Wednesday, October 29, 2025

ভাত কম, শাক বেশি।

 


বিচিত্র সব কাজ করে চলি আমি। তার জন্য প্রচুর পড়াশোনাও করি। পুরাণ, মহাকাব্যের আঙিনায় হোঁচট খেতে খেতে ভোরে হাঁটতে গিয়ে শীতের শাকপাতা দেখে চোখ চকচক আর নোলা শকশক করে ।

শীতের দেরী আছে কিন্তু উত্তুরে হাওয়ার নাচন লাগতে না লাগতেই চাষীরা ভালো দাম পাবে বলে শীতের শাক মানে মেথি, পালং এসবের পসরা সাজিয়ে বসে। জানে বহুদিনের অদর্শনে মানুষ ছোকছোঁকানি তাই কিনবেই যেকোনও মূল্যে।
কিন্তু মহাভারতের নলরাজা তাঁর পাকদর্পণ গ্রন্থে ( সম্ভবতঃ ভারতের প্রথম রান্নার বই যা শুধুই রান্না নয়।
কোন খাদ্য গ্রহণ করা উচিৎ, কোনগুলি অখাদ্য, কোন খাবার খেলে দেহের ত্রিদোষ নাশ হয়, কোন সিজনে কী খেতে হয়... এসব নানাবিধ আয়ুর্বেদিক টিপস সম্বলিত এক আকর গ্রন্থ )।
আর সেই বিশাল কর্মকান্ডে সামিল হয়ে দেখছি নল বলেছেন অনঋতুজ মানে অসময়ে ফলে এমন আনাজপাতি না খেতে।
তাহলে শরীর খারাপ হবেই। তাই অল্প করে এইসব অনঋতুজ মেথিশাক, পালং বা ফুল কপি, শিম এনে বহুক্ষণ ঠান্ডা জলে রেখে দিই আর তারপর বারেবারে রানিং ওয়াটারে ধুয়ে, হালকা ভাপিয়ে জল ফেলে তবেই রান্না করি। শীত ভালোভাবে পড়লে তখন আর রিস্ক এত থাকবেনা।
চাষীরা নিজেদের স্বার্থে এখন এসব আনাজ প্রচুর সার দিয়ে ফলাচ্ছে।কারণ গরম এখনও ভালোই আছে তাই আপনাআপনি এসব ফলবেনা আর তাই কীটনাশকও প্রচুর দিচ্ছে তাতে লাভের মুখ দেখবে বলে। কিন্তু আমরা লোভী। লোভে পাপ না হলেও মৃত্যু অবশ্যম্ভাবী।
দোষ কারও নয় গো মা। তুমি যেমন চালাও তেমনি চলি। তবে স্বখাত সলিলে ডুবে মরার আগে এই সতর্ক বার্তা।
এবার আসি বাঙালির প্রিয় কম্বো শাক-ভাতের বেত্তান্তে। এ কাহিনি নতুন নয়। এখন ভাত কম, শাক বেশি। এটাই তফাৎ শুধু।
"জগতে কে সবচেয়ে সুখী?" দার্শনিক ধর্মবকের এহেন প্রশ্নের উত্তরে যুধিষ্ঠির জানিয়েছিলেন অঋণী ও অপ্রবাসী থেকে যে ব্যক্তি দিবসের অষ্টমভাগে শাক রান্না করে খায় সেই যথার্থ সুখী।
আমাদের ভারতীয় হেঁশেলে ধনী দরিদ্র নির্বিশেষে শাক-ভাত হল চিরকালীন পুষ্টিকর, কমফর্ট ফুডের আওতায়। ভারতীয় আয়ুর্বেদের সুপ্রাচীন ঐতিহ্য অনুসারে আমাদের দেশের বিচিত্র সব শাকপাতার সাতকাহন অফুরান। কিন্তু সেই শাকপাতা ধোয়াটা মাথায় রাখতেই হবে কিন্তু।
যুধিষ্ঠিরের উপরিউক্ত শাকপ্রীতির পরোক্ষ একটি নিদর্শন আছে বলেই দ্রৌপদী প্রথম পাণ্ডবের খাদ্যরুচির কথা মাথায় রেখেই বোধহয় শাক রান্না করেছিলেন।
এই যেমন পালং বা মেথি নিয়ে আয়ুর্বেদে কত প্রশস্তিই না গেয়েছেন বৈদ্যকেরা।
চরক-সুশ্রূত ভেষজ স্তুতিতে পালং কে পালঙ্ক্য বলেছেন।
এটি ভেষজ এবং পথ্যের সুষ্ঠু উপাদান।এই নামরহস্যে লুকিয়ে আছে অদ্ভুত এক গল্প। পালঙ্ক বা শয্যার আধার শব্দটি এসেছে মূল শব্দ পালঙ্ক্য থেকে।
যার বিস্তৃত অর্থ হল যেন কোল পেতে বসে আছে ( পরি + সর্বতো ভাবেন অঙ্কঃ = ক্রোড় ইব) আর আয়ুর্বেদের ভাষায় পালঙ্ক্য যখন শাক তখন তার ব্যুৎপত্তি হল এরূপঃ (পালং+বলং) অচ্ +ক্কিপ্ পাল ততঃ অঙ্ক্য এরূপ বলেছেন আয়ুর্বেদাচার্য শিবকালী ভট্টাচার্য। কোষ্ঠ সাফ করতে এর জুড়ি নেই।
বাত ও পিত্তের ধাতে খুব ভাল ফলদায়ক এই পালং। আর সংস্কৃতে মেথিকা বা মেথি হল স্নিগ্ধ, পাচক এবং বলকারী ভেষজ। অগ্নিমান্দ্যে, অজীর্ণে ও বাতরোগে মেথির প্রয়োগ বহু যুগ আগে থেকেই।
তবে মেথি বেদোক্ত ভেষজ নয় বলে এর আভিজাত্য কিছুটা খন্ডন করা হয়েছে যেন। তবে অত্রি সংহিতার ১৬ নং অধ্যায়ে শব্দটির বিন্যাস এরূপঃ
মেথ (মেধায়াং) +ইন্ । এই মেথ ধাতুর অর্থ গতি, মেধাকর এবং পশুবন্ধন কাষ্ঠ। এটি স্বাদে তিক্ত ও কটুরস সম্পন্ন।
তাই ফেলতেও পারিনা, গিলতেই হবে কিন্তু মাথাতেও রাখতে হবে।
সংগৃহীত

No comments:

Post a Comment