সেই সতেরো শতকের কথা। জাপানে এক সামুরাইয়ের বাড়িতে পরিচারিকার কাজ করত ওকিকু নামের এক মেয়ে। শান্ত, সুন্দরী। গৃহকর্তার বড় মনে ধরে তাকে। একদিন একান্তে ওকিকু-র কাছে নিজের বাসনা ব্যক্ত করে সামুরাই। কিন্ত ওকিকু প্রস্তাব নাকচ করে দেয়। সামান্য পরিচারিকার স্পর্ধা দেখে সামুরাই মনে মনে স্থির করে মেয়েকে শিক্ষা দিতে হবে। যেমন ভাবা তেমন কাজ। বাড়িতে সুদৃশ্য চীনেমাটির তৈরি দশটা কোরিয়ান প্লেটের একটা সেট ছিল যেটা ওকিকু রোজ মুছে পরিষ্কার করে তাকে তুলে রাখত। শৌখিন ব্যক্তি হিসাবে ঐ সামুরাই ভদ্রলোকের বেশ নামডাক ছিল, বাড়ির প্রত্যেকটা দামী সংগ্রহকে রীতিমতো চোখে হারাতেন। সামুরাই সেই প্লেটের সেট থেকে একটা সরিয়ে রাখলে। পরদিন ওকিকু যথারীতি প্লেটগুলো নামিয়ে পরিষ্কার করে তাকে সাজিয়ে রাখতে গিয়ে দেখে একটা প্লেট কম! এক…দুই…তিন…চার…পাঁচ…ছয়…সাত…আট…নয়…। ওকিকু সারা বাড়ি তন্ন তন্ন করে খুঁজল, বার বার প্লেটের সংখ্যা গুনল — দশ নম্বর প্লেটটা কোথাও খুঁজে পেলনা। খবরটা সামুরাইয়ের কানে পৌঁছতে দেরি হলনা। ততক্ষণাৎ সে ওকিকুকে অভিযুক্ত করলে চুরির দায়ে। শেষপর্যন্ত তার শাস্তির নিদান মেনে ওকিকুকে হাত পা বেঁধে ফেলে দেওয়া হয় বাড়ির কুঁয়োতে। মৃত্যুর পর ওকিকু-র আত্মা পরিণত হয় ‘ইউরেয়ি’ বা অতৃপ্ত প্রেতে। তারপর থেকে প্রতিরাতে কুঁয়ো থেকে উঠে আসত ওকিকুর ইউরেয়ি, চাঁদের আলোতে দেখা যেত তার দুধসাদা অবয়ব, হাওয়ায় ভেসে সে পৌঁছে যেত সেই প্লেটগুলোর কাছে, তারপর গোনা শুরু করত এক…দুই…তিন…চার…পাঁচ…ছয়…সাত…আট…নয়…। দশম প্লেটটা না পেয়ে বিলাপ করতে করতে পুনরায় সে মিলিয়ে যেত কুঁয়োর অতলে। এইভাবে দিন কাটতে থাকে। অমঙ্গলের ছায়া নেমে আসে বাড়িতে। কাজের লোকেরা ভয়ে আর কেউ আসতে চায়না। ফাঁকা বাড়িটা জুড়ে নিঃসঙ্গ সামুরাইয়ের চাপা দীর্ঘশ্বাস খেলে বেড়ায়। দগ্ধে দগ্ধে সেই অভিশপ্ত বাড়িতেই মৃত্যু হয় ওই সামুরাইয়ের।
পাহাড়ি ডাইনি ইয়ামাম্বা-র গল্পটা হয়তো অনেকেই শুনেছেন বা জানেন। ইয়ামাম্বা এক করালদর্শন থুত্থুড়ে বুড়ি, সাদা শনের মতো তার চুল, আলুথালু, দুটো জ্বলজ্বলে চোখ, দু কান পর্যন্ত বিস্তৃত ঝকঝকে চওড়া দাঁতের সারি। পাহাড় চূড়ার জঙ্গলে তার বাস। প্রিয় খাবার ছোট মানবশিশু। কিংবদন্তী অনুসারে জঙ্গলে পথ-হারানো ব্যক্তিদের শিকার করে ইয়ামাম্বা। সুন্দরী রমণীর ছদ্মবেশ ধরে তার কুটিরে ধুনি জ্বালিয়ে অপেক্ষা করে সে। কোনো ক্লান্ত পথিক দুয়ারে এসে আশ্রয় চাইলে অত্যন্ত যত্ন করে নিজের কুটিরে তাকে আহ্বান জানায় তাকে। আগন্তুকের খাওয়ার ও শোয়ার ব্যবস্থা করে উষ্ণ আতিথেয়তায় কোনো খামতি রাখেনা ইয়ামাম্বা। রাতে খাবার খেয়ে ঐ ব্যক্তি যখন নিশ্চিন্তে ঘুমিয়ে পড়ে তখন আসল রূপে ফিরে আসে ডাইনি এবং জীবন্ত সেই মানুষকে ভক্ষন করে। ইয়ামাম্বার কিংবদন্তীর উৎপত্তির পেছনে লুকিয়ে আছে এক বেদনাদায়ক প্র্যাকটিসের ইতিকথা যার নাম ‘উবাসুতে’। আগেকার দিনে যখন দেশে দুর্ভিক্ষ লাগত তখন বাড়ির জোয়ানরা বৃদ্ধ সদস্যদের নির্বাসিত করে আসতো পাহাড়ে, জঙ্গলে, যাতে সংসারে কর্মহীন ‘অপ্রয়োজনীয়’ মানুষদের অন্ন জোগানোর খরচ ও দায় লাঘব হয়। মনে করা হয় বৃদ্ধ পরিজনদের এভাবে ত্যাগ করার ফলে মনে জন্ম নেওয়া গিল্ট বা বিবেকের দংশন থেকে ইয়ামাম্বার ভাবনা করা হয়েছে যাতে করে তা ক্রমে ক্রমে নরমাংসলোভী ক্ষুধার্ত প্রতিহিংসাপরায়না ডাইনির রূপ পেয়েছে।
জাপান জুড়ে এরকম অনেক ভুতের গল্প, লোককথারা ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে যাদের নিয়ে একটা মজার খেলা প্রচলিত আছে। খেলাটার নাম হায়াকুমনোগাতারি কাইদাঙ্কাই। খেলার নিয়ম হল রাতে সবাই একজায়গায় জড়ো হয়ে গল্প শুনতে বসবে। একশোটা ভুতের গল্পের জন্য জ্বালতে হবে একশোটা মোমবাতি। একটা করে গল্প বলা শেষ হবে ও সাথে ফুঁ দিয়ে একটা করে মোমবাতি নেভানো হবে। এভাবে একশোতম গল্পটা শেষ হওয়ার সাথেই শেষ মোমবাতিটা নিভে গিয়ে যেই না পুরোপুরি অন্ধকার নেমে আসবে অমনি সেখানে উপস্থিত হবে নীল আলোয় উদ্ভাসিত এক নারীর প্রেত যা পরিচিত ‘আও-আন্দো’ নামে। এব্যাপারে মানুষের বিশ্বাস এত প্রবল ছিল যে ভয়ের চোটে ৯৯ তম গল্প বলার পরেই খেলা ভেঙে দেওয়া হত — ১০০ নম্বর গল্পটা অবধি যাওয়ার সাহস কেউ করতো না। প্রথা অনুসারে খেলাটা খেলা হত গ্রীষ্মকালে, ‘ওবন’-এর সময়। জাপানি বৌদ্ধমতে ওবন হল বছরের সেই নির্দিষ্ট সময় যখন পূর্বপুরুষদের আত্মারা উত্তরসূরিদের সাথে সাক্ষাৎ করতে ইহলোকে অবতরণ করতেন। মৃত পূর্বপুরুষদের সম্মান জানাতে বাড়িঘর ট্রাডিশনাল কাগজের লণ্ঠন বা বাতি দিয়ে সাজানো হত। রাতে ঐ লণ্ঠনের আলোয় পথ দেখে মৃতেরা খুঁজে নেন তাদের আপন জীবিত জ্ঞাতিদের। সাধারণত প্রতিবছর অগাস্ট মাসের ১৩ থেকে ১৬ তারিখ পর্যন্ত ওবন উদযাপিত হয়। উৎসব শেষ হয়ে গেলে কাগজের বাতিগুলো ভাসিয়ে দেওয়া হয় নদী, হ্রদ বা সমুদ্রের জলে যাদের অনুসরণ করে মৃত আত্মারা আবার ফিরে যায় পরলোকে।
আগামীকাল হ্যালোইন। ওবনের রীতির সাথে অদ্ভুতভাবে মেল খায় সাহ্ইনের রীতি। সাহ্ইন অর্থাৎ আজকের হ্যালোইনের আদিম কেল্টিক রূপ। দেখতে গেলে পৃথিবীর প্রত্যেকটা সংস্কৃতিতেই এরকম একটা করে পরব খুঁজে পাওয়া যাবে যেদিন জীবিত ও মৃতদের জগতের সীমানা মিলেমিশে যায়, খুলে যায় এক অদৃশ্য পোর্টাল। তেঁনারা নেমে আসেন আমাদের মাঝে। আর তাদের শ্রদ্ধা জানাতে পালন করা হয় নির্দিষ্ট রীতি বা রিচুয়াল। রাত জেগে ভুতের গল্প শোনাও সেই রীতির একটা অংশ। তাতে কতটা কি নিয়ম রক্ষা হয় জানা নেই কিন্তু আমোদ যে হয় তাতে কোনো দ্বিমত নেই। ভুতের গল্পেরা এভাবেই লোকপরম্পরায় বেঁচে থাকে — আধুনিকতার মাঝেও তা বয়ে নিয়ে আসে অতীতের সোঁদা গন্ধ।
জয়জিত

No comments:
Post a Comment