ইহুদি, খ্রিস্টান এবং ইসলাম ধর্মে সৃষ্টিকর্তার ধারণার মধ্যে যেমন গভীর ঐতিহাসিক ও আধ্যাত্মিক মিল রয়েছে, তেমনি তাদের মধ্যে মৌলিক ধর্মতাত্ত্বিক ও উৎসগত অমিলও বিদ্যমান।
মৌলিক মিলসমূহ:
* একেশ্বরবাদ (Monotheism): তিনটি ধর্মই বিশ্বাস করে যে মহাবিশ্বের সৃষ্টিকর্তা একজনই। যদিও প্রাথমিক ইসরায়েলি ধর্ম 'হেনোথেস্টিক' (অনেক দেবতার মধ্যে একজনকে প্রধান মানা) ছিল, তবে পরবর্তীতে তা কঠোর একেশ্বরবাদে রূপ নেয় । অন্যদিকে, ইসলামে 'তৌহিদ' বা আল্লাহর একত্ববাদ হলো ধর্মের মূল ভিত্তি।
* ইব্রাহিমীয় ঐতিহ্য (Abrahamic Tradition): তিনটি ধর্মই নিজেদের ইব্রাহিমের (আ.) ঐতিহ্যের অংশ বলে দাবি করে এবং তাঁকে বিশ্বাসের আদি পিতা মনে করে। কুরআন অনুসারে, আল্লাহ হলেন সেই একই ঈশ্বর যাকে ইব্রাহিম, মুসা এবং ঈসা (আ.) উপাসনা করতেন। যদিও অন্য ধর্মীয় টেক্সটের এ বিষয়ে একমত পোষণের সুযোগ নেই!
* সৃষ্টিকর্তার গুণাবলী: তিনটি ধর্মেই সৃষ্টিকর্তাকে সর্বশক্তিমান, সর্বজ্ঞ, ন্যায়বিচারক, দয়ালু এবং মহাবিশ্বের রক্ষাকর্তা হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে । তারা বিশ্বাস করে যে ঈশ্বর মানুষের কর্মকাণ্ড এবং ইতিহাসের সাথে সরাসরি যুক্ত।
* রহস্যময় ও অতীন্দ্রিয় সত্তা (Mysticism): ক্যারেন আর্মস্ট্রং-এর মতে, তিনটি ধর্মেরই মরমী বা রহস্যবাদী ধারায় (যেমন: ইহুদিদের কাবালাহ, ইসলামের সূফীবাদ এবং খ্রিস্টধর্মের হেসিকাসম) সৃষ্টিকর্তাকে মানুষের বুদ্ধির অতীত এক সত্তা হিসেবে দেখা হয়। এই ধারার সাধকরা সৃষ্টিকর্তাকে অনেক সময় 'শূন্যতা' (Nothingness) বা 'অস্তিত্বহীন' বলে অভিহিত করেছেন, কারণ তাঁর অস্তিত্ব মানুষের পরিচিত কোনো অস্তিত্বের মতো নয়।
মৌলিক অমিলসমূহ:
* সত্তাগত প্রকৃতি (Trinity vs. Absolute Unity):
খ্রিস্টধর্ম সৃষ্টিকর্তাকে ত্রিত্ববাদী (Trinity) হিসেবে দেখা হয়—পিতা, পুত্র এবং পবিত্র আত্মা; যেখানে তাঁরা তিনজনেই এক এবং অভিন্ন সত্তা।
ইসলাম ও ইহুদি ধর্মে এই ধারণাটিকে তারা কঠোরভাবে প্রত্যাখ্যান করে । ইসলাম আল্লাহকে সম্পূর্ণ অংশীদারহীন এবং একক সত্তা হিসেবে উপস্থাপন করে, যিনি কাউকে জন্ম দেননি এবং জন্ম নেননি । ইহুদি ধর্মেও সৃষ্টিকর্তার একত্ববাদ অত্যন্ত কঠোর।
* দেহধারণ বা অবতার (Incarnation):
খ্রিস্টধর্মে বিশ্বাস করা হয় যে সৃষ্টিকর্তা যীশুর রূপ ধারণ করে মানব ইতিহাসে প্রবেশ করেছেন (Incarnation)।
ইসলাম ও ইহুদি ধর্মেই সৃষ্টিকর্তার মানুষ রূপ ধারণ করাকে ধর্মবিরোধী বা ব্লাসফেমি মনে করা হয়। ইসলাম মনে করে আল্লাহ কোনো সসীম দেহে সীমাবদ্ধ হতে পারেন না এবং তিনি সম্পূর্ণভাবে অতীন্দ্রিয় (Transcendent)।
* ঐতিহাসিক ও ভাষাগত উৎস:
ড. নীল হ্যামসনের মতে, ইসলামিক 'আল্লাহ' এবং হিব্রু বাইবেলের 'ঈশ্বর' ঐতিহাসিকভাবে এক নন । ভাষাগতভাবে 'আল্লাহ' শব্দটি সেমেটিক মূল শব্দ 'ইলা' থেকে এসেছে যা একটি সাধারণ উপাধি, কোনো নির্দিষ্ট নাম নয়। হিব্রু বাইবেলের ঈশ্বর 'ইয়াহওয়েহ' (Yahweh) প্রাচীন ইসরায়েলি 'ঐশ্বরিক পরিষদ' থেকে বিবর্তিত হয়ে এসেছেন, যার সাথে আল্লাহর কোনো সরাসরি ঐতিহাসিক সংযোগ পাওয়া যায় না । ড. হ্যামসনের মতে, কুরআন আল্লাহকে ইব্রাহিমের ঈশ্বর হিসেবে উপস্থাপন করেছে যা একটি পরবর্তী সময়ের ধর্মতাত্ত্বিক প্রক্ষেপণ (projection)।
* সৃষ্টিকর্তার সাথে মানুষের সম্পর্ক:
ইহুদি ও ইসলাম এই দুই ধর্মে সৃষ্টিকর্তার সাথে সম্পর্কের প্রধান মাধ্যম হলো তাঁর দেওয়া আইন বা শরীয়াহ (Law) পালন করা ।
খ্রিস্টধর্মে সৃষ্টিকর্তার সাথে সম্পর্কটি মূলত প্রেম (Love) এবং পরিত্রাণের ওপর ভিত্তি করে গড়ে উঠেছে। যীশুর আত্মত্যাগের মাধ্যমে মানুষ সৃষ্টিকর্তার সান্নিধ্য লাভ করে বলে তারা বিশ্বাস করে।
সংক্ষেপে বললে, ইহুদি ধর্ম সৃষ্টিকর্তাকে একজন 'আইনদাতা', খ্রিস্টধর্ম তাঁকে 'প্রেমময় পিতা' এবং ইসলাম তাঁকে 'একক ও অপ্রতিদ্বন্দ্বী অধিপতি' হিসেবে চেনে । যদিও তারা সবাই একই উৎস থেকে আসার দাবি করে, তবে সময়ের বিবর্তনে তাদের ধর্মতাত্ত্বিক ও সত্তাগত পরিচয় সম্পূর্ণ ভিন্ন রূপ নিয়েছে ।
এই আলাপ তোলার কারণ হচ্ছে, সৃষ্টিকর্তার ধারণাই আসলে কিছুটা বুঝতে দেয়, কিভাবে ধর্মগুলোর সৃষ্টি। আমার দৃঢ় ধারণা জন্মেছে যে, ইহুদি ধর্ম থেকে খৃষ্ট ধর্ম আলাদা হবার পথেই একদল ধর্মগুরু মধ্য পন্থা হিসাবে আলাদা সেক্টের জন্ম দেয়। এই সেক্টের জন্ম মোটা দাগে নেইসিয়া কাউন্সিলের পরে, যা ৩২৫ খৃষ্টাব্দে অনুষ্ঠিত হয়েছিল, এই সেক্টটাই পরে প্রাথমিক ইসলাম হিসেবে রূপ নেয়। এরপর আব্বাসীরা যাকে ইরানিয়ান বানায়। উসমানীরা তাদের মত করার চেষ্টা করে। অবশেষে আমাদের কপালে জুটেছে, ওয়াহাবি ভার্সন, সবচেয়ে খারাপটা।
No comments:
Post a Comment