আমরা মাঝেমাঝে খুবই আনপ্রেডিক্টেবল ও ইমোশনালি ফ্রিজ মানুষের প্রেমে পড়ি। আমরা তার সৌন্দর্য আর ক্যারিশমা দেখে অন্ধ হয়ে যাই। এ মানুষটি আমাদের জীবনের জন্য ক্ষতিকর জেনেও আমরা তাকে ছেড়ে আসতে পারি না। কিন্তু কেন? বিজ্ঞানীরা আবিষ্কার করেছেন, সন্তান জন্মের পর মায়ের মস্তিষ্কে সন্তানের সাথে অ্যাটাচমেন্ট তৈরির জন্য যে নিউরোকেমিক্যাল নিঃস্বরণ হয়, ভালোবাসার মানুষের সাথে অ্যাটাচমেন্ট তৈরির সময়ও একই নিউরোকেমিক্যাল নিঃস্বরণ হয়। নিউরোকেমিক্যাল দৃষ্টিকোণ থেকে আমাদের ভালোবাসার মানুষ আমাদের সন্তান। এখন প্রশ্ন হলো, আপনার সন্তান আপনার সাথে অন্যায় আচরণ করলে আপনি কি তাকে ত্যাগ করতে পারবেন?
একই কারণে আমরাও আসলে ব্রেকআপ মেনে নিতে পারি না। সন্তানের কাছ থেকে মাকে আলাদা করা আর প্রেমিকের কাছ থেকে প্রেমিককে আলাদা করা নিউরোকেমিক্যালি সেইম ইম্প্যাক্ট তৈরি করে। কিন্তু কোথা থেকে আমাদের সেন্স অব অ্যাটাচমেন্ট তৈরি হয়? একজন মানুষের ভালোবাসার সার্কিট লিখে আসলে তার পরিবার। যে পরিবার সন্তানের প্রতি সেনসেটিভ ও রেসপন্সিভ তাদের একটি সিকিউর অ্যাটাচমেন্ট স্টাইল তৈরি হয়। আর যে সব পরিবার সন্তানকে অসঙ্গতিপূর্ণভাবে রেসপন্স করে তারা “anxious attachment style” উন্নত করে। এ সব মানুষ সবসময় ভ্যালিডেশন চায়, ভালোবাসার মানুষের দূরত্বকে তাদের নার্ভাস সিস্টেম থ্রেট হিসেবে দেখে। তারা ভাবে, আমি রিপ্লেসেবল! তারা বেশি বেশি মেসেজ দেয়, সাইলেন্সকে রিজেকশন ভাবে ও ওভারথিংক করে। আর যে সব পরিবার সন্তানের সাথে খারাপ ব্যবহার করে, দূরত্ব মেনে চলে ও আনরেসপন্সিভ তাদের সন্তানের মধ্যে “avoidant attachment style” তৈরি হয়। এরা শুরুর দিকে সম্পর্কের প্রতি অনেক বেশি আগ্রহী হলেও, নৈকট্য বাড়লেই তারা প্রত্যাখ্যান করে এবং ইমোশনালি শাট ডাউন করে। তাদের নার্ভাস সিস্টেম তাদের বলে, ডিপেন্ড করলেই তুমি ট্র্যাপে আটকে যাবে। কাউকে দরকার মনে করা মানে তুমি দুর্বল।
আমাদের সমাজ আমাদের ইমোশনালি ব্লাইন্ড হতে শেখায়। আমাদের বোঝানো হয় dependency = weakness, closeness = neediness এবং emotional reliance = immaturity। তারা ইন্ডিপেন্ডেট হওয়াটাকে প্রায় নৈতিক গুণ বানিয়ে ফেলে। ফলে কেউ যদি ইমোশনাল সাপোর্ট চায়, তাকে দুর্বল মনে করা হয় আর কেউ যদি দূরত্ব মেনে চলে তাকে স্ট্রং মনে করা হয়। কিন্তু বাস্তবতা হলো আমরা অ্যাটাচমেন্ট ছাড়া সার্ভাইভ করতে পারি না।
আনুমানিক ২ মিলিয়ন বছর পূর্বে আমাদের পূর্বসূরিরা আফ্রিকার সাভানায় বাস করত। এ সময় আমরা যদি ভালোবাসার মানুষ, পরিবার ও সমাজের সাথে অ্যাটাচমেন্ট তৈরি করতে ব্যর্থ হতাম, তাহলে আমরা বাঘ ও সিংহের খাবারে রূপান্তরিত হতাম। আমাদের ডিজাইন করা হয়েছে ডিপেন্ডেন্সির জন্য, একা একা সার্ভাইভ করার জন্য আমাদের ডিজাইন করা হয়নি। সব মানুষকে “emotionally self-sufficient” হতে হবে—এই বিশ্বাসটাই ভুল। এই ধারণা নতুন না। পশ্চিমা সমাজে একসময় বিশ্বাস করা হতো— শিশুকে বেশি আদর করলে সে দুর্বল হয়ে যাবে। এটা ছিল pseudo-scientific myth।
১৯২০ সালের দিকে মানুষ বিশ্বাস করত, বাচ্চাদের কান্না করতে দাও, তাকে আদর দিওনা, তাকে তার আবেগ অনুযায়ী নয়, নিয়ম অনুযায়ী খাবার দাও। তাদের বিশ্বাস ছিল বেশি ভালোবাসলে শিশুরা ইনসিকিউর্ড হয়ে উঠবে। জন ওয়াটসন নামক এক উন্মাদ বিজ্ঞানী একটি ভয়ানক ধারণা প্রতিষ্ঠা করেছিলেন, তার মতে, আদর্শ বাচ্চা কান্না করে না, অ্যাটাচ হতে চায় না, তারা স্বৈরাচারী, নির্ভিক ও আত্মনির্ভরশীল হয়। শুনতে সুন্দর মনে হলেও, আধুনিক বিজ্ঞান দেখিয়েছে, এ ধরনের শিশুরা ইমোশনালি ডেড হয়। তারা এক একটি মেশিন হয়ে বেড়ে ওঠে।
সবচেয়ে ভয়ানক ব্যাপার হলো আজকের যুগে আমরা শিশুদের “attachment accept” করে নিলেও অ্যাডাল্ট রিলেশনশিপের ক্ষেত্রে এখনও তা মানতে চাই না। আমরা বড় হওয়ার পর আমাদের শেখায় নিডি হওয়া যাবে না, তোমাকে স্ট্রং হতে হবে, তুমি কারও উপর ডিপেন্ড করতে পারবে না। এই সমাজ ইমোশনালি ফ্রিজ থাকাকে স্বাভাবিক ভাবতে শেখায়। কিন্তু আজকের সমাজেও মানুষ যেটা জানে না তা হলো, মানুষ বড় হওয়ার পরও তার নার্ভাস সিস্টেম বদলায় না। সমাজ ও সংস্কৃতি বদলায় কিন্তু আমাদের মস্তিষ্কের অ্যাটাচমেন্ট সার্কিট বদলায় না।
মানুষ বিবর্তিত হয়েছিল ২ লাখ বছর পূর্বে। এটা বিবর্তনের চোখে এক সেকেন্ডের একটি ক্ষুদ্র ভগ্নাংশও নয়। এত অল্পসময়ে আমাদের প্রস্তর যুগের ব্রেন সার্কিট এখনো বদলায়নি। আমাদের চারপাশে এখন বাঘ অথবা সিংহ না থাকলেও জেনেটিক্যালি আমরা এখনো অ্যাটাচড হতে চাই। শিশু বলে—“আমাকে ছেড়ে যেও না” প্রাপ্তবয়স্ক বলে—“আমার মেসেজের রিপ্লাই দাও। Same system. Different expression। এটা বুঝলে সম্পর্কে নাটক কমে। না বুঝলে—same pain, different person।
আপনি যতই মানুষের ইমোশনাল চাহিদাকে অস্বীকার করবেন, আপনার সম্পর্ক ততোই দ্রুতগতিতে ভেঙে যাবে। আর এজন্য এংশাস মানুষ নিজেকে নিজে দোষ দেয়, অ্যাভোয়ডেন্ট মানুষ অন্তরঙ্গতাকে ডেমোনাইজ করে এবং সিকিউর্ড মানুষ কনফিউজড হয়।
জীববিজ্ঞান বলছে, ভালোবাসা মোটেও সাইকোলজিক্যাল ইস্যু নয়, এটা সরাসরি শারীরীক ইস্যু। আপনি যখন একজন মানুষের সাথে অ্যাটাচ হয়ে যান, তখন দুজনের বডি সিস্টেম আলাদা থাকে না, এক হয়ে যায়। আপনার সঙ্গী আপনার হৃদস্পন্দন নিয়ন্ত্রণ করে, ব্লাড প্রেসার প্রভাবিত করে, শ্বাসপ্রশ্বাস প্যাটার্ন শান্ত করে, কর্টিসল, অক্সিটোসিন ও অ্যাড্রেনালিন হর্মোনের মাত্রা পরিবর্তন করে।ভালোবাসার বিচ্ছেদ মানসিক ইফেক্ট নয়, সরাসরি বায়োলজিক্যাল ইফেক্ট তৈরি করে।
মানুষ ইন্ডিপেন্ডেড নয়, আমরা দুই লাখ বছর পূর্ব থেকেই ডিপেন্ডেসির জন্য তৈরি। এটা আমাদের চয়েজ না, দুর্বলতা না এবং এটা আমাদের অপরিপক্কতাও না। জেমস কোয়েন একবার একজন বিবাহিত নারীর মস্তিষ্কের উপর একটি এক্সপেরিমেন্ট করেন। তিনি তাকে ইলেক্ট্রিক শক দিয়ে স্ট্রেস দিচ্ছিলেন আর ব্রেন স্ক্যান করে তার মস্তিষ্কের হাইপোথালামাস পর্যবেক্ষণ করছিলেন। যখন তাকে স্ট্রেস দেয়া হয়, হাইপোথালামাস থ্রেট রেসপন্স করে। একজন আগন্তুক মহিলাটির হাতে হাত রাখার পরপর, থ্রেট রেসপন্স কিছুটা হ্রাস পায় কিন্তু যখন তার হাজব্যান্ড তাকে স্পর্শ করে তখন তার থ্রেট রেসপন্স বন্ধ হয়ে যায়। হাইপোথালামাস একদম সাইলেন্ট!! এটা কোনো ইমাজিনেশন নয়, তার ব্রেইন অ্যাকটিভিটি। আপনার ব্রেইন আপনার পার্টনারকে “external nervous system regulator" হিসেবে রিসিভ করে। এজন্য বিবাহিত নারীদের স্ট্রেস কম দেখা যায়।
আমাদের সমাজ আমাদের শেখায়,“Don’t depend on your partner” “Don’t make them your world”। কিন্তু বায়োলজি বলে, আপনার সঙ্গী আপনার সন্তান। সে একটি শিশুর মতোই আপনার উপর ডিপেন্ডেড। ডিপেন্ডেন্সি কোনো ইমোশনাল ত্রুটি নয়। এটা নিউরোবায়োলজিক্যাল রিয়্যালিটি। মানুষ “Emotionally independent” হতে পারে না। সে শুধু “Emotionally disconnected” হতে পারে।
কাউকে মিস করা আপনার দুর্বলতা নয়, কাউকে প্রয়োজন মনে করা আপনার ইম্যাচিউরিটি নয়। আপনি চাইলে আমার বক্তব্য অস্বীকার করতে পারেন কিন্তু আপনি আপনার হাইপোথালামাসকে অস্বীকার করতে পারেন না। যে সম্পর্ক আপনাকে শান্ত করে, সে সম্পর্ক আপনাকে স্বাস্থ্যবান করে তোলে। যে সম্পর্ক আপনাকে “chronically anxious” রাখে__সে সম্পর্ক আপনাকে বায়োলজিক্যালি ক্ষয় করে। আপনি মানুষ। আর মানুষ একা থাকার জন্য ডিজাইন করা হয়নি—নিউরোসায়েন্স সেটা পরিষ্কার করে দিয়েছে।
আমি ইন্ডিপেন্ডেড থাকবো, কিন্তু ডিপেন্ড করবো না”—এটা ফ্যান্টাসি। সবচেয়ে বড় “survival advantage” আসে তখনই,যখন দুইজন মানুষ একটা “physiological unit” হয়ে যায়। He or she is part of me, and I will do anything to save him or her। এটা কোনো কবিতা না। এটা থিওরি অভ ইভল্যুশন। অনেকে ভাবে— ডিপেন্ড করলে তো ক্যারিয়ার যাবে, ফ্রেন্ডস যাবে, ইন্ডিভিজুয়ালিটি যাবে। কিন্তু জীববিজ্ঞান আমাদের সম্পূর্ণ উলটো কথা বলে। আপনি সবচেয়ে বেশি স্বাধীনভাবে পৃথিবীতে হাঁটতে পারেন, তখনই যখন আপনার ব্রেইন জানে— “পেছনে কেউ আছে, যাকে আমি বিশ্বাস করতে পারি।” আপনি যখন কারও কাছে সিকিউর্ড ডিপেন্ডেন্সি পান, তখনই আপনি একটি সত্যিকার ইন্ডিপেন্ডেন্স পান। আপনি রিস্ক নিতে পারেন! আপনি গ্রো করতে পারেন। আপনি ওয়ার্ল্ডকে ফেস করতে পারেন কারণ ফলব্যাক আছে। If you want to take the road to independence and happiness, find the right person to depend on and travel down it with that person.
সারাহ কিমি একবার শিশুদের উপর একটি এক্সপেরিমেন্ট করেছিলেন, তিনি শিশুদের অজস্র খেলনা দিয়ে একটি নতুন পরিবেশে রাখলেন। শিশুটি আত্মবিশ্বাসের সাথে খেলছে আর মায়ের দিকে তাকাচ্ছে। এটাকে বলে সিকিউরিটি চেকিং। মা যখন বেরিয়ে যায় শিশুটি প্যানিকড হয়, কান্না করে এবং দরজায় ধাক্কাধাক্কি করে। এটা উইকনেস না। এটা “separation distress reflex”। মা ফিরে আসার সাথে সাথে শিশুটির নার্ভাস সিস্টেম শান্ত হয়ে যায়। একটি শিশু যখন বোঝে আমি একা নই, দরকার হলে কেউ আছে, তখনই সে ইন্ডিপেন্ডেড হয়ে ওঠে। শিশুটি যখন সিকিউর বেস পায় না, তার আবিষ্কার বন্ধ হয়ে যায়, কৌতুহল কমে যায় ও শিক্ষা ধীর হয়ে যায়। আপনার যখন একজন সিকিউর্ড পার্টনার থাকে, আপনি রিস্ক নিতে পারেন, নতুন নতুন কাজ করতে পারেন এবং ইমোশনালি এক্সপান্ড করতে পারেন। অবিশ্বস্ত সঙ্গীর পেছনে আপনার সকল মেন্টাল এনার্জি খরচ হয়ে যায়, আপনি বিশ্বকে আবিষ্কার করতে পারেন না। শিশু independent হয় কারণ মা reliable। Adult independent হয় কারণ partner reliable।
আপনার সঙ্গী যদি বিশ্বস্ত না হয় আপনার নার্ভাস সিস্টেম কখনোই শক্ত হয়ে দাঁড়াতে পারবে না। আপনি ফিউচারে আপনার কত বড় স্বপ্ন ও আশা পূরণ করবেন (future attempt rate) তা আপনার সঙ্গী ঠিক করে দেয়। সে ঠিক করে দেয়, কত বেশি ঝুঁকি নেবেন আর আপনার আইকিউ কত বেশি হবে। সঙ্গী অবিশ্বস্ত হলে আপনার ইমিউন সিস্টেম দুর্বল হয়ে যাবে, আপনাকে বায়োলজিক্যালি কম্প্রোমাইজড করতে হবে।
আমি কোনো মানুষকেই খারাপ বলব না, তবে একজন “inconsistently available partner” আপনার জন্য থ্রেট। একজন আনপ্রেডিক্টেবল সঙ্গী একটি দুঃস্বপ্ন। যে আজ আছে কাল নেই__সে আপনাকে কখনো রিল্যাক্স করে না। আপনার ব্রেন সবসময় স্ক্যান করতেই থাকে, ব্যাকগ্রাউন্ড নয়েজ চলতেই থাকে, জীবনের আর উন্নতির সুযোগ থাকে না। আর তাই একজন ভালো সঙ্গী না খুঁজে আপনার ডিএনএ সম্পর্কে জানুন। আপনি কেমন মানুষ আর আপনি কি ধরনের সঙ্গী চান।
লিহান প্রাইম
No comments:
Post a Comment