Wednesday, December 10, 2025

রোকেয়াও তসলিমার মতো মুরতাদ এবং কাফের!

 


বেগম রোকেয়ার ছবি দেখেছে এতকাল বাঙালি মুসলমান। ফুলস্লিভ ব্লাউজ পরা, স্লিভলেস নয়, ছোটহাতা নয়, তার ওপর মাথায় ঘোমটা । রক্ষণশীল নানি দাদিদের মতো। বাঙালি মুসলিম ভেবেছিল বেগম রোকেয়া পর্দার পক্ষে, ইসলামের পক্ষে, পুরুষতন্ত্রের পক্ষে। কারণ পর্দানসীন নারী সাধারণত সেটাই হয়।

ইদানীং কিছু কৌতূহলী জিহাদি পড়তে শুরু করেছে বেগম রোকেয়ার বই। দেখছে, ওমা, যে তসলিমাকে তারা ঘৃণা করে, যার মুণ্ডু কাটার জন্য ছুরিতে আজ ৩৫ বছর ধরে শান দিয়ে রেখেছে, রোকেয়া তো সেই তসলিমার মতো করেই কথা বলেছিলেন! রোকেয়াও ধর্ম আর পুরুষতন্ত্রের বিরুদ্ধে লিখেছিলেন!! তাহলে তিনি মুখ বুজে থাকা নামাজ রোজা করা, তসবিহ পড়া অন্তঃপুরবাসিনী নন!! তাহলে তাঁকে যে মাথায় তুলে মুসলমানেরা নেচেছে, তার কী হবে!
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের এক জিহাদি অধ্যাপক রোকেয়াকে এখন মুরতাদ ঘোষণা করেছেন।
বাহ, এতদিনে মোল্লা জাতের টনক নড়েছে। রোকেয়াও তসলিমার মতো মুরতাদ এবং কাফের! আমি অনেক আগেই বলেছিলাম, আজকের জিহাদিরা বেগম রোকেয়ার জমানায় যদি থাকতো, তাঁকে জ্যান্ত পুঁতে ফেলতো।
জিহাদিরা এখন সমস্বরে বলছে, রোকেয়া ছিল সেযুগের তসলিমা! রোকেয়া ছিল দেশের প্রথম তসলিমা! এক বিন্দু মিথ্যে নয় কথাটা। তবে এই সত্যটা আবিষ্কার করতে তাদের দীর্ঘ সময় লেগেছে। অথবা সত্যটা তারা জানতোই, তবে রোকেয়াকে বাতিল করার মোক্ষম সময় তারা মনে করেছে জিহাদি জঙ্গি সমর্থিত সরকারের আমলই।
রোকেয়া বেঁচে থাকাকালীন ধর্ম ও পুরুষতন্ত্রের বিরুদ্ধে তাঁর লড়াই সম্পর্কে মৌলবাদীরা একেবারে যে জানতো না, তা নয়। জানতো, এবং কলকাতায়, যে শহরে রোকেয়ার মৃত্যু হয়েছিল, সেই শহরের কবরস্থানে তাঁকে কবর দিতে দেয়নি তারা, দাফন করতে বা জানাজা পড়তে দেয়নি। রোকেয়ার লাশ নিয়ে কাকপক্ষী যেন না জানে, এমনভাবে কলকাতার বাইরে সোদপুরের কাছে পানিহাটি নামের একটি জায়গায় রাতের অন্ধকারে গঙ্গার তীরে কবর দিয়েছিল তাঁর কয়েকজন আত্মীয়।
জিহাদিরা, মোল্লা মৌলবীরা, মৌলবাদী পুরুষতান্ত্রিকেরা তসলিমাকে সহ্য করে না। রোকেয়াকেও সহ্য করার কোনও যুক্তি নেই। তারা জেনে যাচ্ছে সে আমলে ঘোমটা পরাটা আর ফুলস্লেভ ব্লাউজ পরাটা ছিল মুসলিম সমাজের রীতি। রোকেয়ার পোশাক যতটা পুরুষতন্ত্রে বিশ্বাসীর পোশাক, ততটাই ধর্মহীন নারীবাদীর পোশাক।
মোদ্দাকথা তসলিমা এ যুগের একজন আলোকিত নারীবাদী, রোকেয়ার যুগে রোকেয়া ছিলেন একজন আলোকিত নারীবাদী। তসলিমা পুরুষতন্ত্র এবং ধর্মের বিরদ্ধে লড়াই করেছে, রোকেয়াও তাই করেছেন। নারীবিদ্বেষী ধর্মব্যবসায়ীরা তসলিমাকে যেমন ছুড়ে ফেলেছে, রোকেয়াকেও একদিন ছুড়ে ফেলবে, এ আমি জানতাম। তবে তসলিমার বিরুদ্ধে নেতিবাচক প্রচারটা যেমন হয়েছে, রোকেয়ার বিরুদ্ধে তা হয়নি। কারণ অর্ধশিক্ষিত স্যুডো আধুনিক মুসলমান সমাজ আধুনিকতার মুখোশ পরার জন্য একজন মুসলিম নারীবাদী চেয়েছিল, তারা তাই রোকেয়াকে এতকাল ব্যবহার করেছে, রোকেয়ার বিরুদ্ধে কোনও নেতিবাচক প্রচার হতে দেয়নি। অর্ধশিক্ষিত স্যুডো আধুনিক মুসলমান সমাজ আধুনিকতার মুখোশ পরার জন্য রোকেয়ার পক্ষে এই প্রচারটি খুব বেশি করেছেন যে মুসলিম মেয়েদের জন্য রোকেয়া একটি স্কুল খুলে মেয়েদের মধ্যে জ্ঞানের আলো ছড়িয়ে দিতে চেয়েছিলেন। এই প্রচারের কারণে সাধারণ মধ্যবিত্ত মুসলমান রোকেয়াকে সমর্থন করেছে। এই সমর্থকদের মধ্যে তারাও আছে যারা মনে করে ফাইভ বা এইট পাশ করার পরই মেয়েদের বিয়ে হয়ে যাওয়া উচিত। ওটুকু অক্ষর জ্ঞানের জন্য একটি তো স্কুলের দরকার হয়, সেই স্কুলের আয়োজনটি রোকেয়া করেছিলেন বলে তাদের বিশ্বাস। অর্ধশিক্ষিত স্যুডো আধুনিক মুসলমান সমাজই রোকেয়ার ধর্মবিরোধী বক্তব্যগুলো ডিলিট করে রোকেয়া রচনাবলি ছাপিয়েছে। কিন্তু জিহাদিরা শেষ পর্যন্ত আবিষ্কার করেছে বা মুখ খোলার সিদ্ধান্ত নিয়েছে এই সত্যটি, যে, তসলিমা আর রোকেয়ার বিশ্বাসে কোনও পার্থক্য নেই।
জিহাদিরা যে রোকেয়ার গায়ে মুরতাদ উপাধি সেঁটে দিল, যে উপাধি রোকেয়ার গায়ে সাঁটা হয়েছিল ৯৩ বছর আগে, সে কারণে মুসলমানদের কবরস্থানে তাঁর জায়গা হয়নি! নতুন করে পাওয়া উপাধিটি কি রোকেয়ার মুসলমান ভক্তরা মুছতে চেষ্টা করবেন নাকি বলবেন হ্যাঁ রোকেয়া মুরতাদ, এই মুরতাদ রোকেয়াকেই আমরা সম্মান করবো? তখন অবশ্য রোকেয়ার মুসলমান ভক্তদের একটু অসুবিধেই হবে, কারণ তখন তো তাদের বলতে হবে, তসলিমা মুরতাদ, এই মুরতাদ তসলিমাকেই আমরা সম্মান করবো! সেটা কী করে বলবেন তাঁরা? এতকাল তো বলে এসেছেন, তসলিমা খারাপ, রোকেয়া ভাল। তসলিমা মুরতাদ, রোকেয়া স্কুল খুলেছেন, তসলিমা নাস্তিক, রোকেয়া মুসলমান!

তস লিমা নাস রিন

No comments:

Post a Comment