ঘুগনি আর আলুরদম তাকে এতটা বিপদে ফেলবে বুঝতে পারেনি স্বপন। তার ভাত ডাল সবজির হোটেলের পাশে এতদিন চরণকাকা জ্যুস বিক্রি করত। গরমকালে লাইন পড়ত দোকানে। প্লাস্টিকের ছোট গেলাসে মুসাম্বির জ্যুস পনের টাকা। হাসপাতালের কাছে খাবারদাবারের দোকানগুলো দুর্দান্ত চলে। হাসপাতালের ভেতরে টিকিটের লাইন যত বড় হয়, খাবারের দোকানগুলোতে ভিড় তত বাড়ে। ওষুধের দোকানের থেকেও মাঝেমাঝে খাবার দোকানে ভিড় বেশি হয়। তেলচিটে নড়বড়ে বেঞ্চিগুলো সন্ধে পর্যন্ত ভর্তি থাকে। ওষুধ ,সস্তার নাইটি,বাচ্চাদের জামা, টিফিনকৌটো,প্লাস্টিকের বোতল,ফলের দোকান বাদে বাদবাকি সব খাবারেরই দোকান। মুড়ি ছোলা বাদাম,ভাত সবজি,কচুরি আলুর তরকারি,পেটাই পরোটা সুজি সবকিছুই বিক্রি হয় এখানে ,পাশাপাশি। হাসপাতালের একপাশে কালী মন্দির। বেশিরভাগ দোকানিই বাঙালি অথবা অবাঙালি হিন্দু। মুসলমানদের দোকানও আছে। এই গলির শেষে একটা বাঁক ঘুরে আর একটা রাস্তার মধ্যে ঢুকলে দেখতে পাওয়া যায় সারি সারি খাবারের দোকান। বিক্রেতারা মুসলমান। ওই রাস্তার ফুটপাতের দোকানগুলোতে বিরিয়ানি,কাবাব, পুরী,মোটা মোটা করে কাটা আলুভাজা,জিলিপি পাওয়া যায়। গলির বাঁক ঘুরে কাবাব বা বিরিয়ানির গন্ধ হাসপাতালের কাছে পৌঁছতে পারে না বলে রুগীর আত্মীয়স্বজনেরা এই সব হোটেলের খোঁজ পান না। তাছাড়া হাসপাতালের বেডে নিজের লোককে শুইয়ে রেখে এসে কারই বা বিরিয়ানি আর কাবাব খেতে ইচ্ছে করে! কাজেই ডাক্তার দেখাতে আসা বা রুগীকে দেখতে আসা মানুষরা হাসপাতালের গেটের উল্টোদিকে স্বপনের ভাতের হোটেলে টুক করে ঢুকে পড়ে। স্বপন খদ্দেরদের দিকটা দ্যাখে আর স্বপনের মা রান্নাটা সামলায়।
স্বপনের থেকে তার মায়ের ব্যবসায়িক বুদ্ধিটা বেশি। আর পাঁচটা সস্তার হোটেল কারবারির মতো সে একটাই লাল টকটকে ঝোল বানিয়ে খদ্দেরদের চাহিদা মতো ওই একই ঝোলের ভেতরে ডিম বা মাছ দিয়ে সার্ভ করে না। মাছের ঝোল আলাদা বানায়। তাতে জিরে ধনে লঙ্কা আর আদা বাটা দেয়। ডিমের ঝোলে পেঁয়াজ আদা রসুন কাশ্মীরি লঙ্কাবাটা আর গরমমশলার গুঁড়ো দিয়ে এমন রগরগে করে তোলে যে লোভ সামলানো মুশকিল হয়ে পড়ে। চিকেন রাঁধে পেঁপে আর আলু দিয়ে। স্বপনের মা হেঁড়ে গলায় হাঁকে "ভাত গরম ভাত পাবেন...পেঁপে চিকেনের হালকা ঝোল দিয়ে গরম গরম ভাত খেয়ে যান..... একদম বাড়ির মতো হালকা মশলায় রান্না.....আর কোত্থাও পাবেন না।"
ডাকের মধ্যে এমন একটা কিছু থাকে যে সেই ডাককে অনুসরণ ক'রে অনেকেই দোকানের দিকে ঘুরে তাকায়। ভোলার হোটেলে না ঢুকে মানুষ ঘরোয়া খাবারের লোভে স্বপনের হোটেলে ঢুকে পড়ে আর লাল টকটকে ডিমে নজর আটকে গিয়ে পেঁপে চিকেন , ডিমকষা.... দুটোই খেয়ে ফ্যালে। সন্ধের পরে মা আর ছেলে হাসিমুখে হিসেব করতে বসে। রাতে ভ্যানে সবকিছু গুছিয়ে মায়েপোয়ে খুশি মনে বাড়ি ফিরে যায়। কাছেই বাড়ি। আড্ডিবাগানে। যেটা লোকমুখে এখন হাড্ডিবাগান হয়ে গিয়েছে।
স্বপন ভাবে এমনি যেকোনো ফুটপাতের চাইতে হাসপাতালের কাছে খাবারের দোকান খোলার আলাদারকম সুবিধা আছে। সোম থেকে শনিবার তুমুল ভিড়। প্রতিদিন প্রায় নতুন নতুন খদ্দের। নতুন নতুন গল্প। ধারবাকির কোনো গল্পই নেই। তবে দু একজন মানুষ ,যাদের প্রতি সপ্তাহেই চিকিৎসার জন্যে হাসপাতালে আসতে হয়....তারা মুখচেনা হয়ে যায়। তাদের জন্য স্বপনের মা আলু বেগুন দিয়ে কলমিশাক ভেজে রাখে। এসব কিন্তু দখলদারির দোকান। যখন যে পার্টি সরকারে থাকে, পার্টির ছেলেদের সপ্তাহে কিছু টাকা ধরে দিতে হয়। আর পার্টির বিশেষ প্রোগ্রাম থাকলে চাঁদা দেওয়াটা বাধ্যতামূলক। তবে পার্টির ছেলেরা ভালো। তারাই এখানকার সব কটা দোকানে মিটারের ব্যবস্থা করে দিয়েছে। দোকানদারদের নিজের নামের মিটার। একটা ঘুপচি মিটারঘরে সবকটা মিটার পরপর বসানো। নিজের মিটার থেকে তার টেনে দোকান পর্যন্ত নিয়ে গেলেই একটা ফ্যান,একটা লাইট। দারুণ ব্যবস্থা। ফুটপাতে এর চেয়ে আরামের ব্যবস্থা আর কীইবা হতে পারে! গলির এ মুখে একটা টাইম কল আর গলির শেষপ্রান্তে একটা টিউবওয়েল। অঢেল জল। রান্না,বাসন মাজার কোনো অসুবিধে নেই। প্লাসটিকের রং বাহারি জগে টিউবয়েলের জল খদ্দেরদের জন্য ভরা থাকে। পাশে একটা ছোট্ট কৌটোয় থাকে নুন।
দোকানের জায়গাটা দখল করা ছাড়া স্বপনের বাবা তাদের সংসারে আর কোনো উপকারে আসেনি। পান বিড়ির দোকান খুললেও চলেনি সেভাবে। স্বপনের মা সংসারের হাল ধরতেই তাদের ভাগ্য ফিরেছে। ভাতের হোটেল খোলার ভাবনা এবং তার রূপায়ণ..... সব স্বপনের মায়ের কৃতিত্ব। এর জন্য মায়ের কাছে সে কৃতজ্ঞ। আজ দুখানা পাকা ঘর,বাথরুম ,সুখ স্বাচ্ছন্দ্য সব মায়ের বুদ্ধি আর পরিশ্রমের ফল। দারুণ সুখে দিন কাটছিল তাদের। সেই সুখে কাঁটা হয়ে এল নীলু। তার হোটেলের গা ঘেঁষা জ্যুসের দোকানটা চরণকাকা ভাড়া দিয়ে দিল। ভাত তরকারির সঙ্গে ফলের রসের কোনও বিবাদ নাই। অনেকে তার দোকান থেকে মাছ ভাত খেয়ে চরণকাকার দোকানে মুসাম্বি বা পাকা আমের জ্যুস কিনে আরাম করে খেয়ে হেঁউ করে ঢেঁকুর তুলে বাস ধরতে যেত। কিন্তু যেদিন থেকে নীলু নামের মেয়েটা চরণকাকার দোকানটা ভাড়া নিয়েছে সেইদিন থেকেই ভাত মাছ, পেঁপে চিকেনের সঙ্গে ঘুগনি এবং আলুরদমের সংঘর্ষ লেগে গিয়েছে। স্বপন কায়দা করে কতোবার দোকানটা ভাড়া নেওয়ার কথা চরণকাকাকে বলেছে! কথাটা কাকা কানেই তোলেনি। দুটো দোকান একসঙ্গে জুড়ে দিয়ে কটা প্লাস্টিকের টেবিল চেয়ার লাগিয়ে দিতে পারলেই দোকানটা রেস্টুরেন্ট হয়ে উঠত। একটা রেস্টুরেন্ট খোলার খুব ইচ্ছা স্বপনের। চরণকাকা চাইলেই স্বপনের সেই স্বপ্ন পূরণ হতে পারত। স্বপ্নকেবিন... নামও ভেবে রেখেছিল মনেমনে।
লকডাউনে ব্যবসা লাটে উঠলে চরণকাকা চিন্তায় চিন্তায় অসুস্থ হয়ে পড়ল। জীবনযাত্রা স্বাভাবিক হওয়ার পরেও কাকার শরীর ঠিক হলো না। বৌবাজারের ওদিকে কাকার বাড়ি। চরণকাকার সঙ্গে কীভাবে যে মেয়েটার যোগাযোগ হল কে জানে!
মেয়েটা ট্যাংরার ওদিক থেকে আসে। আনন্দপালিতের ভেতর দিয়ে একটা রাস্তা ট্যাংরার ওদিকে যায়। মেয়েটা ওই রাস্তা দিয়েই রিক্সায় যাতায়াত করে। মেয়েটা দেখতে আহামরি কিছু না। কিন্তু চোখদুটো বড্ড গভীর। মুখের চেয়ে চোখ দিয়েই কথা বলে বেশি। বয়স বোঝা যায় না। সিথিতে সিঁদুর টিদুর নেই। হাতে দুটো রঙিন বালা। সালোয়ার কামিজ , জিন্স কুর্তি এইসব পরে আসে। ডান পাটা মনে হয় খারাপ। খুঁড়িয়ে হাঁটে। সঙ্গে একটা সাত আট বছরের বাচ্চা মেয়ে আসে। বাচ্চাটিও টুকটাক অনেক কাজ করে দেয়। মেয়েটার বোন টোন হতে পারে!
বড় বড় দুটো ডেগচিতে করে ঘুগনি আর আলুর দম বাড়ি থেকেই বানিয়ে নিয়ে আসে। দোকানে এসে সেগুলো শুধু পাম্প দেওয়া স্টোভে বসিয়ে ওপরে নানারকমের গুঁড়ো মশলা ছেটোয়। কী যে মশলা কে জানে! মশলা পড়ার সঙ্গে সঙ্গে ঘুগনি আর আলুর দমের অদ্ভুত সুন্দর সুগন্ধ ছড়িয়ে পড়ে চারদিকে। সেই স্বর্গীয় গন্ধের নিচে চাপা পড়ে যায় স্বপনের মায়ের দক্ষ হাতের রাঁধা ডিম কষা বা পেঁপে চিকেনের ঘ্রাণ। মানুষজন স্বপনের হোটেলে ঢুকতে গিয়েও ঢোকে না। নীলুর কাছে গিয়ে পাউরুটি আলুরদম বা ঘুগনির অর্ডার দেয়। আশপাশের দোকানদাররা দুপুরে আর কেউ ভাত খায় না। নীলুর দোকানের সামনে দাঁড়িয়ে স্টিলের প্লেটে আলুরদম পাউরুটি খায়। নীলুর দোকানের সামনে ভিড় শেষ যেন হতে চায় না!
আজকাল স্বপনের মা ছেলের ওপরে সবসময় ঝাঁঝ দেখায়। বলে " একটু জোরে হাঁক না দিলে খদ্দের আসবে কেন? হাসপাতালের গেটের মুখে দাঁড়িয়ে থেকে কায়দা করে খদ্দের ধরে আনতে হবে। কিচ্ছু শিখলি না! এমন মিনমিনে মিনসে তোর বাপও ছিল না।"
মায়ের কথার কোন উত্তর দেয় না স্বপন।এমন ফাঁপরে আগে কখনো পড়েনি সে। দুপুরে মানুষ ভাত না খেয়ে ঘুগনি পাউরুটি খেতে শুরু করেছে কেন ভেবে পাচ্ছে না! বেলায় পাউরুটি খেলে গ্যাস হচ্ছে না মানুষের! স্বপন নীলুর সঙ্গে একদিনও কথা বলেনি। তবে স্বপনের মা মেয়েটার উদ্দেশ্যে নানান খোঁচা মারা কথা বাতাসে উড়িয়ে দেয়। মেয়েটার দিক থেকে কোনো প্রতিক্রিয়া দেখা যায় না। তার বসারই সময় নেই। সারাদিন তারজালির ওপরে পাউরুটি সেঁকে চলে। ধনেপাতা ,পেঁয়াজ,কাঁচালঙ্কা কুচোয়। বাচ্চাটার সঙ্গে কথা বলে।
মেয়েটার দিনলিপি স্বপনের মুখস্থ। সকালে দোকানে এসে ডেগচিগুলো রাখে। তালা লাগানো কাঠের বাক্সটার ভেতর থেকে প্লেটগুলো বের করে সাজায়। পাউরুটিওয়ালা পাউরুটি দিয়ে গেলে সেগুলো কাঠের ডালার ওপরে থাক লাগিয়ে রেখে দেয়। খোঁড়াতে খোঁড়াতে বালতি করে জল আনে। সবশেষে মন্দিরের পাশের ফুলের দোকানটা থেকে একটা জবার মালা এনে কালী ঠাকুরের ছবিতে ঝুলিয়ে দেয়। ধুপকাঠি জ্বেলে কী যেন বিড়বিড় করে, তারপর বাচ্চা মেয়েটির কপালে একটা চুমু খায়। ততক্ষনে হাসপাতালে টিকিট করার আগে মানুষজন তার দোকানের সামনে জটলা করে।
স্বপনের মা বলে " মেয়েটার সঙ্গে পেরেম করলেও তো পারিস! মুখশ্রী খারাপ নয়। পায়ে খুঁত থাকলেও কাজকর্ম তো সবই পারে! বিয়ে হলে দোকানটা তোরই হবে। আমি আর কদিন বাঁচব! তোরা দুজনে ব্যবসা সামলালে টাকা রাখার জায়গা পাবি না।"
স্বপন গুম মেরে বসে থাকে। মায়ের কথার উত্তর দিলে ঝগড়া অনিবার্য। মা ঝগড়াতে বিশাল পটু। নীলু নামের মেয়েটার সামনে আর নতুন করে অপদস্থ হতে চায় না সে।
মাকে উত্তর দেওয়াই যায়! মেয়েটার হাতযশ আছে। নইলে মাত্র এই কদিনে ঘুগনি আলুরদম খাইয়ে সবার মন জিতে নেয়! ভালো রান্না করলে মানুষ নিজে উবজে আসবে। পেঁপে দিয়ে চিকেন কোনও সুস্থ মানুষে খায়! আমাকে মেয়েটার পেছনে না লেলিয়ে দিয়ে নিজে রান্নাটা আরও ভালো করে তো করতে পারো!.. চেঁচামেচির ভয়ে কথাগুলো মাকে বলতে পারে না স্বপন। গিলে নেয়।
যা কোনদিন হয়নি,এখন সেটাই হচ্ছে। পেঁপে চিকেন,মাছের তরকারি বেঁচে যাচ্ছে। স্বপন বুঝতে পারে মায়ের এখন আর রান্নায় মন নেই। বেঞ্চের এককোণায় বসে একদৃষ্টিতে নীলু নামের মেয়েটার দিকে তাকিয়ে থাকে। অস্ফূট স্বরে গালমন্দ করে,অভিশাপ দেয়। স্বপনের খুব খারাপ লাগে। যদি কাউকে দোষ দিতে হয়,তবে সেটা চরণকাকার দোষ। সেতো দোকানটা ন্যায্য ভাড়ার বিনিময়েই নিত! দিল না কেন? কতোদিন দুপুরে ডাল ভাত সবজি খাইয়েছে স্বপন। পয়সা নেয়নি। প্রচণ্ড গরমে কাকাও তাকে আর তার মাকে কাঁচামিঠে আমের শরবত খাইয়ে জানটাকে আরাম দিয়েছে। সেই কাকা দোকানটা তাদের না দিয়ে কী করে একটা উটকো মেয়েকে দিয়ে দিল! কী করে পারল কাকা! কাকাকে অনেকদিন দ্যাখেনি স্বপন। ভাড়া নিতেও আসেনি। এলে স্বপন ঠিকই দেখতে পেত।
দু চারদিন হলো স্বপনও তার মায়ের মতো নীলুর দোকানের দিকে একদৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে। মুখ চেনা মানুষগুলো অচেনা হয়ে গিয়ে প্লেট থেকে ঘুগনির অবশিষ্ট তরলটুকুও কীভাবে চেটে নিচ্ছে.... আর স্বাদের মাহাত্ম্যে নির্লজ্জের মতো উহ্ আহ্ করছে চেয়ে চেয়ে দ্যাখে। বিশেষ এবং গোপন গুঁড়ো মশলা ছড়ানো ঘুগনির ঘ্রাণে কী যেন একটা হয় স্বপনের ! ঘোর লাগে। সেও কী লাইন দেবে নীলুর হাতের ঘুগনি আর আলুরদম খাওয়ার জন্য! এদিকে খদ্দের আর এক হাতা ডাল চেয়ে চেয়ে বিরক্ত হয়ে যায়। "ধুস! দোকানদারের হুঁশ নাই। কাল থেকে আলুরদম পাউরুটি খাবো।" স্বপনের যখন সম্বিৎ ফেরে তখন খদ্দেরের খাওয়া শেষ। তার দোকানের ওপরে একরাশ বিরক্তি ঢেলে দিয়ে খদ্দের বেরিয়ে যায় । নীলুর দোকানের সামনে গিয়ে দেওয়ালে রং দিয়ে লেখা খাবারের দামগুলোর ওপরে একবার চোখ বুলিয়ে হাঁটতে শুরু করে।
এখন স্বপনের মায়ের পাগল পাগল অবস্থা। স্বপন জানে মা ভৈরবীদির কাছে গিয়েছিল। ভৈরবী দি তুকতাক জানে। লঙ্কা পোড়া, মাদুলি, কাপড়ের টুকরো নিয়ে নানাবিধ চর্চা করে। ভৈরবীদির কাছ থেকে একটা ছোট শিশিতে ক'রে থেকে মন্ত্রপড়া জল এনে সেদিন খুব ভোরে মেয়েটার দোকানের ওপরে ছিটিয়ে দিয়েছিল। 'পিচাশ ' এর মতো মুখ চুমরে মা বলেছিল "দেখিস এবার থেকে সব মানুষ আমাদের দোকানেই আসবে। মেয়েটা রক্তবমি করে মরবে।" শিউরে উঠেছিল স্বপন। মেয়েটা গায়ে গতরে খেটে ইনকাম করছে। যদি কেউ অন্যায় করে থাকে,সে হল চরণকাকা। অনেকবার বলা সত্বেও দোকানটা চরণকে ভাড়া দেয়নি। তাছাড়া মেয়েটা রোজ ভক্তিভরে মাকালীর ছবিতে জবার মালা চড়িয়ে ব্যবসা শুরু করে,ও কেন রক্তবমি করে মরবে! মাকালীর ক্ষমতা বেশি না ভৈরবীদির!
মাকালীর ক্ষমতাই বেশি। কারণ নীলু নামের মেয়েটার দোকানে ভিড় তো কমলই না, বরঞ্চ হাসপাতালের নার্সগুলোও ঘুগনি আর আলুরদম খাওয়ার জন্য দোকানের সামনে লাইন দিতে শুরু করল। কেউ কেউ আবার ব্যাগ থেকে টিফিনকৌটো বের করে তার মধ্যে ঘুগনি আলুরদম ভরে বাড়ি নিয়ে যেতে শুরু করল। মেয়েটার রক্তবমি হলো না। বদলে রক্তরঙা ছোট্ট একটা টিপ নীলুর কপালের শোভা বাড়াল।
সেদিন বাজারে গিয়েছিল স্বপন। মুরগিওয়ালা টাকা পাবে,সেটাই দিতে গিয়েছিল। বেলায় বাজার থেকে ফিরে দোকানে যাওয়ামাত্র মা তাকে ইশারা করে কী যেন বলতে শুরু করল! কিছু একটা নিশ্চয় ঘটিয়েছে! মাকে পৈচাশিক হাসি হাসতে দেখে বুকটা ধড়াস করে উঠল স্বপনের। মা যেন মনের জোর ফিরে পেয়েছে। গলার জোরও তাই অনেক বেশি।
মেয়েটার দোকানের দিকে আঙুল দেখিয়ে স্বপনের মা চিৎকার করতে শুরু করল।
"কী সব্বনাশ! একটা মুসলমান মেয়ে নিজের পরিচয় গোপন করে ব্যবসা করছে । ছি ছি....আবার ঢং করে ঠাকুরপুজো করে! "
সঙ্গে সঙ্গে লোক জড়ো হয়ে গেল । মাকালীর গলায় টাটকা জবাফুলের মালার দিকে অবাক হয়ে তাকিয়ে থাকল অনেকেই।
মেয়েটা যখন জল আনতে গিয়েছিল তখন বাচ্চাটাকে চেপে ধরেছিল স্বপনের মা। "ওই মেয়েটা তোর কে হয়? সত্যি করে বল। "লজেন' দেব।"
লজেনের লোভে নাকি স্বপনের মায়ের উগ্রচণ্ডী রূপ দেখে বাচ্চাটা ভয় পেয়ে বলে ছিল "আমার আম্মু হয়। "
ব্যাস! তারপর থেকে নাটক শুরু হয়েছিল। অনেকেই মজা নিচ্ছিল নাটকের। নীলু ঘুগনি আর আলুরদমে গোপন গুঁড়ো মশলটা ছড়িয়ে দেওয়ামাত্র, দর্শকরা খদ্দের হয়ে গিয়ে চিল্লামিল্লি করতে শুরু করল।
"এই আমাকে বেশি করে লঙ্কা দাও।"
কেউ বলে উঠল "কাঁচা পেঁয়াজ দেবে না। অল্প ধনেপাতা দাও।"
"আর একটু বীটনুন দাও না! পাউরুটি দুটো বেশি কড়া করে সেঁকে দাও।"
ভিড়ের ভেতর থেকে এক মধ্যবয়সী মহিলা বলে উঠলেন খাবারের আবার হিন্দু মুসলমান ! যত্তসব!
আজকের মতো এত খারাপ বিজনেস কোনোদিন হয়নি। স্বপনের মায়ের মাথায় হাত। অর্ধেকের বেশি খাবার পড়ে রয়েছে। যে সময় দোকানের পাট চুকেবুকে যায় সেই সময়টাতে স্বপন আর তার মা মুখ কালো করে দোকানে বসে মাছি তাড়াচ্ছে। এমন সময় নীলু তাদের দোকানের সামনে এসে দাঁড়াল। স্বপন কী করবে কী বলবে বুঝতে না পেরে বোকার মতো হাসলো। বলল "রোজ ঘুগনি আর আলুরদমের হেবি গন্ধ ছাড়ে। "
মেয়েটার মুখে ম্লান হাসি। বলল "আমার স্বামী যখন মেরে আমার পা টা ভেঙে দিয়েছিল, এই হাসপাতালে ডাক্তার দেখাতে আসতাম। তখন চরণকাকুর সঙ্গে আলাপ হয়েছিল। আমার দুঃখ কষ্টের কথা জেনে কাকুই আমাকে দোকানটা ভাড়া নেওয়ার কথা বলেন। উচ্চমাধ্যমিক পাশ আমি। রান্নাটাও ভালো পারি। তাই কাকুর পরামর্শেই এই দোকান।কাকুই নিজের পরিচয় গোপন রাখতে বলেছিলেন। বলেছিলেন মন্দিরের পাশে দোকান, মুসলমান জানলে হয়তো কিছু সমস্যা হলেও হতে পারে!
আমি যখন প্রতিদিন কালীঠাকুরকে মালা পরাই,মনে মনে বলি রাগ কোরো না ঠাকুর। তুমি তো সবই জানো! তোমার কাছে তো কোনো ভেদ নাই! আমি যে মন নিয়ে নামাজ পড়ি,সেই মন দিয়েই তোমাকে মালা পরাই।"
স্বপন চুপ করে শুনছিল। স্বপনের মা বলল "যাই বল না কেন পরিচয় লুকিয়ে বিজনেস করা পাপ। তুমি পাপ করেছ।"
মেয়েটি বলল "কাল থেকে আর পাপ করব না। যে ছেলেটা সাইনবোর্ড লেখে,তাকে ডেকে লিখিয়ে নেব নিলুফা ফাস্ট ফুড সেন্টার। আর কালী ঠাকুরের গলায় এতদিন যেমন মালা পরাচ্ছিলাম,ধুপ জ্বালছিলাম, সেটাও বন্ধ হবে না।"
কথাগুলো ব'লে মেয়েটা একহাতে ফাঁকা ডেগচি আর অন্য হাতে বাচ্চাটাকে ধরে খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে রিক্সাস্ট্যান্ডের দিকে এগিয়ে গেল। শুধু স্বপন আর তার মা- ই নয়,কৌতূহলী জনতা এবং বাকি দোকানদাররাও তার চলে যাওয়া দেখতে লাগল অনেকক্ষণ ধরে।
( একদা এই সময় পত্রিকার রবিবারোয়ারি - তে প্রকাশিত)
No comments:
Post a Comment