Thursday, October 22, 2026

ধর্ম থেকে সংস্কৃতিকে আলাদা করে ফেললে, সংস্কৃতির কিছুই হবে না, বরং ধর্মটা টিকবেনা।

 ময়মনসিংহের দূর্গাপূজা উৎসবের নাচ দেখতেছি, আর আমার মনে হচ্ছে, আচ্ছা, আমার ইসলাম ধর্মে এরকম কি কোনো উৎসব আছে যেখানে নারী পুরুষ এক সাথে নাচতে পারে, আনন্দ করতে পারে? হইহই করতে পারে? অনেক খুঁজেও আমি সেটা বের করতে পারলাম না। পরে মনে পড়ল, ধ্যাত্তেরি! নারী জিনিসটাইতো হারাম, আমি আবার এদেরকে উৎসবে টানতেছি কেনো?

আমি জানি কেউ কেউ খুব রাগ করবেন, এজন্য ধর্ম নিয়ে পারতপক্ষে লিখিনা; কিন্তু অনেস্টলি বলেন তো, পেটপুরে খেয়ে কাতল মাছের মত পেট ভাসিয়ে বিছানায় পড়ে থাকা ছাড়া আমাদের উৎসবে আর কি আছে?
অথচ মানুষ জন্মগতভাবেই উৎসবপ্রবণ। সুর তার মজ্জায়।
জন্মের পর কানের কাছে যখন আজান দেয়, সেটাও সুর করেই দেয়। মৃত্যুর পর কফিনের পাশে বসে যখন সুর করে কোরআন শরীফ পড়ে, খেয়াল করে দেখবেন, সেখানেও সুর। ‍হুট করে যদি একদিন মসজিদ থেকে সুর ছাড়া আজান শোনেন, আপনার খটকা লাগবে না? খ্রিস্টানদের গির্জায় সাপ্তাহিক প্রার্থনায় যোগ দিয়েছেন কখনো? রীতিমত হারমোনিয়াম, গিটার বাজিয়ে সুর করে গান গাওয়া হয়। হিন্দুদের উৎসবের কথাতো বলাই বাহুল্য। আফ্রিকার সব ট্রাইবাল কমিউনিটির কমন ক্যারেক্টর হলো, নাচ।
সোমালিল্যান্ডে হোটেলের পেছনের দিকটায় ছিল আমার রুম। বারান্দার দরজা খুলে দিলে শহরের বড় একটা অংশ দেখা যেত। হোটেলের গা ষেঁষা একটা প্রাইভেট ইউনিভার্সিটি। প্রায় প্রতি শুক্রবার বিকেলে সেই ইউনিভার্সিটি থেকে কাবানের চমৎকার সুর ভেসে আসতো। কাবান হলো আমাদের দেশের দোতারার মত একটা বাদ্যযন্ত্র। মাথা নষ্ট করা সুর বের হয় ওই কাঠের যন্ত্র থেকে! আমি বারান্দার কাঁচটা পুরোটা সরিয়ে দিয়ে মন্ত্রমুগ্ধের মতো শুনতাম। অথচ এই শরীয়াহ দেশে জনসমক্ষে গানবাজনা হারাম।
সোমালিয়া থেকে যেদিন চলে আসবো, তার আগের দিন রাতে তারা আমার জন্য একটা বিদায় অনুষ্ঠানের আয়োজন করল। বয়স্ক এক শিল্পী কাবান বাজিয়ে গান গাইছেন, সাথে সোমালিয়ার ট্রাডিশনাল খাবার। কিছুক্ষণ পর একে এক উপস্থিত সব সরকারি কর্মকর্তারা গান গাওয়া শুরু করল। কাবাজ বাজাচ্ছে সেই বৃদ্ধ শিল্পী। এক পর্যায়ে সবার সেকি উদ্দাম নৃত্য। নারী-পুুরুষ সবাই এক সাথে নাচছে। আমারতো চক্ষু কপালে ওঠার যোগাড়!! এটা না শরীয়াহ আইনের দেশ? তাদের অনুমতি নিয়ে ভিডিও করলাম। কোনো এক সম শেয়ার করবো।
মানুষের শরীরজুড়ে মিউজিক। মানুষের পায়ের তলে, হাতের তালুতে ছন্দ। এসব আপনি কি করে আটকাবেন বলেনতো? বোরখা দিয়ে, শরীয়াহ দিয়ে নারীর শরীর ঢাকতে পারবেন, তার নৃত্যপাগল মন আটকাবেন কি দিয়ে?
কিন্তু আমাদের দেশের মোল্লারা এসব বুঝেনা। এদের ধ্যানজ্ঞান যেকোনো ভাবেই হোক, ইসলাম ধর্ম থেকে উৎসবকে খারিজ করে এটাকে রসকষহীন করে তোলা। যেনো এই ধর্মের প্রতি মানুষের কোনো আগ্রহ অবশিষ্ট না থাকে।
অথচ যে সুফীদের হাত ধরে এই উপমহাদেশের সংস্কৃতিকে ধারণ করে এখানে ধর্মপ্রচার হয়েছে, সেটা তারা স্বীকার করবেনা। বরং ধর্ম থেকে সংস্কৃতিকে আলাদা করার মধ্য দিয়ে উগ্রপন্থার চাষ করছে এরা।
ফলে ইসলাম ধর্মটাকে উৎসববিমুখ করে ফেলেছে দিনে দিনে। আপনি বিয়েতে নাচেন, গায়ে হলুদে অনুষ্ঠান করেন, তাদের আপত্তি।
শবেবরাতে মানুষ একটু হালুয়া রুটি রান্না করতো, বলে দিল এসব হারাম- করা যাবেনা। রাত জেগে ইবাদত করতো, ছেলেরা সারা রাত ঘুরে বেড়াতো, মুরুব্বিদের কবরস্থানে যেতো, বলা হল, আস্তাগফিরুল্লাহ, এসব করা যাবেনা।
নবীর জন্মদিন পালন করতো, বললো, ইসলামে এসব জায়েজ নাই। নবী নাকি এসব পছন্দ করতেন না। কোথায় বলেছেন তিনি এসব? বলতে পারবেনা কিন্তু। এর সাথে ফতোয়া জারি করা হল- জন্মদিনের অনুষ্ঠান করাই নাকি জায়েজ নাই। ফলে এখন দেশের লাখলাখ ঘরে জন্মদিন পালন করা হয়না। এটা কিন্তু সত্য। আমি এক চুলও বাড়িয়ে বলছিনা।
তাজিয়া মিছিল করা হতো আশুরায়, বলা হল, না না... এসব করা যাবেনা, হারাম। বেদাত।
ওরশ ছিল আমাদের দেশের উৎসবের বড় প্রাণকেন্দ্র। ওরশ শুধু উৎসব না তো, ছিল ছোট ছোট ব্যবসায়ীদের সারা বছরের রোজগারের কেন্দ্র ছিল। সেখানে মেলা হত। কত কি পাওয়া যেত সেসব মেলায়। আমাদের ছোটবেলার সবচেয়ে বড় স্মৃতি সারা বছর ধরে জমানো টাকা নিয়ে মেলায় যাওয়া। ওটাকেও বন্ধ করে দিয়েছে।
নদীতে নৌকা বাইচও নাকি হারাম! মেয়েরা ফুটবল খেলে, ওটাও হারাম।
এসব করে ধর্মটাকে এমন এক অচ্যুত জায়গায় নিয়ে গেছে যে, সারা পৃথিবীতে একে একঘরে করে ফেলেছে। খেয়াল করে দেখবেন, এই নব্য মুসলিমদের মধ্যে বৈচিত্র্যকে গ্রহণ করার মানসিকতা নাই। এদের ধর্ম, এদের পোশাক, এদের চিন্তার বাইরে বাবি সব হারাম।
অথচ এরা জানেনা, ধর্ম থেকে সংস্কৃতিকে আলাদা করে ফেললে, সংস্কৃতির কিছুই হবে না, বরং ধর্মটা টিকবেনা।


Raju Norul

No comments:

Post a Comment