একটু মানিয়ে নিতে হয় শ্বশুর বাড়িতে! ওতো কথায় কথায় রাগ করলে হবে না! তুই তো জানিস তোর ঠাকুমা কি অত্যাচার টাই না করেছে! " - পাশের ভদ্রমহিলা বলেই যাচ্ছে। সাতটা পয়ত্রিশের কৃষ্ণনগর খুব ভিড় ছিল না বলে ভালো একটা বসার জায়গা দখল করে বসতে পেরেছি।একটু ঘুমাবো ঠিক করেছি হঠাৎ পাশে এমন একটা কথা শুনে চোখ জুড়ে আসা ঘুমটা চটকে গেল।" মানিয়ে নেওয়া!" - যুগের পর যুগ চলে আসা একটা পরিচিত শব্দ। সেই বোরোলিন থেকে বাপুজি কেক খানিকটা সেরকম। ছোট বেলায়ও শুনেছি এখনও শুনছি। সাধারণত মা বা মাতৃস্থানীয় মানুষদের থেকেই শোনা যায় এই কথা গুলো।
এক্ষেত্রেও বোধহয় ভদ্রমহিলা মা ই হবে।পাশে ওনার মেয়ে আর জানলার কাছের ক্ষুদে টা বোধহয় নাতনি। তিন প্রজন্ম একসাথে।
" মানিয়ে নিবি তবেই সংসার শান্তির হবে। রূপাঞ্জন সারাদিন অফিস করে ফেরে তখন যদি দেখে মা বৌয়ের অশান্তি -ওর ভালো লাগে!"
ভদ্রমহিলার কথা ওনার মেয়ে কতটা মনে নিচ্ছে সেটা শ্রোতা হয়ে আমার পক্ষে বোঝা সম্ভব নয়!দেখে মনে হচ্ছে মেয়েটি আমার বয়সিই হবে, বা কিছুটা কম। খুব মিষ্টি করে সেজেছে। একটা লম্বা বেণী, হলুদ রঙয়ের শাড়ি সাথে গাঢ় নীলের ব্লাউজ।
নীল রঙ নিজে চাপা হলে কি হবে রূপ খুলে দেয় আশপাশের রঙয়ের ।তাই বোধহয় নীল হলুদে মাখামাখি মেয়েটিকে আরও সুন্দর লাগছে দেখতে। আর সেটা মেয়েটি বোধহয় নিজেও জানে তাই হাবেভাবে প্রচন্ড আত্মবিশ্বাস।
" শাশুড়ি তো বলবেই! বয়স হলে এমনি মানুষ খিটখিটে হয়ে যায়! আর তোর শাশুড়ি তো আমার থেকে অনেক বড়!হাতে পায়ে জোর কমে এসেছে!"- ভদ্রমহিলা বলেই যাচ্ছেন। উনি বোধহয় পরিবারের একমাত্র বক্তা।
" হুম হাতে পায়ে জোর কমে এসেছে শুধু জোর আছে মুখের। মুখের সাথে যদি হাত পা সবে জোর থাকতো! বুঝতাম! এই যে সারাদিন বাদে বাড়ি যাবো গিয়ে দেখবো কিচ্ছু রান্না নেই। খাবার নেই। আমি গিয়ে রান্না করলে তবে খাওয়া জুটবে! সকালেও সকালের খাবার, দুপুরের খাবার সব করে এসেছি! সব করে আর সেজেগুজে আসতে ইচ্ছেই করছিলো না। মান্তু মাসিকে তো বললাম বুকানের আইবুড়ো ভাতটায় আমায় বাদ দাও! একদম বিয়ের দিন রাতে যাবো!"
মেয়েটি ফোনের দিকে তাকিয়েই বলে যাচ্ছে কথা গুলো। আজ বাড়ি গিয়ে সব কাজ সেরে আবার কাল বিয়েবাড়ি।ছেলে মা কারোরই রান্নার লোকের রান্না পছন্দ না। আসলে বৌ খাটলেই খুশি!"
অভিমানী গলা মেয়েটার।" এটা তো করতেই হবে। আর রান্নার লোকের রান্না খাওয়া কি ভালো? আর তুই তো বাড়িতেই থাকিস!" ভদ্রমহিলার কথায় আমি বাধ্য হয়ে সরাসরি তাকালাম। বোঝার চেষ্টা করলাম সৎ মা কি!
" সেটাই তো ভুল করেছি চাকরিটা ছেড়ে! কি বলতো দিনের শেষে কখনো আমারও ইচ্ছে করে অন্তত একটা দিন শুয়ে বসে থাকতে। " - মেয়েটির মুখ কিন্ত নীচের দিকে, মোবাইলে আটকানো। কিন্তু মাকে উপেক্ষা করছে না। সব কথা গুলো মন দিয়ে শুনে উত্তর দিচ্ছে।
" মনে রাখবি ওটা তোর সংসার আর সেটা আগলে রাখার দায়িত্ব তোর! তোর জন্মের সময় আতুর উঠতে না উঠতেই আমি রান্নাঘরে ঢুকেছি!" ভদ্রমহিলা আবার বলে উঠলেন। মেয়েটা সরাসরি এবার মায়ের দিকে তাকিয়ে খুব আস্তে করে বললো " তাই কি তুমি আমার এই পরিস্থিতি দেখে শান্তি পাচ্ছ! মানে নিজের সাথে হওয়া ঘটনা মেয়ের সাথেও হয়েছে এটা তোমার বেশ লাগছে বোধহয়!"
মেয়েটি মুখ তুলতে আমি দেখলাম ওর মুখটা। কি অপূর্ব চোখ গুলো কিন্তু সেটা কানায় কানায় ভর্তি। বুঝতে পারলাম এই দুঃখটা আরও মারাত্মক। বিশ্বের সবার সাথে লড়াই করা যায় কিন্ত নিজের মা! হুম ভদ্রমহিলা তো নিজেরই মা সেরকমই তো বললেন মেয়েটির হওয়ার সময়কার আতুরের গল্প ঠাকুমার গল্প।
তাহলে সেই মা এতো নির্মম কেন! আজকাল মেয়র মায়েরা খুব চালাক। তাঁরা না পারতে মেয়ের সংসারে ঢোকে না। উটকো ঝামেলা মনে করে কিন্তু এই ভদ্রমহিলা তেমনটাও নয় উনি বেশ অন্যরকম। বোঝা যাচ্ছে উনি মেয়ের সব দুঃখ শোনেন কিন্তু রায়টা মেয়ের বিপক্ষেই দেন।
আমি আবার ভদ্রমহিলার দিকে তাকালাম। মেয়ের কথা গুলো শুনে ওনার চোখ দুটি গোলগোল হয়ে গেছে। মেয়ে কিভাবে এই কথাটা বলতে পারে সেটাই হয়তো ভাবছেন। ট্রেন বলে হয়তো খুব বেশী প্রতিবাদী হলেন না।
শুধু আলতো রাগী গলায় বললেন " এরকম কথা এরকম শিক্ষা জানিনা মেয়েটা কেমন তৈরী হবে। আমার শিক্ষা ভালো ছিল তাই তুই এখনও ওখানে আছিস! যেভাবেই হোক করছিস তোর যা শিক্ষা তোর মেয়ে তো মোটেই মানবে না কারোকে।
" আমি চাইও না মেয়েটা আপোষ করতে শিখুক! আমি চাই ও প্রতিবাদ করুক! নিজের সম্মান টুকু ভালোটুকু বুঝে নিক!" - মেয়েটি বলতেই আরও রেগে গেলেন ভদ্রমহিলা, বললেন -"তাহলে আর কি বাড়িতে মেয়ের জন্য একটা ঘর রেখে দিস। এরকম শিক্ষার মেয়েরা বরের ঘর করতে পারেনা। যে মা এই শিক্ষা দেয় যে প্রতিবাদ করবি, মানিয়ে নিবি না! সেসব বাচ্চাদের এটাই হয়!"
দেখলাম মেয়েটি চোখ বন্ধ করে নিলো। তারপর মাকে বললো " হিসেব করো! ৫০০ টাকা নাচে, ৩০০ টাকা ক্যারাটে, ৫০০০ টাকা স্কুলে, ৩০০ টাকা আঁকা, তারপর সুইমিং টা এক কালিন তাই বাদ দিলাম!"
এইটুকু বলেই থামলো মেয়েটা।" হিসেব করলে? আচ্ছা দাঁড়াও আমি বলছি ছ হাজার একশো! মেয়ে সবে ক্লাস টু। যতদিন যাবে এটা বাড়তে থাকবে। এবার বলো এতগুলো টাকা খরচ করে মেয়েকে মানুষ করছি মানিয়ে নেওয়ার জন্য! " বলেই মেয়েটি মুচকি হাসলো।
ভদ্রমহিলা চুপ। " আরে ভাই এতো টাকা খরচ করলাম আমাদের কিছু দিতে হবে না কিন্তু তার বিনিময়ে ও নিজের ভালো থাকা টুকু তো কিনে নিক! নাহলে কিসের শিক্ষা!"
" খরচ কিন্ত আমরাও করেছি তোর জন্য। মাস্টার্স এমনি এমনি হোস নি!" - বুঝলাম ভদ্রমহিলা প্রসঙ্গ বদলে জেতার চেষ্টা করছে। " আমি কৃতজ্ঞ তার জন্য। অনেক খরচ করেছো শিক্ষিত করেছো কিন্তু আসল শিক্ষা টুকু দিতে পারোনি। " মেয়েটি আরেকবার তাকালো মায়ের দিকে।
না আর জল নেই চোখে বরং অনেকটা আগুন আছে তাতে।" মা কিসের শিক্ষা বলতে পারো যদি আত্মরক্ষাই না হলো! না আমার শ্বশুর বাড়ির কেউ আমার গায়ে হাত তোলে না কিন্ত মানসিক ভাবে আমি ভালো নেই মা। আরও খারাপ লাগে যখন তুমি আমায় বলো মানিয়ে নে!" আবার গলাটা ধরে আসছে মেয়েটার। মা জায়গাটাই যে বড্ড আবেগ প্রবণ জায়গা
" মা তুমি চাও আমি ভালো থাকি, সুখে সংসার করি। মিমি দিদির মত ডিভোর্স না হয়! কিন্তু এটা কি বেঁচে থাকা!" - বলেই উঠে পড়লো মেয়েটা তারপর জানলার পাশে বসা বাচ্চা মেয়েটাকে টেনে এগিয়ে গেল।
"আরে সবে তো বেলঘরিয়া!" ভদ্রমহিলা বললেন। মেয়েটা বললো " আমি আগরপাড়া নেমে অটো নিয়ে নেব। তুমি সাবধানে সোদপুর নেমে যেও।
" তোর তো সোদপুর নেমেই কাছে হোত!' ভদ্রমহিলা বললেন ঠিকই কিন্তু মেয়েটি ততক্ষনে এগিয়ে গেছে নামবে বলে। ভদ্রমহিলার মুখখানি লাল। দেখে মনে হচ্ছে উনি বেশ কষ্ট পাচ্ছেন। মেয়ের দুঃখে কষ্ট পেয়েছেন উনি। কিন্তু সেটা মনে আনেন নি বা মেয়েকে আস্কারা দেন নি পাছে মেয়ের সংসার ভেঙে যায়! মেয়ে আবার ফিরে আসে! কি জবাব দেবেন উনি! সবাই তো মেয়েকে অশিক্ষিত বলবে!
ওনাকে দেখে আমার সেরকমই মনে হলো! ইচ্ছে হচ্ছে বলি কাকিমা চিন্তা করবেন না মেয়েকে দারুন শিক্ষিত করেছেন। মানিয়ে তো ততক্ষন নেওয়া যায় যতক্ষণ ক্ষমতা থাকে। সংসার মানে সবার আপোষ করা!ব্যক্তি বিশেষে নয়! কিন্ত সাহস পেলাম না কারণ উনি ওনার জায়গা থেকে নড়বেন না পাছে হেরে যান!
এটাই কথা সংসার মানে হার জিৎ নয় বরং মিলেমিশে মানিয়ে নেওয়া।
No comments:
Post a Comment