মহামায়ার সংসারে কিছুই ফেলা হয়না। পুরোনো শাড়ি কাঁথা হয়, ভাঙা হাত পাখা শাড়ির পাড়ে মুড়ে নতুন হয়। তার রান্নাঘরে কুলোয় চাল ঝাড়লে রোজ এক দু মুঠ করে ভাঙা চাল হয়, তাই জড়ো করে রাখেন মাখনবালা, একটা আলাদা হাঁড়িতে, যেদিন অবসর হয় সেদিন তারা খুদ টালা করেন, মাটির হাঁড়িতে খুদের ভাতের স্বাদ পাওয়া যায়, সেদিন সংসারের কাজ কম, খুদের ভাত আর কিছু একটা বাটা কি সেদ্ধ, ফুরসত সেদিন দুই বোনের, ভাতের পালা সাঙ্গ হলে তারা পুরোনো পেঁজে যাওয়া শাড়ির পাড় ছাড়ান, পাড়ের নকশা বড় ভালো, বেলপাতা, ডুমুর লতা, শঙ্খ মানিক, কত তাদের নাম, কাঁথার চারিদিক মোড়া হবে এই পাড় দিয়ে। রান্না খাওয়া সেরে শীতলপাটি বিছিয়ে দুই বোন কাঁথা সেলাই করেন।
মহামায়ার নাতি ঘরে ফেরে,যাযাবরের ঘর, তার চালের খুদ আনে ফরিদা মাসি, প্রতিবার, তাই দিয়ে সে রাঁধে খুদটালা, আলু মাখে সরষের তেলে, আগের দিনের করমচা দেওয়া ডাল শুকিয়ে নেয়, শুকনো লংকা ভেঙে মাখে,শীলে বাটে ফুল চিংড়ি, ঝাল তাতে বেশ, শীলে দু দলা ভাত মেখে খায়। মৃদুল সেই কবে ক্ষেতের সাদা তিল পাঠিয়েছিলো, তাও বাটা হয়। হয় আরো রান্না, আজ রান্নাঘরে ম্যালা কাজ, হয় খেজুরছড়ি চালের ভাত, এই ভাত মোটা লাল চালের, সাথে মান বাটা,তাতে সরষে নারকেল আর লংকা। হয় কুমড়ো ডগা কাঁঠালদানা দিয়ে।
আবার ফেরা মহাময়ার রান্নাঘরে, জলের দিন আসছে, শোয়ার ঘর থেকে রান্নাঘরে আসতে উঠোনময় জল, ছোট ছোট ব্যাঙ লাফায়, রাত থাকতে সেই জলে পা দিতে হয় সাবধানে, সাপের ভয়, রান্নাঘরে এই সময় সঞ্চয়ের ভরসা, সেই খরদিনে হাঁড়িতে ছাতু, চিঁড়া সব যোগাড় করে মুখ বেঁধে রাখা, ছেলেপিলে স্কুলে যাবে, তাদের জন্য ছাতু মুড়ি দিয়ে দিলেই হবে, সকালে এখন উনুন ধরানো এক হ্যাপা, মাঝেমধ্যেই ঘুঁটে জলে ভিজে যায়, একটু বেলা হলে মাখনবালা সুস্থির হন, জলের দিনে তার বাতের বেদনা বাড়ে, রোদ উঠলে তিনি রান্নাঘরে আসেন, আজ ভাতের হাঁড়িতে খিচুড়ি হয়, মহামায়া গাছের কুল দিয়ে গুড় দিয়ে আচার বানিয়ে রেখেছেন, খিচুড়ি দিয়ে খাওয়া হবে। আজ তাড়াতাড়ি কাজ সেরে কাঁথাখানা শেষ করতে হবে।
১৩ ই আষাঢ়, ১৪৩৩
No comments:
Post a Comment