Saturday, October 24, 2026

'অসময়'

 


যে মেয়েটাকে আমি ক্লাস টেনে আপু বলে ডাকতাম, প্রায় এক যুগ পরে সে আমাকে জিজ্ঞেস করল, ‘তুই যদি তখন একটু বড় হতি, তাহলে কি আমার জীবনটা অন্যরকম হতো?’
বিকেলের দিকে মেঘগুলো যখন কেমন যেন পঁচা ডোবার নোংরা পানির মতো কালচে হয়ে আসত, আমাদের ক্লাসরুমের চারপাশটা তখন অদ্ভুত এক রকম নিঝুম হয়ে যেত। শের-ই-বাংলা রোডের ওই পুরোনো স্কুল বিল্ডিংটার তিনতলার শেষ মাথায় ছিল আমাদের ক্লাস নাইনের সেকশন এ। একদম পেছনের বেঞ্চটায় বসলে জানলা দিয়ে একটা বিশাল কৃষ্ণচূড়া গাছের মগডাল দেখা যেত। ডালটার পাতাগুলো বাতাসে কাঁপত, আর আমি খাতার পাতায় বীজগণিত মেলানোর বদলে তাকিয়ে থাকতাম সেই কম্পনের দিকে।
আমি আফিফ। খানিকটা লম্বা ছিপছিপে গড়ন, মাঝারি চুল, আর রেজাল্ট শিটের মাঝামাঝি কোথাও আটকে থাকা এক নিতান্ত সাধারণ কিশোর। আমাকে আলাদা করে চেনার কোনো উপায় ছিল না। শিক্ষকেরা রোল ডাকার সময় ছাড়া আমার অস্তিত্ব টের পেতেন না, আর ক্লাসের ডানপিটে ছেলেরা টিফিনের সময় মারামারি করার জন্য আমাকে কখনো গোণায় ধরত না। আমি ছিলাম সেই ব্যাকবেঞ্চার, যে পৃথিবীর সব কোলাহল থেকে নিজেকে গুটিয়ে নিয়ে একটা নিজস্ব কুয়াশার ভেতর বাস করত।
কিন্তু সেই কুয়াশা ভেদ করে একটা নাম প্রতিদিন আমার কানে এসে লাগত। নামটা বিপাশা।
বিপাশা আপু। ক্লাস টেন।
আমাদের চেয়ে ঠিক এক ক্লাস সিনিয়র। সে স্কুলের সবচেয়ে সুন্দরী মেয়ে ছিল কি না, তা নিয়ে বিতর্ক হতে পারে। কিন্তু তার একটা ব্যাপার ছিল, সে যখন করিডোর দিয়ে হেঁটে যেত, তখন কেন যেন মনে হতো দুপুরের কড়া রোদটা আচমকা নরম হয়ে বিকেলের মায়াবী আলোয় রূপ নিয়েছে। সে ডিবেট করত, স্কুল ম্যাগাজিনে তার কবিতা ছাপা হতো, আর বার্ষিক সাংস্কৃতিক প্রতিযোগিতায় রবীন্দ্রসংগীত গাওয়ার সময় পুরো অডিটোরিয়াম কেমন যেন পিনপতন নীরব হয়ে যেত। সবাই তার সাথে কথা বলতে চাইত, শিক্ষকেরাও তাকে আলাদা খাতির করতেন।
আমার জন্য সে ছিল আকাশের ওই চিলটার মতো, যে ডানা মেলে অনেক উঁচুতে উড়ে বেড়ায়, যার ছায়াটা মাটিতে পড়লেও তাকে ছোঁয়া যায় না। আমার তখন মনে হতো, ও আমার নাগালের মানুষ না। ও অন্য এক জগতের, যেখানে আমার মতো এক নিস্পৃহ ব্যাকবেঞ্চারের কোনো প্রবেশাধিকার নেই। আমি তাকে দূর থেকে দেখতাম, সিঁড়ি দিয়ে নামার সময়, কিংবা অ্যাসেম্বলিতে লাইনে দাঁড়ানোর সময়। সেটা প্রেম ছিল না, অন্তত তখন আমি তাকে প্রেম বলে চিনিনি। সেটা ছিল এক ধরনের মুগ্ধতা, একটা দূরত্বকে সমীহ করার তীব্র অনুভূতি।
দিনটা ছিল জুলাইয়ের কোনো এক বৃহস্পতিবার। ক্লাস শেষের ঘণ্টা পড়ার আগেই আকাশ ভেঙে বৃষ্টি নামল। শ্রাবণের সেই অবিরাম ধারায় স্কুলের মাঠটা দেখতে দেখতে কর্দমাক্ত একটা ডোবায় পরিণত হলো। ছুটির ঘণ্টা পড়ার সাথে সাথে সবাই হইহই করে ছাতা মাথায় দিয়ে কিংবা ভিজতে ভিজতে গেটের দিকে ছুটে গেল। কিন্তু আমার ব্যাগে ছাতা ছিল না। আমি বারান্দার একটা পিলারে পিঠ ঠেকিয়ে দাঁড়িয়ে রইলাম, ভাবছিলাম বৃষ্টিটা একটু কমলে সাইকেলটা নিয়ে রওনা দেব।
স্কুল বিল্ডিং দ্রুত ফাঁকা হয়ে আসছিল। বারান্দার টিনের চালে বৃষ্টির শব্দে তখন কান পাতা দায়। ঠিক তখনই সিঁড়ি দিয়ে নেমে এলো সে। কাঁধে একটা নীল রঙের স্কুলব্যাগ, হাতে একটা মাঝারি সাইজের কালো ছাতা। সে একা ছিল। করিডোর দিয়ে যাওয়ার সময় আমাকে এভাবে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে সে থমকে দাঁড়াল।
তার চোখের চশমাটায় তখন বৃষ্টির দু-একটা কণা জমে আছে। সে আমার দিকে তাকিয়ে ভ্রুকুটি করল, তারপর খুব স্বাভাবিক একটা দিদিগিরির গলায় বলল, “এই ছেলে, ছাতা আনিসনি?”
আমি একটু ঘাবড়ে গেলাম। আমতা আমতা করে বললাম, “না, আপু। মানে, সকালে তো রোদ ছিল…”
সে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল। তারপর ছাতাটা মেলে ধরে আমার দিকে এগিয়ে এসে বলল, “এদিকে আয়। ভিজে অসুস্থ হলে সামনে হাফ-ইয়ার্লি পরীক্ষা দিবি কীভাবে? আয়, মোড় পর্যন্ত এক ছাতায় চল।”
আমার বুকের ভেতর তখন যেন একটা পুরো হাইস্কুলের ঘণ্টা একসাথে বেজে উঠল। আমি খুব জড়োসড়ো হয়ে তার ছাতার নিচে গিয়ে দাঁড়ালাম। কনুইটা যাতে কোনোভাবে তার গায়ের সাথে না লাগে, সেজন্য আমি নিজেকে যতটা সম্ভব সংকুচিত করে নিয়েছিলাম।
আমরা হাঁটতে শুরু করলাম। চটচটে কাদার ওপর দিয়ে আমাদের জুতো জোড়া একই ছন্দে এগোচ্ছিল। বাতাসের ঝাপটায় বৃষ্টির ছাঁট এসে আমার ডান কাঁধটা ভিজিয়ে দিচ্ছিল, কিন্তু আমার শরীর তখন অন্য এক তাপে ফুটছিল। আমি আড়চোখে বিপাশার প্রোফাইলটা দেখলাম। তার চুল থেকে শ্যাম্পুর একটা হালকা গন্ধ আসছিল, আর বৃষ্টির পানির ফোঁটা তার গাল বেয়ে নিচে নেমে যাচ্ছিল।
সে বলল, “তুই তো ক্লাস নাইনের আফিফ, তাই না? ডিবেট ক্লাবের নোটিশ বোর্ডে তোর নাম দেখেছিলাম, নাম লিখিয়ে আর আসিসনি কেন?”
আমি অবাক হলাম। সে আমার নাম জানে! আমি নিচু গলায় বললাম, “ওখানে সবাই খুব ভালো ডিবেট করে। আমার...আমার অত সাহস নেই।”
অনন্যা একটু হাসল। সেই হাসিতে কোনো উপহাস ছিল না, ছিল এক অদ্ভুত প্রশ্রয়। সে বলল, “সাহস এমনি এমনি আসে না রে, আফিফ। সাহস তৈরি করে নিতে হয়। তুই একটু বেশি চুপচাপ, তাই না?”
আমি কোনো উত্তর দিতে পারিনি। শুধু মনে হয়েছিল, ওই সামান্য পাঁচ মিনিটের পথ যেন কখনো শেষ না হয়। শের-ই-বাংলা রোডের সেই কর্দমাক্ত পথ, মাথার ওপর একটা পুরোনো কালো ছাতা, আর পাশে ক্লাস টেনের বিপাশা আপু, একদম সাধারণ একটা বিকেল, যা প্রতিদিন হাজারটা মানুষের জীবনে ঘটে। কিন্তু চোদ্দ বছর বয়সের সেই কাঁচা মাথায় ঘটনাটা কেমন যেন চিরস্থায়ী এক আলপনা এঁকে দিল। আমি বাড়ি ফিরে সেদিন আর ভেজা জামা কাপড়টা বদলাইনি, শুধু জানলার পাশে বসে বিপাশার সেই মৃদু হাসির শব্দটা মনে করার চেষ্টা করছিলাম
সেই বৃষ্টির দিনের পর থেকে আমাদের পৃথিবীটা কেমন যেন একটু বদলে গেল। টিফিনের সময় আমি যখন একা একা লাইব্রেরির পেছনের বারান্দায় গিয়ে বসতাম, বিপাশা কখনো কখনো হাতে একটা টিফিন বক্স নিয়ে সেখানে এসে হাজির হতো।
“কী রে, আজকেও একা?” সে এসে বসত সিমেন্টের তৈরি বেঞ্চটায়।
আমি একটু অপ্রস্তুত হয়ে হাসতাম। সে নিজের ডালপুরি বা নুডলসের বাটিটা আমার দিকে এগিয়ে দিয়ে বলত, “নে, একটু খা। শুকিয়ে তো কাঠ হয়ে আছিস। পড়াশোনার কী খবর তোর? ম্যাথ স্যারের ক্লাসে নাকি তোকে রোজ দাঁড় করিয়ে রাখে?”
আমি লজ্জা পেতাম। কিন্তু বিপাশা সেটাকে বাড়তে দিত না। সে নিজেই আমার খাতা টেনে নিত। বীজগণিতের কঠিন কঠিন সূত্রগুলো সে এমন সহজ করে বুঝিয়ে দিত, যা ক্লাসের স্যাররা কখনোই পারতেন না। লাইব্রেরির সেই ঠান্ডা, ধুলোবালি আর পুরোনো বইয়ের গন্ধমাখা ঘরে বিপাশার গলার আওয়াজটা আমার কাছে কোনো অপার্থিব সুরের মতো শোনাত।
ধীরে ধীরে আমি বুঝতে পারলাম, আমার ভেতর একটা পরিবর্তন আসছে। আমি এখন আর শুধু কৃষ্ণচূড়ার ডালটার দিকে তাকিয়ে থাকি না। এখন আমি ঘড়ির কাঁটার দিকে তাকিয়ে থাকি, কখন টিফিনের সময় হবে, কখন স্কুল ছুটি হবে। করিডোরে তার গলার আওয়াজ পেলে আমার হাতের কলমটা থমকে যেত। এটা আর শুধু দূর থেকে দেখা বড় আপুর প্রতি শ্রদ্ধা ছিল না। এটা ছিল অন্য কিছু। একটা তীব্র, দমবন্ধকরা, গোপন অনুভূতি, যার কোনো নাম আমি তখনো জানতাম না।
কিন্তু সেই অনুভূতির সমান্তরালে একটা নির্মম সত্যও আমার মাথার ভেতর হাতুড়ি পেটাতো। সে আমার চেয়ে এক বছরের বড়। সে ক্লাস টেন, আমি ক্লাস নাইন। সে পরের বছরই এই স্কুল ছেড়ে চলে যাবে বড় কোনো কলেজে, আর আমি পড়ে থাকব এই চেনা ক্লাসরুমের শেষ বেঞ্চটায়।
একদিন স্কুল শেষের পর আমরা সাইকেল স্ট্যান্ডের পাশে দাঁড়িয়ে কথা বলছিলাম। রোদের তেজ তখন মরে এসেছে। বিপাশা কাধে ব্যাগটা ঝোলাতে ঝোলাতে আচমকা আমার দিকে তাকাল। তার চোখে তখন এক ধরনের গভীরতা, যা কিশোরী মেয়েদের হঠাৎ করেই বয়সের চেয়ে বড় করে তোলে।
সে বলল, “আফিফ, এদিকে আয় তো।"
আমি বাধ্য ছেলের মত তার দিকে এগিয়ে গেলাম।
"একটা কথা বলব?”
“বলো।”
“তুই যেভাবে আমার দিকে তাকিয়ে থাকিস না… আমার কেমন যেন লাগে। তুই এখন অনেক ছোট রে। সামনে তোর ফাইনাল পরীক্ষা। মন দিয়ে পড়াশোনা কর।” সে একটু থামল, তারপর ঠোঁটের কোণে সেই চেনা হাসিটা ফুটিয়ে বলল, “তুই আগে বড় হ। ভালো কোথাও চান্স পা। তারপর প্রেম করিস। এখন এসব ভেবে জীবনটা নষ্ট করিস না।”
সে কথাটা হেসে, খুব হালকা চালে বলেছিল। হয়তো একটা ছোট ভাইকে সামলানোর জন্য, কিংবা আমাকে একটা অদৃশ্য সীমারেখা মনে করিয়ে দেওয়ার জন্য। কিন্তু আমার চোদ্দ বছর বয়সের মন সেই লাইনটা খুব সিরিয়াসলি নিয়ে নিল। আমার মনে হলো, সে আমাকে রিজেক্ট করেনি, সে শুধু আমার বড় হওয়ার অপেক্ষা করতে বলেছে। আমার মনে হলো, অপরাধটা বিপাশার না, অপরাধটা আমার বয়সের। আমি কেন এক বছর আগে জন্মাইনি?
দেখতে দেখতে বছরটা কেটে গেল। বিপাশার টেস্ট পরীক্ষা শেষ হলো, তারপর এসএসসি। বিদায় সংবর্ধনার দিন পুরো স্কুল জুড়ে একটা কান্নাকাটি আর অটোগ্রাফ খাতা সই করার ধুম পড়ে গেল। বিপাশা সেদিন একটা নীল রঙের শাড়ি পরে এসেছিল। তাকে এতটাই অপার্থিব লাগছিল যে, আমার তার সামনে যাওয়ার সাহসটুকুও হচ্ছিল না।
আমি আগের রাতেই ডায়েরির সাদা কাগজে অনেক কাটাকুটি করে একটা চিঠি লিখেছিলাম। চিঠিটা কোনো প্রেমের চিঠি ছিল না, ছিল এক কিশোরের অসহায়ত্বের দলিল। চিঠির শেষে আমি লিখেছিলাম, 'আমার কেন যেন মনে হয়, আমি এই পৃথিবীতে একটু দেরিতে জন্মেছি। যদি আমি এক বছর আগে আসতাম, তাহলে হয়তো আজ আমিও তোমার সাথে এই স্কুলটা ছেড়ে যেতাম।'
চিঠিটা আমার পকেটে ছিল। আমি বারবার বিপাশার কাছাকাছি যাওয়ার চেষ্টা করেছি, কিন্তু তার বান্ধবীদের ভিড় আর শিক্ষকদের উপস্থিতির কারণে এগোতে পারিনি। শেষ পর্যন্ত স্কুল ছুটি হয়ে গেল। বিপাশা তার বন্ধুদের সাথে কথা বলতে বলতে গেট দিয়ে বেরিয়ে গেল। সে একবারও পেছনের দিকে তাকাল না।
আমি মাঠের মাঝখানে দাঁড়িয়ে রইলাম। আমার পকেটের চিঠিটা পকেটেই থেকে গেল। আমি সেটা তাকে দিতে পারলাম না। বাড়ি ফিরে আমি চিঠিটা আর পেলাম না। হয়তো ভীড়ের মাঝে কোথাও পড়ে গিয়েছিল। বৃষ্টিতে কাদায় মাটির সাথে মিশে যাবে ওটা।
ডায়েরির ভেতরে আরও একটা চিঠি ছিল। আমি সেটা সেখানেই লুকিয়ে রাখলাম। মনে মনে ভাবলাম, একদিন আমি বড় হব, যোগ্য হব, তখন বিপাশাকে খুঁজে বের করে এই চিঠিটা তার হাতে দেব। তখন সে আর আমাকে ছোট বলে হাসতে পারবে না।
আমি যখন ক্লাস টেনে উঠলাম, তখন স্কুলটা আমার কাছে কেমন যেন একটা খাঁ খাঁ মরুভূমির মতো মনে হতো। লাইব্রেরির পেছনের বেঞ্চ, সাইকেল স্ট্যান্ড, কিংবা সেই তিনতলার করিডোর, সব জায়গায় বিপাশার একটা অদৃশ্য উপস্থিতি টের পেতাম, কিন্তু মানুষটা আর ছিল না।
আমি বিপাশাকে দেওয়া সেই অবাধ্য কথাটাই রাখলাম। আমি পাগলের মতো পড়তে শুরু করলাম। যে ছেলেটা সবসময় মাঝারির কোঠায় থাকত, সে ক্লাস টেনের টেস্টে স্কুলের মধ্যে টপ থ্রি-র মধ্যে চলে এলো। এসএসসি পরীক্ষায়ও খুব ভালো রেজাল্ট করলাম। কলেজে উঠেও আমি কোনো আড্ডায় জড়াতাম না, কোনো মেয়ের দিকে তাকাতাম না। আমার বন্ধুমহল আমাকে আঁতেল, রোবট বলে ডাকত। কিন্তু আমার মাথার ভেতর শুধু একটা লক্ষ্য কাজ করত, আমাকে বড় হতে হবে, দ্রুত বড় হতে হবে।
ফেসবুকের যুগ তখন সবে শুরু হয়েছে। আমি অনেক খুঁজে বিপাশার আইডি বের করেছিলাম। কিন্তু তাকে রিকোয়েস্ট পাঠানোর সাহস আমার হয়নি। আমি শুধু দূর থেকে তার প্রোফাইল পিকচার বদলানো দেখতাম। সে একটা সরকারি কলেজে ভর্তি হয়েছিল। তার হাসিমাখা ছবিগুলো দেখে মনে হতো, সে তার নতুন জীবনে খুব সুখে আছে। সে হয়তো ভুলেই গেছে স্কুলের সেই পেছনের বেঞ্চের ছেলেটাকে, যাকে সে বৃষ্টিতে ছাতা ধার দিয়েছিল।
তারপর একদিন খবর পেলাম, বিপাশা মেডিকেলে চান্স পায়নি।
ফেসবুকে তার একটা পোস্ট দেখেছিলাম, খুব বিষণ্ণ কিছু লাইন। আমি খোঁজ নিয়ে জানলাম, বিপাশার পারিবারিক অবস্থা খুব খারাপ হয়ে গেছে। তার বাবা হঠাৎ করে ব্রেন স্ট্রোক করে প্যারালাইজড হয়ে গেছেন। বিপাশার একটা ছোট ভাই ছিল, যে তখনো স্কুলে পড়ে। সংসারের পুরো দায়িত্বটা কেমন যেন বিপাশার মায়ের ওপর এসে পড়ল। বিপাশার পড়াশোনা প্রায় বন্ধ হওয়ার উপক্রম হলো। সে একটা লোকাল ন্যাশনাল কলেজে অনার্সে ভর্তি হলো, যাতে বাড়ি থেকে বেশি দূরে যেতে না হয় এবং টিউশনি করে সংসার চালানো যায়।
আমার খুব ইচ্ছে করছিল বিপাশাকে একটা মেসেজ দিই। বলি, ‘আমি আছি তো।’ কিন্তু আমি তখনো একজন স্রেফ কলেজ স্টুডেন্ট, নিজের পকেট খরচের জন্যই বাবার ওপর নির্ভরশীল। আমার কোনো যোগ্যতা ছিল না বিপাশার পাশে দাঁড়ানোর। আমি আবার অনুভব করলাম সেই সময়ের নিষ্ঠুরতা। আমি যখন বড় হচ্ছি, বিপাশা তখন জীবনের আঘাতে আরও দ্রুত বুড়িয়ে যাচ্ছে। আমাদের মধ্যকার দূরত্বের ব্যবধানটা এক বছর থেকে যেন এক দশকে রূপ নিল।
ধীরে ধীরে আমাদের যোগাযোগ একেবারেই শূন্যে নেমে এলো। আমি নিজের পড়াশোনা আর ক্যারিয়ারের ইঁদুরদৌড়ে ব্যস্ত হয়ে পড়লাম। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে চান্স পাওয়ার পর জীবনটা আরও দ্রুত ছুটতে লাগল।
তারপর একদিন। আমার তখন থার্ড ইয়ার।
ফেসবুকে স্ক্রোল করতে করতে হঠাৎ একটা নোটিফিকেশন চোখের সামনে ভেসে উঠল। বিপাশার প্রোফাইলে একটা নতুন ছবি আপলোড হয়েছে। ছবিতে বিপাশা একটা লাল বেনারসি পরে বসে আছে, আর তার পাশে লম্বাচওড়া, বয়সে বেশ বড়, স্যুট পরা এক ভদ্রলোক। ভদ্রলোকের মাথায় চুলের সং্খ্যা অতীব নগণ্য, কিন্তু চেহারায় একটা সচ্ছল আভিজাত্যের ছাপ স্পষ্ট।
ক্যাপশনে লেখা: “গট এনগেজড। আলহামদুলিল্লাহ।”
নিচে শত শত কমেন্ট, “কী সুন্দর জুটি!”, “পারফেক্ট ম্যাচ”, “মেড ফর ইচ আদার।”
আমি স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে রইলাম। আমার চোখের সামনে তখন ভেসে উঠছিল স্কুলের সেই বৃষ্টির দিনটা। সেই কালো ছাতা, সেই বিপাশা আপু, যে আমাকে বলেছিল, ‘তুই বড় হ, তারপর প্রেম করিস।’
আমি বড় হয়েছি। আমি এখন আর সেই পনেরো বছরের ফ্রক-পরা মেয়েটার চেয়ে ছোট কোনো কিশোর নই। আমার দাড়ি-গোঁফ গজিয়েছে, আমার গলার আওয়াজ ভারী হয়েছে। কিন্তু আমি যখন বড় হলাম, বিপাশা তখন অন্য কারো জীবনের অংশ হতে চলে গেছে। সে সংসারের হাল ধরতে, বাবার চিকিৎসার খরচ জোগাতে, নিজের চেয়ে প্রায় তেরো-চৌদ্দ বছরের বড় এক প্রতিষ্ঠিত প্রবাসীর গলায় মালা ঝুলিয়ে দিয়েছে।
সেদিন রাতে আমি কোনো কান্নাকাটি করিনি। আমি শুধু আমার পুরোনো ড্রয়ারটা খুলেছিলাম। ধুলো জমা সেই ডায়েরিটার ভেতর থেকে বের করেছিলাম ক্লাস নাইনে লেখা সেই অপূর্ণ চিঠিটা। কাগজের পাতাটা হলুদ হয়ে গিয়েছিল।
আমি খুব শান্ত হাতে চিঠিটা কুচি কুচি করে ছিঁড়ে ফেললাম। তারপর জানলা দিয়ে রাতের অন্ধকারে উড়িয়ে দিলাম। বাতাসে কাগজের টুকরোগুলো সাদা প্রজাপতির মতো মিলিয়ে গেল। আমার মনে হলো, একটা অধ্যায়ের সমাপ্তি ঘটল। যে গল্পটা কখনো শুরুই হয়নি, তার শেষটা অন্তত হওয়া দরকার ছিল।
আমার বয়স এখন ছাব্বিশ। ইউনিভার্সিটি শেষ করে একটা মাল্টিন্যাশনাল কোম্পানিতে ইন্টার্নশিপ করছি। পকেটে এখন নিজের উপার্জনের টাকা থাকে, চোখে একটা কর্পোরেট দুনিয়ার চতুরতা এসেছে। আমি এখন আর সেই লাজুক আফিফ নই।
ঠিক তখনই একদিন স্কুলের বন্ধুদের গ্রুপে একটা মেসেজ এলো, আমাদের স্কুলের একশো বছর পূর্তি উপলক্ষে একটা গ্র্যান্ড রিইউনিয়ন হবে। পুরোনো সবাই আসবে। প্রথমে যাওয়ার ইচ্ছে ছিল না, কিন্তু মনের ভেতরের কোনো এক সুপ্ত কৌতুহল আমাকে বাধ্য করল।
রিইউনিয়নের দিন স্কুলের মাঠটা রঙিন আলোয় সেজেছিল। পুরোনো চেনা মুখগুলো সব বদলে গেছে। কেউ মোটা হয়েছে, কারো মাথায় চুল কমেছে, কেউ কোলে বাচ্চা নিয়ে এসেছে। আমি এক কোনায় দাঁড়িয়ে একটা কোকের ক্যান হাতে নিয়ে চারপাশটা দেখছিলাম।
“আফিফ না?”
একটা চেনা, কিন্তু কিছুটা ভারী হয়ে যাওয়া গলার আওয়াজ শুনে আমি ঘুরলাম।
সামনে বিপাশা দাঁড়িয়ে।
আমি স্তব্ধ হয়ে গেলাম। বিপাশার গায়ে একটা সাধারণ সুতির শাড়ি। তার সেই উজ্জ্বল, দীপ্তিময় চেহারাটা আর নেই। চোখের নিচে গভীর কালচে দাগ, গালের হাড়গুলো কিছুটা স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। তার চুলে কিছু রুপোলি রেখা উঁকি দিচ্ছে। কিন্তু তার সেই চোখ দুটো… সেই চোখ দুটো একই রকম আছে।
আমি মৃদু হেসে বললাম, “বিপাশা আপু। কেমন আছ?”
সে একটু হাসল। কিন্তু সেই হাসিতে আগের মতো বিকেলের রোদ ছিল না, ছিল এক ধরণের ক্লান্ত শরৎকাল। সে বলল, “ভালো। তুই তো অনেক বড় হয়ে গেছিস রে। শুনলাম ভালো চাকরি করছিস।”
“হ্যাঁ, এই তো শুরু করলাম।”
আমরা মাঠের এক কোণায়, সেই পুরোনো লাইব্রেরির পেছনের সিমেন্টের বেঞ্চটায় গিয়ে বসলাম। চারপাশে তখন তারুণ্যের কোলাহল, লাউডস্পিকারে পুরোনো দিনের গান বাজছে।
কথা বলতে বলতে জানা গেল অনেক কিছু। বিপাশার সেই বিয়েটা টেকেনি। ভদ্রলোক প্রবাসে থাকতেন ঠিকই, কিন্তু মানুষ হিসেবে ছিলেন অত্যন্ত সন্দেহবাতিকগ্রস্ত এবং অত্যাচারী। বিপাশার পড়াশোনা বন্ধ করে দিয়ে তাকে ঘরে বন্দি করে রেখেছিলেন। তিন বছর সেই নরক যন্ত্রণার পর বিপাশা ডিভোর্সের সিদ্ধান্ত নেয়। এখন সে একটা ছোট স্কুলে চাকরি করে, মায়ের সাথে থাকে। কোনো সন্তান নেই।
বিপাশা আকাশের দিকে তাকিয়ে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল, “জীবনে কিছু মানুষ আসে ভুল সময়ে, বুঝলি আফিফ? যখন আমাদের মন তৈরি থাকে, তখন পরিস্থিতি থাকে না। আর যখন পরিস্থিতি আসে, তখন মনটাই মরে যায়।”
আমি বিপাশার মুখের দিকে তাকালাম। আমার বুকের ভেতর জমে থাকা এত বছরের একটা পাথর যেন হঠাৎ করে নড়ে উঠল। আমি একটু মজা করার চেষ্টা করে বললাম, “হুম। সময় জিনিসটাই খুব অদ্ভুত।”
বিপাশা হঠাৎ আমার দিকে ঘুরল। তার চোখ দুটো আমার চোখের ওপর স্থির হলো। সে খুব নিচু গলায় জিজ্ঞেস করল, “তুই কি কখনো প্রেম করিসনি, আফিফ? মানে, তোর ইউনিভার্সিটিতে?”
আমি মাথা নাড়ালাম। “না। ওসব আমাকে দিয়ে হয়নি।”
বিপাশা কিছুক্ষণ একদৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল। তারপর খুব স্বাভাবিক, যেন একটা সাধারণ গল্প করার গলায় বলল, “স্কুলে তুই আমাকে খুব পছন্দ করতি, তাই না?”
আমার হাতের কোকের ক্যানটা প্রায় হাত থেকে পড়ে যাচ্ছিল। আমি জমে গেলাম। আমার হৃৎপিণ্ডটা যেন এক মুহূর্তের জন্য থমকে গেল। আমি আমতা আমতা করে বললাম, “কী… কীভাবে জানলা?”
বিপাশা তার ভ্যানিটি ব্যাগটা খুলল। ভেতর থেকে একটা ছোট প্লাস্টিকের পাউচ বের করল। তার ভেতর থেকে সে একটা ভাঁজ করা কাগজ বের করল। কাগজটা ছেঁড়া ছিল, কিন্তু খুব যত্ন করে স্কচটেপ দিয়ে জোড়া লাগানো।
আমি কাগজের লেখাটা দেখেই চিনতে পারলাম। এটা আমার সেই ক্লাস নাইনের চিঠি!
আমি স্তম্ভিত হয়ে বললাম, “এটা… এটা তোমার কাছে কীভাবে এলো? আমি তো এটা কোনোদিন তোমাকে দিইনি! ওটা তো আমি হারিয়ে ফেলেছিলাম।”
বিপাশা একটু শব্দ করে হাসল। সেই হাসিতে এক ফোঁটা কান্না লুকিয়ে ছিল। সে বলল, “তুই কি জানিস, বিদায়ের দিন তুই যখন অটোগ্রাফ খাতার ভিড়ে আমার পেছনে ঘুর ঘুর করছিস, তখন তোর পকেট থেকে এই কাগজটা পড়ে গিয়েছিল? তুই খেয়াল করিসনি। আমি তুলে নিয়েছিলাম।”
আমার পুরো পৃথিবীটা যেন দুলতে লাগল। “তুমি… তুমি এটা পড়েছিলে?”
“হ্যাঁ, পড়েছিলাম।” বিপাশা কাগজটার ওপর হাত বোলাল। “আর তুই যেটা ছিঁড়ে ফেলেছিলি, সেটা তো তোর ডায়েরির কপিটা ছিল। আসলটা তো আমার কাছেই ছিল বারো বছর ধরে।”
আমি কোনো কথা বলতে পারলাম না। আমার গলা শুকিয়ে কাঠ হয়ে গেছে।
বিপাশা অনেকক্ষণ চুপ করে রইল। মাঠের ওপাশে তখন আতশবাজি ফাটছে, আলোয় আলোকময় হয়ে উঠছে চারপাশ। বিপাশা সেই আলোর দিকে তাকিয়ে বলল, “তুই চিঠির শেষে লিখেছিলি না, তুই একটু দেরিতে জন্মেছিস?”
আমি শুধু মাথা নাড়ালাম।
বিপাশা আমার দিকে তাকাল। তার চোখে তখন পানি টলমল করছে। সে বলল, “আমি তখন তোকে ‘না’ বলতাম, আফিফ। কারণ তুই সত্যি ছোট ছিলি। চোদ্দ বছরের একটা ছেলের আবেগকে প্রশ্রয় দেওয়ার মতো বয়স বা মানসিকতা আমার ছিল না।”
সে থামল। একটা গভীর শ্বাস নিয়ে বলল, “কিন্তু তুই যদি তখন আমার ক্লাসমেট হতি… তুই যদি আমার সমবয়সী হতি… আমি হয়তো অপেক্ষা করতাম। আমি হয়তো তোর হাতটা ধরতাম। তাহলে হয়তো আমার জীবনটা আজ অন্যরকম হতো।”
বাতাসটা হঠাৎ খুব ভারী হয়ে গেল। আমাদের মাঝখানের সেই বারো বছরের দূরত্ব, এক ক্লাসের ব্যবধান, আর সময়ের নিষ্ঠুর হিসাবটা যেন একটা বিশাল দেয়াল হয়ে আমাদের মাঝখানে দাঁড়িয়ে রইল। আমরা কেউ কারো দিকে তাকাতে পারছিলাম না।
রাত বাড়ার পর আমরা যে যার মতো বিদায় নিলাম। বিপাশা চলে গেল তার চেনা একাকীত্বের দিকে, আর আমি ফিরে এলাম আমার শূন্য ঘরের দিকে।
বাড়ি ফিরে আমি আমার পুরোনো আলমারিটা খুললাম। সেই ডায়েরিটা বের করলাম, যার ভেতর আমি চিঠিটার ছেঁড়া অংশগুলো রেখেছিলাম বলে ভাবতাম। ডায়েরিটা ফাঁকা। বিপাশা আজকে বিদায়ের সময় সেই স্কচটেপ দিয়ে জোড়া লাগানো চিঠিটা আমার পকেটে গুঁজে দিয়ে গেছে।
আমি চিঠিটা উল্টো করলাম। চিঠির পেছনের সাদা অংশে বিপাশার হাতের কলমে নতুন একটা লাইন লেখা রয়েছে। নীল কালিতে লেখা, খুব চেনা হাতের লেখা, “আমরা কেউ কাউকে হারাইনি, আফিফ। আমরা শুধু একই সময়ে বড় হইনি।”
আমি জানলার পাশে এসে দাঁড়ালাম। বাইরে তখন আবার ঝুম বৃষ্টি শুরু হয়েছে, ঠিক বারো বছর আগের সেই বৃহস্পতিবারটার মতো। কিন্তু এবার আর কেউ ছাতা হাতে দাঁড়িয়ে নেই।
সেদিন প্রথম বুঝলাম, সব বিশ্বাসঘাতকতা মানুষ করে না। কিছু বিশ্বাসঘাতকতা সময় করে। আমরা শুধু সেই সময়ের জালে আটকে থাকা দুটো ভুল ডিরেকশনের যাত্রী, যারা একই স্টেশনে এসেও কখনো এক ট্রেনে উঠতে পারেনি।
Afif Farhan

No comments:

Post a Comment