শূকর গরু দুটি পশু/খাইতে বলেছেন যিশু।
তবে কেন হিন্দু মুসলমান/পিছে তে-হটাই।।
-লালন ফকির
ভারতে গো-হত্যার জন্য বহু দাঙ্গা হয়েছে। ভারতে এখন গরুকে দেবতার মর্যাদা দেয়া হয়। হিন্দু ধর্মের ইসকনপন্থীরা মাংস খাওয়ার বিরুদ্ধে। জৈনরাও মাংস খাওয়ারই বিরোধীতা করে। বৌদ্ধরা জীবন্ত প্রাণী হত্যারই বিরুদ্ধে। ইহুদীরা শূকর খায় না। আবার খ্রিস্টানরা খাওয়ার কারণ হল: শয়তান নাকি একটি শুকরের শরীরে লুকিয়ে ছিল। তাই শূকরকে খেয়ে শয়তানকে বধ করার জন্যই তারা শূকরকে মজা করেই খায়। ভারতে জরাথ্রুস্টরা গরু খায় না কেবল হিন্দুদের ভয়েই। পারস্যে থাকাকালীন তারা গরু ঠিকই খেতো। পারস্য থেকে তারা ভারতে আশ্রয় নেয়ার সময়ই কিছু বিষয় মেনে নেয়। শূকরের পায়ের খুর দ্বিখণ্ডিত এবং সে চিবিয়ে খাবার খায়। তারপরেও সেমিটিক ধর্মে নিষিদ্ধ কেন? কোরআনে সরাসরি শূকর খাওয়া নিষিদ্ধ করেছে। একসময় খ্রিস্টান ধর্মেও নিষিদ্ধ ছিল। মূলত শূকর নোংরায় থাকে বলেই নিষিদ্ধ। শূকর নিয়ে কিছু প্রচলিত ধারণাও রয়েছে যে, এগুলো খেলে বিভিন্ন রোগ হতে পারে। এখন শূকর খামারে উন্নত প্রযুক্তিতে চাষ করা হয়। গরু, ছাগল ও শুকরের মাংস প্রায় একই রকম। ইসলামে দাঁত বিশিষ্ট হিংস্র পশু খাওয়া হারাম। বাঘ-সিংহ, নেকড়ে-হায়েনা, চিতা-জাগোয়ার, হাতি-ঘোড়া, কুকুর, শিয়াল, বিড়াল, কুমির, কচ্ছপ, সজারু, বানরসহ অনেক প্রাণিই ইসলামে খাওয়া নিষিদ্ধ বা হারাম। নখ দিয়ে শিকার করে এমন পাখি পাওয়াও নিষিদ্ধ। প্রাণির রক্ত খাওয়াও ইসলামে হারাম। বন্য প্রাণী খাওয়া নিষিদ্ধ মন্দ নয়। এখন যে প্রাণী খাওয়া বৈধ সে প্রাণীই তত বেশি টিকে আছে। এখন পৃথিবীতে মুরগীর সংখ্যা বিপুল। মানুষের তিনগুণ মুরগী রয়েছে পৃথিবীতে। যদি মুরগী খাওয়া নিষিদ্ধ থাকতো তবে এতো মুরগী পৃথিবীতে থাকতো না। ভারতে এভাবে গরু খাওয়া নিষিদ্ধের ফল হল আগামী ২০ বছরে ভারতে গরুর সংখ্যা মারাত্মকভাবে কমে যাবে। কারণ এখন চাষেও ষাঁড় লাগে না। কেবল দুধের জন্য গরু পাললে তাতে দুধের দাম অনেক বেড়ে যাবে। গরু খাওয়া গেলে দুধ দেয়ার শেষ হলে কসাইর কাছে বিক্রি করলে কৃষক লাভবান হতো। এতে ভারতের কৃষকগণ গরু পালাই ছেড়ে দিবে। মুসলিমদের জন্য চিংড়ি ও কাঁকড়া খাওয়া মাকরুহ। চিংড়ি ও কাঁকড়া মাছ নয়, আর্থ্রোপোডা পর্বের একটি প্রাণী। বাজারে মাছের মতোই চিংড়ি মাছ হিসেবেই বিক্রি হয় এবং মানুষের চিংড়ি খাওয়া নিয়ে কোন সামাজিক বাধা নেই। মুসলিমরা সাধারণত কাঁকড়া খাওয়া এড়িয়ে চলে। চিংড়ি খাওয়া গেলে কাঁকড়া খাওয়ায় সমস্যা কি? এটাকে প্রথা বলতে পারি। আর্থ্রোপোডা পর্বের বহু প্রাণীই মুসলিমরা খায় না। প্রথা তৈরিতে দুর্ভিক্ষ অনেক দেশে ভূমিকা রেখেছে। চীনারা অনেক কিছুই খায়। এর কারণ হল বিপ্লব পূর্ববর্তী সময়ে চীনে নিয়মিত মারাত্মক দুর্ভিক্ষ হতো এবং খাবারের অভাবে মানুষ সব প্রাণীই খাওয়ার অভ্যাস করে নিয়েছিল। আঞ্চলিক কারণেও খাদ্যাভ্যাস গড়ে উঠে। যেমন বাংলাদেশে কুইচ্চা/কুচিয়া সাধারণত খায় না কিন্তু জাপানিদের প্রিয় খাবার কুচিয়া। মুসলিমরা কুকুর খাওয়ার কথা ভাবতেই পারে না। কিন্তু চীন-কুরিয়ায় সবচেয়ে দামি মাংশের নাম কুকুরের মাংস!
ধর্মগুলোতে পশুপাখি পালন নিয়েও নানা ফ্যাকড়া আছে। ইসলামে ঘরে কুকুর রাখা নিষিদ্ধ, শখ করে কুকুর পালাও নিষিদ্ধ। সহিহ বুখারি শরিফ এর হাদিস নং ৫৫২৫ এ বলা আছে, ‘যে ঘরে কুকুর আছে, সে ঘরে রহমতের ফেরেশতারা প্রবেশ করেন না।’ আর কুকুরের লালা যেহেতু নাপাক, তাই কোনো পাত্রে কুকুর মুখ দিলে তা তিন বা সাতবার ধৌত করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এ নির্দেশের পেছনে তাদের যুক্তি হল— প্রথমত, কুকুরের মধ্যে শয়তানের প্রভাব বেশি। তাই আজানের সময় কুকুর আওয়াজ করে। দ্বিতীয়ত, কুকুর পচা ও নিকৃষ্ট খাবার খায়, যেখানে-সেখানে অশ্লীল কাজে লিপ্ত থাকে, খেলাধুলা ও দৌড়ের ওপর থাকে এবং খাবার দেখলে লালায়িত হয়। মহান রাব্বুল আলামীন নিজেই কুকুর ও শূকর সৃষ্টি করেছেন আবার নিজেই এদের নিন্দা করছেন। এদের চরিত্রটা একটু বদলে দিলেও পারতেন। তবে মানুষ ব্যাতিত সকল প্রাণীই প্রকাশ্যেই সেক্স করে। সাপ, ব্যাঙ, ঘোড়া ইত্যাদিরতো সেক্স করার জন্য গোপন কক্ষ নেই, অমন বোধও নেই। আল্লাহ পাক আবার একটি কুকুরকে বেহেস্তেও পাঠাবেন। আমরা জানি ইসলামের দৃষ্টিতে মানুষ ব্যতিত ১০টি প্রাণি বেহেস্তে যাবে। যথা: হযরত সালেহ আ এর উটনি, ইব্রাহিম আ এর গো শাবক, ইসমাইল আ এর দুম্বা, মুসা আ এর গাভী, ইউনুস আ এর মৎস, উযাইর আ এর গর্দব, সুলাইমান আ এর পিপিলিকা, বিলকিস রাণীর কাছে পাঠানো হুদহুদ পাখি, হযরত মুহাম্মদ স এর হিযরতের বাহন উষ্ট্রী এবং আসহাবে কাহাফের সঙ্গী কুকুর।
হিন্দুরা গরু খায় না, মুসলিমরা কচ্ছপ খায় না৷ ইহুদীরা আঁশ ও পাখনাযুক্ত মাছ খেতে পারে, অন্য মাছ নিষিদ্ধ৷ মুসলিম, ইহুদী, শিখসহ অনেক ধর্মেই শূকর খাওয়া নিষিদ্ধ৷ শূকর জন্মের সেমিটিক গল্প হয়তো আপনারা জানেন৷ নূহ নবীর নৌকায় সমস্ত প্রাণীর মলমূত্রের দুর্গন্ধে টেকা যাচ্ছিল না৷ তখন নবী আল্লাহর কাছে পানা চান৷ আল্লাহ নবীকে হাতির কপালে হাত রাখতে বলেন৷ হাত রাখার সাথে সাথেই হাতির নাক দিয়ে দুটো শূকর বের হয়ে মল খেয়ে সাবার করে দেয়৷ এরপর শয়তান হাতির কপালে হাত রাখলে দুটি ইঁদুর বের হয়ে নৌকার কাঠ কেটে ফুটু করতে থাকে৷ এবার নবী আল্লাহর নির্দেশে বাঘের মাথায় হাত রাখলে দুটি বেড়ালের জন্ম হয়৷ বিড়াল ইঁদুর মেরে নৌকা রক্ষা করে। ইসলাম ও ইহুদি ধর্মে শূকর, বেড়াল, বাঘ ও ইঁদুর খাওয়া নিষিদ্ধ!
প্রকৃত পক্ষে হিন্দুদের প্রধান ধর্মগ্রন্থ এবং মহাকাব্যগুলিতে গোহত্যা কিংবা গোমাংস খাবার বিরুদ্ধে কোন নিষেধাজ্ঞা নেই। প্রকৃত ঘটনা প্রাচীন বৈদিক যুগ থেকে মধ্যযুগ পর্যন্ত গরুর মাংস খাওয়া ভারতবর্ষে বহুল প্রচলিত ছিল। হিন্দু শাস্ত্রের কিছু উদাহরণ তুলে দেই জয়ন্তানুজ বন্দোপাধ্যায়ের ‘মহাকাব্য ও মৌলবাদ’ গ্রন্থের ১৬৪ ও ১৬৫ পৃষ্ঠা থেকে-
ঋগ্বেদ সংহিতায় অগ্নি কাছে প্রার্থনায় ‘গাভীদের খণ্ড খণ্ড করে ছেদন’ করবার উল্লেখ করা হয়েছে। অন্যত্র ইন্দ্রের কাছে প্রার্থনা করা হয়েছে, ‘তুমি আমার জন্যে পনের-কুড়িটি বৃষ রান্না করে দাও, আমি তা খেয়ে আমার উদরের দুদিক পূর্ণ করি, আমার শরীর স্থূল করি। ’ইন্দ্রের কাছেই প্রার্থনায় আরেক জায়গায় বলা হয়েছে, ‘গোহত্যাস্থানে যেমন গরুরা হত হয়, আমাদের শত্রু রাক্ষসেরা তেমনি যেন তোমার অস্ত্রের দ্বারা নিহত হয়ে পৃথিবীতে শয়ন করে।’ অগ্নির কাছে প্রার্থনায় বলদ, ষাঁড় এবং দুগ্ধহীনা গাভী বলিদানের উল্লেখ আছে। ঋগ্বেদ সংহিতার সুপ্রসিদ্ধ বিবাহসূক্তে কন্যার বিবাহ উপলক্ষে সমাগত অতিথি-অভ্যাগতদের গোমাংস পরিবেশনের জন্য একাধিক গরু বলি দেবার বিধান আছে।
অর্থববেদ সংহিতায় একই বিধান আছে। তাছাড়া ঘোড়ার মাংস এবং মোষের মাংস খাবার উদাহরণ ঋগ্বেদে সর্বত্র ছড়িয়ে আছে।
শতপথ ব্রাহ্মণে ঋষি যাজ্ঞবল্ক্যের অনুশাসন উল্লেখ করে বলা হয়েছে যে গরুর মাংস যদি নরম হয় তবে তা খাওয়া যেতে পারে।
তৈত্তিরীয় ব্রাহ্মণে শুধু যে গোহত্যার নির্দেশ দেয়া হয়েছে তাই নয়, কোন দেবতার কাছে কি ধরনের গরু বলি দিতে হবে তাও বিধিবদ্ধ করা হয়েছে। বিষ্ণুর জন্য ছোট ষাঁড়, ইন্দ্রের জন্যে বাঁকা শিংযুক্ত বলদ, পূষনের জন্য কালো গরু এবং রুদ্রের জন্য লাল গরু বলি দেবার বিধান দেয়া হয়েছে।
বৃহদারণ্যক উপনিষদের একটি শ্লোক: কোন ব্যক্তি যদি এমন পুত্র লাভে উচ্ছুক হন, যে পুত্র হবে প্রসিদ্ধ পণ্ডিত, সভাসমিতিতে আদৃত, যার বক্তব্য শ্রুতিসুখকর, যে সর্ববেদে পারদর্শী এবং দীর্ঘায়ু, তবে তিনি যেন বাছুর অথবা বড় বৃষের মাংসের সংগে ঘি দিয়ে ভাত রান্ন করে নিজের স্ত্রীর সংগে আহার করেন। বৃষমাংস বিরিয়ানীর মতো রান্না করে রাখতে নির্দেশ দেয়া হয়েছে।
বৈদিক সাহিত্যের অন্তর্গত গৃহ্যসূত্রগুলিতেও গরুবলি এবং গোমাংস ভক্ষণের সুস্পষ্ট নির্দেশ আছে। অধিকাংশ গৃহ্যসূত্রে ব্রাহ্মণ, আচার্য, জামাতা, রাজা, স্নাতক, গৃহস্থের প্রিয় অতিথি অথবা যে কোন অতিথির জন্যেই মধুপর্ক অনুষ্ঠানের বিধান আছে। আর সেই অনুষ্ঠানে গোমাংস পরিবেশন করাই ছিল সাধারণ বিধান ও রীতি। এই লোকাচার এমন ব্যাপক ও বাধ্যতামূলক হয়ে দাঁড়িয়েছিল যে আশ্বলায়ন গৃহ্যসূত্রের বিধান অনুযায়ী বাড়িতে অতিথি এলে গরুদের বাঁচাবার জন্য ছেড়ে দেয়া হতো যাতে অতিথিরা মনে করে যে, বাড়িতে গরু নেই। রুদ্রের উদ্দেশ্যে বৃষ বলি দেবার এবং সে বলির মাংস ভক্ষণ করবার সুস্পষ্ট এবং বিস্তারিত বিধান দেয়া হয়েছে। বলা হয়েছে যে, এভাবে বৃষমাংস ভক্ষণ করলে নানাভাবে ভাগ্যেদয় হবে। বিত্ত, জমি, পবিত্রতা, পুত্র, গবাদি পশু, দীর্ঘ আয়ু এবং ঐশ্বর্য লাভ হবে। একই রকম বিধান আছে, আপস্তম্ভ গৃহ্যসূত্র, পারস্কর গৃহ্যসূত্র এবং হিরণ্যকেশী গৃহ্যসূত্রতে। হিরণ্যকেশী গৃহ্যসূত্রে গরু বলি দিয়ে সে মাংস রোস্ট করে ঘি এবং ভাতের সংগে মিশিয়ে প্রয়াত পূর্বপুরুষদের উৎসর্গ করতে নির্দেশ দেয়া হয়েছে।
আরো অসংখ্য উদাহরণ দেয়া যেতে পারে। তাহলে ভারতের নাগরিকগণ গরু খাওয়া বাদ দিলো কেনো? স্পষ্ট কারণ রয়েছে। অতিরিক্ত গরু ভক্ষণের ফলে ভারতে গরু অতিমাত্রায় কমে যায়। এতে দুধ উৎপাদন ও কৃষিকাজ মারাত্মকভাবে ব্যহত হয়। এ থেকে নিষ্কৃতিলাভের জন্যই গোহত্যা নিষিদ্ধ করে সেটাকে ধর্মীয় বিধান হিসাবে চালিয়ে দেয়া হয়। মানুষ হয়তো সাধারণ নির্দেশ মানতো না কিন্তু ধর্মীয় নির্দেশ মনে করে তারা মেনে নেয়।
পৃথিবীতে ৪৩০০টি ধর্মের মধ্যে বিস্ময়কর একটা পার্থক্য যে, একেক ধর্মে একেকটা খাওয়া নিষিদ্ধ। এখন মুসলিমরা শূকর খাওয়ার বিরুদ্ধে যে যুক্তিগুলো দেয় ঠিক একই যুক্তি দেয় হিন্দুরা গরু খাওয়ার বিরুদ্ধে। লালনের মতো আমারও প্রশ্ন? যিশু শূকর ও গরু খেতে বলেছে কিন্তু মুসলিমরা শূকর ও হিন্দুরা গরু খাওয়ার কথা শুনলে কেন আঁৎকে উঠে? কেবলই ধর্মীয় ও প্রথাগত কারণেইতো! এমন নিষিদ্ধের কারণে সাধারণ মানুষইতো আমিষ হতে বঞ্চিত হচ্ছে। দক্ষিণ এশিয়ার মানুষ এখনো পৃথিবীর সবচেয়ে কম মাংস খাওয়াদের অন্যতম। এসব বিধিনিষেধ না থাকলে মানুষের আমিষ খাওয়া বাড়তো এবং তারা আরেকটু সুস্থ ও সবল থাকতো।
No comments:
Post a Comment