Saturday, December 20, 2025

খারাপভাবে ভাবছি, নাকি ভাবছিই না

 

আজকের বাংলাদেশে সবচেয়ে বড় সংকট কোনো অর্থনৈতিক সূচকে ধরা পড়ে না। এটি চিন্তার সংকট। আমরা কি খারাপভাবে ভাবছি, নাকি একেবারেই ভাবছি না—এই প্রশ্নটি এড়িয়ে যাওয়ার যত চেষ্টা করছি, বাস্তবতা তত জোরে আমাদের সামনে এসে দাঁড়াচ্ছে। চারপাশে তাকালে দেখা যায়, আমরা আবেগে উত্তেজিত হই, মতামতে ভরপুর হই, কিন্তু বিশ্লেষণে অনুপস্থিত থাকি। সিদ্ধান্ত নেওয়া হচ্ছে দৃঢ় কণ্ঠে, অথচ সেই সিদ্ধান্তের ভিত্তি একেবারেই ফাঁপা, শূন্য।
মানুষ নিজের চিন্তার চেয়ে সমাজের চিন্তাকে বেশি বিশ্বাস করে—এটাই চিরন্তন সামাজিক ত্রুটি। বাংলাদেশে এই ত্রুটি কোনো ব্যতিক্রম নয়, বরং নিয়ম। এখানে ভিন্নভাবে ভাবা মানে আলাদা হয়ে যাওয়া, আর আলাদা হওয়া মানেই সন্দেহের চোখে পড়া। ফলে মানুষ নিরাপদ থাকতে চায়, সঠিক থাকতে নয়। আমরা দলীয় পরিচয়, আদর্শিক শিবির আর সামাজিক গ্রহণযোগ্যতার ভেতর নিজেদের চিন্তাকে বন্দি করে ফেলেছি। প্রশ্ন না করাকে শালীনতা আর চুপ থাকাকে প্রজ্ঞা ভেবে ভুল করছি এবং সঙ্গে যুক্ত হয়েছে জড়তার একপেশে শাসন আর অভ্যাসের আরাম, যা বহুদিন ধরে চলছে, সেটাই স্বাভাবিক বলে ধরে নেওয়া হচ্ছে।
শিক্ষাব্যবস্থা চিন্তা তৈরি না করে মুখস্থ তৈরি করলেও আমরা বিস্মিত হই না। প্রশাসনিক অদক্ষতা আমাদের নিত্যসঙ্গী হলেও আমরা তাকে ভাগ্যের লিখন বলে মেনে নিই। নাগরিক হিসেবে দায়িত্ব এড়িয়ে যাওয়াকেই আমরা বাস্তববাদ বলে চালিয়ে দিচ্ছি। পরিবর্তনের অনিশ্চয়তা আমাদের এতটাই ভীত করে যে স্থবিরতাকেই আমরা স্থিতিশীলতা বলে আত্মপ্রবঞ্চনা করি। এই ত্রুটিগুলো একা কাজ করে না; তারা পরস্পরের সহযোদ্ধা। সামাজিক চাপ অভ্যাসকে শক্ত করে, অভ্যাস আবার সমাজকে প্রশ্নহীন করে তোলে। এর ফল এক ধরনের সম্মিলিত বুদ্ধিবৃত্তিক অলসতা—যেখানে সবাই কথা বলে, কিন্তু খুব কম মানুষই ভাবে। আমরা প্রতিক্রিয়াশীল হয়ে উঠেছি, চিন্তাশীল নই। ঘটনা ঘটলে আমরা রাগ করি, পক্ষ নিই, পোস্ট লিখি—কিন্তু কেন ঘটল, কীভাবে ঘটল, এবং আবার ঘটবে কি না—এই প্রশ্নগুলো এড়িয়ে যাই। এখানেই বিপদ সবচেয়ে গভীর। কারণ চিন্তা না করা মানুষকে শাসন করা সহজ, বিভক্ত করা সহজ, এবং ভুল পথে চালিত করা আরও সহজ। ইতিহাস বলে, কোনো সমাজ তখনই দীর্ঘমেয়াদে ক্ষতিগ্রস্ত হয়, যখন তার মানুষ যুক্তির জায়গা ছেড়ে আবেগের আশ্রয়ে চলে যায়। আমরা আজ সেই পথেই দ্রুত হাঁটছি।
কিছু মানুষ আছে, যারা আবেগ আর অহংকারকে লাগাম পরাতে শেখে। তারা জানে, প্রতিটি মতামত প্রকাশযোগ্য নয়, আবার প্রতিটি প্রশ্ন দমিয়ে রাখাও উচিত নয়। তারা আজকের সাধারণ মুহূর্তগুলোতে ঠান্ডা মাথায় ভাবতে পারে বলেই আগামীকালের জন্য নিজেদের ও সমাজকে একটু ভালো অবস্থানে রাখতে সক্ষম হয়। তারা ভিড়ের বাইরে দাঁড়ানোর মূল্য বোঝে—এবং সেই মূল্য দিতে রাজি থাকে।
বাংলাদেশের বর্তমান বাস্তবতায় এই মানসিক সাহসটাই সবচেয়ে জরুরি নাগরিক গুণ। নিজেকে কঠিন প্রশ্ন করা—আমি কি তথ্য বিশ্লেষণ করছি, নাকি শুধু নিজের পক্ষকেই ভারী করছি? আমার বিশ্বাস কি যাচাই করা, নাকি উত্তরাধিকারসূত্রে পাওয়া? আমি কি সত্য খুঁজছি, নাকি স্বস্তি? এই প্রশ্নগুলো এড়িয়ে গেলে আমরা বারবার একই ভুল করছি, আর প্রতিবারই নতুনভাবে তাকে চিহ্নিত করছি।
একটি সমাজ খারাপভাবে ভাবা আর একেবারেই না ভাবার মধ্যবর্তী ফাঁদে আটকে থাকলে তার ভবিষ্যৎ অন্য কোথাও থেকে লিখিত হয়। বাংলাদেশকে যদি সত্যিই নিজের ভবিষ্যৎ নিজে লিখতে হয়, তবে আগে শিখতে হবে—ভাবতে। কঠিনভাবে, অস্বস্তিকরভাবে, কিন্তু সৎভাবে। নইলে আমরা শুধু সময় নয়, সম্ভাবনাও নষ্ট করব—নীরবে, সম্মিলিতভাবে।
সন্ত্রাসকে আমরা ধর্ম বলে পালন করছি, ফলে ধর্মই এখন চরম অধর্ম আর বিশ্বত্রাসের কারণ দাঁড়াচ্ছে। মোটা দাগের স্থূল বিনোদনকে সংস্কৃতি হিসেবে চিহ্নিত করে আমরা যৌনসুলভ বাণিজ্যিক উন্নতি করতে চাইছি।
ধর্মের নামে যে রেগে তেড়ে ফুঁড়ে মানুষকে মারছে তাকে সংশোধন না করলে বাংলাদেশ একদিন গভীরতর অন্ধকারে ডুবে যাবে, এদেশে কোনো সুস্থ মানুষ বাস করতে পারবে না।

রবিশঙ্কর মৈত্রী

No comments:

Post a Comment