অনেক বাধা বিপত্তি পেরিয়ে মানুষের উত্তরণের পথ, শুরু থেকেই ক্ষুধার জন্য হাহাকার, খাদ্যকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠে দল, শিকার করা বস্তুটিকে সবাই মিলে ভাগ করে খাওয়ার ব্যবস্থা, বিচিত্র অভিজ্ঞতা জন্ম দেয় নানান সংস্কার, ভয়। প্রাকৃতিক সম্পদকে রক্ষা করার জন্য নানান প্রথার উৎপত্তি, গড়ে ওঠে বিশ্বাস, গড়ে ওঠে দেবতা। শুরুতে অরণ্য, শিকার ছিলো খাদ্যের উৎস, কালক্রমে কৃষিকেন্দ্রিকতা মানুষের জীবন গড়ে ভাঙে। খাদ্যকে মানুষ সমাদর করেছে তাই সবচেয়ে বেশি, ঈশ্বর রূপে দেখেছে, তাইতো কৃষিকেন্দ্রিক উৎসব দেশ কালের সীমানা ছাড়িয়ে সর্বত্র।
আমাদের দেশে প্রধান খাদ্যশস্য হলো ধান, নব অন্ন, নতুন খাদ্য। প্রাচীন কালে অগ্রহায়ণ পৌষে ধান উঠলে হতো নতুন বছর বা অগ্র হায়ণ।
মৈমনসিংহ-গীতিকায় পাওয়া যায় -
পঞ্চগাছি বাতার ডুগল
হাতেতে লইয়া
ধানের গাড়ি মাঠ থেকে ঘরমুখো
মাঠের মাঝে যায় বিনোদ
বারোমাস্যা গাহিয়া।
বাতা গাছের পাঁচটি ডগা আর উপাচার সাজিয়ে কৃষক ধানের ডগা বেঁধে শুরু করেন ক্ষেত্রলক্ষ্মী পুজো।
মানুষের বিশ্বাসে, ধর্মে, লোকাচারে৷ কাব্যে৷ উপন্যাসে, লৌকিক বাগধারায় ধানের কথা আসে, যুগে যুগে। আর আমরা তো ভেতো বাঙালি, যাদের সন্তানের মুখে প্রসাদের নাম মুখে ভাত, নতুন বঁধু এলে বৌ ভাত। অন্নদামঙ্গলের সেই বর চাওয়া - আমার সন্তান যেন থাকে দুধেভাতে। শিশুর জন্মের পরে ধান, তাকে ধান দিয়ে আশীর্বাদ করা হয়, অন্নপ্রাশনের ভাত, বিবাহের সময় কনকাঞ্জলিতেও চাল, ভাত কাপড়ের অনুষ্ঠানেও ভাত, মৃত্যতে খই। জীবনের মূল্য ধানে, চালে। আর তাইতো জাপানিদের তোয়তা হলো ধান ভরা মাঠ।
মিগের বাতের পর নিড়েন, গাভর, ডাক সংক্রান্তি, মুঠ আনা, হালকাটা, দাওন ইত্যাদি পেরিয়ে আসে নবান্নের দিন। সকাল ত্থেকেই ব্যস্ততা ঘরে ঘরে, ইষ্টদেবতাকে প্রসাদ নিবেদন, চাল গোলা লবান, তাতে নতুন চাল বেটে, গুড়, আখ, ফল, মুলো, মটরশুঁটি, কমলা, বেদানা, নারকেল, ডাবের জল কত কি। এরপর দুপুরের পালা, নতুন সেদ্ধ চালের ভাত, নয় রকম ভাজা, আখ ভাজা, নতুন সবজি পাতি, জলপাই কি মুলোর টক, পায়েস। বাস্তু ভোগ নিবেদিত হয় পূর্ব পুরুষের উদ্দেশ্যে, কাকবলি প্রথায়।
কাকের উদ্দেশ্যে খাবার দিয়ে ছোটোরা ছড়া কাটে
কো কো, আমাগো বাড়ি শুভ নবান্ন
শুভ নবান্ন খাবা কাকবলি লবা।
পাতি কাউয়া লাথি খায়।
দাঁড় কাউয়া কলা খায়।
কো কো কো
মোরোগো বাড়ি শুভ নবান্ন।
পরেরদিন বাসি লবান, বাড়ির সবার বিশ্রাম, অরন্ধন, ঘুরে ফিরে আগের দিনের রাঁধাবাড়া খাওয়া।
নবান্ন হলো ধরিত্রীমাতার প্রতি, অন্নের প্রতি, খিদের প্রতি কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন, শিকড়ের প্রতিও। কারন অন্নই ব্রক্ষ্ম।
No comments:
Post a Comment