Friday, October 3, 2025

লুনেটিক

 


ইংরেজী লুনি বা লুনেটিক, যার অর্থ ছিটগ্রস্ত বা বিকারগ্রস্থ, শব্দটা এসেছে ইংরেজি শব্দ লুন থেকে যেটা আবার এসেছে ল্যাটিন শব্দ লুনা থেকে যার অর্থ চন্দ্র বা চাঁদ। বহু প্রাচীন দার্শনিক, চিকিৎসক, এমনকি মহাজ্ঞানী আ্যারিস্টটলও বলেছেন পুর্নিমা কিছু মানুষের পাগলামী বৃদ্ধি করে। এক আধুনিক মনোবিজ্ঞানী তত্ত্ব হাজির করেছেন (জর্নাল অব অ্যাফেক্টিভ ডিসর্ডার, ১৯৯৯) যে চন্দ্রের কলা বাইপোলার ডিসঅর্ডার যাদের আছে তাদের উপর প্রভাব ফেলে। সম্প্রতি প্রভাবশালী বিজ্ঞান সাময়ীকি সায়েন্টিফিক আমেরিকানের 'লুন্যেসি অ্যান্ড দ্য ফুল মুন', ফেব্রুয়ারী, ২০০৯ প্রবন্ধে বিষয়টাকে স্বীকার না করলেও একেবারে উড়িয়ে দিতে পারেনি।

লেখক হুমায়ুন আহমেদ জোছনা খুব ভালবাসতেন। সেই জোছনা তাঁর উপর কি প্রভাব ফেলত জানি না, তবে তাঁর জনপ্রিয় চরিত্রগুলো যে চন্দ্রপ্রভাবযুক্ত বা লুনি ছিল তা অস্বীকার করার কোন উপায় নাই। তাঁর ভক্তদের অনেকের ক্রিয়াকলাপ দেখেও সংক্রমিত চন্দ্রপ্রভাবের কথাই কেন যেন মনে আসে।
কয়েকদিন আগে এক ফেসবুক বন্ধু আমার একটা পোস্ট এ মন্তব্য করলেন "ভাই, গত কয়েকদিন ধরে আমি আপনার পোস্টগুলো গভীরভাবে অনুসরণ করছিলাম, এমনকি মন্তব্যগুলোও। সেগুলো পড়ে আমারও ঠিক একই ভাবনা হয়েছে। এমন (বিকারগ্রস্থ) মানুষদের সাথে কীভাবে যুক্ত থাকবো, যাতে মনের ভেতরের শান্তি যেন নষ্ট না হয়?" তাঁর মন্তব্যটির যদিও একটা স্ট্রাটেজিক উত্তর আমি দিয়েছিলাম যে এই সময় কি করতে হবে। তবে তাঁর কথাটির মধ্য যে অন্তর্নহীত প্যারাডক্স, সেটির গভীরতাকে অস্বীকার করার উপায় নেই। অর্থাৎ আমি আমার অনেক পোস্টে যা বলছি, আর আমার অবস্থানের বিপরীতে দাড়িয়ে যারা কথা বলেন - এই দুটি বক্তব্যকে তৃতীয় কোন ব্যক্তির পক্ষে সুস্থ মস্তিষ্কে গ্রহণ করা সম্ভব না।
আজকের যে লাঠি, চাপাতি হাতে শিক্ষিত তরুণেরা মব সন্ত্রাসী, যাদের দেখে জাতি স্তম্ভিত, তার ভিত্তি কিন্তু জীবন শুরুই হয় নি এমন অনভিজ্ঞ তরূণ তরুণীদের মধ্যে ব্যাপক অন্ধ ধর্মবিশ্বাস। কিন্তু এই অন্ধ ধর্মবিশ্বাসের আগে তাদের ছিল জীবনের অনেক জটিল বিষয় সম্পর্কে স্রেফ অন্ধবিশ্বাস। শিক্ষা, ক্রিকেট, প্রেম, সমাজ, সরকার সবকিছু সম্পর্কে অন্ধবিশ্বাসকে জিয়িয়ে রাখার একটি নতুন সংস্কৃতি শুরু হয়েছে আমাদের।
এই সন্ত্রাসী তরূণ তরুণীদের পিতা মাতাদের মধ্যেই তুমুল জনপ্রিয় হুমায়ুন, মিলনেরা। এই জাতীয় লেখকেরা চিন্তা করে আবেগ দিয়ে। তাঁরা তাঁদের লেখায় জীবনের জটিলতাকে উপস্থাপিত করেন সস্তা আবেগ দিয়ে। এদের পাঠকেরাও চিন্তা করে আবেগ দিয়ে। এই হালকা আবেগনির্ভর সংস্কৃতি তৈরী করে জীবনের জটিল বিষয় সম্পর্কে সরল অন্ধবিশ্বাস। যেমন "পুলিশ খারাপ", "সরকার অথর্ব", "রাজনিতীবিদেরা চোর", "ভারত সব দখল করে নিচ্ছে", "পশ্চিমারা ফেরেশতা" ইত্যাদী। এই সরল অন্ধবিশ্বাসীরা যখন জীবনে প্রথমবার কোন অস্তিত্বের সংকটে পড়ে, তখন সে নিজেকে সমর্পিত করে ধর্মীয় বা অন্য কোন অন্ধবিশ্বাসে।
কিন্তু এই সরল অন্ধবিশ্বাসের কারণটি কি? কারণটি বিমূর্ত বিষয় নিয়ে চিন্তা ভাবনায় অক্ষমতা। জীবনের বাস্তবতার গভীর ও জটিল বিষয় সম্পর্কে ধারণা করতে তল না পাওয়া। তখন উপায় হল চিন্তা ভাবনায় সমাপ্তি টেনে প্রচলিত অন্ধ চিন্তায় বিশ্বাস স্থাপন করা। এটিই হল মস্তিষ্কের কগনিটিভ অক্ষমতা বা বিষয়ভিত্তিক ছিটগ্রস্থতা। এই অক্ষমতা সত্ত্বেও কোন কারিগরী বিষয়ে বা উচ্চতর পড়াশোনায় বিশেষ করে শিক্ষক হিসাবে বা লেখাজোখায় এরা চরম সাফল্য লাভ করতে পারে, যেখানে জটিল বিমূর্ত বিষয়ের চর্চা হয় না।
কোন কোন ব্যক্তির ক্ষেত্রে এই আংশিক ছিটগ্রস্থতা প্যাথলজিক্যাল, মানে মস্তিষ্কের ভৌতিক ত্রুটি। কিন্তু ভয়ের বিষয় হচ্ছে সম্পুর্ন সুস্থ মস্তিষ্কের মানুষও এই আংশিক ছিটগ্রস্থতায় সংক্রমিত হতে পারে যদি আংশিক ছিটগ্রস্থদের সাথে দীর্ঘ সময় সে বাস করে। তার কগনিটিভ প্রচেষ্টা (অন্তর্গত চিন্তা) যদি মুল্যায়িত না হয়, নিজস্ব ভিন্ন চিন্তার কারণে তাকে যদি নিয়মিত হেয়, উপহাস করা হয়, তাহলে সে ভিন্ন ও যৌক্তিক চিন্তা ভাবনা বন্ধ করে দিতে পারে এবং তার মধ্যে তৈরী হতে পারে ঐ একই আংশিক ছিটগ্রস্থতা যেটি তার কমিউনিটির মধ্যে প্রভাব বিস্তারকারী। তখন তার হয় ঐ সমাজ ত্যাগ করতে হয় অথবা বেছে নিতে হয় একাকী বিচ্ছিন্ন বুদ্ধিবৃত্তিগত এক সংগ্রামী জীবন - যেটা সবার পক্ষে বহন করা কঠিন। এভাবেই আমাদের মূলধারা শিক্ষা, বুদ্ধিচর্চা এবং সংস্কৃতি জগতও হয়ে যেতে পারে ছিটগ্রস্থতা থেকে অন্ধ ধর্মবিশ্বাসের জন্মস্থান।
“It is the very error of the moon.
She comes more near the earth
than she was wont. And makes
men mad.”
—William Shakespeare, Othello

Sirajul Hossain

No comments:

Post a Comment