Tuesday, December 2, 2025

সেই অম্বল

 


খেজুরের গুড় বাড়ি আসতেই আমরা বুঝতাম নবান্ন৷ কামিনীভোগ চাল বাটা,নতুন কড়াইশুঁটি, আখের টুকরো। ছোট্ট উঠোনের চারদিক ঘিরে মরশুমি সবজির বাগান। উঁকি দিচ্ছে ফুলকপি পালং। কুলগাছের ডাঁসা কুলে সবে হলদেপনা রঙ ধরেছে।বেগুনি সিম ফুল ঝেঁপে আসে দরমার বেড়ায়।
চালকুমড়ো বড়ি ভাজা,টুকরো নারকোল ভাজা আর চুবড়ি আলু। মাসকলাই হলুদ নিমপাতা দিয়ে তেল ফুটিয়ে রাখত ঠাম্মা। স্নানের আগে গায়ে ঘসে ঘসে তেল মেখে স্নান করতাম আমরা কচি কাঁচারা। রোদে রাখা জলের বালতিতে দুব্বো ফেলে রাখা। ধান কাটার পরে ন্যাড়া মাঠ ধু ধু করে। সবুজ জলে ছায়া পরে টসটসে বাতাবী লেবুর। আমাদের টিনের সুটকেসে ভরা নীল সবুজ মার্বেল, লাটিম। মাঠে খেলে এসে হাঁটু ভর্তি ধুলো,ঘসেঘসে যখন তুলতাম টের পেতাম শীত এসে গেছে। কলপাড়ে তারে মেলা গামছা,অন্ধকারে কালচে দেখায়। পড়তে বসে গুড় জ্বালের গন্ধ,নতুন চালের পায়েস নিভু আঁচে। টুপ টুপ হিম পরে সারা রাত। শুকনো খেজুর পাতায় আগুন পোয়ানো। একটা বড়ো হাঁড়িতে জমা হয় সারা বছরের গুড়। আমাদের বইএর ভাঁজে রাখা ময়ুরের পালক আর কদিন পরেই দুটো হয়ে যাবে।
শীতের শুরুতেই নতুন গুড়ে বাগানের কচি লাল মুলো আর চালতার অম্বল বানাতো ঠাম্মা অল্প নারকোল কোরা দিয়ে। একদিনের বাসি সেই অম্বল খেতাম শেষপাতে। ওপার পেরিয়ে আসা ঠাম্মার গল্পে বগুড়া,ভবানী মন্দির, গাইবান্ধা হাই স্কুল। আর সেই তালগাছটা। মুলো চালতার অম্বলটাও ঠাম্মার দু চোখের পাতায় করোতোয়ায় ছলাৎছল। ছিপ নৌকো বেয়ে মাঝরাতে আসা আমার স্বাধীনতা সংগ্রামী ঠাকুরদাদা, রাজবন্দী থাকার সময় লেখা সেই ডায়েরি যা হারিয়ে গিয়েছে কবেই। আজ ও শীতের শুরুতে তাই নতুন গুড়ে ঠাম্মার ওম। চালতা মুলোর অম্বলে সেই এক রাতে ছেড়ে আসা বাড়িটার ছবি।

No comments:

Post a Comment