সম্প্রতি ঢাকা আতংকিত হয়েছে একাধিক ভূ-কম্পনে। আতংকের যৌক্তিক কারন হচ্ছে ভূমিকম্পের কেন্দ্র ঢাকার খুব কাছাকাছি। যে অঞ্চলে এপিসেন্টার চিহ্নিত হয়েছে তার কাছাকাছি আবার বাংলার এখন পর্যন্ত প্রাপ্ত সবচেয়ে প্রাচীন নগরীর ধ্বংসাবশেষ। বর্তমান নরসিংদী জেলার বেলাবোতে আবিস্কৃত ওয়ারি বটেশ্বর- শুধু একটি নগরীর ধ্বংসাবশেষ নয়, দুর্গ নগর ভিত্তিক সভ্যতারও চিহ্ন।
প্রত্নতাত্ত্বিক প্রমাণ অনুযায়ী, এই নগরীর উদ্ভব ঘটেছিল খ্রিস্টপূর্ব প্রথম সহস্রাব্দের শুরুর দিকে, সম্ভবত খ্রিস্টপূর্ব ৮০০ থেকে ৪০০ সালের মধ্যে। এই সময়কালটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, কারণ আর্য বা বৈদিক সংস্কৃতি তখনো পূর্ববঙ্গে পৌঁছায়নি। আর্যরা খ্রিস্টপূর্ব ১৫০০-১২০০ সালের দিকে উত্তর-পশ্চিম দিক দিয়ে ভারত উপমহাদেশে প্রবেশ করে এবং দীর্ঘ সময় ধরে পাঞ্জাব, হরিয়ানা ও পশ্চিম উত্তরপ্রদেশ অঞ্চলে অবস্থান করে। গঙ্গা অববাহিকার ওপর তাদের প্রভাব প্রতিষ্ঠিত হতে সময় লেগেছিল বহু শতাব্দী, এবং পূর্ববঙ্গে তাদের সাংস্কৃতিক উপস্থিতি দেখা যায় আরও পরে, সম্ভবত খ্রিস্টপূর্ব ৩০০-২০০ বছরের দিকে। ফলে স্পষ্ট যে ওয়ারি-বটেশ্বরের নির্মাণ ও বিকাশের সময়টি আর্য প্রভাব পূর্ববঙ্গে পৌঁছানোর আগের, এবং এ কারণে এটি একেবারে মৌলিক, স্বতন্ত্র, অনার্য সভ্যতার প্রতিনিধিত্ব করে।
প্রত্নতাত্ত্বিক খননে পাওয়া নিদর্শনগুলো এ ধারণাকে আরও দৃঢ় করে। এখানে পাওয়া গেছে সুরক্ষিত নগরপ্রাচীর, পরিকল্পিত আবাসিক এলাকা, শিল্পকারখানা, লোহার সরঞ্জাম, পাথরের তৈরি মনোরম পুঁতি , টেরাকোটা এবং প্রচুর পাঞ্চ-মার্কড কয়েন। এগুলো প্রমান করে যে এখানে এক সুসংগঠিত অর্থনীতি, কারুশিল্পভিত্তিক উৎপাদন ব্যবস্থা এবং প্রযুক্তিগত দক্ষতা বিদ্যমান ছিল। এসব নিদর্শন বৈদিক সমাজের চরিত্রের সঙ্গে সম্পূর্ণ ভিন্ন, কারণ প্রাথমিক বৈদিক সমাজ ছিল মূলত পশুপালনভিত্তিক, আচারনির্ভর এবং নগরজীবনের বিকাশ তাদের মধ্যে ছিল অত্যন্ত ধীর। এখানে কোনো বৈদিক যজ্ঞবেদী, হোমকুণ্ড বা বৈদিক আচারসম্পর্কিত বস্তু পাওয়া যায়নি। অর্থাৎ ওয়ারি-বটেশ্বরের মানুষরা তাদের নিজস্ব ধর্মীয়-সাংস্কৃতিক ধারা অনুসরণ করত, যা পূর্বভারতের প্রাচীন নদীভিত্তিক সভ্যতাগুলোর ধারার সঙ্গে বেশি সামঞ্জস্যপূর্ণ।
ভৌগোলিক অবস্থান বিবেচনায় স্পষ্ট যে ওয়ারি-বটেশ্বর ছিল এক সক্রিয় নদীনির্ভর বন্দরনগরী। পাঞ্চ-মার্কড কয়েন ও পুঁতি শিল্পের নিদর্শনগুলো জানান দেয় যে এই নগরীর বাণিজ্যিক যোগাযোগ ছিল অত্যন্ত বিস্তৃত। বর্তমানে ওয়ারি বটেশ্বর লাগোয়া কোন নদী নেই। কয়েক কিলোমিটার দূরে পুরাতন ব্রম্মপুত্র এবং তা থেকে উদ্ভুত আড়িয়াল খাঁ রয়েছে- এ দুটিই আবার মেঘনায় গিয়ে মিশেছে৷ সম্ভবত: ব্রম্মপুত্র তখন আরো কাছাকাছি ছিলো।
জ্যারেড ডায়মন্ড, তাঁর “কলাপস” গ্রন্থে ৫টি প্রাচীন সভ্যতার ধ্বংস নিয়ে আলোচনা করেছেন। তিনি দেখিয়েছেন মুলত: বন্যা, খরা, ভূমিকম্পের মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারনে সভ্যতাগুলো বিলুপ্ত হয়ে গেছে। জ্যারেড ডায়মন্ড ওয়ারি বটেশ্বর নিয়ে আলাপ করেননি।
তবে আমরা যদি ধারনা করি একেবারে অমুলক হবে না।
বাংলার নদীগুলো স্বভাবতই পরিবর্তনশীল। স্রোতের চাপ, পলির মাত্রা, ভৌগোলিক উত্থান-পতন এবং মৌসুমি বন্যার কারণে দ্রুত দিক পরিবর্তন করতে সক্ষম। যে নদী/ নদীগুলো একসময় ওয়ারি-বটেশ্বরের পাশ দিয়ে প্রবাহিত হতো, তা ধীরে ধীরে বা কোনো বড় ধরনের বন্যা বা ভূমিকম্পের ফলে হঠাৎ দিক বদলে দূরে সরে যেতে পারে। নদী সরে গেলে শহরের বাণিজ্যিক কার্যক্রম বন্ধ হয়ে যায়, নৌযোগাযোগ ভেঙে পড়ে, আর ধীরে ধীরে নগরীর অর্থনৈতিক ভিত্তি দুর্বল হয়ে পড়ে। ঠিক এভাবেই নগরীর গুরুত্ব কমতে থাকে এবং শেষ পর্যন্ত নগরবাসী ধীরে ধীরে এলাকা ত্যাগ করে অন্যত্র সরে যায়।
এই মানুষেরা কারা ছিলেন, তাঁদের ভাষা- আচরন- জীবনযাপন কী ছিলো সেগুলো নিয়ে আমরা খুব আগ্রহ দেখাইনি। গুরুত্ব দেইনি। এই অঞ্চলের মানুষ হিন্দু, বৌদ্ধ, মুসলমান, খ্রিস্টান হবার আগের সত্য এসব। আমাদের বর্তমান উচ্চারিত ভাষায় কি তাঁদের শব্দ আছে, আমাদের আচরন ও জীবন যাপনে?
৩ হাজার বছর পর যেমন আমরা আর তাদেরকে মনে রাখিনি, বর্তমান সভ্যতা ধ্বংস হবার পর নিশ্চয় পরবর্তীরাও মনে করার দায় রাখবে না।
রেফারেন্স:
~~~~~~~
1., A. M. Wari-Bateshwar: An Urban Centre of Ancient Bangladesh.
2.Chakrabarti, Dilip. Ancient Bangladesh: A Study of the Archaeological Sources.
No comments:
Post a Comment