গরল রাজ্যের রাজকুমারী ছিল বড়ই রূপসী। বিয়ের বয়স হতে না হতেই তার জন্য তাই দেশ-বিদেশ থেকে প্রস্তাব আসতে শুরু করলো। কিন্তু রূপে-গুণে অনন্যা সে রাজকুমারীর জন্য যোগ্য পাত্র কাউকেই পাওয়া গেল না। এমনি করেই দিন কেটে যায়, রাজকুমারীর বয়স বাড়ে আর বাড়তে থাকে রাজা-রানীর কপালে দুশ্চিন্তার রেখা। কেননা সে সময়ে মেয়ের বিয়ে দেয়াটা ছিল বাবা-মায়ের বিশাল এক চিন্তা।
কর্ণফুলীর অপর প্রান্তে যে রাজ্যটি ছিল, তার নাম জানা নেই। তবে গল্পের সুবাদে তাকে নাম দেয়া যায় ‘অমৃত’। সে রাজ্যেও ছিল এক সুদর্শন রাজপুত্র, যার বিয়ের জন্য তার বাবা-মা পাত্রীর খোঁজ করছিলেন।
রাজ্য দুটি শুনতে অনেকটা কাছে মনে হলেও মাঝখানের নদীটি তাদের আলাদা করে রেখেছিল। তাই বিবাহ অভিযানে এ দুইজনের সাক্ষাৎ ঘটেনি। এদিকে দুই রাজ্যের আচার-আচরণ, সংস্কৃতি, নিয়ম-কানুন সবই ছিল বেশ আলাদা।
একদিন সেই অমৃত রাজ্যের রাজকুমার নৌবিহারে বেরোলো কর্ণফুলীতে। আর ভাগ্যের কী খেলা, ঠিক সেই সময়েই গরল রাজকুমারী সখীদের নিয়ে স্নান করছিল নদীর ঘাটে। চোখে চোখ পড়তেই দুজন দুজনকে মন দিয়ে বসলো। নদীর ধারের সুমধুর হাওয়া বয়ে নিয়ে গেল প্রেমের বার্তা।
এরপর থেকে রাজকুমার প্রায়ই নৌবিহারে এই সময়ে এদিকটায় আসতে থাকলো। আর রাজকুমারীও রাজকুমারের অপেক্ষায় স্নানটান রেখে নদীর ধারে দাঁড়িয়ে থাকতো। যতদিন গেল, রাজকুমারীর রূপে রাজকুমার আরো বেশি মুগ্ধ হলো। একদিন আর থাকতে না পেরে বাড়ি ফিরে সে তার বাবাকে বললো, “বাবা, আমার একটি মেয়েকে বড় মন ধরেছে। সে গরল রাজ্যের রাজকুমারী। তাকে আমি বিয়ে করতে চাই। তুমি জলদি সেখানে দূত পাঠাও।” কিন্তু অমৃত দেশের রাজার জাত ছিলেন গরল দেশের রাজায় চেয়ে উঁচু। অহঙ্কারেও সে কম যায় না। ছেলের এমনতর কথায় যেন তেলে-বেগুনে তেতে উঠলেন।
“অমন ছোট জাতে আমার ছেলের বিয়ে? কোনোভাবেই সম্ভব না।”
তবে রানী জাতপাত অত মানতেন না। তিনি কোনোমতে রাজাকে বুঝিয়ে-শুনিয়ে রাজি করলেন গরল রাজ্যে বিয়ের প্রস্তাব পাঠাতে। ওদিকে গরল রাজা জাতে ছোট হলে কী হবে, তারও মেজাজ বড় চড়া। তিনি ওই রাজ্যের রাজাকে খুব একটা দেখতে পারতেন না। তাই অপমানের সুযোগ পেয়ে তিনিও ছাড়লেন না। খুব করে কথা শুনিয়ে ফেরত পাঠালেন অমৃত রাজ্যের দূতকে।
মান-অপমানের এই খেলায় দুই তরুণ মনের প্রেম খুব একটা সুবিধা তো করতে পারলই না, ওদিকে দুই রাজ্যের অহঙ্কারে কঠিন যুদ্ধ বেঁধে যাওয়ার উপক্রম হলো। তবে যুদ্ধের কথায় ভয় পেলেন গরলরাজ। সত্যি বলতে, অত বড় রাজ্যের সঙ্গে যুদ্ধ করে তিনি পেরে উঠবেন না। তখন আবহাওয়া একটু ঠাণ্ডা হলো। ছেলের বাড়ি থেকে আবার এলো বিয়ের খবর। তবে এবারেও গরলরাজ সহজে ছাড়লেন না। এ দফা বিয়েতে রাজি হলেও জানিয়ে দিলেন তার শর্ত,
“বিয়ের পর অমৃত রাজপুত্রকে এক বছর থাকতে হবে গরল রাজ্যে। তারপর বর-কনে যেখানে খুশি যাক, আমি কিছু বলব না।”
ছেলের মুখ চেয়ে অগত্যা রাজি হলেন অমৃত রাজাও। মোটামুটি ভালোভাবেই শেষ হলো বিয়ের কাজ। কিন্তু বিয়ের কিছুদিন পর বাঁধলো এক বিপত্তি। অমৃত রাজপুত্রের কনে, গরল রাজকুমারীকে কোথাও খুঁজে পাওয়া গেল না। অনেক জায়গায় লোক লাগিয়েও যখন পাওয়া গেল না, তখন সকলে ভাবলো, সে বুঝি মারা গেছে।
কিন্তু হারিয়ে যাবার তিন তিনদিন পর সবাইকে চমকে দিয়ে সম্পূর্ণ ভিজে শরীর নিয়ে নদী থেকে উঠে এলো রাজকুমারী। তবে কানে নেই তার কানের দুটি দুল, যে দুল তাকে বিয়ের সময় রাজকুমার উপহার দিয়েছিল। দুলের খবর জানতে গেলে সে বলে, “সে তো নদীর জলে হারিয়ে গেছে।”
কর্ণফুল হারিয়ে গেল যে নদীতে, তার নাম দিল রাজকুমার— কর্ণফুলী।
এতদিন পর বউকে ফিরে পেয়ে রাজকুমার তো আনন্দে পাগলপ্রায়। কিন্তু রাজকুমারীর মধ্যে কিছু একটা বদল এসেছে। কী বদল, সে বুঝতে পারে না। শুধু বোঝে, রাজকুমারী কিছু একটা লুকোচ্ছে। এতদিন কোথায় ছিল— কী করেছে, এ নিয়ে প্রশ্ন করলেই সে চুপ। কিছুই বলে না। ওদিকে রাজকুমারের সন্দেহও বাড়ে। মাঝে মাঝেই সে রাতে ঘুম ভেঙে দেখে, রাজকুমারী পাশে নেই। এরকম বেশ কিছুদিন যাবার পর রাজকুমার বউকে চেপে ধরলো।
“তুমি কি দুশ্চরিত্রা হয়েছ? সত্যি করে বলো প্রায় রাতে তুমি কোথায় যাও। আর নয়তো আমি ফিরে যাব আমার রাজ্যে।”
তখন অগত্যা বিপদে পড়ে রাজকুমারী সব কথা খুলে বলে,
“যেদিন আমি হারিয়ে যাই, নদীর ঘাটে একা একা স্নান করতে গেছিলাম সেদিন। সাথে ছিল না কোনো সখী। যেমনি জলে ডুব দিলাম, কে যেন আমাকে টেনে নিয়ে গেল এক বিশাল প্রাসাদে। সে প্রাসাদ একেবারে সমুদ্রের তলায়। সে যে জলপরীর প্রাসাদ গো! আজ যাকে দেখলে, এই মেয়েটিই আমার সেই বন্ধু জলপরী। এ ক’দিন তার প্রাসাদে আমাকে কী যে আপ্যায়ন করেছে, তা আর বলার নয়। আমরা দুজনে এখন প্রাণের সখী। তাই মাঝে মাঝে সে আমার কাছে আসে, দুজনে মিলে সুখ-দুঃখের কথা কই। এই দুটি প্রবাল পাথর দিয়ে গেছে, দুটোয় মিলে ঘষা দিলেই জলপরী আমার খবর পেয়ে যায়।”
“সবই বুঝলাম, কিন্তু এসব কথা এতদিন আমায় বলোনি কেন?”
“কী করে বলি— সখী যে আমায় মানা করে দিয়েছিল। সে বলেছিল, কাউকে বললেই ক্ষতি নিশ্চিত। আজ তুমি দেখে ফেললে নির্ঘাৎ, তাই বলতে হলো।”
এত কথা শোনার পরও অবশ্য রাজকুমারের মন থেকে সন্দেহ গেল না। আদতে সে তার বাবারই ছেলে। মনে মনে অহঙ্কার আর কূটবুদ্ধি আছে।
তাই এক রাতে সে রাজকুমারীর পিছু নিল। চাঁদনি রাতে সে গিয়ে দেখে, কর্ণফুলী নদীর ঘাটে রাজকুমারী বসে আছে। আর তার পাশে অপূর্ব সুন্দরী এক জলপরী। দেখে মনে হলো, বহু পুরনো দুই সখী চাঁদের আলোয় গল্প করছে। জলপরীর রূপ তো আর কোনো মানবীর সাথে মেলানো যায় না। তার রূপের আলো যেন চাঁদকেও হার মানাচ্ছে। আর সে রূপে অমৃত রাজকুমার একেবারে ডুবে গেল। বউকে তার আর ভালো লাগলো না।
সবকিছু দেখেশুনে এইবেলা রাজকুমার মনে মনে ফন্দি আঁটলো। যে করেই হোক প্রবাল দুটো হাত করতে হবে। এই প্রবাল দিয়েই তাকে পৌঁছুতে হবে রূপসী জলপরীর কাছে। কিন্তু রাজকুমারী কিছুতেই প্রবাল দুটো হাতছাড়া করবে না। বারবার তাকে হুমকি দেবার পরও কান্নাকাটি করে সে একটা কথাই বলে,
“এ প্রবাল তোমাকে দিলে তুমি ধ্বংস হয়ে যাবে। নিজের বিপদ নিজেই কেন ডেকে আনতে চাইছ?”
এসব কথা শুনে রাজকুমারের মাথায় আরো জেদ চেপে যায়। রাগের চোটে সে খাপ থেকে তলোয়ার বের করে এক কোপে রাজকুমারীর মাথা ফেলে দেয়। এরপর প্রবাল নিয়ে পাগলের মতো ছুটে যায় নদীর ঘাটে। বারবার ঘষতে থাকতে প্রবাল পাথরগুলো। ওমনি বিশাল জোয়ারের মধ্য দিয়ে উদয় হয় রাজকুমারীর সখী জলপরী। রাজকুমার এতটাই উন্মাদ হয়ে উঠেছিল যে সে জোরপূর্বক জলপরীকে তুলে নিয়ে যায়। ঘোড়া ছুটিয়ে সে রাতেই সে জলপরীসমেত পালিয়ে যায় নিজের রাজ্যে। কিন্তু যতই সে প্রাসাদের দিকে আগায়, ততই তার মনে হয় নদীর জল তার পেছনে ছুটছে। রাজকুমারের চোখের সামনে হারিয়ে যায় তার রাজমহল, রাজ্য, পরিবার, প্রজা সবকিছু। চাঁদের আলোয় ভেসে আসা সেই জলের জোয়ার ভাসিয়ে নেয় তাকেও। সত্য হয় রাজকুমারীর কথা। জলপরী প্রতিশোধ নেয় তার সখীহত্যার। আর এমনি করে ছোট্ট নদী বেড়ে উঠে বিশাল কর্ণফুলী হয়ে।
সময়ের গহ্বরে হারিয়েছে রাজা-রাজ্য, লোভ ও পাপের কথা— সবই। জনশ্রুতি থেকে জানা যায়, যে ঘাটে রাজকুমারী স্নান করতো— সে ঘাট নাকি বর্তমানে ধলঘাট। কে জানে, কতটা সত্যি— কতটা কল্পনা। তবে গল্পের রাজ্যে অমৃত-গরল, সবই এখন জল্পনা।
No comments:
Post a Comment