Wednesday, October 22, 2025

দীপাবলির ধারণাটা অসাধারণ।

 


দীপাবলির ধারণাটা অসাধারণ। শুধু দীপাবলি নয়, বেদিক হিন্দুধর্ম সহ সনাতন ধর্ম (প্রকৃতি ধর্ম) এবং আরো অনেক ধর্মে প্রদীপ বা আলো ঈশ্বর এবং আত্মার মধ্যে সংযোগের রূপক। ইসলাম ও আব্রাহামপূর্ব একেশ্বরবাদী ধর্ম জরাথুস্ত্রবাদে আগুনের শিখা সামনে রেখে ঈশ্বর ও তার দেবতাদের স্মরণ করতে হয়।
নিজের হাতের আঙ্গুল ডুবিয়ে তোলা এক ফোঁটা ঘি। সেটি সলতের ভেতরে গিয়ে তৈরী করবে এক উজ্জ্বল আলো। কলার পাতা বা কলা গাছের বাকলের উপর মাটির পাত্রের ঘি-সলতের প্রদীপ বা মোমবাতি নিয়ে বসে আছে অনেক মানুষ। সন্ধ্যা হলে সূর্য্য ডুবলে মন্দিরে বাজবে ঘন্টা। তখনই প্রদীপ জ্বালানো হবে। এই প্রদীপ নিভানো যাবে না। ঘি শেষ হয়ে নিজে নিজেই নিভে গেলে নিরামিষ প্রসাদ খেয়ে ভাঙা হবে উপবাস। এই মানুষগুলো না খেয়ে উপবাস করেছে শুধুই তাদের আপনজনদের কল্যানের জন্য। খেয়াল করলে দেখা যাবে প্রত্যেকের সামনে রাখা প্রদীপের সংখ্যা এক নয়। প্রদীপের সংখ্যা হল তাদের প্রত্যেকের আপনজনেদের সংখ্যার সমান। একজনের জন্য একটি। এই ব্রত শুরু হয় যখন তখন এই অঞ্চলে ছিল ব্যাপক কলেরা মহামারির প্রকোপ। পরিবারের অন্যদের জন্য উপবাস এবং তাদের সুস্থতা ও দীর্ঘায়ুর জন্য এই ব্রত। সংস্কৃত ব্রত শব্দের অর্থ সংকল্প। আগুনের প্রদীপ সামনে নিয়ে বসা মানেই আগুন পুজা নয়, লক্ষ্য মানুষ, পরিবার, আপন জনের কল্যাণ।
কিন্তু প্রতিটি মানুষের জন্য প্রদীপ কেন? মনে করা হয় আব্রাহামিক ধর্মগুলো এবং বৈদিক হিন্দু ধর্ম উভয়েই প্রভাবিত হয়েছে প্রাচীন ইরানী একেশ্বরবাদী ধর্ম প্রাক জরাথ্রুস্ত্রবাদ থেকে। জরাথ্রুস্ত্রবাদীরা তাদের মন্দিরে আগুন সামনে রেখে ঈশ্বরের প্রার্থনা করে। আগুন কেন? কারণ আগুন জীবনদায়ী এবং আগুন অন্ধকার দুর করে। আগুন যেখানেই জ্বলুক তার শিখা উপরের দিকে যায় অর্থাৎ ঈশ্বরের দিকে।
ইব্রাহিমিয় সৃষ্টিতত্বে বাইবেলের শুরুতেই বলা হয়েছে "Let There Be Light" (Genesis 1:3), আলো জ্বলুক - আলোই সবার আগে। কোরানে আছে "নিশ্চয় আল্লাহ আলোকময় সত্তা"। শুধু এটুকু নয়, আরও বিস্তারিত আছে:
"আল্লাহ আকাশ মন্ডলী ও পৃথিবীর আলো। (তিনি যে আলো) তার উপমা যেন একটি তাকের উপরে একটি প্রদীপ রাখা আছে, প্রদীপটি আছে একটি চিমনির মধ্যে, চিমনিটি দেখতে এমন যেন মুক্তোর মতো ঝকঝকে দিপ্তিময়, আর এ প্রদীপটি জলপাইয়ের এমন একটি আশ্চর্য্য তেল দিয়ে ঔজ্জল্য দান করে, যার গাছ পূর্বেরও নয়, পশ্চিমেরও নয়। যা যেন আপনা আপনিই জ্বলে, যেন আগুন তেলকে স্পর্শ না করেই। জ্যোতির উপর জ্যোতির বিচ্ছ্যুরণ; আল্লাহ যাকে চান তাকে তাঁর জ্যোতির দিকে পথপ্রদর্শন করেন; আল্লাহ মানুষের জন্য নানা উপমা পেশ করে থাকেন; আল্লাহতায়ালা সকল বিষয় সম্পর্কেই সম্যক অবগত আছেন" (সূরা: আন-নূর, আয়াত: ৩৫)।
পৃথিবীর বহু সংস্কৃতিতে প্রদীপ সৃষ্টি বা যে কোন কিছুর নবজন্মের সময় মঙ্গল কামনার সাথে সম্পর্কযুক্ত। যে কোন প্রার্থনায় প্রদীপ জ্বালানো একটি রূপক বা উপমা (যেমন সূরা নূরে উপমা দেওয়া)। প্রার্থনায় প্রদীপ রাখার অর্থ হচ্ছে সাধারনভাবে দেখা সব কিছুই নিচের দিকে পতিত হয়। পানি নিচে গড়ায়, বস্তু নিচে পড়ে - একমাত্র প্রদীপের শিখা যেটা উপরের দিকে উঠে যায়। এখনে রূপকটা হচ্ছে এই শিখা যেন তার সাথে মঙ্গল প্রার্থনাটাকেও সৃষ্টিকর্তার কাছে নিয়ে যায়। সেই সৃষ্টিকর্তা যার যার নিজের।

সিরাজুল হোসেন

No comments:

Post a Comment