Sunday, October 25, 2026

প্রজ্ঞা

 



কেবল জ্ঞান অর্জন করলে হয় না। জ্ঞানকে পরিচালনার জন্য প্রজ্ঞা অর্জন করতে হয়। কথাটা আমার আব্বা তাঁর ভাষায় আমাকে সহজ করে বলতেন এভাবে, “এক মণ এলেম পরিচালনার জন্য দশ মণ হেলেম প্রয়োজন হয়।” আবার কখনো কখনো বলতেন, ‘এক জাহাজ এলেমের জন্য দশ জাহাজ হেলেম দরকার।” ‘এলেম’ অর্থ জ্ঞান, আর ‘হেলেম’ অর্থ প্রজ্ঞা।

জ্ঞান হচ্ছে কোনো বিষয় সম্পর্কে জানা এবং তা মনে রাখা। বই পড়া, গবেষণা বা তথ্য মুখস্থ করার মাধ্যমে জ্ঞান অর্জন করা যায়। জ্ঞান হলো তথ্য-উপাত্তের ভান্ডার। যেমন—প্রফেসর সলিমুল্লাহ খান একজন জ্ঞানী।
অপরদিকে, প্রজ্ঞা হলো অর্জিত জ্ঞানকে হৃদয়ঙ্গম করে বাস্তব অভিজ্ঞতা, ভালো-মন্দের বিচার ও দূরদর্শিতা দিয়ে সঠিক সময়ে সঠিক কাজে প্রয়োগ করার ক্ষমতা। যেমন—রবীন্দ্রনাথ একজন প্রজ্ঞাবান বা প্রজ্ঞানী। লালন সাঁই, শাহ আবদুল করিম, রাধারমণ দত্ত প্রজ্ঞাবান বা প্রজ্ঞানী।
ধর্মীয় জ্ঞান হচ্ছে আদেশ-উপদেশে, বিধি-নিষেধের কিছু তথ্য। যাকে বলা হয় ‘শরিয়ত’। এটা জ্ঞান। এই জ্ঞানকে পরিচালনার জন্য দরকার হয় মারফতের। অর্থাৎ আধ্যাত্মিকতার। জ্ঞানকে পরিচালনা করতে শেখায় আধ্যাত্মিকতা। যে ধর্মীয় জ্ঞানীর কাছে কেবল শরিয়ত আছে, কিন্তু মারফত নেই, সে ভয়ংকর। বানরের হাতে ব্লেডের মতো। ব্লেড একটি জ্ঞান, একটি বিজ্ঞান। সেই ব্লেড পরিচালনার ক্ষমতা বানরের নেই। তাই সে সেই ব্লেড দিয়ে নিজের শরীর র-ক্তা-ক্ত করতে থাকে।
বাংলাদেশে সাম্প্রতিক কালে কিছু ধর্মজ্ঞানী গজিয়েছে। যেমন—হাফেজ জুবায়ের আহমাদ তাশরীফ, মাওলানা রফিকুল ইসলাম মাদানি, তিন ইঞ্চি হুজুর, শিশু বক্তা প্রমুখ। এরকম আরও আছে। সংখ্যায় তারা বিস্তর। গুনে শেষ করা যাবে না। এরা কিছু ধর্মীয় জ্ঞান অর্জন করেছে, ধর্মীয় তথ্য মুখস্থ করেছে। কিন্তু সেই জ্ঞান কোথায় এবং কীভাবে কাজে লাগাতে হবে, সেই প্রজ্ঞা তারা অর্জন করেনি।
যার ফলে এরা হয়ে উঠেছে ভয়ংকর। ব্লেডধারী বানরের মতো ভয়ংকর। এরা ওয়াজ মাহফিলে সাধারণ মানুষকে উসকে দিচ্ছে, মানুষকে অসহিষ্ণু করে তুলছে। ফেসবুক লাইভে এসে সাম্প্রদায়িক উসকানিমূলক কথা বলছে, মানুষকে হ-ত্যা-র হুমকি দিচ্ছে; যত প্রকারের ধর্মসন্ত্রাস আছে, সব তারা করে বেড়াচ্ছে। কেন তারা এমন করছে? কারণ একটাই—তারা প্রজ্ঞা অর্জন করেনি। অর্থাৎ ‘হেলেম’ অর্জন করেনি।
এই কারণে ভারতবর্ষের সুফিগণ বলতেন, কেবল শরিয়ত শিখে কেউ আলেম (ধর্মীয় জ্ঞানী) হতে পারে না। শরিয়তের সঙ্গে মারফতের সংমিশ্রণ থাকতে হবে। সেই আলেমকে একজন মুর্শিদ বা গুরুর শরণাপন্ন হতে হবে। মুর্শিদ বা গুরুই তাকে মারফতের সবক দেবেন। অর্থাৎ প্রজ্ঞার প্রশিক্ষণ দেবেন, প্রজ্ঞার পথে পরিচালিত করবেন।
একটু আগে সংসদ সদস্য মুক্তিযোদ্ধা অ্যাডভোকেট ফজলুর রহমানের একটা বক্তব্য শুনছিলাম। তিনি বলছেন, “যে সমাজে শুধু শিক্ষা আছে, সার্টিফিকেটধারী শিক্ষা—সেই সমাজ কোনো সমাজ না এবং সেই শিক্ষা যারা ধারণ করে, তারা প্রকৃত মানুষও হয় না। প্রকৃত মানুষ তখনই হয়, যখন শিক্ষার সঙ্গে সাহিত্য ও সংস্কৃতি যুক্ত হয়। তখনই একটা সমাজ সভ্য হয়। সভ্যতা অর্জন করতে গেলে সমাজের জন্য সাহিত্য ও সংস্কৃতি লাগবেই—এটার কোনো বিকল্প নাই।”
কী চমৎকার বলেছেন তিনি! নোট-গাইড পড়ে সার্টিফিকেট অর্জন শিক্ষা। সার্টিফিকেটধারী ব্যক্তিটি জ্ঞানী। কিন্তু এই জ্ঞানকে পরিচালনার জন্য তার দরকার সাহিত্য ও সংস্কৃতি। সাহিত্য ও সংস্কৃতি সেই জ্ঞানীকে প্রজ্ঞাবান করে তুলবে, প্রজ্ঞার পথে পরিচালিত করবে। সাহিত্য ও সংস্কৃতিহীন জ্ঞান নিস্ফলা বৃক্ষ। এই জ্ঞান কখনো কখনো ভয়ংকর। এতটাই যে, গোটা একটা সভ্যতাকে, একটা জাতিকে, একটা রাষ্ট্রকে ধ্বংস করে দিতে পারে।
.Swakrito Noman

No comments:

Post a Comment