অবশেষে বাঙালীর অতি প্রতীক্ষিত আয়েসী শীতকাল আসিয়া পড়িল সুপন্নে! এই দুটি মাস বাঙালী ঘামিবে না; পথেঘাটে অযথা তুচ্ছ কারণে মেজাজ হারাইবে না। গৃহে গৃহে বিবাহযোগ্য পুত্র-কন্যা থাকিলে শ্রাবণ মাসে বিয়ের কথা পাকা হইলেও মাঘ মাসে বিবাহের দিন স্থির করা হইয়াছে। রমণীকূল মহানন্দে ভারী বেনারসী কাঞ্চিপুরমাদি বাহির করিয়া সজ্জার পরিকল্পনা করিতেছেন। আরামের কথা এই যে মেক আপ গলিয়া যাইবে না। বিপণী কেকে সাজিয়া উঠিয়াছে। কলকেতায় বরফ না পড়িলেও স্নো ফ্লেকস, সান্তা, রেইন ডীয়ার আর তুলো দিয়া তুষারে তুষারে সকল লন্ডনপ্রায়। ব্রিটেনের অধীনতা ছাড়িয়াও তাহাদের ছায়ায় আজিও মুগ্ধ পার্কস্ট্রীট; আলো জ্বলিতেছে, টুনি টুনি। মোকাম্বো ফ্লুরিজ, নাহুমে সর্পসম দীর্ঘ লাইন। বাঙালি জ্বালাময়ী ভাষণ দিলেও ইংরেজি ভালোবাসে। গড সেভ দ্য কিং-এর বদলে বন্দে মাতরম বলিলেও সাহেবি কাঁটা চামচে আত্মপ্রসাদ লাভ করে।
তাহার বাঙালীয়ানাও আছে। প্রভাতে কর্মস্থলে যাওয়ার সময় রিক্সায় বসিয়া মালবিকা বাজার দেখিতে দেখিতে মোহিত হইয়া যায়- রঙের কী অপরূপ বিন্যাস! গুচ্ছ গুচ্ছ হরিদ্রাভ কুমড়াফুলের পাশে শ্যামল পেঁয়াজকলি; রক্তিম বিলাতি বেগুন, মাখনা বেগুন, দেশী, রাঙা আলু, তরতাজা শাক কী নাই! মালবিকা গৃহসহায়িকাকে চলভাষে লিখিয়া দেয় বাজারের তালিকা। রন্ধন এখনো সে নিজ হস্তেই করে। সন্ধ্যায় প্সলং শাকের ঘন্ট রাঁধিয়া রাখে; পরদিবসে দ্বিপ্রহরে ফিরিয়া গরম ভাতের সাথে পরিতৃপ্তি সহকারে খায় - শাকান্ন।
কে বলে সাধারণ! বর্ণে গন্ধে স্বাদে রাজকীয়!
পাক-প্রণালী-
"পালমশাকের ঘণ্ট -কচি অবস্থায় কোন কোন শাকের ঘণ্ট উত্তম সুখাদ্য।
এইজন্য, একটি প্রবাদ আছে, "শাকের ছা আর মাছের মা” অর্থাৎ শাকের কচি, মাছের মা; ইহার তাৎপর্য্য এই যে, পাকা মাছ (অর্থাৎ যাহাতে তৈলের সঞ্চার হইয়াছে) এবং কচি শাকের ব্যঞ্জন সুস্বাদু হইয়া থাকে।
প্রথমে, শাকগুলি কুচি কুচি করিয়া কুটিয়া, ভাসাজলে উত্তমরূপে ধুইয়া লইল পরে, হরিদ্রা জলে গুলিয়া তাহাতে শাক সিদ্ধ করিবে। সুসিদ্ধ হইলে, উনান হইতে নামাইয়া, জল গালিয়া ফেলিবে। এখন, উহা কোন পাত্রে ঢালিয়া রাখিবে। এদিকে, তেজপত্র, লবঙ্গ এবং গন্ধদ্রব্য ভিন্ন, আর সমুদায় মসলা, শাক ও তরকারী, অন্যান্য উপকরণগুলির সহিত একত্রে চট্টকাইয়া মাখিবে।
অনন্তর, পাক-পাত্র জ্বালে ছড়াইয়া, তাহাতে তৈল বা ঘৃত (যে পরিমাণে ব্যবহৃত হইবে, তাহার অর্দ্ধেক) পাকাইয়া লইবে। পরে, তাহাতে বড়িগুলি ভাজিয়া তুলিয়া লইয়া, তেজপত্র ও লবঙ্গ ফোড়ন দিয়া, শাক সম্বরা দিবে। একবার উহা ফুটিয়া আসিলে, ভাজা-বড়ি ও অবশিষ্ট ঘৃত, গন্ধ-মসলা-চূর্ণ বা বাটা, উহার উপর ঢালিয়া দিয়া, উত্তমরূপে নাড়িয়া, নামাইয়া লইলেই শাকের ঘণ্ট রাঁধা হইল। ঘুতের অভাবে, কেবলমাত্র তৈল দ্বারাও ঘণ্ট পাক হইতে পারে। কিন্তু মসলা দেওয়ার সময় একটু ঘৃত দিলে, আস্বাদন উত্তম হইয়া থাকে।” - বিপ্রদাস মুখোপাধ্যায়।
মালবিকা আজ রাঁধিল.....
মনে মনে ভাবিল - বাঙালী ভুলিও না, এই ঘন্ট, এই কালিয়া, এই চচ্চড়ি তোমার শিকড়। পালক পনীর খাইও, বিভেদ রাখিও না, কিন্তু পালং শাকের ঘন্ট তোমার মায়ের, তাহার মায়ের এবং তাহার তাহার তাহার মায়ের হাতের স্পর্শ। মুলি কা পারাঠা বেলিতে নাজেহাল হইতে হইতে ভাবিও, একবার পিছনে তাকাইয়া দেখিও, সর্ষে ফোড়ন দিয়া মূলার ঘন্ট। ইত্যাদি। ইত্যাদি।
No comments:
Post a Comment