বিজ্ঞানী গটম্যান তার “দ্য সায়েন্স অব ট্রাস্ট” বইতে বলেছিলেন, যে সম্পর্কে পরকিয়া থাকে সেটি ম্যাথম্যাটিক্যালি অসম্ভব। আমরা যখন একটি সম্পর্কে জড়িত হই, তখন সেখানে একটি “Shared reality” তৈরি করি। আমরা একে অন্যের কাছে ট্র্যান্সপারেন্টলি তথ্য আদান-প্রদান করি। কিন্তু প্রতারণা এই শেয়ার্ড রিয়্যলিটি দুই ভাগে ভেঙে ফেলে- পাবলিক রিয়্যালিটি এবং সিক্রেট রিয়্যালিটি। মনে করুন, দুজন পাইলট ককপিটে বসে আছে। একজনের কাছে পুরো রাডার ডেটা, আবহাওয়ার রিপোর্ট, ফুয়েল লেভেল—সব সত্য তথ্য আছে। অন্যজনের কাছে আছে শুধু অর্ধেক তথ্য, কারণ প্রথম পাইলট গোপনে কিছু সতর্ক সংকেত লুকিয়ে যাচ্ছে। এখন দুইজন দুই রকম “রিয়্যালিটি ম্যাপ” দেখে প্লেন চালাচ্ছে—একজন ভাবছে আকাশ পরিষ্কার, অন্যজন জানে সামনে ঝড়। এই অসঙ্গতি যত বাড়ে, বিমান তত খারাপ সিদ্ধান্ত নেয়- শেষে সম্পর্কের মতো বিমানটিও অস্বাভাবিকভাবে ক্রাশ করে।
অনেকে মনে করেন, পরকিয়ার সম্পর্ক আকস্মিক হয়, আসলে পরকিয়ার সম্পর্ক আকস্মিক ঘটে না। গটম্যান তার ল্যাবে দীর্ঘ বিশ বছরের পরীক্ষামূলক প্রমাণ বিশ্লেষণ করে দেখিয়েছেন, সঙ্গীর কাছ থেকে আসা হাজার হাজার মাইক্রো প্রতারণা একসাথে জমে এমন একটি কন্ডিশন তৈরি হয়, যখন রিলেশনশিপ সিস্টেম তার প্রেডিক্টিবিলিটি হারায়। পরকিয়ার পেছনে একটি শক্তিশালী কারণ অপমান ও হেয় করা, এটাকে বলে সম্পর্ক ভাঙার সালফিউরিক অ্যাসিড।
ছোট ছোট অপমান, উপেক্ষা ও অবহেলা দিনের পর দিন পুঞ্জিভূত হতে হতে এমন একটি সময় আসে যখন শেয়ার্ড রিয়্যালিটি ভেঙে যায়। পার্টনার যখন আপনাকে ছোট ছোট উপেক্ষা ও নীরবতার মাধ্যমে কষ্ট দেয়, আপনার মস্তিষ্কের অ্যামিগডেলা এটাকে মাইক্রোথ্রেট হিসেবে এনকোড করে। তখনই আসে সবচেয়ে ভয়ানক একটি খেলা। আপনার পার্টনার এ সময় বিকল্প একজন মানুষের সাথে কমিউনিকেশন করা শুরু করে, তাদের কাছ থেকে সামান্য পরিমাণ ভ্যালিডেশন পাওয়ার সাথে সাথে তাদের মাইক্রোস্ট্রেস রিলিফ হয় এবং ব্যাপকভাবে ডোপামিন বুস্ট করে। তাদের কাছে পাওয়া ডোপামিন, আপনার কাছ থেকে পাওয়া স্ট্রেস রিলিফ করে।
একজন পুরুষ যখন তার পার্টনারের পক্ষ থেকে বিকল্প কোনো পুরুষের সাথে যোগাযোগ করে, প্রাকৃতিকভাবে সে পুরুষটি তার উচ্চমাত্রিক প্রশংসা করে। আপনার কাছ থেকে সে পায় মাইক্রো থ্রেট আর বিকল্প পুরুষের কাছে পায় উচ্চমাত্রিক প্রশংসা। সে স্ট্রেস হর্মোন কর্টিসল থেকে মুক্তির জন্য বিকল্প পুরুষের সাথে নিয়মিত কথা বলা শুরু করে। আর এভাবেই প্রতারণার নিউরোলজিক্যাল বীজ বপন হয়। শেয়ার্ড রিয়্যালিটি ভেঙে গেলে দুজন দুটি আলাদা ইউনিভার্সে চলে যায়।
একজন ভাবে, আমরা ভালো আছি-শুধু একটু ডিস্টেন্সে আছি। অন্যজন ভাবে আমি একা একা ফাইট করছি, আমাকে কেউ বুঝতে পারে না। এভাবে তাদের ইউনিভার্স আলাদা হতে থাকে। তারা আর কিছুতেই একে অন্যের সাথে কানেক্ট হতে পারে না। মাইক্রো প্রতারণা থেকে আপনার সঙ্গী আপনার কাছ থেকে ডিসকানেক্ট হয়, ইমোশনাল ভ্যাকিউম তৈরি হয়, সে একটা সিক্রেট লাইফ তৈরি করে এবং আল্টিমেটলি সেটা পরকিয়ার সম্পর্কে রূপান্তরিত হয়। আপনি আর এই সম্পর্ককে প্রেডিক্ট করতে পারেন না। কারণ অলরেডি সিস্টেম গাণিতিকভাবে অস্থিতিশীল। আর বিভিন্ন পুরুষ ও নারীর কাছ থেকে আসা র্যান্ডম ট্রিগার যেমন টেক্সট, অ্যাটেনশন ও ভ্যালিডেশন এই সম্পর্কের পতন ঘটনোর জন্য যথেষ্ট। আপনার পার্টনার স্ট্রেস হর্মোন থেকে রিলিফ চায় আর প্রতিযোগী পার্টনার চায় তার শরীর। কিন্তু সে একবারের জন্যেও কল্পনা করে না, যেই মাইক্রো থ্রেট আজ তাকে অন্য সম্পর্কের দিকে চালনা করছে, একই মাইক্রো থ্রেট তাকে আবারও অন্য একটি সম্পর্কের দিকে চালনা করবে।
একবার আপনার পার্টনার পরকিয়ার সম্পর্কে জড়িয়ে গেলে আপনি তাকে কখনোই রিকভার করতে পারবেন না। এটা তার কোনো মুড বা ইগো নয়। এটা হলো তার একটি নিউরোবায়োলজিক্যাল রেজিস্ট্যান্স। আপনার সঙ্গী যদি আপনার দ্বারা প্রতারণার শিকার হয়, আপনি তাকে যতই সেফটি ও সিকিউরিটির নিশ্চয়তা দেন না কেন সে আর সেফ রিলেশনে ফিরে আসে না। তার ভ্যাগাস নার্ভ ও প্যারাসিম্পেথেটিক নার্ভাস সিস্টেম হাইপারঅ্যাকটিভ থাকে। তার ব্রেন কনস্ট্যান্ট ডেঞ্জার মোডে আটকে থাকে, তার হার্টরেট ১৬০ bpm পর্যন্ত লাফ দেয়। আপনি সম্পর্ক রিপেয়ার করতে চাইলেও তার ব্রেন আর রাজি হয় না। মস্তিষ্কের এমিগডেলা একবার আপনাকে “High Threat” হিসেবে গ্রহণ করে নিলে আর সহজে ছেড়ে দেয় না।
আপনি যদি তার সাথে সেফ মুডে কথা বলেন, তার ব্রেন এটাকে ক্রস চেক করে এভাবে: “This signal doesn’t match previous betrayal history.”। আপনি যখন তাকে বলবেন, চাইলেই তো সবকিছু ঠিক করে নেয়া যায়, সে আপনার কথা শুনবে না। কারণ আপনার কাছ থেকে মাইক্রোস্ট্রেস পেতে পেতে তার প্রিফ্রন্টাল কর্টেক্স দুর্বল হয়ে গেছে, সে এখন ডিসিশন নেয়ার ক্ষমতা রাখে না। আপনি তাকে যতই ফিরে আসতে বলেন, সে কিছুতেই আপনার কথা লজিক্যাল সেন্স তৈরি করতে পারবে না, আপনার বক্তব্য নিউরোলজিক্যালি হাস্যকর।
গটম্যান এটাকে বলেন সাইকোলজিক্যাল ফ্লাডিং। এই অবস্থায় রিপেয়ার পদক্ষেপ ব্যর্থ হওয়ার সম্ভাবনা ৯০% এর বেশি। ব্রেন যাকে একবার “unsafe” হিসেবে লেবেল করে, তাকে আবার “safe” করতে চাইলে শুধু ক্ষমা, কথা, ভালোবাসা—কিছুই যথেষ্ট নয়। এটা ইচ্ছাশক্তির খেলা নয়; এটা নার্ভাস সিস্টেমের স্বয়ংক্রিয় সার্ভাইভাল মেকানিজম। সে যদি আপনার কাছে ফিরে আসে, তবে ইমোশন দিয়ে নয়, তাকে নিউরোবায়োলজিক্যাল পরিবর্তনের ভেতর দিয়ে ফিরে আসতে হবে, ৯০% মানুষ এটা অর্জন করতে পারে না।
কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য যে, বিজ্ঞানী গটম্যান পরকিয়াকে অনৈতিক আচরণ বলছেন না। এখানে কোনো ধর্ম, নীতিশাস্ত্র বা চরিত্রের বিচার নেই। তিনি বলেন পরকিয়া হলো “Personal emotional regulation problem”। একজন ব্যক্তি তার ট্রমা ব্যাকগ্রাউন্ড থেকে পরকিয়ার সম্পর্কে জড়ায়। কিন্তু আপনার পার্টনার যখন পরকিয়া করে আপনার কেমন লাগে?
এই প্রশ্নের উত্তর জানার জন্য কল্পনা করুন, রিলেশনশিপ হলো একটি ইকোসিস্টেম। একটি ইকোসিস্টেমে পানি, আলো, পুষ্টি—সবকিছু ভারসাম্য থাকলে গাছ বেঁচে থাকে, একইভাবে একটি সম্পর্ক টিকে থাকে দুজনের মনোযোগ, সহানুভূতি, অন্তরঙ্গতা, আত্মনিয়ন্ত্রণ, সংবেদনশীলতা ও বিশ্বাস থেকে। এগুলো একটি সম্পর্কের নিউট্রিয়েন্টস। পরকিয়া হলো এই ইকোসিস্টেম থেকে নিউট্রিয়েন্টস তুলে অন্য কোনো ইকোসিস্টেমে দেয়া। এটা চারিত্রিক সমস্যা নয়, পরিবেশের ভারসাম্যহীনতা। যখন আপনার প্রেমিকা আপনাকে অন্তরঙ্গতা না দিয়ে অন্য কাউকে অন্তরঙ্গতা দেয়, তখন সেটা আপনার মস্তিষ্কে সরাসরি নিউরোলজিক্যাল ক্ষত তৈরি করে। এটি আপনার সেফটি সিস্টেমে সরাসরি আঘাত করে। আর তখন আপনার মনে হতে থাকে __ আমি যথেষ্ট না।আমার জায়গা কেড়ে নেওয়া হয়েছে। আমাকে ফেলে দেওয়া হলো। সে আমাকে আর নিরাপদ মনে করে না। আমি এখন একা। সে আপনার থেকে আদর, সহানুভূতি ও সেক্স কেড়ে নিয়ে অন্য কাউকে উপহার দিচ্ছে। আপনার মস্তিষ্ক এটাকে ডেপ্রিভেশন হিসেবে দেখে, তার অ্যাটাচমেন্ট প্যানিক তৈরি হয়, তার শরীর ফাইট অর ফ্লাইট এবং ফ্রিজ মোডে চলে যায়। পরকিয়ার আঘাত থেকে মানুষের মস্তিষ্কের স্মৃতির কর্টেক্স হিপোক্যাম্পাস ছোট হয়ে যায়।
ধরুন আপনার জীবনে একজনই আছে যার কাঁধে মাথা রেখে আপনি শান্ত হন। আপনার নার্ভাস সিস্টেম তাকে “safe person” হিসেবে রেজিস্টার করেছে। একদিন দেখলেন— সে তার কাঁধ অন্য কারো জন্য ব্যবহার করছে। এবং আপনাকে জানায়নি। এটা আপনার নৈতিক ক্ষোভ না—এটা আপনার সেফটি-সিস্টেমে আঘাত। আপনার ভেতরের ব্রেন শুধু বলে— “আমি এখন নিরাপদ নই।” যতক্ষণ পর্যন্ত এই ক্ষত শুকায় না, সম্পর্ক কাজ করে না, এটাকে বলে “Attachment wound”। পরকিয়া কোনো চারিত্রিক ত্রুটি নয়। এটি আমাদের নিরাপত্তাবোধ ভেঙে দেয়, এটি কোনো নৈতিক বিষয় নয়, স্নায়ুবিক আঘাত।
No comments:
Post a Comment