মেয়েটা আমাদেরই এক বিদেশী বান্ধবীর বিদেশী বান্ধবী। ঢাকার একটি বিদেশী ক্লাবে খেলা শেষ করে আমরা আড্ডা দিচ্ছি এমন সময় দেখা। আমাদের টেবিলে এসে বসল। কিছুক্ষণ গল্প করার পর বলল তার শরীরটা ভাল লাগছে না। সে উঠে চলে গেল। মেয়েটা চলে যাবার পর আমার বান্ধবীটি আমার দিকে অর্থপূর্ণ চোখে তাকিয়ে মৃদু হেসে বলল কিছু বুঝলে? মেয়েটিকে আমি আগেও দেখেছি। এবার দেখে আরো প্রণবন্ত, শারীরিকভাবে পরিপুষ্ট মনে হল। আন্দাজেই ঢিল ছুঁড়লাম, বললাম খুশির খবর আছে নাকি? ঢিলে কাজ হল, আমার বান্ধবীটি হাসি কান পর্যন্ত নিয়ে বলল তুমি স্মার্ট আছ, ও কিন্তু মা হবে। মনে মনে আমি তো আকাশ থেকে পড়লাম। মেয়েটি বেশ সুন্দরী। ইউরোপিয় হলেও চেহারাটা অনেকটা ভারতীয় দেবীদের মত। সে একা, তার কোন ছেলে বন্ধু নেই বলেই জনতাম। বাংলাদেশেও ছেলেদের সাথে তার তেমন কোন ঘনিষ্টতা দেখিনি। এর মধ্যে সে নিজের দেশেও যায়নি। নিজের বিস্ময় চেপে আমি প্রশ্ন করলাম কিভাবে হল? আমার বান্ধবীটি বলল গত ঈদের সময় দুই সপ্তাহের জন্য ভারতে গেল না? সেখানেই পেয়েছে তার সন্তানের বাবাকে। আমি বললাম খুশির খবর, পার্টি কবে? বান্ধবীটি বলল ধুর পার্টি ফার্টি হবে না, ওদের বিচ্ছেদ হয়ে গেছে। ছেলেটাকে ভুল নম্বর আর ঠিকানা দিয়ে এসেছে। ও শুধু বাচ্চাটাই চেয়েছিল একজন প্রিন্সের মত দেখতে পুরুষের কাছ থেকে।
একজন প্রিন্সের মত দেখতে পুরুষের কাছ থেকে শুধু বাচ্চাটা নেব, আর কিছু নেব না এবং আর কোন বন্ধন, নিয়ম কানুন, পুরুষের নিকটস্থ হওয়া, তাদের চাহিদা পুরণ করা, তাদের সহযোগীতা করা, তাদের সাথে বাস করা, তাদের সাথে প্রেম ভালবাসার চিন্তা করা এসব অসহ্য - এই মানসিকতার মেয়েদের আগে খুব একটা প্রকাশ্যে দেখা না গেলেও এখন আমরা অনেক দেখি। মিডিয়া জগতের ফিমেল স্টারদের থেকে শুরু করে সফল নারী প্রফেশনাল এমনকি মধ্যবিত্ত সমাজে কোন উপার্জন করে না এমন মেয়েদের মধ্যেও অনেকে আছে এই মানসিকতার। নিজেকে আকর্ষণীয় এবং যৌন আকর্ষনীয় ভাবে উপস্থাপিত করা, প্রেম ভালবাসায় নিজেকে আবেগগতভাবে সংযুক্ত না করা, এবং এক সময় প্রিন্সের মত পুরুষের সাথে সন্তানের আকাঙ্ক্ষা কিন্তু পুরুষটিকে ত্যাগ করা, এই হল মোটামুটিভাবে এই মানসিকতার নারীদের মনের কামনা।
পুরুষকে প্রলুব্ধ করার ক্ষমতা থাকা, সমাজ সংসার ও দাম্পত্য জীবনের নিয়ম কানুন ও দায়িত্ব অপছন্দ করা কিন্তু শিশু চাওয়া - এই মনস্তাত্বিক আর্কিটাইপটাই হল লিলিথের আর্কিটাইপ, হারিয়ে যাওয়া ইব্রাহামীয় মিথে আদমের সঙ্গী হিসাবে যে নারীকে প্রথম সৃষ্টি করা হয়েছিল বলে মনে করা হয়। আদমের পাঁজরের হাড় থেকে তৈরি করে তার স্ত্রী হতে গেলে আদমের অধীনস্ত হবার নির্দেশ সে অস্বীকার করে। কোন কোন বিশ্লেষক কতৃক এটাও দাবি করা হয় যে আদমের অধীনস্ত হবার নির্দেশ সে অমান্য করলে তাকে স্বর্গ থেকে বিতাড়ণ করা হয়। তখন আদমের সঙ্গী হিসাবে ইভকে সৃষ্টি করা হয়। কিন্তু পরবর্তীতে সর্প হিসাবে লিলিথ স্বর্গে পুনরায় প্রবেশ করে এবং ইভ ও আদমকে প্রলুব্ধ করে যেন তারা জ্ঞনবৃক্ষের ফল খায়। এই ফল খেলে তাদের মধ্যে যৌন আগ্রহ জন্ম নেবে, তারা যৌন সঙ্গম করবে ও শিশু জন্ম নেবে। ঐ শিশুটি সে চুরি করবে এটাই ছিল তার প্রাণের ইচ্ছা।
কোলাজের ডানের ছবিটি ব্রিটিশ মিউজিয়ামে রাখা দ্য বার্নি রিলিফের যেটি হল একটি মেসোপটেমিয়ান পোড়ামাটির ফলক যা ওল্ড-ব্যাবিলনীয় সময়ে খৃষ্টপূর্ব ১৯-১৮ শতকের বা অর্থাৎ প্রায় চার হাজার বছর আগের। এই রিলিফটি একটি ডানাওয়ালা নগ্ন নারীর যার পা পাখির থাবার মত। যার সাথে আছে দুটো পেঁচা। ঐ সময়ে বায়ুকে ধরা হত মন্দ এবং পেঁচাকে মনে করা হত অশুভ। পেঁচা রাতে বিচরণ করে, মন্দ বাতাস তৈরি করে, এবং প্রাণীদের শাবক চুরি করে। লিলিতু নামক সুমেরীয় নারী রাক্ষসের বিবরণটা তখন এমনই ছিল।
মনোবিদ্যায় বেশ কিছু ব্যক্তিত্বের সমস্যা (পার্সোনালিটি ডিসঅর্ডার) আছে যেগুলোতে মানুষ অন্য মানুষের সাথে বাস করতে, সম্পর্ক তৈরি করতেে, পরিণত মানুষের মত দায়িত্ব নিতে চরম অস্বস্তি বোধ করে। সামাজিক বা পারিবারিক নিয়ম কানুন মানা, শর্ত রক্ষা করা, আদর্শ বজায় রাখা বা অন্যের অধিকার রক্ষায় ছাড় দেওয়াকে তারা একেবারেই মেনে নিতে পারে না। এক কথায় পরিণত মানুষদেরই তারা অপছন্দ করে কারন পরিণত মানুষ পারস্পরিক বিনিময়ের সম্পর্ক আকাঙ্ক্ষা করে। কিন্তু শিশুদের তারা পছন্দ করে এক গভীর প্রজনন আবেগ থেকে, আর দুই শিশুদের মন মত নিয়ন্ত্রণ করা যায়। শিশুদের সাথে সম্পর্ক পারস্পরিক বিনিময়ের সম্পর্ক নয়। তাদের আদর আর খাবার দিয়ে খুশি রাখলেই তারা ভালবাসে।
No comments:
Post a Comment