৯০ এর দশকেও আমরা জানতাম পাশের ফ্ল্যাটে কে থাকে, হাটে বাজারে গেলে গল্প জুড়ে দিতাম অপরিচিত মানুষের সাথে, নৌকায় বসলে মাঝি আর যাত্রী পরস্পরের নাম না জেনেও আলাপ করতো, বিয়ের দাওয়াতে মা চাচীরা অনেক অনাত্মীয়ার সাথেও দীর্ঘ গল্প করতো, পাঁচ-ছয় বাড়ি দূরের প্রতিবেশীর বাসা থেকে ইফতার আসতো, প্রতি শুক্রবার বাসায় অকারণে মেহমান আসতো, পোলাও রান্নার চল ছিল। এখন অকারণে মেহমান আসে না। মেহমান আসতে হলে "কারণ" লাগে।
মানসিকভাবে ৯০' এর দশকে বসবাস করা রিকশাওয়ালা মামা যাত্রীর সাথে গল্প জুড়ে দিলে যাত্রীর কাছে তা বিরক্তিকর মনে হয়।
তা না হয় মানা যায়। কারণ রিকশাওয়ালা মামার সাথে শ্রেণি মেলে না। আলাপের আগ্রহের বিষয় মেলে না। সমাজে শ্রেণিভেদ আছে - এ কথা স্বীকার না করে উপায় নেই। কিন্তু যেখানে শ্রেণি মেলে, জাত মেলে সেখানেও আমরা সোশ্যাল বাবল নামক খাঁচা তৈরি করেছি। নাহলে অন্তত একই বিশ্ববিদ্যালয়ের বাসে যাতায়াতের সময় অথবা বরিশালের লঞ্চে চাদর বিছিয়ে ফ্লোরিং করার সময় মানুষে মানুষে আরও বেশি আলাপ হতো।
গ্লোবালাইজেশনের শেষ দিকে এসে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম জনপ্রিয় হয়। গত ৩ লাখ বছর ধরে আমরা যে বাস্তবতায় ছিলাম যে - শুধু নিজের ৫ কিলোমিটার আশেপাশের মানুষের সাথেই প্রেম করতে হবে, বন্ধুত্ব করতে হবে, ব্যবসা করতে হবে - সেটা মিথ্যা প্রমাণিত হয়। ভার্চুয়াল বন্ধু, লং ডিস্টেন্স রিলেশনশিপ নামের আলাদা টার্মগুলোর জন্ম হয়।
৩ লাখ বছরের মধ্যে প্রথমবার সাধারণ মানুষের কাছে বিশ্বায়ন উন্মুক্ত হয়। সে তখন নেপালি হয়েও তানজানিয়ার দালিচাকোর সাথে বন্ধুত্ব করতে পারে, আর্জেন্টিনার ফিগানো বাতিস্তা বাংলাদেশের জরিনার সাথে কথা বলতে পারে। এই সুযোগ দিয়ে সাংস্কৃতিক, অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক, প্রযুক্তিক এক কোটি সম্ভাবনার দুয়ার (Exchange) উন্মুক্ত হবার কথা ছিল। হয়েছেও কিছু। ২০১২-২০১৬ এর মধ্যে বাংলাদেশিদের ফেসবুক ভরে ফিলিপিনো, ইন্দোনেশিয়ান, ভারতীয়, ব্রাজিলিয়ান, মার্কিনিদের যুক্ততা ছিল। এখন আর সেই ধারা নেই। যে ঢাকায় বাস করে, তার বন্ধু তালিকায় এখন ফিলিপিনো দূরে থাক, খুঁজে পেতে কুড়িগ্রামের কাওকে পাওয়াও কষ্টকর। এই পরিবর্তন শুরু হয় ২০১৭ সালের দিকে।
গ্লোবালাইজেশনের যুগ শেষ হয়।
পরিচিত না হলে ফ্রেন্ড রিকোয়েস্ট এক্সেপ্ট না করা অত্যন্ত পশ্চিমা, আরও ভালো করে বললে দক্ষিণ যুক্তরাষ্ট্রের চিন্তাভাবনা। যেখানে ভুল করে কারো বাসায় ঢুকে পড়লে তাকে শটগান দিয়ে গুলি করে মেরে ফেলা আইনত সিদ্ধ। এই পার্সোনাল স্পেসের ধারণা, ইন্ডিভিজুয়ালিজমের চর্চা যুক্তরাষ্ট্র ছাপিয়ে ইউরোপ কলুষিত করে আমাদের এদিকে এসেছে ১০ বছরও হয়নি। অথচ আমরা জর্জরিত।
যে অ্যাঞ্জেল সাদিয়া ২০১৪ সালে শত শত অপরিচিত মানুষের সাথে অনলাইনে যুক্ত ছিল, সেই সাদিয়াকে এখন কেউ মেসেজ রিকোয়েস্ট পাঠালে সে উত্তর দেয় 'ডু আই নো ইউ?' (সাদিয়া বলছি তার মানে এটা না যে এই প্রবণতা কেবল মেয়েদের মধ্যে বেড়েছে। আমি ব্যক্তিগত জরিপে দেখেছি, ছেলেরা মেয়েদের চেয়ে অসামাজিক। প্রেম ও যৌনতা ঘটিত কারণ না হলে, বার্তাবাহক নারী না হলে - সাধারণত ছেলেরা মেসেজ রিকোয়েস্টের উত্তর দেয় না।) ৯০ দশকের তুলনায় নারী-পুরুষ উভয়ের মধ্যে অপরিচিত মানুষের সাথে কথা না বলার প্রবণতা কয়েক গুণ বেড়েছে।
সোশ্যাল বাবোল কালচার সামাজিক সাংস্কৃতিক বিনিময় আটকে রাখে। একজন নতুন মানুষ একটা নতুন টুরিস্ট স্পট বা একটা না-পড়া উপন্যাসের মতই আকর্ষণীয়, সম্ভাবনাময়, জ্ঞানীয়ভাবে জরুরি অবজেক্ট (!)
মানুষের মানবিক উৎকর্ষের প্রধান তিন কারণ হলো -
- নতুন স্থান,
- নতুন বই ও
- নতুন মানুষ।
গ্লোবালাইজেশন শেষ হবার পর মানুষ এই তিনের মধ্যে শেষটাকে বর্জন করছে। সে একা থাকতে চায়।
আমি বলছি না যে তালাকের হার বেড়ে যাওয়া, মেহমান আসলে দেখা-সাক্ষাৎ না করে আপনার সন্তানটির বেডরুমে ঘাপটি মেরে শুয়ে থাকা, একান্নবর্তী পরিবার ভেঙে খান খান হয়ে যাওয়া বা ৯০ দশকের ১৫ জনের ফ্রেন্ড সার্কেলের বদলে এখন ফ্রেন্ড সার্কেল ২-৩ বা অনেকক্ষেত্রে মাত্র ১ এ চলে আসা কোন গুরুতর সমস্যা।
আমি বলছি যে এইসব তালাক, পরিবার ভাঙন, মেহমান-শূণ্যতা আর বন্ধুর সংখ্যা কমে যাওয়ার অর্থ হলো আমাদের ধৈর্য্য অনেক কমে গেছে। আমরা আর ঝামেলা চাই না, অন্যের মতামত চাই না। একা স্বাধীনভাবে বাঁচতে চাই। আর এটা করতে গিয়ে অন্যের কাছ থেকে শেখার ও পাওয়ার যে ফ্রি সুযোগগুলো আমরা পেতাম, যেটাকে বলে সামাজিকীকরণ - সেটা বন্ধ হয়ে গেছে। আমাদের জীবনের সবচেয়ে বড় স্কুলটা বন্ধ হয়ে গেছে।
পশ্চিমে তারা এটাকে নাম দিয়েছে লোনলিনেস এপিডেমিক - একাকীত্বের মহামারী।
যুক্তরাষ্ট্রের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের অধীন এমটিএফ ১৯৯১ সাল থেকে ২০২৩ পর্যন্ত একাকীত্বের তথ্য সংগ্রহ করেছে। ১৯৯২ সালে ২৮% মানুষ মনে করতো যে তারা একাকী। ২০০৫-০৬ সালে এই একাকীত্ব এক ধাক্কায় ২১% এ গিয়ে নামে। এরপর ২০০৭-০৮ সালে হঠাৎ এই সূচক আবারও ২৬ এ উঠে।
কারণ ২০০৫ সালে ফেসবুক লঞ্চ হয় আর ২০০৭ সালে আইফোন। ফেসবুক ২০০৫ সালে সবার মধ্যে সম্পর্ক প্রমোট করেছে। আইফোন প্রমোট করেছে সবার মধ্যে ইন্ডিভিজুয়ালিজম। এখন অবশ্য ফেসবুকও তাই করছে। ২০২৩ সালে এই একাকীত্বের হিসাব ৪১% গিয়ে ঠেকেছে। মানব জাতির ইতিহাসে, যে কোন সময়ের চাইতে তারা এখন সবচেয়ে বেশি নিজেকে একা ভাবছে। জাপান আর পোল্যান্ড বলছে একাকীত্বের মহামারী তাদের অর্থনীতি ধ্বংস করতে শুরু করেছে।
আমার ব্যক্তিগত জীবনের সবচেয়ে ঘনিষ্ঠ বন্ধু, প্রেমিকা, শিক্ষক, বিজনেস পার্টনার, মেন্টরকে আমি অনলাইনে পেয়েছি। অপরিচিত এই মানুষগুলো এখন আমার সবচেয়ে পরিচিত। অর্থাৎ আমার আমার আজকের সম্পর্ক, আমার ব্যবসা, আমার শিক্ষার জন্য এই অপরিচিত মানুষগুলো দায়ী। নতুন অপরিচিত মানুষ না থাকলে আমি আর নতুন করে বিকশিত হব না। আমি আজ যা আছি কাল কম-বেশি তাই থাকবো।
শ্রেণিগত জ্ঞান বলে একটা কনসেপ্ট আছে। অপরিচিত মানুষ আপনার জীবনে না থাকলে আপনার শ্রেণিগত জ্ঞান উত্তরণের কোন সুযোগ নেই। বই পড়ে বা ভ্রমণ করে বা চাকরি বাকরি করে আপনার এই শ্রেণি-উত্তরণ ঘটবে না। বস্তি এবং প্রাসাদের শ্রেণিগত অপরিচিতদের মাঝে বিচরণ করলেই কেবল আপনি বস্তি ও প্রাসাদ সর্বত্র টিকে থাকার যোগ্যতা অর্জন করবেন। এই দিনেরে নিয়ে যেতে পারবেন সেই দিনেরও কাছে।
মানুষ সব খাবার খায় না। বেছে খায়। সব বই মানুষ পড়বে না, তার রুচি অনুযায়ী পড়বে। মানুষ তাই বেছে নেবে কোন অপরিচিত মানুষের সাথে সে মিশবে। সবার সাথে সে মিশবে না। কিন্তু বই পড়ার অব্যাহত অভ্যাসের মতই - নতুন মানুষের অভিজ্ঞতা জানার যাত্রা জারি রাখা জরুরি। কারণ প্রতিটি মানুষ প্রচন্ড সম্ভাবনাময়। সে সম্ভাবনা থেকে, তার জীবনের অভিজ্ঞতা থেকে নিজেকে বঞ্চিত করলে সামগ্রিক সমাজের গতি কমে যায়। যে গ্রামে হিন্দু মুসলমান অবাধে মেশে সে গ্রামেই দাঙ্গা হয় না। যে সিনিয়র তার জুনিয়রকে 'তুমি' সম্বোধন করার অনুমতি দেয় সে কখনো র্যাগিং এর সাথে যুক্ত হয় না।
যুক্তরাষ্ট্রকে অনুসরণ করে (যেসব মার্কিনিদের জীবনে অফিস আর পরিবার ছাড়া কিছু নেই। যাদের ফেসবুকে বন্ধুর সংখ্যা ১৭-২৫)।
বাংলাদেশের মত ঐতিহ্যগতভাবে এক্সট্রোভার্ট একটা জাতিকে, রঙিলা এক জাতিকে জোর করে সাদা কালো বানানো মানে সামাজিক সম্প্রীতিকে গলা টিপে হত্যা করা। নিজেকে কুয়োর ব্যাঙ বানিয়ে রাখা।
অতুলপ্রসাদ সেন নতুনের পূজা করতেন।
গেয়েছেন,
"আজি নূতন আলোকে নূতন পুলকে
দাও গো ভাসায়ে ভূলোকে দ্যুলোকে,
নূতন হাসিতে বাসনারাশিতে, জীবণ মরণ ভরিয়ে দাও।"
সংগ্রহীত
No comments:
Post a Comment