স্ত্রীকে নিয়ে সহজে কোথাও আমি বেড়াতে যেতে চাই না।প্রথমত, ঠিকঠাক সময় গিয়ে পৌঁছাতে পারি না দ্বিতীয়ত বাচ্চাদের সাথে নিয়ে যাবার জন্যে তোড়জোড় শুরু করে। বাচ্চা বলতে ছেলে এইটে উঠেছে আর মেয়েটা এসএসসি দিবে। এই বয়সী বাচ্চারা সাধারণত অপরিচিত বাসায় বেড়াতে যেতে একদমই উৎসাহী থাকে না আবার সারা সপ্তাহের স্কুল,কোচিংএর ঝক্কি সামলে শুক্রবার অবসর চায়৷
সুমী এব্যাপারগুলো বুঝবে না। প্রথমে আমার কাছে ঘ্যানঘ্যান শুরু করবে,
-বাচ্চাদের একা বাসায় রেখে যাওয়া কি ভালো? বলো?
-ওরা যথেষ্ট বড় হয়েছে।
-ওদের রেখে পোলাও,মাংস আমার গলা দিয়ে নামবে!
এবার সত্যি বিরক্ত লাগে। এরা কি আমাদের যুগের ছেলেমেয়ে নাকি যে মাংসের ঝোল পেলেও চেটেপুটে খাবে আর পোলাও রান্না মানেই ঈদের দিন!যুগ পাল্টেছে। পিৎজা,পাস্তা, ফ্রায়েড চিকেন খাওয়া বাচ্চাদের কাছে পোলাও,কোরমা হচ্ছে ডালভাত।মুরগির রোস্ট খেতে এরা বিয়েবাড়ি ছুটবে ভাবাটাও অন্যায়।
একটা বয়সের পর স্বামী-স্ত্রীর শারিরীক সুখের চেয়েও মানসিক প্রশান্তি বেশি প্রয়োজন হয়। সপ্তাহের ছয়টাদিন ও বাচ্চাদের পিছনে ছুটে একটাদিন কোথাও ঘুরতে যাব, বেড়াতে যাব তা না। সাথে ছাওপাও নেওয়া চাই।
আতিফ সাহেব খুব করে বলে দিয়েছেন,
-স্যার,ম্যাডামকে নিয়ে আসবেন প্লিজ৷ নয়ত খুব কষ্ট পাব।
নিমন্ত্রণের দিন সকালে চা খাচ্ছি। দেখলাম রান্নাঘর থেকে কোরমার সুগন্ধ ভেসে আসছে।সুমী আমার সাথে একা যেতে রাজি হয়েছে কিন্তু বাচ্চাদের জন্যে ভালো খাবারের আয়োজন করে যেতে ভুলবে না।
ওর হাতের কাজ শেষ করে রেডি হতে সাড়ে বারোটা বাজল। আরো সময় লাগত আমার কুঁচকানো ভ্রু দেখে দ্রুত মাথায় হিজাব বেঁধে বলল,
-চলো।
আতিক সাহেব থাকেন যাত্রাবাড়ি। ঠিকানা দেখে বেশ পুরাতন একটা বাড়ির সামনে গাড়ি থামালাম।প্রাইভেট কোম্পানিতে জব করে। বেতন যা পায় তাতে এরচেয়ে ভালো বাড়িতে থাকা সম্ভবও না। সম্প্রীতি প্রমোশন হয়েছে।প্রমোশন লেটার হাতে দিতেই খুশিতে আত্মহারা হয়ে বারবার ধন্যবাদ দিচ্ছিল। বলল,
-স্যার,একদিন যদি আমাদের সাথে চারটে ডালভাত খান। খুব খুশি হব।
আমি সাধারণত জুনিয়র স্টাফদের সাথে বেশি মাখামাখি পছন্দ করি না৷ কিন্তু এ ছেলেটাকে আমার ভালো লাগে। বয়স পয়ত্রিশ হবে। পরিশ্রমী,দায়িত্ববান। এছেলে অনেকদূর যাবে বোঝা যায়।
মিষ্টির প্যাকেট নিয়ে চার তলা বেয়ে উঠতে কষ্ট হচ্ছিল। সুমীও শাড়ি সামলে উঠতে হিমসিম খাচ্ছে।
কোনোক্রমে তিন তলা উঠতেই আতিক এসে এগিয়ে নিল।
-স্যার, গেটে এসে আমাকে একটা কল করবেন তো! গরীবের বাড়ি। একটু কষ্ট করে আসুন।
ছিমছাম সাজানো বাসা। বেতের সোফা,বাঁশের পর্দা,দেয়ালে মস্তবড় ওয়েল পেইন্টিং। দামী শোপিসের বাহুল্য নেই। ঘরটায় পা দিয়ে মন ভালো হয়ে গেল।সম্ভবত ইচ্ছা থাকলে অল্প টাকায় স্বস্তিতে থাকা যায়। আতিকের বউ এল ট্রেতে করে শরবত নিয়ে। মিলি শান্ত,সুশ্রী মেয়ে। এখনও বাচ্চাকাচ্চা হয় নাই। আমাদের দেখে ওর চেহারায় একটা নববধূসুলভ লাজুকতা কাজ করছিল।
-স্যার,শরবত নিন।গরমে ভালো লাগবে।
-
এক চুমুক শরবত মুখে দিতেই কাগজি লেবুর ঘ্রাণে মন জুড়িয়ে গেল।আহ!
আমি,সুমী আর আতিক গল্প করছি।মিলি টেবিল রেডি করছে। একফাঁকে আতিক শসা,টমেটো ট্রেতে করে নিয়ে আসল।সালাদ বানাচ্ছে আর আমাদের সাথে গল্প করছে। দৃশ্যটা দেখেই সুমী আড়চোখে আমার দিকে তাকাল। চোখের ভাষাতে বলে দিল,
-দেখলে কত ভালো মানুষ! স্ত্রীকে সাহায্য করছে।
দুইটা নাগাদ খাবারের ডাক এল। বেসিন থেকে হাত ধুয়ে টেবিলের সামনে যেতেই দেখেই সুমী থমকে দাঁড়িয়ে আছে। আয়োজন খুব সামান্য। মাঝারি সাইজের চিংড়ি মাছ দিয়ে পুঁইশাকের চচ্চড়ি, ডালের বড়ি দিয়ে বোয়াল মাছ, আলু দিয়ে মুরগির ঝোল আর কাতল মাছের মাথা দিয়ে ঘন মুগ ডাল। এমন মাছ-ভাত তো আমরা বাড়িতেই খাই। পোলাও-রোস্ট ছাড়া অতিথিদের জন্য টেবিল সাজানো এই জীবনে দেখি নাই।আতিক আমায় বাড়িতে ডেকে সস্ত্রীক অপমান করে ফেলল!
মিলি সম্ভবত আমাদের মনোভাব বুঝল। বলল,
-আমি পোলাও করতে চেয়েছিলাম কিন্তু বাচ্চারা আসবে না উনি করতে না বললেন।
আতিক বলল,
-স্যার,বিয়ের মৌসুমে তো রোস্ট,রেজালা খেতে খেতে হাঁপিয়ে উঠেছেন। আপনাদের মুখের রুচি পরিবর্তন করতেই এই ব্যবস্থা।
খাবার টেবিলের দাঁড়িয়ে থাকা যায় না। আতিকের অনুরোধে বসলাম।ঝরঝরে বাসমতি চালের ভাত আর পুঁইডাঁটা চচ্চড়ি মুখে দিতেই মায়ের কথা মনে পরল। আমার মা রাঁধতেন কুচো চিংড়ি দিয়ে পুঁইশাক। এক শাক দিয়েই এক প্লেট ভাত খেয়ে ফেলা যেত।
-স্যার মাছ নিন।আপনারর আসবেন বলে হাওড়ের মাছ অর্ডার দিয়ে আনিয়েছি।
ভাজা বড়ি দিয়ে তাজা মাছের সুঘ্রাণেই পেট অর্ধেক ভরে যাচ্ছিল। সুমী মাছ নিতে চাইল না। হাসতে হাসতে বললাম,
-খেয়ে দেখো। এমন মাছ আমি নিজেও বহুদিন খাই নাই।
মাছ দিয়ে ভাত একটু বেশি খেয়ে ফেলেছিলাম আবার মিলির অনুরোধে আর এক চামচ ভাত নিতে হল। নতুন আলু দিয়ে দেশী মুরগির ঝোল।রোস্ট,কোরমা আর ফ্রাইয়ের যুগে আমরা ভুলেই যেতে বসেছি দেশি মুরগির ঝালঝাল ঝোল মাখানো ভাত খেতে যে অমৃতের মত লাগে। সাথে যদি লেবু আর কৃষ্ণচূড়া মরিচ থাকে তাহলে তো আর কথাই নাই। খেতে খেতে গল্প হচ্ছিল। আতিকই কথা বলছিল বেশি।
-স্যার,আমরা বিয়ের পর আত্মীয়র বাড়িই যাই পোলাও,কোরমা দিয়ে এলাহি অবস্থা। আমাদের দেশে এত রকমের দেশি মাছ,সবজি আছে অথচ সব বাড়িতে একই আয়োজন। পোলও,রোস্ট,কাবাব,চিংড়ি,ইলিশ ভাজা।খেতে খেতে মুখে জং ধরে গিয়েছিল। তারপর থেকে আমি আর মিলি নিয়ে প্লান করলাম আমাদের বাড়িতেই যেই অতিথি হয়ে আসুক আমরা চেষ্টা করব তাকে আমরা ভিন্ন কিছু দিয়ে সমাদর করতে।অল্প কিছু আইটেম হবে কিন্তু রান্না হবে ইউনিক।
সুমীও সায় দিল,
-চমৎকার আইডিয়া।।আমরা ভাবি আট-দশ পদ দিয়ে টেবিল না সাজালে মান থাকে না। মেহমান এত খাবার খায় না।ফ্রীজে বাসি হয়। আর গিন্নীর কষ্ট বাড়ে।
কথাটা আমার উদ্দেশ্যে।সত্যি চট্রগ্রামের ছেলের বউ হিসেবে বিয়ের পর থেকে সুমীর কম ঝামেলা পোহাতে হয় নাই। শুঁটকি ভর্তা থেকে মেজবানি গরুর গোশত,দরুস কুরা, তরকা ডাল,মগজ ভুনা দিয়ে টেবিল না সাজালে আমরা লোকদের কৃপণ ভাবতাম।
খাওয়া হোক বা না হোক ভরপুর খাবার দিয়ে টেবিল সাজানো আমাদের ঐতিহ্য।অবশ্য সেই ঐতিহ্য বলির পাঠা হয় গৃহিণীরা। ভোর থেকে দুপুর পর্যন্ত রান্নাঘরে খুন্তি না নাড়ালে এত নবাবী খাবারের দাবারের আয়োজন হয় না। আবার মেহমান চলে গেলে তিনদিন পর্যন্ত সেই বাসি খাবার তাদেরই কষ্ট করে খেতে হয়।
ভালো খেলে মনও ভালো থাকে। খাবার-দাবার পর একচোট আড্ডা হল। কার জেলায় কোন খাবার বিখ্যাত তা নিয়ে। সুমী বলল,
-মিলি একদিন আমাদের বাসায় এসো। তোমাকে কালা ভুনার সিক্রেট রেসিপি শিখিয়ে দেব।
ঘরে বানানো মিষ্টি দই খেয়ে বিদায় নিলাম।
বহুদিন পর আমি আর সুমী রিকশায় চড়েছি। সুমী বলল,
-দেখলে তো, ওদের কাছে অনেক কিছু শেখার আছে।ওরা কিন্তু কৃপণ নয়। বাড়িতে নিশ্চয়ই ওরা সবসময় বাসমতি চালের ভাত খায় না। চিংড়ি মাছ, কাতল মাছ,বোয়াল মাছ, দেশী মুরগি কোনোটাই কমদামি নয়। কিন্তু আয়োজনের ভঙ্গীটা কালচারাল। তুমি এসব বুঝবে না।তোমার কাছে দাওয়াতের আয়োজন মানেই গরু,খাসি আর মুরগির গোশত।
-মিলির রান্না ভালো বলে….এত মজা.…
-চুপ করো। আমার রান্না খারাপ?
-না৷ না।তোমার দোষ নাই। দশ-বারো পদ রান্না করতে গেলে মাথা ঠিক থাকে নাকি! মেয়েরাও তো মানুষ রোবট তো আর না।
-এতদিনে বুঝলে!
-এইযে তোমার নিয়ে কতদিন পর রিকশায় ঘুরতে বের হলাম।খুশি হও নাই?
-প্রেমটা যেমন রিকশায় বসে দেখাও অমন রান্নাঘরেও দেখাতে পারো। দেখলে,আতিক সাহেব কি সুন্দর স্ত্রীকে হেল্প করছে...
©হাবিবা সরকার হিলা*
No comments:
Post a Comment