Wednesday, June 17, 2026

বাপের_বাড়ি

 আমার মায়ের একটা বাপের বাড়ি আছে। সেখানে তার বাপ মারা গেলেও বয়সের ভারে নুয়ে পড়া জুবুথুবু একটা মা আছে। আমার মা নিয়মিত তার বাপের বাড়ি যায়। ভায়ের বৌদের সাথে উনুনের পাশে বসে গড়ম পিঠে খায়, গল্প করে। সে বাড়িতে টিনের চালে রাতের বেলায় বাঁশের পাতা বেয়ে শিশির পরে। দিনের বেলায় ফুটো দিয়ে আকাশ দেখা যায়। সেই বাড়িতে বৃষ্টি হলে মাটির ঘ্রাণ পাওয়া যায়। শোলার বেড়ার ফাঁক দিয়ে তাকালে মধুদের বাড়ি দেখা যায়। বাড়ির পশ্চিমে একটা কল তলা আছে। তার পেছনে বাঁশঝাড়ের মধ্যে একটা কাচা পায়খানা! সেখানে না আছে দরজা না আছে ছাদ। উপরে তাকালে প্লেন দেখা যায় আর উঁকি দিলেই মানুষ! তবু সেই বাড়িতে আমার মায়ের একটা অধিকার আছে। সেই অধিকারের জেরে সে ভায়ের বৌদের কথা শোনাতে ও ছাড়েনা।

যাদুর মা বলতে আমার বাড়িতে যে চল্লিশউর্ধো মহিলাটি কাজ করে তারও নাকি রংপুরে একটা বাপের বাড়ি আছে। সেখানে তার বাপ মা দুটোই আছে। মেয়ে কামাই করে টাকা পাঠায় বাপ মা সেই টাকায় চলছে। সেদিন ওর বাপ ফোন দিসিলো। আমি তখন নাশতার টেবিলে। আয়েশ করে পরোটা দিয়ে ডিম পোঁচা খাচ্ছি। ঘর মুছতে মুছতে সে বললো, " বাপজান কইলেই তো আর আওন যায় না। নতুন কাম নিছি। গাছে আম ধরছে আপনেরা খাইতে থাকেন আমি এখানে কিনে খামুনে।" হঠাৎ গলার কাছে পরোটা আটকে গেল। মনে হলো, আমাদের বাড়িতে ও কত বিশাল চারটা আমের গাছ ছিলো। সেই আমের স্বাদ আমি ভুলে গেছি ততদিনে।
আমার ননদ নীলার ও একটা বাপের বাড়ি আছে। সেই বাড়িতে আমার বিয়ে হয়েছিলো বছর পাঁচেক আগে। ছবির মতোন সুন্দর সাজানো গোছানো একটা বাড়ি। ভেতরের উঠোনে গোলাপের ঝাড়। সন্ধ্যায় সেখান থেকে হুহু করে মন মাতানো এক মাতাল ঘ্রাণ ঘরে ঢোকে। মুল ফটকের সামনে দু'বছর আগে একটা শিউলী গাছ লাগিয়েছিলাম। সে নিয়ে আমার শাশুড়ির কি আপত্তি! উনার বাসায় আমার কোনো রকম হস্তক্ষেপ উনি সহ্য করতে পারেন না। অথচ আমি উনার একমাত্র ছেলের বউ। ওই বাড়ির পান থেকে চুনের সমস্ত খরচ পিয়াস বহন করে কিন্তু তবুও মা মেয়ে চান্স পাইলেই আমাকে বলে, শশুর বাড়িতে মেয়েদের কোনো অধিকার থাকে না। স্বামীর বাড়িতে বৌয়ের থাকে আর বাবার বাড়িতে মেয়ের থাকে। কথায় কথা বাড়ে তাই ওদের সাথে আমি কোনো রকম তর্কে জরাইনি। শুধু ও বাড়িতে যাতায়াত কমিয়ে দিয়েছি। যে বাড়িতে অধিকার নেই সে বাড়িতে যাওয়ার প্রশ্নই ওঠে নাহ।
নীলা বছরের লম্বা একটা সময় মেয়ে নিয়ে সেই বাড়িতে যায়। ওখানে ওর একটা ঘর আছে, কাপড় রাখার আলমারি আছে আর বড় একটা আয়না। ওর বাবা পিয়াস কে ফোন দিয়ে বলে, " পিয়াস টাকা পাঠাও তো বাবা হাজার পাঁচেক নীলা আসছে। বাজারে ফোন দিয়ে বলো নদীর বড় মাছটা দিয়ে যেতে। আমার শাশুড়ী দৌড়ে যায় দেশি মুরগীর ডিমের জন্য। অথবা কালো গাইয়ের দুধ! ঘরের পালা মুরগী জবাই হয়। ননদের আগমন উপলক্ষে চলে এলাহী আয়োজন! আমি কি অবাক হই? হিংসে হয়? হয় হয়তো। নীলা ঔ বাড়ির একমাত্র মেয়ে। আমি ও তো আমার বাড়ির বড় মেয়ে ছিলাম। ধ্রুব প্রথম নাতি!
আমার ও একটা বাপের বাড়ি আছে। আছে মানে ছিলো। ছিলো মানে এখনও আছে হয়তো। হয়তো না। আমি ঠিক জানি নাহ। ঐ বাড়িতে প্রায় ত্রিশ বছর আগে আমার জন্ম হয়েছিলো। ঐ বাড়ি থেকে আমার স্কুল কলেজ পাশ করা। পরে ওখান থেকেই আমার বিয়ে। এমন কি আমার প্রথম সন্তানের জন্ম ওই বাড়িতেই। আমি আব্বু আম্মু দিশা দিয়া সবাই একসাথে ওই বাড়িতে থাকতাম। হয়তো খুব সুখী পরিবার ছিলো না আমাদের কিন্তু একটা পরিবার অবশ্যই ছিলো। সেই পরিবারে নিত্য অশান্তি লেগেই থাকতো। সেই অশান্তির অবসান ঘটিয়ে একদিন আমার আব্বু আম্মু আলাদা হয়ে গেলেন। আম্মু আলাদা বাসা নিলো। তখন পাবনায় গেলে আম্মুর ভাড়া বাসায় উঠতাম। আব্বু কে দেখতে যেতাম ঠিকই। কি জীর্ণ শীর্ণ অবস্থা আব্বুর। চুল উশকো খুশকো। মুখ ভর্তি দাঁড়ি। খাওয়া দাওয়ার ঠিক নাই। দেখলে খুব মায়া লাগতো। মনে মনে বলতাম, কেন ভালো হয়ে চললে কি হয়? কেন আম্মুর উপরে এতো অন্যায় অত্যাচার করো? সে তো তোমাকে ভালোই বাসে। এতো অত্যাচার করলে কিভাবে সে তোমার সাথে থাকে! তাঁর ও তো জীবন!
বাবাকে কখনো মুখে কিছু বলতে পারিনি। মন খারাপ করে চলে আসলাম। মা কে যে বলবো ফিরে চলো সেই সাহস কখনো হয়নি। পিয়াস অবশ্য মাঝে মাঝেই বলতো। আমি চুপ করে থাকতাম। একদিন দেখলাম আব্বু চুল দাড়ি শেফ করে চকচক করতিছে। বাড়ি ঘর রঙ করা হচ্ছে। বুঝলাম, বাড়িতে নতুন মানুষ আসবে। মায়ের মলিন মুখটা মুখের সামনে ভেসে উঠতেছে। বত্রিশ টা বছর ওই বাড়িটা মা তার আঁচলের নিচে আগলে রেখেছিলো। বাড়ির সামনে সবজি বাগান করতো। আমি চোখ বন্ধ করলেই ওই বাগানে এখনো মা কে মরিচ, ঢেড়শ তুলতে দেখি। লাউয়ের মাচা বাধতে দেখি।
সেই থেকে আমার বাপের বাড়ি টা নাই হয়ে গেলে। আর কখনো যাইনি ওই বাড়িতে। কিভাবে যাবো? আম্মুর ঘরে আরেকজন মহিলাকে দেখতে নিশ্চয়ই আমার খারাপ লাগবে। যে রান্না ঘরে এতো বছর আমার মা রান্না করতো সেখানে অন্য একটা মহিলা ঘটি বাটি নাড়ে। যে খাটে আমার মা ঘুমাতো......! 😞😞
যাই হোক। পাবনাতেই আম্মু র ভাড়া বাসাতে আমরা যেতাম। একদিন শুনলাম সেই বাসা টাও ওরা ছেড়ে দিবে। এমন কি পাবনাও ছেড়ে দিবে। বিয়ের দিন আমি একটুও কাঁদিনি। বরং হাসতে হাসতে পিয়াসের হাত ধরে ওর গাড়িতে উঠেছিলাম। এই নিয়ে সবাই কতো রং তামাশা করলো। আজ কাঁদলাম। অঝোরে কাঁদলাম। বাপের বাড়ি ছাড়ার কষ্টে কাঁদলাম। পাবনা ছাড়ার কষ্টেও কাদলাম। আম্মু গিয়ে উঠলো খুলনায় দিশার কাছে। চাকরি সুত্রে দিশা খুলনায় থাকে। নেভাল কমিশন অফিসারের বিশাল কোয়ার্টারে। কি বড় বাসা! সে এলাহি কান্ড! দারুন নিরাপত্তা । কিন্তু সেই বাসায় আমি গিয়ে শান্তি পাই না। ওই বাড়িতে আমার আপ্যায়ন আছে ঠিকই কিন্তু অধিকার নেই। এতো ঝা চকচকে বাড়িতে আমরা বড় হইনি। আমার আব্বু আম্মুর বাসা নোংরা ছিলো কিছু আপন ছিলো।
আর এভাবেই ধীরে ধীরে একদিন আমার বাপের বাড়ি টা ও নাই হয়ে গেলো।আমার মায়ের বাপের বাড়ি আছে, যাদুর মায়ের ও বাপের বাড়ি আছে, নীলার ও বাপের বাড়ি আছে। শুধু আমারই বাপের বাড়ি বলতে কিছু নাই।



No comments:

Post a Comment