বৌদ্ধধর্মের বুদ্ধ কেবল সিদ্ধার্থ গৌতম নন, যার মূর্তি আমরা দেখি মঠগুলোতে। আসলে তিনি একাধিক বুদ্ধের মধ্যে একজন। মহাযান গ্রন্থে বুদ্ধত্বকে একটি সর্বজনীন এবং সকল প্রাণীর মধ্যে অন্তর্নিহিত গুণ হিসেবে বিবেচনা করা হয় (তথাগতগর্ভ ধারণা)। এই দৃষ্টিকোণ থেকে, বুদ্ধত্ব একটি আধ্যাত্মিক অবস্থা, যা বিভিন্ন ব্যক্তি বিভিন্ন সময়ে অর্জন করতে পারেন বা বিভিন্ন ব্যক্তির মধ্যে সেটা বিকশিত হয়। পালি ক্যাননেও পূর্ববর্তী বুদ্ধদের (যেমন দীপঙ্কর, কোণাগমন) উল্লেখ রয়েছে, যা ইঙ্গিত করে যে সিদ্ধার্থ গৌতম একমাত্র বুদ্ধ নন। মহাযান গ্রন্থে (যেমন তৈশো ত্রিপিটক, নম্বর ৪৩৯-৪৪৮) অমিতাভ, বৈরোচন প্রমুখ স্বর্গীয় বুদ্ধদের উল্লেখ পাওয়া যায়, যারা ঐতিহাসিক ব্যক্তি নন, বরং আধ্যাত্মিক প্রতীক।
বৌদ্ধ ধর্মগ্রন্থ পালি ক্যানন ও মহাযান সূত্রে উল্লেখ আছে অতীতের বুদ্ধেরা: যেমন বিপশী, ককুসন্ধ, কোনাগমন, কাশ্যপ, যাঁরা গৌতম বুদ্ধের আগে এসেছিলেন। ভবিষ্যতের বুদ্ধ: মৈত্রেয় (মেত্তেয়) নামে একজন ভবিষ্যতে আসবেন বলে বলা হয়। তাই ‘বুদ্ধ’ কোনো ব্যক্তির নাম নয়, বরং একটি উপাধি, যার মানে “জ্ঞানপ্রাপ্ত” বা “জেগে ওঠা” এটি এমন এক আধ্যাত্মিক অবস্থাকে বোঝায় যা অনেকেই অর্জন করতে পারে। তাই ‘বুদ্ধ’ একক ব্যক্তি নন, বরং একটি আদর্শ বা প্রতীকী চরিত্র হিসেবে ভাবা যায়।
বুদ্ধের ধর্ম বা বৌদ্ধ ধর্ম শুরুর সময় থেকে এই বিষয়টি সকলেই জানত। তাই ব্যক্তির অবয়ব দিয়ে বুদ্ধের মূর্তি তৈরি করা নিষিদ্ধ ছিল। সবচেয়ে পুরোনো বুদ্ধ মূর্তি পাওয়া যায় জামাল গারিতে যেটা বর্তমানের খাইবার পাখতুনখোয়ার পাহাড়ের কোলে যেটা পাক-আফগান সীমান্তে অবস্থিত। এই এলকাটি ১০০-১৫০ খ্রীস্টপূর্বে ইন্দো-গ্রীক সাম্রাজ্যের অধীনে ছিল। মূর্তি গড়ার বিষয়টি গ্রীক বা হেলেনিয় সংস্কৃতি থেকে যুক্ত হয়েছে বলে মনে করা হয়।
আমি মনে করি বুদ্ধ ধর্ম এসেছে প্রাচীন উত্তর ইরানের তুরান অঞ্চল খেকে। জরাস্ত্রীয়ান ঈশ্বর মানুষের মত নাকি জ্ঞান ও বোধের অজানা সত্ত্বা এই সংঘাত থেকে যার উৎপত্তি। সংস্কৃত/পালি ভাষায় "জ্ঞান" বা জাগরণ পারস্যের আবেস্তা ভাষায় "বাওধা" বা সচেতনতা একই অর্থ বহন করে। জ্ঞান একই মূল বোধ থেকে এসেছে যার অর্থ জেগে ওঠা। আবার সংস্কৃত/পালি ভাষায় "বুদ্ধ" মানে জ্ঞানপ্রাপ্ত ব্যক্তি অপর দিকে পারস্যের আবেস্তা ভাষায় "মাজদা" মানে প্রজ্ঞার প্রভু, উভয়েই প্রজ্ঞাকে দেবত্ব দেয় (জীবন্ত সত্ত্বাটিকে নয়)। যেমন সংস্কৃত/পালি ভাষায় ধর্ম (ধম্ম) নৈতিক সত্যবো বোঝায়। অপরদিকে পারস্যের আবেস্তা ভাষায় "আশা" যা মহাজাগতিক নৈতিকতাকে বোঝায়। যেগুলো আসলে একই।
মানুষ বিমূর্ত বিষয় বোঝার ক্ষমতা হারালে ধর্ম তার আধ্যাত্মিক ও ভাবগত মূল্যবোধ হারায়। তখন মানুষ হয় মূর্তি গড়ে পুজা করে অথবা ধর্মকে রছম বা আচার-অনুষ্ঠান বানিয়ে সেটা নিয়ে শয়তানের নৃত্য শুরু করে। তবে শুধু ধর্ম নয়, রাজনীতিতেও একই ঘটনা ঘটে কারণ সমস্যাটা মস্তিস্কের কগনিটিভ বা চিন্তাগত ক্ষমতার বিলুপ্তি সংক্রান্ত।
No comments:
Post a Comment