উনিশশো চল্লিশ সাল । সময়টা অশ্বিনের শুরু । শিউলির গন্ধ নিয়ে জেগে ওঠে ভোর । কাশের বনে হওয়ার দোলায় মায়ের আসার সুর দোলে এদিক থেকে ওদিক ।
তখন কোনো একদিন দত্তবাড়ির উঠোনে ...
রসময়ী ফাটানো নারকেল গুলো ঝুড়িতে করে নিয়ে কুঁয়োর পাশের বাঁধানো চাতালে গিয়ে রাখেন । তারপর নিরামিষ হেঁশেল থেকে বড় কুড়ুনী নিয়ে এসে জল ভরা বালতির পাশে রেখে ঘটি করে জল তুলে ধুয়ে নেন সেটি । নারকেল গুলির বাইরের গা ভালো করে ধুয়ে নেন । তারপর সব একসাথে নিয়ে ঠাকুর ঘরের সামনের দাওয়ার উপরে গিয়ে রাখেন ।
এখন থেকে নাড়ু বানানোর প্রস্তুতি নিতে হবে । মুড়কি মোয়া বানিয়ে রাখতে হবে । লক্ষ্মী পুজোর তো দেরি নেই । মহালয়া পেরিয়ে গেল । এবারে সব ধরনের শুকনো প্রাসাদ নিষ্ঠা ভরে শুচিতা মেনে বানিয়ে কৌটো গুলো ভরে রেখে দিতেই তো কয়েকটা দিন লেগে যাবে । তিনি ছাড়া আর কে করবে এই সব ভারি কাজ ! তিনিই তো আছেন একমাত্র বিনি পয়সার দাসী । চারপাশে গঙ্গা জলের ছিঁটে দিয়ে শুদ্ধ করে নেন রসময়ী । তারপর কপালে করাঘাত করে বাড়ির মহিলাদের কথা ভাবতে ভাবতে আর মনে মনে তাঁদের গালি দিয়ে মুণ্ডুপাত করতে করতে কাজ শুরু করেন।
বাড়ির বড় বৌ লক্ষ্মীপ্রিয়া দেবী তো সারাদিন এই আতংকেই মরলো যে বাড়ির ছোটরা কেউ খাওয়া দাওয়া করছে না । সবাই শুকিয়ে না খেয়ে খেয়ে মারা পড়বে যে কোন মুহূর্তে । তাই সে দুধ জ্বাল দেয় আর গ্লাস নিয়ে ছোটে সবার পিছনে । তাকে দেখলেই যারা দুধ পছন্দ করে না সেই ছেলে পিলের দল আস্তাকুঁড়ের পিছনে গিয়ে লুকিয়ে থাকে । বড় বৌ ঠাকুর দেবতার চেয়ে যত্র শিশু তত্ৰ শিব জাতীয় স্বরচিত ধারণায় বিশ্বাসী । লক্ষ্মী পুজো নিয়ে তাঁর অত মাথাব্যথা নেই । পারলে পুজো হওয়ার আগেই সবাইকে ডেকে সব নাড়ু মোয়া তোক্তি বিলিয়ে দিতে পারলে তিনি অন্তর থেকে সুখী হন ।
বাড়ির মেজ বৌ হরিমতি দেবী আয়না নিয়েই ব্যস্ত । বাড়ির অল্প বয়সী বৌ ঝিরা তার কাছ থেকে ঘরোয়া সব রূপচর্চা পদ্ধতির হদিশ জেনে নেয় । একবার ছাগলের দুধের সর যোগাড় করতে গিয়ে অন্যের ছাগল বেঁধে রেখে দুধ দুইয়ে নিতে গিয়ে প্রায় থানা পুলিশ হওয়ার পরিস্থিতি হয়েছিল । বড়ভাই ছাগলের রগচটা মালিককে ছাগলটির দ্বিগুন দাম দিয়ে সে যাত্রা বাড়ির সম্মান বাঁচান । হরিমতির সময় নেই তাঁর রূপচর্চার ব্যাঘাত ঘটিয়ে লক্ষ্মী পুজোর নাড়ু বানানোর । হরি বা হরি প্রিয়া কারোর উপরেই তার টান নেই যতটা টান আছে তার রূপটানে ।
ছোটগিন্নি উদাসী বালা দেবী । তিনি বড়ো দুই জায়ের কর্মব্যস্ততা দেখে আমিষ হেঁসেলের পুরো দায়িত্ব নিয়ে সগর্বে বাড়ির প্রকৃত গিন্নি হয়ে বসেছে । সংসারের সব দিকে তাঁর সজাগ দৃষ্টি । কী বাজার হবে কী বাজার এলো ভাঁড়ারে কোথায় কী থাকে এবং প্রতিদিন কোন জিনিস কতটা লাগবে তার সমস্ত হিসাব থাকে তাঁর কাছে । স্নেহশীল বড়ো ভাসুর তাঁকে নিজের মায়ের মতো মানেন । ছোট বৌ এর কথাই সংসারে শেষ কথা । উদাসীবালা আর যাইহোক সাংসারিক কোনো বিষয়ে উদাসী নন । এই বৌ টির উপর বাল্য বিধবা ননদ রসময়ীর সবচেয়ে রাগ । এ না আসা পর্যন্ত দাদাদের সংসারে সেই ছিল সর্বেসর্বা । এখন শুধু ঠাকুরঘর এবং পুজোর যাবতীয় কার্যকলাপের দায়িত্বে নিয়োজিত হয়েছেন রসময়ী । সেটাও ছোট বৌয়ের মর্জিতে ।
পুজোর জন্য রাঁধা বাড়ার সময় নিরামিষ হেঁশেলের সব দায়িত্ব তিনি নিজের মাথায় তুলে নেন। কি এক অজানা কারণে উদাসীবালা এই ব্যাপারে বাড়াবাড়ি ধরনের উদাসীন থাকেন । ভাগ্যিস । তাই এই পুজো পার্বণের সময়টাতে মনের আনন্দে গিন্নীপনা করে নেন রসময়ী ।
সে প্রায় তিরিশ বছর আগে ... অল্প বয়সে বিয়ে হয়েছিল তাঁর । বিয়ের পর বাপের বাড়িতেই ছিলেন । তখন বাবা মা বাঁচা । তিনি ছিলেন পাঁচ মেয়ের সবচেয়ে ছোট আর বাপ সোহাগী । বাড়ির অবস্থা চিরদিনই স্বচ্ছল তাই তিনি বাপের কাছেই থাকতেন । বাকি দিদিরা বিয়ে হয়ে শ্বশুর বাড়িতে । ভাইদের বিয়ে হয়নি তখনো ।
কয়েক বছর বাদে একদিন ভোরে উঠে মায়ের আছাড়ি পিছাড়ি কান্না দেখে জানতে পারলেন সেই একদিন মাঝরাতে ঘুমন্ত অবস্থায় যাঁর সাথে তাঁর বিয়ে হয়েছিল সে মারা গেছে কলেরা হয়ে। তাঁর কোনো অনুভূতি হয়নি স্বাভাবিক ভাবেই ।শুধু রং মোছা জীবনটা শাস্তি বলে মনে হয়েছিল । একটা ঘরে লুকিয়ে তাঁকে ভালো ভালো ফল আর মিষ্টি বেছে বেছে খাওয়াতেন তাঁর মা । দূর থেকে মাছ ভাজার গন্ধ নাকে আসলে ঢোঁক গিলে লোভ সংবরন করতে হতো কিশোরী মেয়েটিকে । একদিন লুকিয়ে একটা মাছ খেয়ে ধরা পড়ে যান নিজের মায়ের কাছে । সেদিন জেনেছিলেন অনন্ত নরকবাস নাচছে তাঁর মৃত্যু পরবর্তী বিদেহী আত্মার কপালে । একটুও ভয় লাগেনি তাঁর । এই ভাবে জাগতিক সমস্ত সুখ থেকে বঞ্চিত হয়ে বাঁচাটাই তো নরকবাস । নতুন করে কোনো নারকীয় কষ্ট পাবে না তাঁর আত্মা । মানুষের বানানো নির্মম নিয়ম নামক অত্যাচারের শিকার সে, যমদূতের ক্ষমতা কী তাকে শাস্তি দেওয়ার।
........
উনিশশো ষাট সাল । দেশ স্বাধীন হয়ে গেছে । সমাজ ব্যবস্থায় বেশ কিছু পরিবর্তন এসেছে । মেয়েরা লেখাপড়া শিখছে । অর্থনৈতিক স্বাধীনতা সঠিক বয়সে বিয়ে কম সন্তান ইত্যাদি ধারণা গুলো মেয়েদের অনেকের মাথায় শুভ বুদ্ধি হিসেবে গেঁথে বসেছে ।
দত্ত বাড়িতেও অনেক পরিবর্তন এসেছে । রসময়ীর বড়ো ভাই সপরিবারে অন্য বাড়ি কিনে পাশের পাড়ায় উঠে গেছে । তাঁর দুই ছেলের বৌ এসেছে । তারা গুছিয়ে সংসার করছে ।
মেজ ভাই দোতলায় উঠে গিয়ে হাঁড়ি আলাদা করে নিয়েছে । তাঁর বৌমা সংসারী ও কর্মঠ হওয়ায় তার সংসার চলে সঠিক নিয়মে ।
রসময়ীর চিরদিন ছোট ভাইয়ের উপর বেশি টান । ছোটভাই ও তাঁকে মায়ের মতই সম্মান ও যত্ন করে নিজের কাছে রেখে দিয়েছেন । যেহেতু এই বয়সেও রসময়ী যথেষ্ট কর্মসক্ষম তাই তাঁকে নিজের কাছে রাখতে চেয়েছেন সবাই । রসময়ী মনে মনে হাসেন । অন্যের সংসারকে জোর করে নিজের ভেবে গতর খাটিয়ে টিকে থাকার মন্ত্র আউড়িয়ে কেটে গেল জীবনের এত গুলো বছর । তাঁর ভাগ্যে ভগবান নিজের জন বলে কিছুই লেখেন নি । একসময় খুব কষ্ট হতো এখন এই প্রৌঢ়া অবস্থায় শেষের দিনের জন্য অপেক্ষা করা ছাড়া আর কোনো মূল্যবান কাজ তাঁর নেই । এটাও তো একধরনের সুখ । কোনো আপন নেই কোনো চিন্তাও নেই ।
উদাসীবালা আঘাত পেলেন ছোট ছেলে জয়ন্তর আচরণে । জয়ন্ত একদিন ছুটির দুপুরে সবার সামনে জানিয়ে দিল তার একজন বাগদত্তা আছে । সে স্কুলের শিক্ষিকা । তাঁকে সে পরের রবিবার বাড়িতে আনতে চায় । উদাসীবালা আগে চটলেন তারপর চেঁচালেন ও সব শেষে কাঁদলেন আত্মহ ত্যার হুমকি দিলেন কিন্তু জয়ন্ত যে কথা দিয়েছে তার নড়চড় করা তার পক্ষে অসম্ভব ।
একদিন মন্দিরে বিয়ে সেরে সোজা বৌ নিয়ে বাড়ি ফিরলো জেদী ছেলেটি । উদাসীবালা ঠাকুরঘরে ঢুকে বুঝলেন এটাই এখন তাঁর সম্মান বাঁচানোর এক মাত্র রাস্তা । শাশুড়ির এহেন আচরণে বিব্রত হয়ে বাকি দুই পুত্রবধূ এসে রসময়ীর কাছে দরবার করে । এবার তাদের কি করনীয় ? ছোট ভাই এসে দরজার সামনে দাঁড়িয়ে একই প্রশ্ন করে । দীর্ঘ সময় বাদে আবার পরের ঘরে গিন্নিপনার স্বাদ পান রসময়ী । তিনি বলেন ঠাকুর ঘরে দোর দিয়েছে উদাসী । তাই তাঁর ঘরের প্রদীপ নিয়ে জ্বেলে একটা কুলোয় কলার ছড়া রেখে কড়ি ধান দুর্বা ইত্যাদি মঙ্গলময় জিনিস সাজিয়ে নিয়ে দুই বৌ গিয়ে বরণ করুক নতুন বউকে । নতুন কাপড় বিছিয়ে রেখে তার ওপর দুধ আলতা গোলা থালায় পা দিয়ে ঘরে ঢুকবে লক্ষ্মী । উনানে ঘুঁটে দিয়ে আগুন জ্বেলে দুধের পাতিল বসাক রান্নার বৌ । শাঁখ বাজুক উলু দিক মেয়েরা । দোতলা থেকে সবাইকে ডাকা হোক । বিধি নিয়মের কোনো ত্রুটি না দেখে পরের ঘরের মেয়ে ।
সবই হলো । কিন্তু নতুন বৌ বাড়ি ঢুকবে না জানিয়ে দিল । তার একটা শর্ত আছে । তাতে যে জয়ন্তর সায় আছে সেটাও পরিষ্কার বোঝা গেল । বৌরা আবার ছুটলো পিসি শাশুড়ির কাছে । রসময়ী অবাক । এ মেয়ে বলে কি ! শ্বশুর বাড়ি ঢোকার আগেই শর্ত ! যাও তো বাছা জেনে এসো শর্তখানা কি ।
সব শুনে তো দুই বৌ চোখ কপালে তুলে দাঁড়িয়ে থাকে । এ কি অলুক্ষুণে কথা ! রসময়ী শোনেন নতুন বৌ বলেছে সবার চেয়ে বড়ো বলে তাঁকেই বধূ বরণ করতে হবে এটাই একমাত্র দাবি লিপিকা মানে নতুন বৌয়ের ।
ধন্যি বৌ বটে । সব নিয়ম কানুনের পিণ্ডি চটকে রসময়ী কে নতুন থান পরিয়ে বধূ বরণে বাধ্য করলো নতুন বৌ । কে যেন ফিসফিস করে বলে যায় রসময়ীর কানে কানে . ওরে দিন বদলাচ্ছে ।
অনেক রাতে রসময়ীর পাশে শুয়ে লিপিকা জানায় ছোট থেকেই ছোট পিসিমাকে সব কিছু থেকে বঞ্চিত হতে দেখেছে জয়ন্ত । সেই সব গল্প শুনে শুনে লিপিকার মনে হয়েছে এই বার সমাজের এই সব জঘন্য রীতির শেষ ঘটাবে সে দত্তবাড়িতে । কাউকে তো এগিয়ে আসতে হবে আর সবার চোখে খারাপ হতে হবে ।
―“ বৌ এই ঘরে তো জোর করে শুলি কোনো অসুবিধা হচ্ছে না তো মা ?" জিজ্ঞাসা করেন রসময়ী । তার হৃদয় আজকে অধিকার পেয়ে ভিজে আছে আনন্দে । নতুন মেয়েটি নতুন করে একটু রং ঢেলেছে তাঁর জীবনে । কোনো বিবাহ বা সাধের অনুষ্ঠানে তাঁকে দরজা বন্ধ করে লুকিয়ে থাকতে হতো । অমঙ্গলের ভয়ে । আজ তিনি হাতে করে বরণ ডালা নিয়ে উলু দিয়ে চোখের জলে ভিজে বধূবরণের স্বপ্ন পূরণ করলেন ।
―“ অসুবিধা কেন হবে ছোট পিসিমা ? তোমার ঘরে যে ইতিহাস মাখা পুরাতন গন্ধ । ঠিক আমার ঠাকুর দাদার ঘরের মতো । সব গল্প শুনবো কিন্তু আর খুব জ্বালাবো তোমায় । আর হ্যাঁ আমার একটা অনুরোধ এই সাদা শাড়ি তুমি আর পরবে না । আমি সহ্য করতে পারছি না । কালকেই আমি শাড়ি কিনে আনব । না পরলে আমি শুনব না বলে দিলাম" কাছে সরে এসে বলে লিপিকা ।
জীবনে এই প্রথমবার সদ্য পরিচিত মেয়েটির মাথা বুকে চেপে ধরে একবুক নিঃশ্বাস নেন রসময়ী । তার জীবনের সব ক্ষোভ দুঃখ জ্বালা জুড়িয়ে দিতেই ভগবান এই মেয়েটিকে তার কাছে পাঠিয়েছেন ।
অমূল্য সম্পদের মতো শেষ বয়সে পাওয়া এই ভগবান বা ভাগ্য প্রদত্ত উপহারটিকে বুকের ভিতরে অতি যত্নে রাখবেন বাকি কটা দিন । তারপর দুহাতে আশীর্বাদ করে যাত্রী হবেন অনন্ত যাত্রায় । মনে মনে উপাস্য দেবতাদের অসংখ্য প্রণাম জানান রসময়ী ।।
Madhumita Sengupta

No comments:
Post a Comment