Thursday, November 27, 2025

ইসলাম পালন ও কায়েম এই দুটি বিষয় একদমই আলাদা

 



গান না গাওয়া হচ্ছে ‘ইসলাম পালন’। আর কাউকে গান গাইতে না দেয়া হচ্ছে ‘ইসলাম কায়েম’। দুটো ভিন্ন জিনিস। কায়েম অর্থ প্রতিষ্ঠা করা। এগুলো বুঝেন না সাধারণ মানুষ। যখন বলা হবে নামাজ কায়েম করুন তখন এর অর্থ হচ্ছে সবাইকে বাধ্যতামূলক নামাজ পড়তে বাধ্য করবে। আর আপনি যখন নামাজ পড়ছেন তা হচ্ছে ইসলাম পালন। যেমন যাকাত দেয়া ইসলাম পালন। কিন্তু কেউ যাকাত দিতে অস্বীকার করলে তখন জোর করতে হবে এটাকে বলে যাকাত কায়েম করা। আবু বকরের সময় যখন মুসলমানরা যাকাত দিতে অস্বীকার করেছিল তখন আবু বকর সেনাপতি খালিদ বিন ওয়ালিদকে পাঠান এই বিদ্রোহ তরোয়াল দিয়ে দমন করতে। আবু বকর তো পরকালে যাকাত না দেয়ার জন্য সাজা পাবে এই আশায় বসে থাকেননি।

ইসলামে নারীদের পর্দা করা ফরজ ও এটা করা মানে ইসলাম পালন। কিন্তু কোন মুসলিম মেয়ে পর্দা করতে না চাইলে মানে বোরখা হিজাব পরতে না চাইলে ইসলাম কায়েম করতে তাকে বাধ্য করা হবে। আবার ধরেন, কেউ মনে করে ইসলামে বাউল গান জায়েজ, গান বাজনা জায়েজ সেটা তার ধারণা। সে ইসলামকে এমন বলেই মনে করে। কিন্তু কে কি মনে করলো তাতে ইসলামের কিছু যায় আসে না। ইসলাম এমন না যে, তুমি গান শোনো এটা তো হারাম, এ জন্য পরকালে তোমার কানে সীসা ঢেলে দিবো...। এ পর্যন্ত ঠিক ছিল। কিন্তু ইসলাম তা বলে না। পরকালে সাজা তোলা রইল, কিন্তু জমিনে ইসলাম কায়েম করতে হবে। মানে গান শুনতে দিবো না। গাইতে দিবো না। মদ খাওয়া হারাম এটুকু বলেই ইসলাম থামে না। বলে ক্ষমতা থাকলে মদের দোকান ভেঙে ফেলবে। ইসলাম পালন ও কায়েম এই দুটি বিষয় একদমই আলাদা এবং দুটিই ইসলামের অংশ। এই যে কনে ও তার মা বাবাকে বেত মেরেছে এটা ইসলাম কায়েম করা। চারপাশে যা ঘটতে দেখছেন সব ইসলাম কায়েমের অংশ।
এর কি কোন সমাধান নেই? আছে। খুব সহজ। পুরো বিষয়টাই রাষ্ট্র খুব সহজে করতে পারে। রাষ্ট্র নিশ্চিত করবে যে যার মত করে ইসলাম পালন করতে পারবে কিন্তু কেউ ইসলাম কায়েম করতে পারবে না। কারণ

বাংলাদেশ কোন ইসলামী রাষ্ট্র না। এখানে কোন ইসলামী আইনে চলে না। বাংলাদেশ চলে ধর্মনিরপেক্ষ দেওয়ানী ফৈজদারী আইনে। কাজেই এখানে ইসলাম কায়েমের কোন সুযোগ নেই। যে কায়েম করতে যাবে তাকে ফৈজদারী আইনে আটক করে বিচার নিশ্চিত করতে হবে। ইসলামী শাসনন্ত্র বা খিলাফত কায়েমের কোন ঘোষণা বা কোন দলের ভবিষ্যত লক্ষ্য যদি হয় তাহলে কোন গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে এটা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। কারণ এটা গণতন্ত্রকেই উত্খাত করার কথা বলছে। রাষ্ট্র এগুলো নিশ্চিত করলে যে গান শোনা হারাম মনে করবে সে সেটা করবে না। কিন্তু কোথাও গানের অনুষ্ঠান হলে সে সেখানে বাধা দিতে পারবে না। কেউ পর্দা পালন করুক সমস্যা নেই, কিন্তু পর্দা করার জন্য কাউকে ফোর্স করা যাবে না।
এবার দেখুন কী অবস্থা, এনায়েত আব্বাসী ফরহাদ মজহারকেই হত্যার হুমকি দিয়েছে। মজহার ফেইসবুকে পোস্টে জানিয়েছেন আব্বাসীর হুমকির পর তাকে ফোনে হত্যার হুমকি দেয়া হচ্ছে। এর পরিপ্রেক্ষিতে ফরহাদ মজহার ইসলামের উপর যে পোস্ট লিখেছেন তা বিকৃত অসত্য। সেটা নিয়ে আলাদা পোস্ট লেখা যেতে পারে। লিখবো কিনা ভাবছি। কিন্তু ফরহাদ মজহারকে হত্যার ঘোষণা কোন মুফতি দিতে পারেন না কারণ এটা ইসলামী রাষ্ট্র না। ফরহাদ মজহার মবকে কিছুদিন আগে উলঙ্গভাবে সাপোর্ট করে গেছেন যখন সেগুলো আওয়ামী লীগের উপর ঘটছিল। আজ উনার উপর হত্যার জন্য মব উশকে দেয়া হচ্ছে। শেষ পর্যন্ত ফরহাদ মজহার নিজেকে বাঁচাতে বাংলাদেশের প্রচলিত ফৈজদারী আইনের দোহাই দিয়ে আব্বাসীকে সাবধান করেছেন। মানে উনি ঠেকায় পরে আর ইসলামের দোহাই দেননি, দিচ্ছেন বৃটিশদের বানানো ধর্মনিরপেক্ষ আইনের!
দেখুন, দেড় বছর আগে ক্ষমতা পরিবর্তনের পর সর্বপ্রথম হিন্দুদের উপর এই উগ্রপন্থীরা যখন হামলা করেছিল তখন আপনারা সেটাকে ‘রাজনৈতিক হামলা’ বলে উগ্রপন্থীদের ইনডিমিনিটি দিচ্ছিলেন। মেঘমল্লার বসু তার নিজ সম্প্রদায়ের উপর হামলাগুলোকে ভারতের রিপাবলিক টেলিভিশনে লাইভে এসে অস্বীকার করে গেছেন। প্রথম আলো এগুলোকে ভারতের প্রোপাগন্ডা বলে গেছে। আজ দেখুন পালা গানের ইস্যুতে সেই উগ্ররা কাদের হত্যার হুমকি দিচ্ছে? মেঘমল্লার বসু কি নিরাপদ থাকবে আজহারী আব্বাসী চ্যালাদের থেকে? যে ফরহাদ মজহার হেফাজত ইসলামের ১৩ দফাকে সাপোর্ট করেছিলেন, সেই ১৩ দফাই আজ তার উপর প্রয়োগ করতে চাচ্ছে! আজকে এনায়েত আব্বাসী বিএনপির মির্জা ফকরুলের উপর গোস্বা হয়েছেন। অথচ বিএনপি দুদিন আগে উগ্রদের খুশি করতে কুরআন সুন্না বিরোধী সব আইন বাতিলের ঘোষণা দিয়েছে। আপনারা আবুল সরকারের মুক্তি চাচ্ছেন কিন্তু চিন্ময় কৃষ্ণ দাসের মুক্তি চাচ্ছেন না- মানে আপনারা বাংলাদেশকে সবার মনে করেন না। কাজেই আবুল সরকার বা বাউলদের জন্য যারা কথা বলছেন তারা কেবল বাউলদেরই স্বাধীনতা চান। ফলে এখন যারা বাউল বিরোধী তারা চুপ আছে বা বিরোধীতা করছে কাল তারা নিজেরাই অন্য ইস্যুতে ফেঁসে যাবে। কারণ ‘কায়েম’ এটি ভয়াবহ ফ্যাসিজম। অন্যায় কেবল আবুল সরকারের সঙ্গে হয়নি, চিন্ময় কৃষ্ণের সঙ্গেও হয়েছে। এখনো সময় আছে সবার জন্য স্বাধীনতা চান। সবার জন্য।

No comments:

Post a Comment