চার বছর আগে লিখেছিলাম যে নিশ্চিত মৌলবাদের পথে বাংলাদেশ শুধু প্রয়োজন হবে উপরে স্তরে একটি ছোট্ট বিপ্লবের। সেটি এখন সময়ের ব্যাপার মাত্র। যার কারণ যারা রাজনীতি করছে তারা আর রাজনীতি বোঝে না আর যারা শাসনকার্য পরিচালনা করছে তারা আইন বোঝে না।
-
যে সমাজে জনগণ পড়ে রাজা, রানী, সভাসদ, কোটাল সিপাহিদের সেবা করা পিয়ন সুইপারের দলে, যারা মাথার ঘাম পায়ে ফেলে কাজ করে কর দিয়ে রাজ্যের খরচ যোগাবে। থাকবে দাসের মর্যাদায় এবং তাতে কোন ব্যত্যয় হলে গর্দান যাবে। সবচেয়ে বড় শাস্তি হবে যারা এই ব্যবস্থার সমালোচনা করবে তাদের। রাষ্ট্রের চিত্রটি যদি এমনই থেকে যেত আমরা এতটা শঙ্কিত হতাম না। মেনে নিতাম নিয়তিকে। পৃথিবীতে মানব সমাজ এমনভাবে চলেছে হাজার হাজার বছর। কিন্তু বর্তমান সময়ে মানুষের মন অস্থির। তারা অযৌক্তিক কিছু মেনে নিয়ে চলতে পারে না।
ইতিহাস বলে আধুনিক যুগে এই রাজতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থার উত্থান কোথাও ঘটলেও সেটা একটি রূপান্তরের প্রক্রিয়া বা ট্র্যানজিশন মাত্র। বর্তমান সময়ে মানুষ রাজার রাজতন্ত্র আর মেনে নেয় না প্রাথমিক কল্পনাবিলাস বা ইনফ্যাচুয়েশন কেটে গেলে। তারা নিজেদের জন্যই চায় মানবোত্তর কিছু, মানুষের চেয়ে ঊর্ধ্বে যার অবস্থান, বাস্তবে অথবা কল্পনায়।
ঠিক এমনটিই ঘটেছিল বিপ্লব পূর্ব সোভিয়েত সমাজে এবং প্রথম বিশ্বযুদ্ধ পরবর্তি জার্মানিতে। একদিকে শাসকদের আর এলিট সমাজের যথেচ্ছাচার আর অপর দিকে সাধারণ মানুষের ন্যায়বিচার আর ন্যায্যতার জন্য হাহাকার।
এই দুটো সমাজেই তাই শাসক হিসাবে মানুষদের ত্যাগ করেছিল তারা। রাশিয়ানরা বেছে নিয়েছিল একটি অর্থনীতির তত্ত্বকে আর জার্মানেরা বেছে নিয়েছিল একটি সাইকোপ্যাথিক মেশিনকে যারা একটি বিশুদ্ধ মহান জাতি তৈরীর স্বপ্ন দেখিয়েছিল ইউজিনিক্স আর ইউবোট তৈরী করে।
এই উভয় দেশই ছিল বিজ্ঞান, প্রযুক্তি এবং প্রকৌশল বিদ্যায় দক্ষ। আমরা তো সেটাও নই। আমাদের মত দেশে, যেখানে বেশিরভাগ মানুষ মানুষ আগে থেকেই মানুষের চেয়ে ঈশ্বরের পথকেই বড় মনে করে, সেই সব দেশে যখন এমন সামরিক রাজতন্ত্র কায়েম হয়েছে তার পরিণতি হলো অবাধারিত ধর্মীয় মৌলবাদ।
এর সাম্প্রতিক উদাহরণ পাকিস্তান, আফগানিস্তান, ইরান। পাকিস্তানে ১৯৫৮ সাল থেকে আয়ুবিয় সামরিক রাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। আফগানিস্তানে ছিল তার আগে থেকেই এক রাজা, যে নিজের দেশকে আমেরিকা বানাতে চেয়েছিল। ইরানে ছিল রেজা শাহ্ এর আমল, যে ভাবত ইরান ইউরোপে অবস্থিত, ইরানে সে একজন ইউরোপিয় সম্রাট।
বাংলাদেশের মৌলবাদী রাষ্ট্রে পরিণত হওয়া তাই অবধারিত। আর সেটির কারণ বিদেশের ইসলাম, আমেরিকার ভূরাজনীতি বা আইসিস -আলকায়েদা নয়, সেটির কারণ হবে পাকিস্তান, আফগানিস্তান বা ইরানের মতই শাসকগোষ্ঠীর জনবিচ্ছিন্নতা ও আইনের ঊর্ধ্বে অবস্থানের ফল।
সমস্যা হচ্ছে একবার মৌলবাদে রূপান্তরিত হয়ে গেলে বর্তমান দুনিয়ায় এর থেকে ফিরে আসার কোন উদাহরণ নেই। পাকিস্তান, আফগানিস্তান, ইরানের দিকে তাকালেই আমরা বুঝতে পারব। এর কারণ হল জ্ঞান ও গণতন্ত্র নির্ভর যে ইউরোপীয় সমাজ, যারা পুরো দুনিয়াকে একটি ইতিবাচক অধিকার নির্ভর মুক্ত সমাজ নির্মানের পধ দেখিয়েছিল। আমেরিকার প্রভাব সেটাতে কালিমা লেপে তার চোখ অন্ধ করে দিয়েছে। বর্তমান সময়ে মানুষের সামনে আর কোন পথ খোলা নেই নিজস্ব মানে মুক্তি ও গণতন্ত্র নির্মান ছাড়া। যেমনটি দেশে হয়েছিল ১৯৭১ সালে।
কেন আমরা ৭১ এর সেই আলো ফেলে অবধারিতভাবে এই অন্ধকার পথে এগোচ্ছি? এর কারণ যারা রাজনীতি করছে তারা আর রাজনীতি বোঝে না। তারা আসলে রাজনীতিবীদ নয়। তারা চাকর নফরের মানসিকতার। তারা নতজানু মানসিকতার। মানুষের অধিকার তারা বোঝে না। তারা চায় কাউকে খুশি করতে। তারা যেন রাজনৈথি করে কাউকে এটা দেখাতে যে তারা পারে। আর যারা শাসনকার্য পরিচালনা করছে তারা আইন বোঝে না। তাই আইন মানে না, নিজেদের তারা আইনের ঊর্ধ্বে মনে করে।
প্রশাসনিক মৌলবাদ যখন প্রতিষ্ঠিত হয়ে যায়, তখন সেটা রাষ্ট্রকে প্রস্তুত করতে থাকে ধর্মীয় মৌলবাদের জন্য। অস্ত্র, পোশাক, পদ-পদবী দ্বারা সংবিধান ও আইনকে অবজ্ঞা করে যে প্রশাসনিক মৌলবাদের চর্চা এখন তুঙ্গে, এটা প্রতিষ্ঠিত হয়ে গেলে ধর্মীয় মৌলবাদের শাসনের ইনফ্রাস্ট্রাকচার তখন তৈরী। এর পরে শুধু প্রয়োজন হবে উপরে স্তরে একটি ছোট্ট বিপ্লবের। সেটি এখন সময়ের ব্যাপার মাত্র।
অনেকদিন থেকেই বোঝার চেষ্টা করছিলাম যে আফগানিস্তানে কেন তালেবানেরা এত দ্রুত বিজয় লাভ করল। ঠিক এই ঘটনাটাই সেখানে ঘটেছে। এটা নিয়ে গবেষণা করতে গিয়ে দেখলাম পুরো ইসলামের ইতিহাসই তাই। যতদিন নবী মুহম্মদ বেঁচে ছিলেন, ইসলাম তেমন একটা বিস্তার লাভ করেনি। অথচ তাঁর মৃত্যুর পর এটা বিশাল এলাকায় বিস্তার লাভ করেছে খুব দ্রুত।
এর কারণ ইসলামের উৎকর্ষতা ততটা নয়, যতটা যে দেশগুলোতে এটা ছড়িয়েছে সেই সমাজগুলোর ন্যায়বিচার ও মানবাধিকারের পতন। রোমের পতনের পর ক্রমেই ইউরেশীয়াব্যপী রোমান শাসনের অংশগুলো শাসক ও তাদের নিকটস্থ এলিটদের অবিচার, সেচ্ছাচারিতা এবং আইন বহির্ভূত কার্যকলপে পরিপুর্ণ হয়ে ওঠে।
শাসক ও তাদের নিকটস্থ এলিটেরা ক্রমেই চলে যায় আইন কানুনের বাইরে আর জনগনের উপর চলে কঠোরতম আইন প্রণয়ন করে দুঃশাসন। এই নিষ্পেষণে মানব শাসকদের উপর বিশ্বাস হারায় মানুষ তাই তারা কামনা করতে থাকে মানমানবোত্তর কোন আইন, হয় সেটা হিটলার-মুসেলিনির ফ্যাসিবাদ, অথবা মার্কস-লেনিনের সমাজতন্ত্র অথবা ইসলামী শরীয়া।
মৌলবাদকে রোধ করার জন্য তাই শিক্ষা বা অস্ত্র কোন কাজ করে না, কাজ করে ন্যায়বিচার ও মানবাধিকারের চর্চা। এ দুটোরই চরম পতন হয়েছে এবং হচ্ছে বাংলাদেশে। এভাবে চলতে থাকলে নিশ্চিত মৌলবাদের পথে বাংলাদেশ কারণ অবকাঠামো প্রস্তুত।
©Sirajul Hossain
No comments:
Post a Comment