Friday, December 19, 2025

ধর্ম আনুগত্য চায়, সংস্কৃতি বোধ জাগায়।

 কাজী মোতাহার হোসেন চৌধুরীর “সংস্কৃতি কথা” প্রবন্ধে একটি বাক্য আছে, যা আজও আমাদের অস্বস্তিতে ফেলে দেয়—

“ধর্ম সাধারণ লোকের কালচার, আর সংস্কৃতি শিক্ষিত মার্জিত লোকের ধর্ম”
এই কথাটি কোনো ধর্মবিদ্বেষ নয়। বরং এটি এক গভীর সমাজবৈজ্ঞানিক পর্যবেক্ষণ। তিনি বলতে চেয়েছেন—সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনচর্চা, আচরণ, ভয়-ভরসা ও বিশ্বাসের কেন্দ্র হলো ধর্ম। আর শিক্ষিত, চিন্তাশীল, মার্জিত মানুষের কালচার গড়ে ওঠে যুক্তি, মানবিকতা ও বুদ্ধিবৃত্তিক চর্চার মধ্য দিয়ে—যেটাকে আমরা সংস্কৃতি বলি।
কাজী মোতাহার হোসেন চৌধুরী স্পষ্ট করে দেখিয়েছেন, ধর্ম আর সংস্কৃতি এক জিনিস নয়। ধর্ম বিশ্বাসের বিষয়, সংস্কৃতি চর্চার। ধর্ম প্রশ্ন এড়িয়ে যেতে শেখায়, সংস্কৃতি প্রশ্ন করতে শেখায়। ধর্ম আনুগত্য চায়, সংস্কৃতি বোধ জাগায়।
তিনি সতর্ক করেছিলেন—যখন একটি সমাজ ধর্মকে সংস্কৃতির বিকল্প বানিয়ে ফেলে, তখন সেখানে চিন্তার মৃত্যু ঘটে। তখন মানুষ গান-বই-শিল্প নয়, শ্লোগান আর নির্দেশ মানে। তখন ভিন্নমত শত্রু হয়ে যায়, আর যুক্তি হয়ে ওঠে অপরাধ।
আজকের সমাজে দাঁড়িয়ে “সংস্কৃতি কথা” পড়লে বোঝা যায়, লেখাটি কতটা দূরদর্শী ছিল। আমরা আজ উৎসব করি, কিন্তু সহনশীল নই। আমরা ধর্মের কথা বলি, কিন্তু মানবিক হই না। আমরা সংস্কৃতির কথা বলি, কিন্তু প্রশ্ন শুনতে পারি না।
কাজী মোতাহার হোসেন চৌধুরীর মতে, প্রকৃত সংস্কৃতিবান মানুষ সে-ই, যে ভিন্ন বিশ্বাসকে সহ্য করতে পারে, যে যুক্তির সামনে মাথা নত করে, যে মানুষের মর্যাদাকে ধর্মের চেয়েও বড় করে দেখে।
“ধর্ম সাধারণ লোকের কালচার” — এই বাক্যটা অপমান নয়।
এটা বাস্তবতা।
আর “সংস্কৃতি শিক্ষিত মার্জিত লোকের” — এটা কোনো অহংকার নয়, এটা দায়িত্ব।
যে সমাজ সংস্কৃতির জায়গায় শুধু ধর্মকেই বসায়, সে সমাজ একদিন মানুষ হারায়, বিবেক হারায়।
এই কথাটা আজ বুঝতে পারলে—আগামীকাল হয়তো আর দেরি হবে না।

No comments:

Post a Comment