্ত মুখে তার বন্ধু ব্যাঙ্কো বসে আছে রাজসিংহাসনে! এটা কি ব্যাঙ্কোর ভূত!
আর কেউ কিছু দেখতে পাচ্ছে না, কিন্তু ম্যাকবেথ আতঙ্কে চিৎকার করে উঠলেন - "ভূত! ভূত! তুমি কেন এখানে?”
অতিথিরা স্তব্ধ।
লেডি ম্যাকবেথ সবাইকে ভুল বুঝিয়ে বলে সভা ভেঙে দিলেন, কিন্তু বোঝা গেল—
রাজা আর নিজের মনের ওপর কর্তৃত্ব রাখেন না।
ম্যাকবেথ তখন আবার সেই ডাইনিদের খুঁজে বের করলেন।
তারা রহস্যময় কণ্ঠে আবার তিনটি ভবিষ্যদ্বাণী করল:
১. “ম্যাকডাফ থেকে সাবধান।”
২. “নারীর গর্ভ প্রসূত কেউ তোমায় হত্যা করতে পারবে না।”
৩. “যতদিন না বার্নাম বনের গাছ ডানসিনেন পাহাড়ে উঠে না আসে, তুমি নিরাপদ।”
ডাইনিদের ভবিষ্যতবাণী শুনে ম্যাকবেথ আনন্দে হেসে উঠেন - “বন তো কখনো পাহাড়ে আসে না, আর সব মানুষই তো নারীর গর্ভ প্রসূত!”
ম্যাকডাফ ছিলেন ফাইফের ভূস্বামী এবং ম্যাকবেথের প্রধান শত্রু। তিনি ন্যায়বিচার এবং প্রতিশোধের প্রতীক হিসেবে কাজ করেন। ডাইনিদের ভবিষ্যতবাণী শুনে সাবধানতার জন্য ম্যাকবেথ ম্যাকডাফ ও তার পরিবারকে নির্মমভাবে হত্যা করার নির্দেশ দেন।
ম্যাকডাফ পালিয়ে গেলেও তাঁর স্ত্রী ও সন্তানদের হত্যা করা হয়। ম্যাকবেথের অত্যাচারী শাসনের বিরুদ্ধে লড়াই করার জন্য ম্যাকডাফ পালিয়ে ইংল্যান্ডে চলে যান। তার স্ত্রী ও সন্তানদের হত্যার পর, তিনি প্রতিশোধের জন্য আরও দৃঢ়প্রতিজ্ঞ হয়ে ওঠেন।
কিন্তু সত্য কখনো চিরকাল চাপা থাকে না। ইংল্যান্ডে আশ্রয় নেওয়া ম্যালকম ও ম্যাকডাফ একত্র হলেন। তারা সৈন্য সাজিয়ে ম্যাকবেথের দুর্গের দিকে অগ্রসর হলেন।
বনের গাছ কেটে সৈন্যরা নিজেদের আড়াল করল। দূর থেকে দেখে মনে হলো যেন বার্নাম বন সত্যিই ডানসিনেন পাহাড়ের দিকে এগোচ্ছে। ডাইনিদের ভবিষ্যদ্বাণী যেন জীবন্ত হয়ে উঠল।
এদিকে লেডি ম্যাকবেথ যেন উন্মাদ হয়ে গেছেন। রাতে ঘুমের মধ্যে হাঁটে, হাত ধুতে থাকেন -
“Out, damned spot! এই রক্তের দাগ কেন যায় না?”
অপরাধবোধে দগ্ধ হয়ে সে শেষ পর্যন্ত লেডি ম্যাকবেথ আত্মহত্যা করেন।
যুদ্ধক্ষেত্রে ম্যাকবেথ একের পর এক সৈন্যকে পরাজিত করলে অবশেষে সামনে আসে ম্যাকডাফ।
ম্যাকবেথ গর্জে ওঠে,
“কোনো নারীর গর্ভ প্রসূত আমাকে মারতে পারবে না!”
ম্যাকডাফ ঠান্ডা গলায় বলে,
“আমি নারীর গর্ভ প্রসূত হয়ে জন্মাইনি, অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে এসেছি এই পৃথিবীতে।”
মুহূর্তেই ম্যাকবেথের মুখ সাদা হয়ে যায়। সে বুঝতে পারে, ভাগ্যই তাকে ধোঁকা দিয়েছে। শেষ লড়াইয়ে ম্যাকডাফ তার মাথা কেটে ফেলে।
ম্যাকবেথের মৃত্যুতে স্কটল্যান্ড মুক্তি পেল।
ম্যালকম রাজা হলেন।
কিন্তু রাজপ্রাসাদের দেয়ালে তখনও লেগে রইল রক্তের গন্ধ—
এক রাজা, যিনি নিজের উচ্চাকাঙ্ক্ষায় নিজেকেই ধ্বংস করেছিলেন।
“ম্যাকবেথ”-এর গল্প আসলে এক মানুষের আত্মার ভেতরকার যুদ্ধের গল্প—
যেখানে ভাগ্য ও ইচ্ছা, নৈতিকতা ও লোভ, ভালোবাসা ও ভয় একে অপরকে ধ্বংস করে ফেলে। রাজা হওয়া তার লক্ষ্য ছিল, কিন্তু রাজা হতে গিয়ে সে হারিয়েছিল মানুষ হওয়ার যোগ্যতা।
শেক্সপিয়রের ম্যাকবেথ নাটকের ম্যাকবেথ ছিলেন একজন সেনাপতি। পাকিস্তান ও বাংলাদেশে মোল্লা মিলিটারি সেনাপতিরা শেক্সপিয়রের ডাইনিদের মিথ্যা প্রমাণ করতে শেক্সপিয়রের প্রায় ৫০০ বছর পরও লক্ষ লক্ষ মানুষ হত্যা করে চলেছে। এখন তারা দেখছে শেখ মুজিবের ভূত। তারাও হারিয়েছে মানুষ হওয়ার যোগ্যতা।

সিরাজুল হোসেন

No comments:

Post a Comment