ডাক্তারদের দেখুন, তাঁরা রোগীর প্র্রতি কোন যৌন আকর্ষণ অনুভব করেন না যিনি তার কাছে চিকিৎসা নিতে এসেছেন। এমনকি ডাক্তার যদি পুরুষ গাইনি ডাক্তার হোন এবং রোগী মহিলা। পোশাক খুলে গোপন অঙ্গ দেখলেও ডাক্তার নির্বিকার। এটাকে বলা হয় পেশাগত শুদ্ধতা। ডাক্তারী বিদ্যায় এটা নিষিদ্ধ। ডাক্তারীর মত বৈজ্ঞানিক পেশায় এটা যদি শতভাগ পালিত হয়ে থাকে এবং রোগী সম্পর্কে ডাক্তারদের চিন্তাপ্রক্রিয়া বা কগনিশন ও আচরণ যদি অযৌন (অ্যাসেক্সুয়াল) হয়ে যায়, তাহলে মুসলিম ধর্মপ্রচারকদের সেটা হয় না কেন? তারা কেন একজন নারীর দিকে অযৌন চিন্তাপ্রক্রিয়া ও আচরণ করতে পারেন না। তেঁতুল দেখলে জিভের মত সুন্দরী নারী দেখলে তাদের অঙ্গ কেন রসে ভিজে ওঠে? এটা নিয়েই একটা গল্প লিখেছিলেন মহান রুশ সাহিত্যিক লিও টলস্টয়।
বন্ধুদের সাথে পিকনিক করে হাসি ঠাট্টা করতে করতে ঘোড়ার গাড়িতে করে নিজ শহরে ফিরছিল নিজের রূপের মহীমায় অতিবিশ্বাসী এক আধুনিকা তরূনী। পথিমধ্যে একটি গ্রাম পার হবার সময় পাশে বসা বন্ধু ভদ্রলোক হাত তুলে দেখিয়ে বললেন, "ঐ যে এইখানে থাকেন সেই পাদ্রী। যিনি ছিলেন এক সুদর্শন প্রিন্স, একসময় ছিলেন সম্রাটের খুব ভক্ত একজন সেনাধিপতি। বিয়ের দিনেই পরম প্রিয় প্রেমিকার সাথে স্বয়ং সম্রাটের অবৈধ সম্পর্ক আবিষ্কারের পর বিতশ্রদ্ধ হয়ে তিনি নিরুদ্দেশ হন ঈশ্বরের সাধনায়।"
মেয়েটি বন্ধুটির কথায় উৎসাহী হয়ে ওঠে। বিদ্রুপ করে মনে মনে - যে ঐ সব সাধুদের চেনা আছে তার, ভেতরে ভেতরেতো ঠিকই তো নারী লিপ্সু ক্ষুধার্থ পুরুষ। কথায় কথায় চ্যালেন্জ দিয়ে বসে মেয়েটি। ঠিক হয় বন্ধুরা এখানে নামিয়ে দিয়ে যাবে মেযেটিকে, কাল সকালে আবার এসে তুলে নিয়ে যাবে তারা। রাতটি মেয়েটি কাটাবে ঐ পাদ্রীর বিছানায়। এটাই বাজী। গর্বিতা মেয়েটি নিশ্চিত, কোন পুরুষের সাধ্য নেই তার আবেদনে না বলার।
ঝিরি ঝিরি বৃষ্টিতে সিক্ত বসনে ভর সন্ধ্যায় অপ্রতিরোধ্য তন্বী সুন্দরী তরুণী কড়া নাড়ে প্রার্থনারত পাদ্রীর বাড়ীর বন্ধ দরজায়। নারীকন্ঠ শুনে প্রার্থনারত ফাদার খোলেন না দুয়ার। বহু অনুনয় বিনয়, করে মেয়েটি। দুর্যোগের রাত্রে বিপদে পড়া অসহায় নারীর অভিনয়ে ছলে কৌশলে পরিশেষে সফল হয় নারী।
বিরক্ত হয়েও দ্বার খুলে দেন পাদ্রী মহোদয়। মুহুর্তের দৃষ্টিবিনিময় দু'জোড়া চোখের। শরীরের চাওয়া পাওয়ার বোঝাপাড়া হয়ে যায় ঐ ক্ষনিকের দৃষ্টিতেই, তখনই বুঝে যায় নারী তার নারীসূলভ ক্ষমতা দিয়ে যে বিজয় আসন্ন, শুধু সময়ের ব্যাপার। কিন্তু নিজ দুর্বলতায় সন্ত্রস্ত ফাদার শুধু রাতটুকু থাকার অনুমতি দিয়ে দ্রুত চলে যান অন্য ঘরে। মগ্ন হন প্রার্থনায়।
ক্ষনিক পরে ভান করে হাসির ঝংকার, মৃদু চিৎকার-শীৎকারে ফাদারকে আবার ডাকতে থাকেন অর্ধনগ্ন নারী তাকে পোশাক খুলতে সাহায্য করবার জন্য। নিজের আকর্ষনী ক্ষমতায় আত্মবিশ্বাসী নারী যতই চালিয়ে যেতে থাকেন তার আবেগের অস্ত্র, আরও জোরেসোরে চলে তার ছলা কলা কৌশল, ততই বাড়তে থাকে পাশের ঘর থেকে আসা পবিত্র গ্রন্থ থেকে উচ্চারিত কন্ঠের কম্পিত শব্দের তিব্রতা।
সাধারণ আহ্বানের আবেগে কাজ না হলে শারিরীক যন্ত্রনার অভিনয় শুরু করে মেয়েটি। করুন কন্ঠে সাহায্য চায়, ব্যাথায় যেন বিপন্ন সে। একদিকে ব্রত আর একদিকে কামনায় উদভ্রান্ত ফাদার “আসছি এখনই” বলে ছুটে যান জ্বালানী কাটার কুঁড়ে ঘরটিতে। তুলে নেন দেয়ালে খাড়া করে রাখা কুঠারখানি। জ্বালানী টুকরো করার কাঠের টুকরাটির উপর বাঁ হাতের তর্জনীটা রেখে ডান হাতে কুঠারটি নিয়ে বসিয়ে দেন একটি কোপ।
ব্যাথা অনুভবের আগেই তর্জনীর টুকরোটি মাটিতে পতনের শব্দ শুনতে পেলেন যেন তিনি। তারপর তীব্র ব্যাথা সয়ে আস্তীনের কোনাটা কাটা যায়গায় পেঁচিয়ে মেয়েটার সামনে গিয়ে দাঁড়িয়ে বললেন, “কি হয়েছে বোন?” ফাদারের মুখের বিবর্ণতা ও ব্যাথায় কুঞ্চিত কপোলের দিকে চেয়ে সচকিত হয়ে বিছানা থেকে লাফিয়ে উঠে নিচে পড়ে থাকা পোষাকটাকে কোন রকমে গায়ে চাপায় ঘটনার আকষ্মিকতায় লজ্জিত মেয়েটি। খেয়াল করে দেখে রক্ত বেয়ে পড়ছে হাতের কাটা স্থান থেকে তার আজকের রাত্রের কামনার পুরুষের।
দৌড়ে বের হয়ে যায় মেয়েটি। বন্ধুদের কাছে হেরে যাওয়া মেনে নিলেও মনে শান্তি ফিরে পায় না সে। নিজের দম্ভচূর্ণ হলেও সংসারে মন বসে না আর যেন। অপরাধবোধ আর গ্লানী দূর করতে মঠবাসী সন্ন্যাসী হয়ে যায় মেয়েটি।
কিন্তু সেই ফাদার? দিনে দিনে এতই বিখ্যাত হন তিনি যে তার ছোঁয়ায় নাকি কুষ্ঠরোগ সেরে যায় লোক বলে। দুর দুরান্ত থেকে লোক আসে তার একটুখানি পবিত্র স্পর্শের প্রত্যাশায়। কিন্তু বোঝেন তিনি নিজে, দিনে দিনে আরও পতনের অভিজ্ঞতায়, দৃষ্টির আকাঙ্খায় যে অন্তর শুদ্ধ নয় তাঁর – নামকরা ধর্মযাযক হলেও যৌন কামনা, আত্মগরীমা, না পাওয়ার ক্ষুধা কিছুই কমছে না তাঁর। বরং আরও বেড়ে চলেছে হিংস্র পশুর মত। আগে যেখানে সৌন্দর্য শালীনতার লেবাস ছিল, যতই বিখ্যাত হচ্ছেন সেগুলোও চলে যাচ্ছে। বিখ্যাত হবার লোভ আর কাম অপরিণত, অযাচিতের প্রতি নোংরাভাবে প্রয়োগ করছেন যেন তিনি দিনে দিনে।
হৃদয়ের অশান্তী ছাড়ে না যেন তাঁকে। আবার ছেড়ে দেন তিনি সবকিছু। নিরুদ্দেশ হন আবারও, এবার নিজ গ্রামে। পেয়ে যান সেখানে ভালবাসা আর সাধনার সব প্রশ্নের উত্তর, তারই ছোটবেলার পড়শী খালাতো বোন, যাকে ব্যার্থ, বোকা নির্বোধ বলে সবসময় অবজ্ঞা হাসি ঠাট্টা করেছেন। তিনি অবাক বিস্ময়ে দেখেন, সবই পেয়েছে মেয়েটি তিনি যা যা চেয়েছিলেন। প্রিয় পরিজনদের ভালবাসা আর ঈশ্বরের পবিত্র স্পর্শ। যা পাবার জন্য এত করেছেন তিনি তার পুরোটাই পেয়েছে মেয়েটি তার সহজ সরল আটপৌরে জীবনের আখ্যানে শুধু সাধারণ ত্যাগ আর মানুষের কল্যাণ কামনায় নিজেকে বিলিয়ে দিয়া।
টলস্টয়ের লেখা গল্পটি নাম 'ফাদার সের্গি'। যেখানে তিনি দেখান জীবনে ভালবাসা আর ঈশ্বরের সাধনা প্রতিযোগীতা আর জিতে যাবার লক্ষ্যে অর্জিত হয় না। এটা একটা প্রক্রিয়া যেটা ত্যাগ আর মনের বিশ্বাসকে ধরে রেখে মানুষকে সহযোগীতার জন্য সাধারণ নিত্যনৈমিত্তিকতার চর্চার মধ্য দিয়ে ধরা দেয়। জীবনকে ভালবেসে যারা অন্তরের প্রশান্তীর পথ ধরে এগোয় তারাই ওই পরম আরাধ্যকে খুজে পায়। জীবন বিচ্ছিন্ন রোমান্টিকতা বা আদর্শবাদ – দুটোই বিফল হয়, ফল শুধুই মিথ্যা আর আত্মবঞ্চনায় পরিপুর্ণ একটি জীবন যেখানে প্রশান্তি নেই।
মনোবিদ্যার অংশ ব্যক্তিত্বের তত্ত্বগুলো বলে দুনিয়ার সকল ব্যক্তি তাদের আচরণ নিয়ন্ত্রণে একরকমভাবে দক্ষ নয়। চিন্তাপ্রক্রিয়া বা কগনিশন থেকে পরিবেশ পরিস্থিতি অনুযায়ী আচরণ ও প্রেষণা বা ড্রাইভকে উপযুক্ত করা সুস্থ ও পরিপূর্ণ মনোজাগতিক প্রক্রিয়া। অপরিণত মানসিকতা, যার কারণ অনেক সময়ই জন্মগত বা জেনেটিক অপুর্ণতা বা মানসিক ট্রমা অথবা শিশুকালীন সমাজবিরুদ্ধ পরিস্থিতিতে বিকাশ এমন ব্যক্তিত্ব তৈরি করতে পারে যারা পেশাগত জীবনেও আত্মনিয়ন্ত্রণে অক্ষম। তাই তারা অন্তরের প্রশান্তীর পথ কখনও খুঁজে পায় না। ঈশ্বরের পবিত্র স্পর্শ কিভাবে তারা খুঁজে পাবে? এদের পরিণতি শয়তানের পথ, যে পথের দুধারে শুধুই তেঁতুল গাছ।
© সিরাজুল হোসেন
No comments:
Post a Comment